চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হো চি মিন এর দেশে ১

কয়েক বছর আগে আমার পরিচিত এক বড় আপার বেড়ানোর ছবি দেখে আমি হাঁ হয়ে গিয়েছিলাম। প্রকৃতি এমনও সুন্দর হয়! পৃথিবীর যে কোন প্রান্তের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য আমাকে চুম্বকের মতো টানে। কিন্তু শারীরিক এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতায় সব জায়গায় যাওয়া হয় না। কিন্তু ওই ছবিগুলো দেখে মনে মনে ঠিক করে রেখেছিলাম, প্রকৃতির ওই কোণে আমাকে যেতেই হবে। ছবিগুলো ছিল নয়নাভিরাম হা লং বে’র। এর আগে হা লং বে সম্পর্কে জানতাম না। কোন দেশের সম্পদ এটি তাও জানতাম না। নিজ কৌতুহল মেটাতে জেনেছি, ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় এর কাছেই এর অবস্থান। ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ এর তালিকায় রয়েছে হালং বে।

যত সুন্দর জায়গাই হোক, যেতে চাইলেই রওনা দেয়া যায় না। মনে মনে সময়-সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। এবার সেই কাংখিত সুযোগ মিললো। বেশ কয়েক মাস আগেই ঠিক করা ছিল, লম্বা ছুটি পেলে ধারেকাছের কোন দেশে বেড়াতে যাব। সেই তালিকার এক নাম্বারে ছিল ভুটান। কিন্তু একমাত্র ছেলে ভুটানে কেবল প্রকৃতি দেখে আনন্দ পাবে না আশঙ্কায় ছেলের বাবা তেমন সায় দিচ্ছিলেন না। তিনি বরং শ্রীলঙ্কা বা সিংগাপুর যেতে আগ্রহী ছিলেন।

সবুজ শহর হ্যানয়ে বনসাইগুলো চোখে পড়ার মতো

কোথায় যাব কোথায় যাব আলোচনা যখন চলছে সে সময়ে একদিন সাক্ষাৎ হলো আমার অতি প্রিয় এক কূটনীতিক আপার সঙ্গে। এক আড্ডায় তিনি ভিয়েতনাম সফরের আমন্ত্রণ জানালেন। তখন পর্যন্ত জানতাম না ঢাকা থেকে হ্যানয়ের দূরত্ব কত, খরচ কেমন। বেড়াতে যাওয়ার আগে যে বিষয়গুলো জানা খুব জরুরি। আপার প্রস্তাবটা মাথায় রেখে বিকল্পগুলোও ভাবছিলাম। যতই ভাবি, আমার নজর পড়ে আছে হা লং বে তে।

কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যই না, দিনে দিনে সেখানে বেড়ানোর সুব্যবস্থা সম্পর্কেও জানতে পারছি। হালং বে’র শান্ত জলে রাজহাসের মতো চলমান সাদা সাদা ক্রুজ শিপগুলোর ভিডিও দেখলাম একদিন। এই শিপগুলোতে করে হা লং বে ঘোরা ছাড়াও সেখানে জলের বুকে রাত কাটানোর সুব্যবস্থাও আছে! আমার কাছে এ যেন স্বপ্নের সফর।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ যেন স্বপ্ন! প্রসঙ্গে বলে রাখি, গত জানুয়ারিতে নেত্রকোনার বিরিসিরি বেড়াতে গিয়েছিলাম। তখন সেখানকার হাওর ছিল পানিশূন্য ধূ ধূ মরু। আমাদের খুব ইচ্ছা বর্ষার সময় হাওরে নৌকায় রাত কাটাই। স্থানীয়দের সঙ্গে সে বিষয়েই আলাপ চলছিলো। পতিদেবকে বর্ষায় বেড়ানোর আন্তরিক আমন্ত্রণ জানিয়ে বিনয়ের সঙ্গে তারা বললেন, ভাবীকে নিয়ে নৌকায় রাতে থাকা যাবে না। নিরাপত্তার সঙ্কটের কথা বলে প্রতিবেদককে একলাই আমন্ত্রণ জানালেন তারা! কথাগুলো শুনে রীতিমতো দমে গিয়েছিলাম। নিজেকে নিম্নশ্রেণীর মানুষ মনে হয়েছিল।

এই অভিজ্ঞতার পর জলের বুকে রাত কাটানো অধরা স্বপ্নই মনে হয়েছিলো। সেই স্বপ্ন যে হাতের এত নাগালে সেটা কল্পনা করিনি। যা হোক, ভাল-মন্দ নানা কিছু বিবেচনা করে ভিয়েতনাম সফরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলো। গত বছর থাইল্যান্ড সফরের অভিজ্ঞতায় এবার সফরের দু’মাস আগে প্লেনের টিকিট কাটা হলো। বেড়াতে যাওয়ার কাছাকাছি সময়ে বা ভিসা পাওয়ার পর টিকিট কিনতে বেশী দাম দিতে হয়। বেড়ানোর সময় এসব বিষয়েও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হয়। কারণ সফরের সময় প্রতিটি পয়সাই খুব মূল্যবান।

বিশেষ এই ফলটিকে ভিয়েতনামিরা ‘বুদ্ধের হাত’ নামে ডাকে

টিকিট করে দ্রুত গতিতে ভিয়েতনাম সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ খবর শুরু হলো। ইউটিউবে খুঁজে খুঁজে দেখা হলো সেখানে থাকার ব্যবস্থা, খাদ্যাভাস, যাতায়াত ব্যবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে। হা লং বে ছাড়াও সেখানে ঘোরার মতো স্পটগুলো সম্পর্কে খোঁজ চলতে থাকলো। এসব থেকে দেশটি সম্পর্কে জানাশোনা হলো অনেকটাই।

ছুটির তিন সপ্তাহ আগে ভিয়েনতামের ভিসার জন্য আবেদন করলাম। এখানে ভিসা প্রক্রিয়া বেশ সহজ। এক পাতার ভিসা আবেদনপত্রে নিজের সম্পর্কে কিছু তথ্য দিতে হয়। আবেদনপত্রের সঙ্গে পাসপোর্টের কপি, টিকিট করা থাকলে তার কপি, আর ছবি সংযুক্ত করতে হয়। ভিসা পেতে একটু সময় লাগে। ন্যুনতম ৭ কর্মদিবস। ‘অন এরাইভাল’ ভিসা করারও সুযোগ রয়েছে।

আমাদের তিনজনের ভিসা হওয়ার পর ঢাকা থেকে অনলাইনে হ্যানয়ে থাকার হোটেল বুকিং দেয়া হলো। হোটেল খরচ নাগালের মধ্যেই। আমরা যেহেতু পুরো সময় হ্যানয় থাকবো না সেটা চিন্তা করে দুই রাতের জন্য হোটেল বুকিং দেয়া হলো। ঢাকা-হ্যানয় সরাসরি কোন ফ্লাইট না থাকায় ভিয়েতনাম যেতে সময় লাগে বেশী। ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর বা কুয়ালালামপুরে ট্রানজিট থাকে।

আমাদের টিকিট ছিল সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সে। চেঙ্গি এয়ারপোর্টে সাড়ে তিন ঘন্টার ট্রানজিট। আমরা হ্যানয়ে পৌঁছালাম বেলা ১২টায়। সময়ের হিসাবে ভিয়েতনাম আমদের চেয়ে এক ঘন্টা এগিয়ে। সময়ের বিষয়ে আমাদের ছেলে ফিদেল বেশ সতর্ক। হ্যানয় পৌঁছে তার প্রশ্ন, হ্যানয়ে এখন ক’টা বাজে? সময় জেনে নেয়ার পর থেকে পুরো ট্রিপে বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনা করে সময় হিসাব করা তার প্রধান কাজ হয়ে গেল। তার ঘড়ি আবার ৮ মিনিট ফাস্ট! সে কারণে ভিয়েতনামের সময় বের করা তার জন্য একটু কঠিন হিসাব ছিল বৈকি! এই ফাঁকে বলে রাখি, এটা ফিদেলের তৃতীয় বিদেশ সফর। সফরের পরবর্তী সময়ে ট্যুরমেটরা কেউ কেউ তার সফরের লিস্টি শুনে চোখ কপালে তুলেছেন। এক অস্ট্রেলিয় নার্স বললেন, প্রথম বিদেশ সফরে যেতে তাকে ২০ বছর বয়স পর্ন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

হ্যানয়ে পৌঁছে এয়ারপোর্ট থেকেই মোবাইল ফোন সিম কিনলাম। যেহেতু এক সপ্তাহ থাকবো কিছু কাজে তো ফোন দরকার হবেই। যে শপ থেকে সিম নিলাম সেটা ওয়ান স্টপ সার্ভিসের মতো। এক জায়গাতেই ট্যাক্সি সুবিধা, হ্যানয়ের বাইরে বিভিন্ন এলাকায় ট্রিপের প্যাকেজ, ডলার ভাঙ্গানো ইত্যাদি সব সুবিধা রয়েছে। আমরা সিম কিনলাম, কিছু ডলার ভাঙ্গালাম এবং ট্যাক্সি নিলাম। এয়ারপোর্ট থেকে সেন্ট্রাল হ্যানয়ে হোটেলে পৌঁছাতে খরচ পড়লো ২২ মার্কিন ডলার। টাকায় হিসাব করলে অনেক।

হ্যানয়ে পা রেখেই যে যে জ্ঞান অর্জন করলাম তার অন্যতম হলো, দেশটি বাংলাদেশের চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত। তারা ইতিমধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে বিবেচিত। ঢাকার চেয়ে সবকিছুতেই খরচ বেশী। হ্যানয়ের সাধারণ মানুষ ইংরেজী জানেন না। জানাটা জরুরিও মনে করেন না। ৩ লাখ ৯ হাজার ২৭৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দেশটিতে জনসংখ্যা ৯ কোটি ২০ লাখ। কমিউনিস্ট শাসিত দেশটির ৭০ ভাগ মানুষ কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন না। বাকী জনসংখ্যার বেশীরভাগই বুদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ভিয়েতনামী ভাষায় কথা বলেন তারা। তাদের গড় আয়ু ৭৩ বছর (পুরুষ), ৮১ বছর (নারী)। মুদ্রার নাম ডং।

একদলীয় সরকার শাসিত দেশটির গণমাধ্যম পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। বর্তমানে সেখানে মূল্যস্ফীতি বেশ। ২০১৩ সালের হিসাবমতে ৪ কোটি ১০ লাখ ভিয়েতনামী ইন্টারনেট ব্যবহার করে। সেখানে মোবাইল অপারেটর মোট তিনটি।

১৮৫৯ সালে ফরাসিরা সেকানে কলোনি স্থাপন করে। ১৯৪০ সালে এসে জাপান ফরাসীদের কাছ থেকে ইন্দোচায়নার দখল নেয়। ১৯৫৪ সালে হো চি মিন ভিয়েতনামের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। ১৯৪৬ সাবে আবারো ফরাসীরা দেশটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। ফরাসী বিরোধী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। ১৯৫৪ সালে উত্তর এবং দক্ষিণে দুভাগ করা হয় ভিয়েতনামকে। দুই ভাগের মধ্যে বৈরি পরিস্থিতি বিরাজ করে দীর্ঘ দুই দশক ধরে। যেটাকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বা দ্বিতীয় ইন্দোচায়না যুদ্ধ বলা হয়। এ যুদ্ধে সাউথ ভিয়েতনামকে সহেযোগিতা করে যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৬৫ সালে তনকিন উপসাগরে মার্কিন দুই টহল জাহাজে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। পরে মার্কিন কংগ্রেস গালফ অফ তনকিন রেজুলেশন পাশ করে সামরিক হামলা শুরু করে। সেবছরই ২ লাখ মার্কিন সেনা সাউথ ভিয়েতনামে পৌঁছে। ১৯৬৬ সালে সর্বোচ্চ ৫ লাখ সৈন্য পাঠায় যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৬৯ সালে হো চি মিন মারা যান। ভিয়েতনামের প্রতিরোধ বাড়তে থাকায় নিক্সন সরকার সেখানে সেনাসংখ্যা কমাতে থাকে। ১৯৭০ সালে প্যারিসে বৈঠকে বসেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার এবং হ্যানয় সরকারের মুখপত্র লি ডুক তো। ১৯৭৩ সালে প্যারিসে শান্তিচিুক্তি স্বাক্ষরের পর সেনা প্রত্যাহার করে নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

১৯৭৫ সালে কমিউনিস্ট বাহিনী সায়গন শহর দখল করে। ১৯৭৬ সালে নর্থ এবং সাউথ পুনরায় যুক্ত হয়ে ঐক্যবদ্ধ ভিয়েতনাম গঠন করে। ভিয়েতনাম নিজেদের সমাজতান্ত্রিক দেশ হিসেবে ঘোষণা করে। সেসময় বহুমানুষ দেশ থেকে পালিয়ে যায় বিশেষ করে জেলে সম্প্রদায়ের মানুষরা বেশী সংখ্যায় পালিয়ে যায়।

১৯৭৯ সালে ভিয়েতনাম ক্যাম্বোডিয়ায় হামলা চালায় এবং পলপটের নেতৃত্বে খেমারুজ শাসনের অবসান ঘটায়। যার প্রতিউত্তরে চীনা সেনাবাহিনী উত্তরাঞ্চল দিয়ে ভিয়েতনামে প্রবেশ করে। কিন্তু ভিয়েতনামীরা তাদেরকে পুশব্যাক করতে সক্ষম হয়। ১৯৮৯ সালে ক্যাম্বোডিয়া থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহার করে ভিয়েতনাম। ১৯৯২ সালে তাদের নতুন সংবিধান প্রণীত হয়।

১৯৯৪ সালে এসে যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনামের উপর থেকে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৯৫ সাদের তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয় ২৪ বছর আগে। হ্যানয় শহর ঘুরতে ঘুরতে যখন বাংলাদেশ দূতাবাসের সামনে হাজির হলাম, কিছুক্ষণের জন্য আবেগতাড়িত হয়ে পড়েছিলাম। আহা আমার বাংলাদেশ, আমাদের লাল-সবুজ পতাকা। মহামান্য রাষ্ট্রদূত আপার কাছে সেদিন ঘুরতে ঘুরতে জানলাম দূতাবাসকে ভেতরে-বাইরে ঢেলে সাজাতে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন তিনি।

চলবে

বিজ্ঞাপন