চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হিরো আলম এবং আমাদের ক্ষয়িষ্ণু সমাজ

আমাদের বড়আব্বার (দাদীর বাবা) গায়ের রং এমন কালো ছিল যে, সেটা বাদামি টাইপের অন্য একটা বর্ণের মতো হয়ে গিয়েছিল। সে কারণেই হয়তোবা আমার দাদির গায়ের রংও ছিল একইরকম কালো।  তারই বড় ছেলে আমার আব্বারও গায়ের রং যথারীতি কালো ছিল। তারই ধারাবাহিকতায় আমারও গায়ের রং মাশাআল্লাহ কালোই। তবে হ্যাঁ, আমার নানা-নানির ও আমার মায়ের গায়ের রং ছিল খুবই ফরসা। আমি আমার জীবনে আমার মায়ের মতো গায়ের রঙের কোনো মেয়ে এখনো দেখিনি। কেন যে আমি মায়ের দিকে না গিয়ে বাবার দিকে গেলাম সেটা সৃষ্টিকর্তাই ভালো বলতে পারবেন কিন্তু আমি আমার বুদ্ধি হবার পর থেকে কখনই বুঝতে পারিনি গায়ের রং আবার আলোচনার বা বঞ্চনার একটা বিষয় হতে পারে। কারণ আমি আমার দাদির বংশের সবচেয়ে বড় নাতি ছিলাম, তাই আদর-যত্নের কমতি কখনই ছিল না। দাদির ছয় চাচার এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে ও তাদের ছেলের বউদের আমি জন্মগতভাবেই দাদা-দাদি হিসাবে পেয়েছিলাম আর তারা আমাকে কখনোই কোলছাড়া করতেন না। এটা আমি ছোটবেলায় খুবই উপভোগ করতাম।

এরপর নদী ভাঙনে আমাদের ভিটেমাটিসহ প্রায় সব সম্পত্তিই কয়েক রাতের ব্যবধানে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেল। তখন আবার নতুন করে আমাদের ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে হলো। এ সময় আমার দাদী তার জীবনের সবচেয়ে দুঃসাহসী ও ভালো সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন। যেহেতু এভাবে নদী ভাঙন লেগেই থাকবে তাই একটা স্থায়ী বাসস্থান করার জন্য তিনি শহরে একটা জায়গা কেনার কথা চিন্তা করেন। তখন আমাদের জন্য শহরতলিতে একটা জায়গা কেনা হলো আর আমার আব্বাকে আমাদেরসহ পাঠিয়ে দেওয়া হলো ওই জায়গায় বসবাস করার জন্য। আর অন্য সবাইকেসহ দাদী থেকে গেলেন গ্রামের নতুন বাড়িতে।

বিজ্ঞাপন

শহরতলিতে এসে প্রথমবারের মতো অনুভব করলাম আমার গায়ের রং অন্যদের থেকে আলাদা আর সেটা হচ্ছে আমি বেজায় কালো। আমার চেহারা ও গায়ের রং নিয়ে ঠাট্টা করে যে নামগুলো আমাকে দেওয়া হয়েছিল তার দু-একটা এমন—‘কালো ভূত’, ‘কালিনী’, ‘কালীর স্বামী’. ‘কালো কুত্তা’ ইত্যাদি। এ সব শুনে আমি অনেক মন খারাপ করতাম এবং হীনমন্যতায় ভুগতাম। কারণ এর আগেতো আমাকে কেউ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়নি যে, আমি অন্যদের তুলনায় গায়ের রঙে নিচু এবং সমাজে আমার অবস্থানও হবে সবার নিচে। আর আমাকে সব সময় সবার খোঁটা সহ্য করেই বেড়ে উঠতে হবে। এ ব্যাপারটা আমার মাকেও আঘাত করেছিল। কারণ মাও আড়ালে এটা নিয়ে কান্নাকাটি করতেন এবং আমার সামান্য অপরাধের শাস্তি হতো মারাত্মক। কারণ গায়ের রঙের কারণে মাকেওতো অনেক খোঁটা হজম করতে হতো। তা ছাড়াও আমার আরও কিছু উপাধি ছিল যেমন- তিন মাথারি (আমার মাথার আকৃতি তিন কোণা বলে), শিং ওয়ালা (আমার মাথার পেছন দিকে দুইটা শিং আছে), বান্টা (দশম শ্রেণি পর্যন্ত আমি ছিলাম বেশ খর্বকায়)।

বিজ্ঞাপন

এইবার আসি আমার পোশাক পরিচ্ছদের বিষয়ে। আমাদের সময়ে তৃতীয় অথবা চতুর্থ শ্রেণীর বাংলা পাঠ্যপুস্তক আমার বইতে শেখ সাদীর একটা গল্প ছিল। গল্পের নামটা এখন আর মনে নেই। তবে গল্পের বিষয়বস্তুটা এখনো খুব পরিষ্কার মনে আছে। শেখ সাদীকে কোন একটা অনুষ্ঠানে দাওয়াত করা হয়েছিল। তিনি খুব সাধারণ পোশাক পরে সেই দাওয়াত খেতে গেলেন। তখন তাকে আর দশজন সাধারণ অতিথির মতোই আপ্যায়ন করা হল। কিছুদিন পরে আবার তাকে সেই একই অনুষ্ঠানে দাওয়াত করা হয়। এইবার তিনি অনেক সুন্দর পোশাক পরে সেই দাওয়াত খেতে গেলেন। তখন তাকে অনেক ভালো ভালো খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করা হল। শেখ সাদী তখন সেই ভালো ভালো খাবার তার পোশাকের মধ্যে ভরতে শুরু করলেন। আমি তখন কোনভাবেই বুঝে উঠতে পারি নাই কেন উনি এমন করেছিলেন। তখন উপস্থিত সবাই এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে উনি বললেন আগের দিন আমি সাধারণ পোশাক পরে এসে এইসব খাবার পাই নাই। আজ এই সুন্দর পোশাক পরে আসার কারণেই এত ভালো ভালো খাবার পাওয়া যাচ্ছে তাই এইসব খাবার এই পোশাকেরই প্রাপ্য। এই গল্পটা এবং এর সাথে হাশেম খানের আঁকা একটা ছবিও ছিল। এখনো আমার পরিষ্কার মনে পড়ে সেগুলো।

নিজের গায়ের রং এবং চেহারা নিয়ে আমার মনে কখনই কোন জটিলতা ছিল না এখনও নেই। আর পোশাক আমার কাছে সারাজীবনই লজ্জা নিবারণের বস্তু হিসেবেই বিবেচ্য কিন্তু একটু বড় হয়ে যখন শহুরে ভদ্র সমাজে ঢুকে পড়লাম মুশকিলটা শুরু হল তখন থেকে। আমার চেহারা এবং পোশাক পরিচ্ছদ দেখেই সবাই ধরে নেয় আমি সর্বোচ্চ গরুর রাখাল হতে পারি এর বেশি কিছু নই। বিশেষকরে কেনাকাটা করতে গিয়ে অনেকবারই এমন সব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি যেটা নিয়ে পরে অনেকবার হেসেছি। একবার উত্তরা হাউস বিল্ডিঙের নামকরা এক শপিং মলের একটা দোকানে গেছি প্যান্ট কিনতে। দোকানি ছেলেটা প্যান্ট দেখানো শুরু করলো। আমি একটু ভালো কিছু দেখাও বলে অন্য দিকে রাখা প্যান্টগুলার দিকে ইঙ্গিত করতেই সে উচ্চস্বরে বলে উঠলো ঐগুলোর দাম এত টাকা। মানে ব্যাপারটা হচ্ছে, তুমি বাপু রাখাল মানুষ এই প্যান্ট তুমি কিনতে পারবে না। আমি ছেলেটাকে কোন দোষ দেয় না। এটাই আমাদের ভদ্রসমাজের ভদ্রলোক মাপার মাপকাঠি। যার পোশাক যত ভালো তার স্ট্যাটাস তত উঁচু। আমি যেহেতু কখনই ভালো কোন পোশাক পরি নাই তাই আর একজীবনে ভদ্রলোক হতে পারলাম না এখনও।

এইবার আসি হিরো আলম প্রসঙ্গে। হিরো আলমের যখন প্রথম ভিডিওটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলো, তখন থেকেই আমি এই মানুষটার সকল কর্মকাণ্ড অনুসরণ করতে শুরু করলাম। ফেসবুকে উনার পেজ খুঁজে বের করে লাইক দিয়ে রাখলাম যাতে করে উনার কর্মকাণ্ডের নিয়মিত আপডেট পেতে পারি। শুরুতেই বাংলাদেশের মিডিয়া এবং সেলিব্রেটিরা উনাকে নিয়ে যাচ্ছেতাই ভাষায় তিরস্কার করা শুরু করলেন কারণ উনার প্রথমত চেহারায় তথাকথিত হিরোসুলভ কোন ব্যাপার নেই, দ্বিতীয়ত উনার পোশাক এবং ভাষা আমাদের শহুরে সমাজের ভাষায় প্রচণ্ড ক্ষ্যাত বা গাইয়া। আমি শুধু উনার ভিডিওগুলো দেখতাম আর ভাবতাম একজন মানুষের মনে ঠিক কতখানি শক্তি থাকলে পুরোপুরি স্রোতের প্রতিকূলে চলতে পারেন। আমি আগের অনুচ্ছেদ্গুল লিখেছি সে কারণেই। বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় শহর এবং গ্রামের জীবনযাপন প্রণালীর মধ্যে বিস্তর ফারাক। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় শহর এবং গ্রামের মধ্যে একটা দেয়াল আছে যেটা ভেদ করে শহুরে আভিজাত্য যেমন গ্রামে ঢুকতে পারে না ঠিক তেমনি গ্রামের স্নিগ্ধতা শহরকে স্পর্শ করে না।

শহরের সবকিছুই কেন জানি বড্ড মেকি, বড্ড লোক দেখানো। শহরের কাজকর্মের বেশীরভাগই করা হয় স্ট্যাটাস রক্ষা করতে বা পাছে লোকে কিছু বলবে’র ভয়ে। এছাড়াও তৈরি হয়েছে একটা মেকি সভ্যতার। শহুরে মানুষদের ধারণা এই ধরাধামে শুধুই তাদের রাজত্ব আছে বাকিদের কোন অস্তিত্ত্বই নেই। শহরের মানুষজন বাজারে যেয়ে বইয়ের পাতার রঙের ফল খুঁজে তাই আম, লিচু, কলা বিক্রেতা তার ফলে কার্বাইড মেশায় যদিও প্রকৃতিগতভাবে তখনও সেই আম বা কলার পাকার বয়স হয়নি। তরমুজ বিক্রেতা সিরিঞ্জের মাধ্যমে লাল রঙ পুশ করে যাতে তরমুজ হয় টকটকে লাল আর খুচরা শশা বিক্রেতা শশাটা কেটে সবুজ রঙের মধ্যে চুবিয়ে নেন। এছাড়াও মাছ বিক্রেতা মাছের কানকো লাল করেন রঙ দিয়ে আর পশু বিক্রেতা পশু মোটাতাজা করেন ক্ষতিকর ইনজেকশন দিয়ে। এই অভ্যাসটা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে এখন আর এর থেকে বের হবার উপায় নেই। এসবের জন্য আবার দোষ দেয়া হচ্ছে বিক্রেতা বা উৎপাদনের সাথে জড়িত কৃষককে। আমি আমার ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি একজন কৃষক তার ক্ষেতের সবচেয়ে ভালো সবজি বা ফলটাই বাজারে পাঠান বিক্রি করতে আর খারাপগুলো রেখে দেন নিজের সংসারে খাওয়ার জন্য। যাইহোক এখন মানুষ কিছুটা হলেও সচেতন হচ্ছে এইটাই আশার কথা। এইসব কৃত্রিম রঙ মেশানো জিনিসের বাজার চাহিদা না থাকলে সেগুলো এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।

বিজ্ঞাপন

প্রসঙ্গ থেকে দুরে চলে গিয়েছিলাম। হিরো আলমের সমালোচনা করে যখন তাকে আর আটকানো গেলো না তখন তাকে পণ্য বানিয়ে ফেলা হলো কারণ পুঁজিবাদের অন্যতম অস্ত্র হচ্ছে নেগেটিভ মার্কেটিং। এতে করে তাকে নিয়ে যারা শুরুতে নাক সিটকাতো সেইসব মানুষই তার পাশে দন্ত বিকশিত করে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলে রাতারাতি নিজেকে উদার এবং সংস্কৃতিমনা প্রমাণ করতে শুরু করলো। তাকে নিয়ে নির্মাণ শুরু হলো অনেক সাক্ষাৎকারের। এইসব সাক্ষাৎকারে উনি কোন প্রকার রাখঢাক না করেই একেবারে বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে শুরু করলেন এবং নিজের জীবনের সংগ্রামের কথা বলা শুরু করলেন অকপটভাবে। এতে করে শহুরে শিক্ষিত মানুষেরা আহা উহু করা শুরু করলো। ব্যাপারটা এমন যে, তাই না কি গ্রামের জীবনযাপন তো আসলেই অনেক কঠিন কিন্তু এদের সবারই শিকড় কিন্তু সেই গ্রামেই গ্রথিত। মাত্র দু-এক প্রজন্ম পিছনে ফিরে গেলেই দেখা যাবে তাদের বাপ দাদারা কেউ না কেউ কৃষক ছিলেন। এখন পর্যন্ত আমি হিরো আলমের মোটামুটি সবগুলো সাক্ষাৎকার দেখেছি। বরাবরই উনি সৎ এবং সাহসী ভুমিকা রেখেছেন। আর একটা কথাও উল্লেখ করতে ভুলেন নাই, সেটা হলো আমি আপনাদের ভালোবাসায় আজ হিরো আলম। সম্প্রতি উনি ভারত সফরে গিয়েছিলেন সেখানে একটা স্টেজ শোতেও একই কথা বলে এসেছেন।

একসময় জানতে পারলাম উনি একটা বই লিখছেন। জেনে খুবই উৎসাহিত বোধ করছিলাম। আর প্রহর গুনছিলাম কবে উনার বইটা হাতে পাবো। বাংলাদেশ থেকে অস্ট্রেলিয়াতে বই নিয়ে আসা একইসাথে খুবই ঝক্কির এবং খরুচে। বইয়ের যা দাম তার চেয়ে বহুগুণ খরচ পরে ডাকে বই আনতে। তাই আমি যেই দেশে যায় তাকেই হিরো আলমের বইটা আনতে বলতাম। বিপুল দাদা দেশের গিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়াতে উনার কাছে আবদার করলাম। দাদাও সানন্দে রাজি হয়ে গেলেন এবং বইটা এনে রেখেছেন উনার কাছে কিন্তু সিডনির যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় আমাদের দুজনের আর দেখা হয়নি এরপর। এছাড়াও আমি শ্যালক আদনানকে বলে রেখেছিলাম বইটা আনার জন্য। অবশেষে উনার কাছে থেকে হাতে পেলাম ‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলান আমরা সমাজকে বদলে দেবো’। এছাড়াও প্রচ্ছদে আরও একটা লাইন লেখা আছে ‘বিখ্যাত হতে আসিনি, শুধু দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে চেয়েছি’।

এই বইয়ে আলম কথা বলেছেন ছাত্রদের ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলন নিয়ে; মিডিয়া নিয়ে; কথা বলেছেন সুবর্ণচরের ধর্ষিতা গৃহবধূকে নিয়ে; নির্বাচন নিয়ে, শিশু ধর্ষণ ও আত্মহনন নিয়ে। কোন সামাজিক বিজ্ঞানীর মতো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যার দিকে তিনি যাননি; সেটা তার পক্ষে সম্ভবও না। বরং এগুলোকে সে তার নিজের জীবন যুদ্ধের সাথে তুলনা করে আশাবাদের কথা বলতে চেয়েছেন এবং অনেকক্ষেত্রে ভালোই বলেছেন। আলমের ব্যবসায়িক বুদ্ধি আমাকে মুগ্ধ করে। গ্রামের লোকদেরকে নিয়ে স্বল্পমূল্যে দেশের দর্শনীয় স্থান ভ্রমণের উদ্যোগটা তাকে লোকজনের কাছে জনপ্রিয় হতে সাহায্য করেছে। সে তার চেহারা নিয়ে কথা বলে কিন্তু অভিনয় শেখার ব্যাপারে তার কোন উদ্যোগ আছে কিনা বলে না। অথচ বুক ফুলিয়ে বলে বেড়ায় সে হিরো; অভিনয় করেই যাবে! শুধুমাত্র রিয়েল লাইফ হিরো নয় একই সাথে নিজেকে মিডিয়ার হিরোও দাবি করে। এর পেছনে কারণ হতে পারে ভুল আত্মবিশ্বাস; বন্ধুদের উৎসাহ; চাটুকারদের স্তুতিবাক্য কিংবা আমাদের অভিনয়ের স্ট্যান্ডার্ড। বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যেমন ভয়ঙ্কর প্রতিভাবান অভিনেতা অভিনেত্রী আছেন তেমন অভিনয় না জানা লোকেরাও করে খেয়েছে, খাচ্ছে। এই অভিনয় না জানা লোকরাই আলমের উৎসাহের জায়গা। এজন্যে আলম একজন হাসমত কিংবা দিলদার না হতে চেয়ে হিরো হতে চান। অভিনেতা না হয়ে স্টার হবার দিকে ওর মনোযোগ। এটা সোসাইটির বর্তমান প্যাটার্ন। আলমের এই দৃষ্টিভঙ্গিতে কোন ভিন্নতা নেই।

শিক্ষিত লোকজনের দিকে আলম যে প্রশ্নগুলো ছুড়ে দেয় বর্তমান প্রেক্ষিতে সেগুলো সবই সঠিক। এ প্রশ্নগুলো যে কেউ করতে পারে। কারণ কোথাও পচন ধরলে ওটা আবিস্কারের জন্যে বিজ্ঞানী লাগে না। ‘অন্যের ব্যর্থতায় ভর করে নিজের উন্নতি’ এরকম একটা কালচার আমরা বানিয়েছি দেশে। রাজনীতি থেকে শুরু করে অনেকক্ষেত্রেই এটা ফলো হচ্ছে। আলমের এই হিরো হয়ে ওঠাও এই কালচারেরই ফসল। যদি তাই হয় তবে নিকট ভবিষ্যতেই আলমের ব্যর্থতায় ভর করে নতুন হিরোর জন্ম হতে যাচ্ছে। অথবা আলমকে তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। বইটা সম্পাদনায় আরেকটু মনযোগী হওয়া প্রয়োজন ছিলো প্রকাশনী সংস্থার। বানান ভুল ও অযত্নের ছাপ আছে অনেক জায়গায়। আশরাফুল আলম সাঈদের বর্তমান জনপ্রিয়তাকে ব্যবসায়িক মুনাফায় কনভার্ট করা মূল লক্ষ্য না থাকলে বইয়ের দামও খানিকটা কমানো যেত। আমার রুমমেট ফরহাদ এই বইয়ের ব্যাপারে আমাকে বলেছিলো এই কথাগুলো।

হিরো আলমের বইটা পড়ার পর থেকেই ভাবছিলাম উনাকে নিয়ে লিখবো কিন্তু বিভিন্ন ব্যস্ততায় আর সময় হয়ে উঠছিলো না। অবশেষে করোনার এই লকডাউনের সময়ে হাতে অখণ্ড অবসরটা বেছে নিলাম। করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হবার পর যখন সব বড় বড় নেতা নিজেদেরকে ঘরে বন্দি করে বড় বড় বাণী আউড়ে যাচ্ছেন সেখানে হিরো আলম তার সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে ভ্যানে করে বাড়ি বাড়ি খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন। এমন কাজ তিনি অতীতেও করেছেন। উনি এই কাজগুলো করেন নির্বাচনের সময় ভোটের হিসেব না করেই। উনি এই কাজগুলো করেন অন্তরের তাগিদে। উনার কথা হচ্ছে আমি যেভাবে কষ্ট করে বড় হয়েছি সেই জীবন আমাকে শিক্ষা দিয়েছে অভাবি দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়াতে। জানিনা এতে করে সেই অভাবী মানুষদের কতটা উপকার হবে কিন্তু শহুরে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কাছে অপাংক্তেয় একজন মানুষ যিনি নিজেকে হিরো বলে দাবি করেন তথাকথি হিরোসুলভ লুক এবং ভাষা না জানা সত্ত্বেও একজন মানুষ নিজে এগিয়ে যাচ্ছেন এবং পাশাপাশি তার শিকড়কে ভুলে যাচ্ছেন না এটা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কারণ আমরা শিক্ষিত সম্প্রদায় রাতারাতি নিজেদেরকে শহুরে প্রমাণ করতে আদাজল খেয়ে লাগি।

আমি ঠিক জানিনা এই মানুষটাকে শহুরে শিক্ষিত মানুষেরা পণ্য বানিয়ে ঠিক কতদিন ধরে তার লভ্যাংশ গুণবে কিন্তু হিরো আলম শিক্ষিত মানুষদের সামনে একটা দরজা খুলে দিয়েছে যেই দরজা দিয়ে তারা চাইলেই দেখতে পারেন গ্রামের অশিক্ষিত, অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের শরীর এবং গায়ের রঙ দেখতে কেমন হয়। ঠিক কোন ভাষায় আর মূল্যবোধে গ্রামের মানুষ কথা বলেন। এছাড়াও আমরা মুখে মুখে বাংলাদেশের শিক্ষা এবং সমাজমানের যে উন্নয়নের কথা বলি তার মুখেও ঝামা ঘষে দিয়েছেন। আমার কাছে একটা বিষয় খুবই খারাপ লাগে সেটা হলো আমরা এখনও সকল মানুষকে সমান চোখে দেখতে পারিনা এই একবিংশ শতাব্দীতে এসেও তার চেয়ে মুখ্য হয়ে দাঁড়ায় তার পূর্ব-পুরুষের পরিচয়, তার পরিবেশ, তার শিক্ষাগত যোগ্যাত, তার ভাষা, তার পোশাক। আমি আমার পরিচিতজনদের কাছে হিরো আলমের কথা বলে ইতোমধ্যেই বিরাগভাজন ও তীর্যক দৃষ্টিবাণের স্বীকার হয়েছি এবং আমি নিশ্চিত এই লেখা ছাপা হবার পর মানুষজন আবারও আমার বংশ, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ভাষা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। দেশ কাল পাত্রভেদে এটাই বাঙ্গালীদের সমাজ ব্যবস্থার রুঢ় বাস্তবতা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)