চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হেফাজতের সাথে সমঝোতা নয়, প্রতিরোধই হোক

জামায়াতের সাথে জোট করেছিল বিএনপি। ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে জামায়াতের নেতা ও যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহম্মদ মুজাহিদ মন্ত্রিত্বও পেয়েছিলেন। সঙ্গতকারণেই কিছু প্রশ্ন জাগে বিএনপি কেন এমনটি করেছিল? জামায়াত ছাড়া কি তারা সরকার গঠন করতে পারত না। কেন ও কী কারণে তারা জামায়াতের নেতাদেরকে তাদের দলীয় প্রতীক ধানের শীষ তুলে দিয়েছিল? জামায়াত সঙ্গে বিএনপির কি এতে কোন রাজনৈতিক লাভ হয়েছে। হলে সেটা কী লাভ?

বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান। জামায়াত ও যুদ্ধাপরাধীদের সঙ্গে জোট করে দলটি হারালো তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বপক্ষ শক্তির সমর্থন। হারালো অসাম্প্রদায়িক সুশীল সমাজের সমর্থন।হারালো অনেক বৈদেশিক সমর্থন। বাইরের দেশের অনেক কূটনীতিক বিএনপিকে জামাত সঙ্গ ত্যাগ করতেও পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু বিএনপি তা শুনেনি। যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবীতে শাহবাগে গড়ে উঠলো এক বিশাল গণ আন্দোলন। জামায়াতের সঙ্গদোষে বিএনপির বিরুদ্ধে চলে গেল এই জনস্রোতটি।এক এক করে ফাঁসিতে ঝুললো বিএনপির মিত্র মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, কামারুজ্জামান, সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী ও কাদের মোল্লাদের মতো পরাক্রমশালী যুদ্ধাপরাধীরা। ২০১৪ সালের নির্বাচনে রাজাকারদের ভোট দেবেন না বলে রাজপথে নামল গণজাগরণ মঞ্চ। আর গণজাগরণ মঞ্চের এই ভূমিকাটিও বিএনপির বিরুদ্ধেই গেল। সঙ্গতকারণেই প্রশ্ন জাগে জামায়াতের জোটে কী পেলো বিএনপি আর এখন কী পাবে হেফাজতের সাথে সুর নরম করে?

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের বিপরীতে হেফাজতে ইসলাম রাজপথে উঠলো। বিএনপি তার নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিলো হেফাজতের পাশে দাঁড়াবার। আর দাঁড়ালোও। কী লাভ হলো বিএনপির এই দাঁড়ানোতে? হেফাজত শাপলা চত্বর হতে পিছু হটলো। অতঃপর কী দেখলাম হেফাজতে ইসলামের আমীর আহমদ শফী আবেগ গদগদ হয়ে শেখ হাসিনাকে কওমি জননী উপাধি দিয়ে দিলেন।বললেন, আগে কেউ আমাদের স্বীকৃতি দেয়নি। একমাত্র শেখ হাসিনাই আমাদের স্বীকৃতি দিলো। তিনি মঞ্চে উঠে শেখ হাসিনার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়াও করলেন। হেফাজত সঙ্গে পরবর্তীতে কী ঘটলো? হেফাজতের পক্ষ নিয়ে অনেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী হারালো তার অসাম্প্রদায়িক আদর্শ। ফিরে গেল বাতিল হওয়া আওয়ামী মুসলিম লীগের আমলে। হেফাজত পক্ষ নেয়ার দায়ে ঘটল বহিষ্কার ও দলত্যাগের ঘটনা। ঘটলো আওয়ামী লীগ নেতা কর্তৃক সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দিরে হামলার ঘটনা। জামায়াত যেমন বিএনপিতে মিশে গিয়ে বিএনপির সর্বনাশ ডেকে এনেছে হেফাজত কি আওয়ামী লীগের বেলাতেও তাই?

এখন দেশব্যাপী হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অভিযান চলছে। ২০১৩ সালের মামলায় গ্রেফতার হচ্ছে ২০২১ সালে। কেন আরও আগেই গ্রেফতার করা হলো না? হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হকের নারী কাণ্ড আজ টক অব দ্য কান্ট্রি। একের পর এক আলোচনায় আসছে তার নারী সঙ্গের বিষয়। তার নারী বিষয়ক অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়েছে বিভিন্ন মিডিয়ায়। এসব অডিও কথোপকথনকেও বিশ্বাস করল না মামুনুল হকের সমর্থকেরা। মিথ্যা ও বানোয়াট অডিও বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় গালাগালের ঝড় তুললো। কেউ ফেসবুক লাইভে এসে মামুনুলকে রুহানি বাবা দাবী করল।কিছুদিন যেতে না যেতেই মামুনুল হক তার এসব অডিওকে ব্যক্তিগত বিষয় বলল। তিনি স্বীকার করে নিলেন এসব অডিও কথোপকথন। সোশ্যাল মিডিয়া দূষিত হয়ে গেল মামুনুল পন্থীদের গালাগালে। তারা মামুনুল বিরোধীদের অকপটে নাস্তিক মুরতাদ বলে গালাগাল দিতে থাকলো। এসব গালিও নিশ্চয়ই তারা মামুনুলের কাছ থেকেই শিখেছে। অবশেষে মামুনুল হক মোহাম্মদ পুরের একটি মাদ্রাসা হতে আটক হল।মাদ্রাসার ভিতরে শিক্ষার্থীরা মামুনুলের পক্ষে মিছিলও করলো।

হেফাজত নেতা মামুনুল হক এদেশের অনেক বিশিষ্টজনকে গালিগালাজ করেছে। তিনি গালিগালাজ করেছেন শিক্ষাবিদ জাফর ইকবালকে, লেখক শাহরিয়ার কবিরকে, রাজনীতিক রাশেদ খান মেনন ও হাসানুল হক ইনুকে। এককথায় যারাই মামুনুল ও হেফাজতের বিরোধিতা করেছে তাদেরকেই নাস্তিক, মুরতাদ আখ্যা দিয়েছেন। মামুনুল হক শাহরিয়ার কবিরের মতো বিশিষ্ট জনকে বক্তৃতায় বলেছে, মুরগী চোরা শাহরিয়ার কবির। এসব গালিগালাজ কি ইসলাম সমর্থন করে? একজন মুসলমানকে নাস্তিক, কাফের আখ্যা দেয়ার অধিকার কে দিলো মামুনুলকে।

বিজ্ঞাপন

মামুনুলকে ঘিরে হেফাজতে ইসলামে শুরু হল দ্বিধাবিভক্তি। নায়েবে আমীর পদত্যাগ করলো। এর আগে হেফাজতে ইসলামের আমীর আহমদ শফীর মৃত্যুকে ঘিরেও শুরু হল দ্বন্দ্ব। দায়ের হলো হত্যা মামলা।আর সে মামলার চার্জশিটে আসামী হলো জুনায়েদ বাবুনগরী, মামুনুল সহ শফী বিরোধী হেফাজত নেতারা। এভাবেই ধর্মের নামে ঘরে বাইরে সংঘাত উস্কে দিচ্ছে হেফাজত নেতারা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ঘটলো নারকীয় ভাঙচুর যজ্ঞ। মানুষের জমির কাগজপত্র সহ সকল নথিপত্র পুড়িয়ে দিলো তারা। সরকারী, সাংস্কৃতিক ও জনগণের সম্পদে আগুন দিলো তারা। ধর্মের দোহাই দিয়ে নারায়ণগঞ্জের রিসোর্টে আটক মামুনুলকেও ছাড়িয়ে নিলো। এই ছাড়িয়ে নেয়াকেও তারা ভাবলো ধর্মের কাজ। হেফাজতে ইসলাম দেশব্যাপী এমনই এক ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট সৃষ্টি করে চলেছে। তাদের বিরুদ্ধে যে বা যারাই কথা বলবে তাদেরকেই তারা বলে দেবে ইসলাম বিরোধী।

হেফাজত ইসলাম আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাদের জানাজাকেও নাজায়েজ ফতোয়া দিচ্ছে। নিজের নারীসঙ্গের বৈধতার জন্য স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার জন্য মিথ্যে কথাও বলা যাবে। এমন ফতোয়াও দিচ্ছে। মাদ্রাসাগুলো চলছে রাষ্ট্রীয় নিয়মের বাইরে। এখানে জাতীয় সংগীত পর্যন্ত গাওয়া হয় না। প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উস্কে দিচ্ছে এখানকার শিক্ষার্থীদের। অনেক বিশিষ্টজনকে তাদের কাছে তুলে ধরছে নাস্তিক, মুরতাদ তথা ইসলামবিরোধী হিসাবে। ধর্মের নামে তাদের হাতে তুলে দিচ্ছে লাঠি। শান্তির ধর্ম ইসলামে নিয়ে আসছে আক্রমণাত্মক হিংস্রতা। এভাবেই ধর্মের দোহাই দিয়ে ধর্মের ক্ষতি করে চলেছে তারা।

হেফাজত একটা মারাত্মক ভাইরাসের মত ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র। সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়েছে, ভিপি নূরের কণ্ঠে হেফাজতের সুর। নূর বলছে,যারা আওয়ামী লীগ করবে তারা মুসলমান হতে পারে না। সেই হেফাজতের সাথে আওয়ামী লীগের মতো দলের কোন সমঝোতা হতে পারে না। তবে এই সমঝোতায় ও আস্কারায় এদের আসল রূপটা দেশবাসীর কাছে উন্মোচিত হয়েছে। যে মামুনুলকে সোনারগাঁয়ের রিসোর্ট কাণ্ডে পুলিশের হাত থেকে ছিনিয়ে নিল। এদের কী বলা যায়? এটা কি একটি অনৈতিক নারীসঙ্গের ধর্মের দোহাই দিয়ে পক্ষ নেয়া নয়? তারা এই কাণ্ডেও নারায়ে তাকবীর, আল্লাহু আকবর বলেছে। এভাবে আল্লাহ ও ধর্মকে টেনে এনে কি তারা মূলত আল্লাহ ও ধর্মকে উদ্দেশ্যবাজের শিকারই করছে না?

জামায়াত বিএনপিকে গিলে খেয়েছে। হেফাজত সমঝোতায় আওয়ামী লীগে ফিরে এসেছে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রেতাত্মারা। স্নায়ু দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে আওয়ামী লীগের অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শের অনুসারীদের সাথে সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ লালনকারীদের। অথচ আওয়ামী লীগে এসব সাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শদের থাকার কথা ছিল না। সুনামগঞ্জে হেফাজত পক্ষ নিয়ে হেফাজতের সমালোচনাকারীকে হেনস্থা করেছে আওয়ামী লীগ নেতা। পরে অবশ্য সমালোচনার মুখে এই নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছে দলটি। কেউ ধর্মের দোহাই দিয়ে হেফাজতের পক্ষ নিয়ে দলত্যাগও করেছে। ২০১৩ সালের মামলা এতদিন কেন ঝুলে থাকল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন এতদিন কোন আইনি ব্যবস্থা নিল না। এই প্রশ্নগুলো সংগতভাবেই উঠে আসে। যাক দেরিতে হলেও বোধদয় হয়েছে।

এবারের প্রত্যাশা আর সমঝোতা নয় প্রতিরোধ হোক। হেফাজতে ইসলাম ধর্মের নামে উদ্দেশ্যবাজী করে মূলত ধর্মের কোন উপকার নয় নিজেদের উদ্দেশ্যবাজী হাসিল ও ধর্মের চরম ক্ষতিই করছে। মানুষকে করছে বিভ্রান্ত ও হেফাজতের নিজের ঘরসহ দেশজুড়ে সৃষ্টি করছে বিশৃঙ্খলা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)