চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘হিরো আলমকে’ নিয়ে ট্রল বুলিংয়ের নামান্তর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘লাঙল’ মার্কার প্রার্থী হচ্ছেন হিরো আলম। তাকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে ব্যাপক আলোচনা সমালোচনা।

তবে হিরো আলমকে নিয়ে করা ‘ফেসবুকীয়- সুশীলীয় ট্রলকে’ বুলিং-এরই নামান্তর বলে মনে করেন কবি সাহিত্যিক আফরোজা সোমা। 

তিনি তার ফেসবুক পেইজে পোস্ট করেন-

হিরো আলম’

আমাদের চিন্তাভাবনা কি এখনো তীব্রমাত্রায় ক্লাস নির্ভর বা শ্রেণী সচেতন?

কথাটা মনে এলো হিরো আলমের নির্বাচনী মনোনয়ন ফর্ম তোলার পর ‘সুশীল-শিক্ষিত’ ও অপেক্ষাকৃত অার্থিকভাবে সচ্ছল নাগরিকদের ফেসবুক প্রতিক্রিয়া দেখে।

পাশাপাশি, মেইনস্ট্রিম মিডিয়াতে গতকাল তাকে দেখা গেলো। বলা বাহুল্য, তাকে একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, ”আপনি তো এমনিতেই বিখ্যাত, আবার রাজনীতিতে আসা কোন উদ্দেশ্যে? কী করতে চান রাজনীতিতে?”

এপারেন্টলি প্রশ্নটা নিরীহই বটে। কিন্তু, ‘অনেক বিখ্যাত’ শব্দটাতে আমার কান আটকে গেছে। তাছাড়া এই শব্দ-দ্বয় ডেলিভারি দেবার সময় বক্তার স্বরটাও লক্ষনীয়।

বাংলাদেশে শ্রেণি ভেদে হিরো আলমের গ্রহণ যোগ্যতা, তাকে নিয়ে ফেসবুকীয় সুশীলীয় ট্রল ইত্যাদি বিষয়ে যারা অবগত আছেন তারা এই প্রশ্নটির ডেলিভারি শুনতে-শুনতেই ফিল করবেন যে, প্রশ্নটিও আসলে একধরনের বুলিং-এরই নামান্তর।

হিরো আলমকে যেভাবে এনে সাক্ষাতকারের নামে বিনোদন করা হয়েছে বা সার্কাস হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে সেভাবে কি অন্যান্য তারকা যেমন সঙ্গীতশিল্পী কনকচাপা ও বেবী নাজনীন, চিত্রনায়ক সোহেল রানা, অভিনেতা ডিপজল, নায়িকা কবরী ও ময়ূরী ও অন্যান্যদের এনেও করা হয়েছে বা হবে?

বা আমাদের কোটি মানুষের প্রাণেরমানুষ প্রিয় মাশরাফিকে কি এই প্রশ্নটা করা হয়েছে এভাবে গলা টানতে-টানতে যে, ”আপনি তো এমনিতেই বিখ্যাত, আবার রাজনীতিতে আসা কোন উদ্দেশ্যে? কী করতে চান রাজনীতিতে?”

হিরো আলমের এমপি হবার যোগ্যতা নাই থাকতে পারে। তাকে মনোনয়ন দেয়া নাই হতে পারে। বা মনোনয়ন দেয়া হলেও সে ভোটে ফেল করতে পারে। সেটা তার গণতান্ত্রিক অধিকার।

কিন্তু হিরো আলম ‘আনস্মার্ট’, ‘অশিক্ষিত’, ‘গরীব’ ‘ফকিন্নির পুত’ ‘মুর্খ’ (এই কথাগুলো আমি ফেসবুকে এই দুই দিনে হিরো আলমকে নিয়ে লোকের কমেন্টে পড়েছি) তাই সে নির্বাচনের মনোনয়ন ফর্ম কিনতে পারবে না বলেই সাব্যস্ত করেছে আমাদের সুশীল মন।

কিন্তু এই সুশীলরাই আবার দেখি সাবোলটার্নদের পক্ষে নানাখানে কথা বলেন। তারাই আবার শ্রেনী-বর্ণ ও জাত্যাভিমানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

আমরা নিম্নবর্গের সংস্কৃতি নিয়ে গালভরা কথা বলি। কিন্তু একজন প্রকৃত নিম্নবর্গের মানুষ যখন নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য মনোনয়ন ফর্ম কিনেছেন মাত্র সেটিই ‘সুশীল-শিক্ষিত’ সমাজ মেনে নিতে পারছে না।

তাকে নিয়ে আমরা বুলিং করতে ছাড়ছি না। তাকে নিয়ে ‘মজা’ নিতে ছাড়ছি না। তাকে পরোক্ষ ‘র‍্যাগ’ দিতে ছাড়ছি না।

হিরো আলমের পক্ষে বা বিপক্ষে আমি নই। হিরো আলম একটি লিটমাস টেস্ট। আমাদের সুশীল মন কতটা বর্ণবাদী সেটা টেনে বের করে আনে হিরো আলম।

আপনি ফেয়ার এন্ড লাভলীর বিজ্ঞাপনের বিরোধীতা করেন। কারণ এটা সমাজে বর্ণবাদ ছড়ায় বলে আপনি মনে করেন। কিন্ত হিরো আলম ‘শুদ্ধ ভাষায় ঠিক মতন মনোনয়ন শব্দটা উচ্চারণ করতে পারে না’ বলে, সে দেখতে ‘আনস্মার্ট’ বলে ‘অশিক্ষিত’ বলে তারে যখন ট্রল করেন, তারে যখন খারিজ করে দেন তখন কি সেটা বর্ণবাদী আচরণ নয়, মহামান্য?

ঠিক এই মানসিকতা থেকেই তৈরি হয়েছিল আর্য আর অনার্যের মিথ। এইজন্যই আমাদের মিথের অসুরেরা দেখতে হিরো আলমের মত কালো, খাটো, বিদঘুটে। হয়তো অসুর মানেই হিরো আলমের মতন দাঁত উঁচা।

হে হিরো আলমকে-নিয়ে-ট্রল-করা-সমাজ, আপনার মুখে কি নিম্নবর্গের সংস্কৃতির জয়গান তথা সাবোলটার্ন সোসাইটির কালচারাল ফাইট বা এই ভূখন্ডের মিথের সেলিব্রেটি অসুর রাবণের পক্ষে গান গাওয়াটা মানায়?

একটু ভেবে দেখবেন।

আর আমার উপর রাগ নিয়েন না। আমাকে পারলে ক্ষমা করে দিয়েন। কারণ আমি বুদ্ধিজীবীতা করার ধৃষ্টতা দেখাই নাই। আমিও প্রকৃতই হিরো আলমের সমাজের একজন।

আমি কৃষক ও গরিব সমাজের মানুষ। আমার পাড়ার খেলার সাথীরা বড় হয়ে কেউ গার্মেন্টেসে কাজ করতে গেছে, কেউ ওয়ার্কশপ দিয়েছে, কারো কৈশোরে বিয়ে হয়ে গেছে, কেউ রোগে-ভোগে মরে গেছে। আমার খেলার সাথীদের কেউ ‘মান বাংলায়’ ঠিক মতন কথাও বলতে পারে না। আর আমার বংশেও এলিট বা অভিজাত কেউ নাই। আমি খেটে-খাওয়া পরিবারের মানুষ। আমার আত্মীয়-স্বজনেরাও সব গরীব।

হয়তো অন্যের কাছে হাত-পেতে খায় না। কিন্তু তারা গরীব। আমিও দেখতে খাটো আর কৃশকায়। আমার মুখের থুৎনির দিকটাও দেখতে বানরের সাথে অনেকটা মিল আছে। আমাকে নিয়েও ইচ্ছা হলে ট্রল করতে পারেন। আমিও হিরো আলমের মতন নিম্নবর্গের বিধায় আমারো কোনো প্রতিরোধ নাই।

নিম্নবর্গের প্রতিরোধ থাকে না বলেই তারা নিম্নবর্গ থেকে যায়। উচ্চবর্গেরা সব অর্জুনের মতন রাজরক্ত বহন করে। আর হিরো আলমরা সব একলব্য। তাদেরকে আপনাদের সাথে এক পংক্তিতে বসতে না দেয়াই শ্রেয়।