চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ দেখে ডাক্তার থেকে সফল কৃষক

নাম আতিকুর রহমান আতিক। প্রথম দেখায় তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কি করেন? ছোট উত্তর, পেয়ারা চাষ করি। তার তিন শব্দের উত্তরের মধ্যে চিন্তা করা মতো কিছুই ছিলো না। কিন্তু যখন বললেন এক মৌসুমে ৬৫ লাখ টাকার পেয়ারা বিক্রি করেছেন তিনি। ঠিক তখনই নড়েচড়ে বসা।

৬৫ লাখ টাকার পেয়ারা বিক্রি! অনেকটা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কতটুকু জমিতে তার বাগান, আর বাগানে কতগুলো বা পেয়ারা গাছ আছে। বাগানের পরিধির কথা বলতে পারলেও গাছের সংখ্যা তিনি বলতে পারলেন না। পারবেন কি করে। ৮০ বিঘা জমিতে কতটি গাছ সেটা গণনার সময় আতিকের কোথায়?

নিজের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে কৃষিতে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন আতিক। কৃষি মন্ত্রণালয়ে ও কৃষি অধিদপ্তর থেকে জাতীয় পর্যায়ে ২০১৪ সনে ‘ফলদ বৃক্ষ রোপণ ও পরিচর্যায়’ ব্যক্তি পর্যায়ে ১৫৩ জন কৃষকের মধ্যে প্রথম পুরস্কার পান আতিক।

একজন ডেন্টিস্ট থেকে সফল কৃষক হওয়ার পেছনে উৎসাহ হিসেবে কাজ করেছে কৃষি সাংবাদিক ও গণমাধ্যমব্যাক্তিত্ত্ব শাইখ সিরাজের ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান। বছর দুয়েক আগে সাফল্যের সূচনালগ্নে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’র টিম গিয়েছিলো আতিকের নাটোরের ঠাকুর লক্ষ্মীকুল পাবনাপাড়ার বাগানে। সেময় নিজের অভিজ্ঞতার কথা ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর কাছে জানিয়েছিলেন আতিক।

‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর মাধ্যমে তার সেই অভিজ্ঞতার কথা প্রচারের পর অনেকেই জানতে পারেন পরিচিত কৃষকের বাইরে ডেন্টাল মেডিকেলে পড়া এক তরুণ কৃষি উদ্যোক্তার কথা। এরপর অনেকেই গিয়েছেন আতিকের বাগানে। তার পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে বাগান করে লাভবান হয়েছেন তারা।

১৭ জুন পুরস্কার হাতে পেয়ে ১৮ জুন ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর টিমের সঙ্গে দেখা করতে আতিক এসেছিলেন চ্যানেল আই অফিসে। সেখানে বসেই চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা হয়।

চ্যানেল আই: কেমন আছেন?

আতিক: খুব ভালো।

চ্যানেল আই: পেয়ারা চাষে আপনার শুরুর সময়টার কথা যদি একটু বলেন। আর একজন ডাক্তার হয়েও কিভাবে আপনার মাথায় এই কৃষি ব্যাপারটি এলো?

আতিক: একজন কৃষকের সন্তান হিসেবে আগে থেকেই চাষ ব্যাপারটা মাথায় ছিলো। তারপর টেলিভিশনে স্যারের(শাইখ সিরাজ)‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান দেখে আমি অনুপ্রাণিত হই। এরপর ২০০৮ সালের শেষের দিকে শুরু করি।

চ্যানেল আই: কতটুকু জমিতে, কি পরিমাণ গাছ দিয়ে আপনার পেয়ারা চাষ শুরু হয় এবং এখন তার পরিমাণটা কত?

আতিক: আমি প্রথমে ৬ বিঘা জমিতে ১৫শ’ গাছ দিয়ে চাষ শুরু করি। এখন ৮০ বিঘার বাগান। তবে গাছের সংখ্যাটা নিশ্চিত করে বলতে পারবো না।

চ্যানেল আই: আপনার বাগানে কোন জাতের পেয়ারা চাষ হচ্ছে?

আতিক: সবই থাই (থাইল্যান্ড) পেয়ারা।

চ্যানেল আই: গাছ লাগানোর কতদিন পর থেকে আপনার মুনাফা পাওয়া শুরু হয় এবং পেয়ারা সাধারণত কোথায় বিক্রি হয়?

আতিক: গাছ লাগানোর ১৮ মাস পর থেকেই আমি মুনাফা পেতে শুরু করি। আর পেয়ারা আমাদের দেশের বাজারেই বিক্রি হয়। কারণ দেশে এখনো পেয়ারার প্রচুর চাহিদা। প্রতি বছরই বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এমনও দেখা গেছে, দেশের বাজারে আপেলের চেয়ে পেয়ারার চাহিদা বেশি।

চ্যানেল আই: এক মৌসুমে কতো টাকার পেয়ারা বিক্রি করতে পারেন? এখন আপনার অর্থের পরিমাণ কতো?

আতিক: এবার এক মৌসুমে ৬৫ লাখ টাকার পেয়ারা বিক্রি করেছি। আর অর্থের পরিমাণ অনেক(হাসতে হাসতে)।

চ্যানেল আই: আপনার বাগানে এখন কতজন কাজ করে? আর তারা কি মৌসুম ভিত্তিক কাজ করে, নাকি সারা বছরই কাজ করে?

আতিক: ৬০-৬৫ জন কাজ করে। এর মধ্যে ৩২ জন নারী। আমার বাগানের মাধ্যমেই তাদের কর্মসংস্থান হয়েছে। এছাড়া স্কুল-কলেজের অনেক দরিদ্র ছেলে-মেয়েরাও বাগানে খণ্ডকালীন কাজ করে। এদের সংখ্যা প্রায় ২৫ হবে। আর তারা সারা বছরই কাজ করে থাকে। কারণ এই থাই পেয়ারার নির্দিষ্ট কোনো মৌসুম নেই। চাষীর ইচ্ছার ওপরই মৌসুম নির্ভর করে।

বিজ্ঞাপন

চ্যানেল আই: সব রকম চাষেই তো আজকাল কীটনাশকের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। কিন্তু আপনার বাগানের পেয়ারা কি বিষমুক্ত? আর বিষমুক্ত রাখতে আপনি কি করেন?

আতিক: হ্যাঁ, আমার বাগানের পেয়ারা শতভাগ বিষমুক্ত।একটি পেয়ারা লাটিম আকৃতির(১০০-১৫০ গ্রাম) হওয়ার পর পলিথিন দিয়ে মুড়ে দেই যাতে করে কোনো রকম পোকা-মাকড় এর ক্ষতি করতে না পারে। ফলে এখানে কোনো রকম কীটনাশক ব্যবহার করতে হয় না। এতে পেয়ারাটি বিষমুক্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিমানের খাদ্যে পরিণত হয়। এছাড়া পেয়ারা পাতাসহ ছিঁড়লে এমনিতেই ২-৩ দিন ভালো থাকে। দেশের বাজারে বিক্রি করতে তাই ফরমালিনও ব্যবহার করতে হয় না।

চ্যানেল আই: বিদেশে পেয়ারা রফতানির কোনো ইচ্ছে আপনার আছে কিনা?

আতিক: আপাতত নেই। আমার প্রধান ইচ্ছে হলো দেশের চাহিদা পূরণ করা। দেশের মানুষের জন্য যথাসাধ্য পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ফল সরবরাহ করা।

চ্যানেল আই: আপনি বলছিলেন যে, পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ ফল সরবরাহ করা। পেয়ারার বাইরেও কি আপনার অন্য ফলের বাগান বা গাছ আছে?

আতিক: হ্যাঁ, পেয়ারার পাশাপাশি আমার ৫০০ ড্রাগন ফলের(ফিলিপিনো ফল) বাগান আছে। সেই সঙ্গে পেয়ারার বাগানের চারদিকে বেড়া হিসেবে ১২ বিঘাতে ১২শ’ এলাচি লেবুর গাছ লাগিয়েছি। এ থেকে আর্থিকভাবেও আমি লাভবান হচ্ছি। এছাড়া ১০ বিঘা জমিতে একটি আমের বাগান আছে। আছে একটি স্ট্রবেরির বাগানও।

চ্যানেল আই: আপনি শুরুতে বলেছিলেন যে, ৬ বিঘা জমিতে পেয়ারার চাষ শুরু করেন। এখন বাগানের পরিধি ৮০ বিঘা। এই সবই জমিই কি আপনার নিজের?

আতিক: না, এরমধ্যে নিজের জমি আছে ৪০ বিঘা। বাকি জমি লিজ নিয়েছি।

চ্যানেল আই: আপনি একজন ডাক্তার থেকে সফল কৃষকে পরিণত হয়েছেন। আর্থিকভাবেও বেশ ভালো অবস্থায় আছেন। আর্থিক দিকটা বাদে আর কোন দিকটা আপনাকে সুখী করেছে?

আতিক: মানুষ যে কাজই করুক। প্রথমে সবাই চায় আর্থিকভাবে লাভবান হতে। এরপর আসে সামাজিক সম্মানের ব্যাপারটি। অর্থছাড়া আমি সামাজিক যে সম্মান পেয়েছি সেটা নিয়ে আমি সুখী এবং গর্বিত।

চ্যানেল আই: আপনার অবস্থানে দাঁড়িয়ে দেশের বেকার তরুণদের ব্যাপারে কি বলবেন?

আতিক: বেকার তরুণদের এটাই বলতে চাই যে, হতাশ হওয়ার কিছু নেই। আমাদের দেশটা খুবই সম্ভাবনাময় দেশ। শুধু ইচ্ছা শক্তি এবং কাজের মানসিকতা থাকলে এদেশেই অনেক কিছুই করা সম্ভব। যেমন আমার দেখাদেখি, আমার কাছ থেকে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ নিয়ে এলাকার ২০০ বেশি যুবক বাগান করে লাভবান হয়েছে। সেই সঙ্গে তারাও অনেক বেকারদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছে।

চ্যানেল আই: আপনার পরিবার নিয়ে যদি একটু বলেন

আতিক: পরিবারে আমরা স্বামী-স্ত্রী ছাড়াও আমার মা-বাবা, ছোট বোন এবং এক ছেলে এক মেয়ে আছে। কোনো ভাই নেই। বোনকে কৃষিতে অনার্স পড়াচ্ছি।

চ্যানেল আই: ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ ছাড়াও আর কোন জায়গাটা আপনার উঠে আসার পেছনে কাজ করেছে?

আতিক: উৎসাহের পেছনে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ই মূলত প্রধান। তবে নাটোরের কৃষিবিদ মোঃ আওয়াল আমাকে বেশ সাহায্য করেছেন। তার অধীনে ‘সমন্বিত ও মানসম্মত উদ্যান প্রকল্পের’ আওতায় ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে পেয়ারা চাষের নতুন নতুন পদ্ধতি শিখেছি।

চ্যানেল আই: আপনি বলছিলেন নতুন নতুন পদ্ধতি। কী কী পদ্ধতিতে পেয়ারা চাষ করেন?

আতিক: যেমন ধরেন, প্রথমদিকে শুধু বীজ থেকে গাছ উৎপাদন করতাম। নতুন পদ্ধতি শেখার ফলে এখন কলম পদ্ধতিতেও চাষ করছি। কলম পদ্ধতিটা অনেক সময় সাশ্রয়ী।

চ্যানেল আই: কথার শুরুতে আপনি ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ দেখে নিজের উৎসাহের কথা বলছিলেন। এখন তো আপনি একজন সফল কৃষক। সামাজিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত। এই জায়গা থেকে ‘হৃদয় মাটি ও মানুষ’ নিয়ে কি বলবেন?

আতিক: কৃষিকাজ নিয়ে প্রথম দিকে আমার মধ্যে যতটুকু নেতিবাচক ধারণা ছিলো ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ দেখে সেটা মুছে গেছে। কৃষি প্রধান বাংলাদেশে ‘মাটি ও মানুষ’ প্রাণের স্পন্দন ফেরানোর কাজ করছে। আর সুস্থ-সবল মানুষ আর সুখী সমৃদ্ধ দেশ গড়তে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’-এর মতো অনুষ্ঠান যুগ যুগ ধরে অব্যাহত থাকা দরকার।

চ্যালেন আই: মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
আতিক:
আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন