চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাসপাতালে আগুন: উদ্ধারকাজে দারুণ সাফল্য

হাসপাতালে মানুষ যায় অসুখ সারাতে। সেখানে যদি আগুন লেগে যায়, তাহলে তাকে নিশ্চয় মহাবিপর্যয় বলা যায়। ‘ভালোবাসা দিবসে’ ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগার মহাবিপর্যয় থেকে জন্ম নিয়েছে ভালোবাসা, পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার অনন্য নজির।

১৪ ফেব্রুয়ারির শেষ বিকেলে শেরে বাংলা নগরের আকাশ ভরে যায় কালো ধোঁয়ায়। আগুন থেকে সৃষ্ট সেই কালো ধোঁয়া বলে দিচ্ছিল, বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালের ১২ ও ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝামাঝি জায়গা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয় বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে।

বিজ্ঞাপন

ওই জায়গায় একটি বিদ্যুৎ সরবরাহ কক্ষ আছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট হয়েছিল। মুহূর্তের মধ্যে নিচতলা পর্যন্ত ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে যায়। ঘটনা তদন্তে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগুন লাগার সময় হাসপাতালে ভর্তি ছিল প্রায় ১ হাজার ২০০ রোগী। আগুনে হাসপাতালের কেউ হতাহত হয়নি বলে নিশ্চিত করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

এই লেখার উদ্দেশ্য সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দেয়া নয়। উদ্দেশ্য সবাইকে একটা বড় ধন্যবাদ দেয়া। রানা প্লাজার সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পরে যেমন সাধারণ মানুষ, ফায়ার সার্ভিস কর্মী, পুলিশ, আর্মিসহ নানা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এক সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যেভাবে উদ্ধার কাজ চালিয়েছিলেন, এখানেও এমনই অসাধারণ সাহসী, পরিশ্রমী ও উদ্যমী মানুষগুলো অসহায় রোগীদেরকে নিরাপদে সরিয়ে নিয়েছেন, আগুন থেকে রক্ষা করেছেন।

সন্ধ্যায় হাসপাতাল ভবনে আগুনের সূত্রপাতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা। সহস্রাধিক রোগীকে হাসপাতালের বেড থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় সামনের প্রাঙ্গণে। আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পর আবারো রাতেই শুরু হয় চিকিৎসা কার্যক্রম।

ঘটনাস্থলে ছুটে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী। জানান প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস। কারণ অনুসন্ধানে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিস।

হাসপাতালের স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে শুক্রবারের সরকারি ছুটি বাতিল করে দেয় কর্তৃপক্ষ।

অবশেষে স্বাভাবিক হওয়ার পথে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। যেসব মুমূর্ষু রোগীকে আশপাশের হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল তাদেরকে আবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে। থ্যাংকস গড, আরও বড় কোনো বিপর্যয় হয়নি। হতে পারত। আগুন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারত, আগুনে পুড়ে মানুষ মারা যেতে পারত, মানুষ আতঙ্কিত হয়ে উপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়ে হতাহত হতে পারত; মানুষের হুড়োহুড়িতে প্রাণহানী হতে পারত। আল্লাহর বিশেষ রহমত, এমন কিছু হয়নি। এত বড় সাফল্যের জারিয়া হিসেবে যারা কাজ করেছেন তারা সবাই একেকজন সুপারম্যান ও সুপারওম্যান। হৃদয়ের গভীরতম স্থান থেকে ঈশ্বরের প্রতিনিধিদেরকে আমাদের ধন্যবাদ।

বিজ্ঞাপন

বিপদে বাঙালির সাহস আর দায়িত্বশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। এই দুর্ঘটনায়ও পাওয়া গেল। সবাই খুব দরদ দিয়ে কাজ করে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় এড়িয়েছেন। ডাক্তার, নার্সসহ অন্যান্য সকল স্টাফগণ অসাধারণ মানবতা আর ভালোবাসা প্রদর্শন করে দায়িত্বশীলতার অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।

আর বিপদের বন্ধু ফায়ার সার্ভিস তো ছিলই। ‘৯৯৯’ সার্ভিসও দারুণভাবে কাজে দিয়েছে। আগুন লাগার শুরুতেই কলেজের কিছু ছাত্র নাকি ‘৯৯৯’ এ কল দিয়ে দেয়। যথাসম্ভব দ্রুততম সময়ের ভেতরে ফায়ার সার্ভিস চলে আসে ঘটনাস্থলে।

‘৯৯৯’ দিন দিন মানুষের আস্থার স্থল হয়ে উঠছে। রাস্তায় কেউ ছিনতাই এর শিকার হলে, বখাটে ছেলেরা মেয়েদের বিরক্ত করলে, বাড়িতে ডাকাত পড়লে, আগুন লাগলে মানুষ ‘৯৯৯’ কল দিতে শিখছে। মধ্যরাতে কেউ ভয়ঙ্কর শব্দে গান শুনছে, বাচ্চারা ঘুমাতে পারছে না, মানুষ ‘৯৯৯’ এ কল দিয়ে পুলিশের সহায়তা চাচ্ছে।

কদিন আগে কুমিল্লায় ‘৯৯৯’ এ কল দিয়ে ডাকাতির কবল থেকে রক্ষা পেয়েছে এক প্রবাসীর পরিবার। গভীর রাতে বাসরলঙ্কা গ্রামের প্রবাসী সহিদের বাড়ির দরজা ভেঙে ১০-১৫ জনের একদল ডাকাত পরিবারের সকলের হাত-পা বেঁধে ফেলে। এসময় ডাকাতদের উপস্থিতি টের পেয়ে পাশের বাড়ির এক ব্যক্তি পুলিশের ‘৯৯৯’ সেবা নম্বরে ফোন করে। খবর পেয়ে এলাকার টহল পুলিশের দায়িত্বে থাকা নাঙ্গলকোট থানার সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মো. আবদুর রহিম সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে।

এসময় পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাত দল পালিয়ে যায়। এই ঘটনাটা অবিশ্বাস্য না? যখন মোবাইল ফোন ছিল না, ইন্টারনেট ছিল না, ৯৯৯ ছিল না, সে সময়ের কথা কল্পনা করুন। প্রতিবেশী শুধু একটা ফোন দিয়ে বিরাট উপকার করলেন। পুলিশ ১৫ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে গেল, ডাকাত দল পালিয়ে গেল! এমন টা আগে শুধু ইউরোপ-আমেরিকায় ঘটত।  ডিজিটাল নানা সেবায় আমাদের দেশটা বদলে যাচ্ছে অসাধারণভাবে।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকেও ভালোবাসা দিবসে আগুন লাগার দুঃসংবাদ দেয়া হয় ‘৯৯৯’ এ।

ফায়ার সার্ভিস দ্রুত চলে আসে। পাশাপাশি কলেজ ও হাসপাতালের শিক্ষার্থী, ডাক্তার, নার্স, কর্মচারী, রোগীর সাথে থাকা লোকজন সবাই সেদিন খুবই দ্রুততার সাথে কাজ করে রোগীদের বাইরে এনেছেন।

পাশাপাশি মানুষ মাথা ঠাণ্ডা রেখেছে, আতঙ্কিত হয়নি। সব মিলে ১৪ ফেব্রুয়ারির আগুন আমাদেরকে দারুণ একটি শিক্ষা দিয়েছে। বিপদে প্রযুক্তির সহায়তায় মানুষের দক্ষতায় মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে পারলে বড় ধরনের বিপদ এড়ানো যায়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View