চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হ য ব র ল

৮ মার্চ বাংলাদেশে করোনা রোগী সনাক্ত হওয়ার পর থেকে সরকার ও বিভিন্ন পেশা শ্রেণির মানুষের সাহায্য সহযোগিতা ও উদ্যোগ নিয়ে যে শ্বাপদসংকুল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সে বিষয়ে প্রত্যেকটি সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞগণ আশংকা প্রকাশ করেছেন। সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশের পর ত্রাণ বিতরণে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কর্তৃক প্রায় ৬০ জন জনপ্রতিনিধিকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখনো দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি সরকার প্রদত্ত করোনায় ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য বরাদ্দকৃত ২৫০০ টাকা নিয়ে যে হযবরল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তার কিয়দংশ চিত্র ফুটিয়ে তোলা, দায়ী ও দোষীদের সম্বন্ধে অবগত করার উদ্দেশ্যেই লেখাটির সূত্রপাত।

জাতীয় দুর্যোগ কিংবা দুর্বিপাকে আপামর জনসাধারণের ঐক্যবদ্ধ এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দুর্যোগকে মোকাবেলা করার জন্য একযোগে মিলিতভাবে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষদের সহায়তা করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। তারই ফলশ্রুতিতে ঈদুল ফিতরের আগে মোবাইল ব্যাংকিং বিকাশ, রকেট, নগদ ও শিউর ক্যাশের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার নগদ ২৫০০ টাকা করে সহায়তা পাবে মর্মে করোনাভাইরাস মহামারীতে ক্ষতিগ্রস্থ ৫০ লাখ অসহায় পরিবারের মাঝে নগদ ১২৫৯ কোটি অর্থ সহায়তা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।

ক্ষতিগ্রস্থদের (ক্ষতিগ্রস্থ বলতে করোনার লকডাউনে যারা প্রকৃতই ভুক্তভোগী তাদেরকে চিহ্নিত করা হয়েছে) তালিকা করার দায়িত্ব মূলত জনপ্রতিনিধিদের, বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিদের, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ওয়ার্ড মেম্বারদের। কেননা, সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভার তুলনায় ইউনিয়ন পরিষদের অধীনে বসবাস করা মানুষের মধ্যে করোনার লকডাউনে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি।

তাই আলোচ্য অংশে ইউনিয়ন পরিষদের চিত্রকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে এবং স্বরূপ আলোচনা করা হয়েছে। কিন্তু ২৫০০ টাকা যাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তাদের তালিকা প্রকাশের পর ‍যে হযবরল চিত্র দেখা দিয়েছে সেটি কিন্তু সরকারের সদিচ্ছাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সরকার প্রধানও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা স্বত্ত্বেও ত্রাণ নিয়ে যে হযবরল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে সেটি জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা নিয়ে ভাবনার উদ্রেক ঘটায়।

তথ্য জানার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে, যেমন ধরুণ কোন বিবেচনায় ত্রাণ বিতরণের তালিকা তৈরি করেছেন, কাদেরকে সরকারি বরাদ্দ দিয়েছেন, কত কেজি চাল/গম/আলু বরাদ্দ দিয়েছেন ইত্যাদি সংক্রান্ত তথ্য পরিষদ থেকে চাহিবামাত্র প্রদান করা উচিত। কিন্তু আপনি যদি তথ্য সংগ্রহে পরিষদের আশ্রয় গ্রহণ করেন তাহলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সব তথ্য আপনি পাবেন না নিশ্চিত করে বলা যায় আবার অনেকসময় বলা হয় মূল কপি উপজেলায় জমা দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যে। কিন্তু মূল কপি জমা প্রদান করলেও অফিস কপি হিসেবে উক্ত মূল কপির ফটোকপি অফিসকক্ষে জমা থাকে সে বিষয়ে গ্রামের মানুষ তেমন জানে না বলেই জানা যায়।

আবার আগ্রহী হয়ে সাংবাদিক ভাইয়েরা ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে তেমন জবাবদিহীতার চর্চা না করায় জনপ্রতিনিধিরা স্বেচ্ছাচারিতার সুযোগ পায়। আবার অন্যদিকে দেখা যায়, সাংবাদিকদের সঙ্গে লিঁয়াজো করে জনপ্রতিনিধিরা তাদের নিজেদের মতো করে পরিষদ পরিচালনা করে থাকে এবং পরিপ্রেক্ষিতে সাধারণ মানুষরা সরকারি সাহায্য প্রাপ্তিতে অসুবিধায় পড়ে।

তথ্য না জানার অভাবে গ্রামের অধিকাংশ সাধারণ মানুষই ইউনিয়ন পরিষদে সরকার প্রদ্ত্ত সুযোগ সুবিধার বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়, কেননা অজ্ঞতা এবং না জানার অভ্যাসের কারণে গ্রামের মানুষেরা এখনো পিছিয়ে রয়েছেন। পরিচিত কয়েকটি সুবিধা যেমন বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, ভিজিডি, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, ১০ টাকা কেজি চাল, ভিজিএফ, মাতৃত্বকালিন ভাতা, গর্ভকালিন সুবিধা ইত্যাদি সম্বন্ধে সাধারণ মানুষ অবগত এবং ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সেবাগুলো পেয়ে আসছে। অভিযোগ রয়েছে উক্ত কার্ডের সুবিধাভোগী হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকা জনপ্রতিনিধিদের ঘুষ হিসেবে প্রদান করতে হয়, অবশ্য কিছু জায়গায় যে স্বচ্ছতা নেই সেটি কিন্তু সাহস করে বলা যাবে না।

সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, পরিস্থিতি কতটা নাজুক অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছে। যেটা গরিব মানুষের অধিকার, সেই অধিকার অর্জনের জন্যও উৎকোচ প্রদান করতে হয়। ‍উল্লেখ্য, এবারের ঈদে সরকার প্রদত্ত সহযোগিতা শাড়ি, লুঙ্গি প্রদানের দায়িত্ব ডিসিদের দেওয়া হয়েছে যেটি পূর্বে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত মানুষদের প্রদান করা হতো।

বিজ্ঞাপন

কাজেই, এ বিষয়টিকে নিয়ে আলোচনা সমালোচনার সুযোগ রয়েছে এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের জন্য আলোচ্য বিষয়টি অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রায়শই আলোচনা হচ্ছে, দেশ পরিচালনায় খুঁটি-নাটি প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিচালিত হচ্ছে যেখানে রাজনীতিবিদদের গৌণ ভূমিকা পরিলক্ষিত হয়।

কয়েকটি ইউনিয়ন পরিষদের তালিকা (২৫০০ টাকা বরাদ্দ) প্রদানের পর তালিকা দেখে ভুক্তভোগীদের নিয়ে জনমনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। কেননা যারা প্রকৃত অর্থেই বরাদ্দ পাওয়ার অধিকার রাখে তাদেরকে প্রদান না করে যারা আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ও সমাজে মোটামুটিভাবে প্রতিষ্ঠিত তাদেরকে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে দৃষ্টিকটুভাবে। দু’একজন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলা হলে তালিকা প্রদানের স্বচ্ছতার বিষয়টি তারা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। তবে একজন কার্ড বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রশাসনের সুপারিশ মানার নমুনার উদাহরণ টেনেছেন। জিজ্ঞেস করলে উত্তরে জানা যায়, বিভিন্ন সংগঠন এবং পরিষদের ব্যানারে প্রশাসনের বিভিন্ন ব্যক্তিদের নিকট ঐ সংগঠন এবং পরিষদের সদস্যদের কার্ড প্রদানের জন্য অনুরোধ জ্ঞাপন করা হয়ে থাকে।

প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের সুপারিশক্রমে জনপ্রতিনিধিরা উক্ত ব্যক্তিদের সরকারি বরাদ্দ প্রদান করে থাকে এবং সেখানে প্রকৃত ভুক্তভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছে। আবার কার্ড পাওয়া একজন ব্যক্তির নিকট হতে জানা যায়, চেয়ারম্যানের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় তিনি সরকারের বরাদ্দকৃত ২৫০০ টাকার কার্ড পেয়েছেন।

তবে এ ক্ষেত্রে ভোটারদের দায়ও রয়েছে, কারণ স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভোট কেনাবেচার যে চালচরিত দেখা যায় তা থেকে বোঝা যায় সাধারণ জনগণের উপর জনপ্রতিনিধিদের দায়-দায়িত্ব অনেকাংশ কম। তাই তো জনপ্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে আত্নীয়করণ, রাজনৈতিক দল বিবেচনায় নেয়া, ভোট ব্যাংকের হিসাব নিকাশ, ব্যক্তিগত সম্পর্কের উজ্জ্বলতা, স্থানীয় প্রভাবশালীদের গুরুত্ব প্রদান করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ইত্যাদি বিষয়গুলো মোটা দাগে চিহ্নিত করা যায়।

আর এসব কারণেই সাধারণ জনগণের সরকারি বরাদ্দ ও সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে গরমিল পরিলক্ষিত হয়ে থাকে। তবে অবস্থার পরিবর্তন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে, কেননা করোনার মহাদুর্যোগ সময়ে মানবিকতার মিশেলে জনপ্রতিনিধিদের আরো দায়িত্বশীল, নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীন আচরণের মধ্য দিয়ে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্থদের সরকার প্রদত্ত সুবিধাদি প্রদান করা জরুরী।

ইউনিয়ন পরিষদে প্রত্যেক ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যার আনুপাতিক হারে কার্ড প্রদানের বিষয়টি সুনিশ্চিত করা প্রয়োজন হলেও কোন নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো কার্ড দেয়া হয়। যেমন কোন ওয়ার্ডে ৮০ টি কার্ড বরাদ্দ দেওয়া উচিত সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১১০টি আবার কোন ওয়ার্ডে ৬০টি বরাদ্দ দেওয়া প্রয়োজন কিন্তু সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪০টি। এমন গরমিল কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না কারণ হিসেবে বলা যায় সংখ্যানুপাতে বরাদ্দ প্রদান করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে বলা যায়, চেয়ারম্যান মেম্বারদের ব্যক্তিগত পছন্দ, ভোট ব্যাংকের হিসাব নিকাশ করে সরকারি বরাদ্দ নিজের বাহাদুরি দেখিয়ে বরাদ্দ প্রদানের প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। এ সকল বিষয়ের সুষ্ঠু সুরাহা প্রয়োজন, জনগণকে সরকারি সুযোগ সুবিধা প্রদানের বিষয়ে সম্পৃক্তায়ন জরুরী এবং তথ্য অধিকার আইন সম্বন্ধে গ্রামের মানুষদের আরো বেশি সচেতন করার উদ্দেশ্যে সভা সেমিনারের আয়োজন করা উচিত। পরিশেষে শ্বাপদসংকুল পরিস্থিতিকে (করোনা মহামারী) কাটিয়ে আলোর পথে ধাবিত হওয়ার জন্য সরকারি নির্দেশনা মেনা চলাফেরা করা প্রয়োজন এবং এতদসঙ্গে দুর্নীতি বিরোধী কাজকর্মে বাস্তবায়ন সাপেক্ষে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ অবশ্যাম্ভাবী।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: