চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হাত না ধুয়ে বাটারবন খাওয়া ছেলেটি এখন শুচিবাই

কেউ যখন বলেন তিনি করোনাভাইরাস মোকাবিলায় গত ২০ বছর ধরে প্রস্তুতি নিয়েছেন, তখন নিশ্চয়ই তার কথা আমাদের অবাক করে। গত বছরের শেষদিনের আগে আমরা এখনকার করোনাভাইরাসের কথা জানতাম না। এর মহামারী রূপটাও বুঝতে পরে আরো কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে গেছে। তাহলে তিনি কীভাবে ২০ বছর ধরে প্রস্তুতি নিলেন?

বিবিসি’র পিটার গোফিন কিন্তু সে কথাই বলছেন। দুই দশক ধরে তিনি করোনাভাইরাস মোকাবিলায় নিজেকে তৈরি করেছেন বলে বিবিসি অনলাইনের একটি নিবন্ধে জানিয়েছেন। কীভাবে এটা সম্ভব!
গোফিনের নাম হয়তো এ অঞ্চলের মানুষ আমরা তেমন কেউ জানি না, জানার কথাও না। তার নাম আমি বা আমরা প্রথম জানতে পারলাম ওই আর্টিক্যালটি পড়ে। সত্যিই তিনি গত ২০ বছর ধরে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজেকে তৈরি করেছেন। অজানা-অচেনা একটা রোগ কোভিড-১৯ এর বিরুদ্ধে নিজেকে তৈরি করা কীভাবে সম্ভব হলো?

বিজ্ঞাপন

জেনে আরো অবাক হবেন যে, বর্তমানের করোনাভাইরাসের বিরেুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত করার তালিকায় পিটার গোফিন একা নন। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশ বা ১৫ কোটি ৬০ লাখ মানুষ আছেন এ তালিকায়। শুনতে নিশ্চয়ই অবাক লাগছে। কিন্তু, পিটার গোফিনের দাবি অনুযায়ী সেটাই ঘটেছে।
এরা কারা?

জীবনে ভরসার নাম এখন হ্যান্ড স্যানিটাইজার
জীবনে ভরসার নাম এখন হ্যান্ড স্যানিটাইজার

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত রাখা এরকম মানুষ সংখ্যায় খুব কম হলেও আমার-আপনার চারপাশেও কিন্তু কিছু আছে। চিনতে পারছেন তাদের? হ্যাঁ, ওই মানুষগুলো যারা সারাক্ষণ খুঁতখুঁত করে, বিশেষ করে নিজের ও নিজের চারপাশের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে। আমরা তাদের বলি শুচিবাই।

করোনা মহামারীতে শুচিবাই মানুষগুলো আসলে রক্ষা পাচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে তেমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। তবে এটা তো ঠিক যে, করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে আমরা সবাই এখন শুচিবাই হয়ে গেছি এবং এই শুচবাইগ্রস্ততাই হতে পারে করোনা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার বড় উপায়।

আমরা সবাই বোধহয় এখন তাই করছি। যাদের পক্ষে সম্ভব আমরা ঘরে ঢুকে গেছি। বাজার-সওদাও একরকম বন্ধ। নিতপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের জন্য হোম সার্ভিস নিচ্ছি। দাম শোধ করছি অনলাইনে। সম্ভব না হলে যে মানুষটি জিনিসপত্র পৌঁছে দিতে আসছেন, তিনি নিরাপদ দূরত্বে সেগুলো রাখছেন, আমরাও টাকা রাখছি নিরাপদ দূরত্বে। সেই টাকা নিয়েও আবার নানা ঝক্কি। যতোদূর সম্ভব ব্যাংকে না গিয়ে এটিএম বুথ থেকে টাকা উঠিয়ে সেই টাকা স্যানিটাইজার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করছি। এমনকি ইস্ত্রিও করছি টাকা। আর সুপারশপ বা বাজার থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছার পর সেগুলোও নানাভাবে স্যানিটাইজ করছি। সেই স্যানিটাইজ করতে গিয়েও নানারকম খুঁতখুঁত।

শুধু বাজার নয়, নিজের অভিজ্ঞতায় বলি, অনলাইনে বা কাউকে দিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ আনানোর পর সেগুলো শুধু স্যানিটাইজই করছি না, সম্ভব হলে কয়েকদিন খোলা জায়গায় রেখে দিচ্ছি। ইনসুলিন ফ্রিজে ঢোকাতে হয়, তাই ধুতে থাকো, ধুতে থাকোর মতো ইনসুলিন বারবার জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে নিচ্ছি, তবুও জীবাণুমুক্ত হলো কিনা ভেবে হাতে স্যানিটাইজার নিয়ে সেগুলো ধুয়ে নিচ্ছি কয়েক দফা। বাসায় কেউ আসেন না, তারপরও মনের ভয়ে দরোজার হাতল জীবাণুমুক্ত করছি দিনে কয়েক দফা। বাইরেরটা করতে গিয়ে মনে হচ্ছে, ভেতরের হাতলে কোথাও জীবাণু থেকে যায়নি তো! তখন আবার সেগুলো জীবাণুমক্ত করার চেষ্টা।

নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে রিপোর্টিং মিটিং
নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে রিপোর্টিং মিটিং

অফিস করতে হয় তাই মনে খুঁতখুঁত সবসময়। সকালে বের হওয়ার সময় নিজেকে যেনো যুদ্ধসাজে সজ্জিত করতে হয়। প্রথমে আসা যাক কাপড়-চোপড়ের কথায়। ফিরেই কাপড় ধুয়ে ফেলতে হয় এবং প্রতিদিন ইস্ত্রি করা একটা সমস্যা, তাই দুইমাস ধরে অফিস করছি কয়েকটা ট্রাউজার আর সাধারণত শীতে পরি এমন ফুলস্লিভ টি-শার্ট পরে। সেগুলোর সঙ্গে এক মাস্কে যেহেতু জীবাণু ঢুকে যেতে পারে বলে চিকিৎসক বন্ধুরা সতর্ক করেছেন, তাই একজোড়া মাস্ক পরতে হয় মুখে। চশমা পরি ১৩ বছরের বেশি, সেই চশমার ওপর পরতে হয় পিপিই’র গগলস। বিষয়টা বেশি হাস্যকর হয়ে যেতে পারে তাই অফিস থেকে দেওয়া পিপিই পরছি না, কিন্তু গ্লাভস তো অবশ্যই। সঙ্গে হেডক্যাপ। তবে, আগেরদিন জীবাণুমক্ত করা কেডসজোড়া যা দরোজার বাইরে থাকে এবং অ্যাপার্টমেন্টের পক্ষে প্রতিদিন সকালে ছিটানো জীবাণুনাশকে একটু ভেজাই থাকে; সেগুলো পরার পর হাতে আবারো জীবাণুনাশক দিয়ে গ্লোভসে হাত ঢোকানো।

বিজ্ঞাপন

অফিস থেকে যে গাড়ি আসে সেগুলোতে প্রতি ট্রিপের পরই জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হলেও গাড়িতে চড়ার আগে আরেকবার স্প্রে। অফিসে গাড়ি থেকে নামার পর জীবাণুনাশক তরলে জুতোর তলা ভিজিয়ে অফিসে প্রবেশ। তখন গ্লাভসের ওপর আরেকবার হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার। এরপর তরলে ভেজা গ্লাভস পরা হাতে খুব সতর্কভাবে পকেট থেকে কার্ড বের করে সেটা যতোদূর সম্ভব উপর থেকে ধরে অ্যাটেনডেন্স নিশ্চিত করে মূল অফিসে ঢোকা। কম কর্মী দিয়ে অফিস চলছে, তাই করিডোরে তেমন কারো সঙ্গে দেখা হয় না। তারপরও হাঁটার পথে কেউ যেন বেশি কাছে এসে না পড়ে সেজন্য সবসময় সতর্কতা।

এখানেই শেষ নয়। সিঁড়ির মুখে দরোজা এখন সবসময় খোলাই থাকে। হঠাৎ যদি সেটা খোলা না থাকে, তাহলে হাত ব্যবহার না করে পায়ের ধাক্কায় সেটা খুলতে হয়। সেই কৌশলও রপ্ত করে নিয়েছি। নিউজরুমে ঢোকার আগে ওয়াশরুম। গ্লাভস ডিসপোজ করে হ্যান্ডওয়াশ। একবার হাত ধুয়ে আবার কলের হাতল ধোয়া কারণ জানি না এর আগে কে সেটা ব্যবহার করে গেছেন। তারপরও মনে খুঁতখুঁত নিয়ে নিজের রুমে ঢুকে আরেকবার হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার। সঙ্গে গগলস, চশমা, মানিব্যাগ, আইডি কার্ড,  মোবাইল ফোন এবং চাবি ও চাবির রিং অ্যালকোহল প্যাডে জীবাণুমক্তকরণ। পুরো রুম, ফ্লোর, ডেস্ক, ফার্নিচার, সবকিছু আগেই একবার জিরো ভাইরাস দিয়ে জীবাণুমুক্ত করা থাকলেও মনের খুঁতখুঁতে তো আর যায় না। তাই চেয়ারে বসার আগে চেয়ার, চেয়ারের হাতল, ডেস্ক, কিবোর্ড, মাউস সবকিছু আরেকদফা জীবাণুমুক্তকরণ।

এবার কাজ শুরু। কিন্তু, নিজের রুমে থাকা মানেই যে নিজেকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে হয়, এমন না। দমবন্ধ অবস্থা থেকে একটু মুক্ত থাকতে মাস্ক হয়তো খুলে রাখি, কিন্তু নানা প্রয়োজনে কেউ না কেউ আসতেই থাকে। তাই দরোজাতেই কাউকে দেখামাত্র আবার মাস্ক পরা, সবাই সতর্ক থাকার পরও হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দেওয়া যেনো চার/পাঁচ ফুট দূরত্বে অবস্থান করে। আবার দূরত্ব রক্ষা করে ছোট মিটিং করার পর পুরো রুমে আরেকদফা জীবাণুনাশকের ব্যবহার। আর এই কোথাও ছুঁয়ে ফেললাম কিনা, ওই জায়গাটা জীবাণুমুক্ত ছিল কিনা ভাবতে ভাবতে একটু পরপর হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার। মাঝখানে ওয়াশরুমে যেতে হলো সেটা আরেক অভিযান।

চ্যানেল আই টিম
বার্তা প্রধানের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স (বামে), টেকনিক্যাল বিষয়ে ভিডিও কনফারেন্স (ডানে)

এভাবে শুচিবাই অবস্থায় ঘণ্টা ছয়েক পর আবারো যুদ্ধসাজে বাসায় ফেরা। বাড়ির মূল গেটে জুতোয় জীবাণুনাশকের ব্যববহার, লিফটের বাটন প্রেস করতে হবে তাই গ্লাভসে স্যানিটাইজার। লিফট থেকে নেমে বাসায় ঢোকার মুখে পুরো শরীরে জিরো ভাইরাসের স্প্রে, জুতো পুরোটা ভিজিয়ে জায়গামতো রাখা। মাস্ক-গ্লাভস-হেডক্যাপও জায়গামতো ডিসপোজ করার পর সরাসরি ওয়াশরুম। প্রথমে হাত জীবাণুমক্তকরণ। এরপর ডিটারজেন্টের পানিতে কাপড়চোপড় রেখে সেই গগলস, চশমা, ওয়ালেট, মোবাইল ফোন এবং চাবির রিং অ্যালকোহল প্যাডে জীবাণুমক্ত করা। সবশেষে কাপড়চোপড় ধুয়ে শাওয়ার নিয়ে ধোয়া কাপড় পরে মনে হয় এখন সব ঠিকঠাক।

তারপরও খুঁতখুঁতে ভাব চলতেই থাকে। রাতে হাঁটার জন্য ছাদে যাবার পথে লিফটে টুথপিকের ব্যবহার এবং ছাদে উঠে কোনো কারণ ছাড়াই পকেটে থাকা ট্রান্সপারেন্ট হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার। ঘণ্টাখানেক পর বাসায় ঢুকে আরেকদফা হাত-পা-মুখ ধোয়া। খসখসে হাতে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার। ময়েশ্চারাইজার যতোই ব্যবহার করি না কেন, হাতের চামড়া গত দুইমাসে শুকিয়ে চরম শুষ্ক।

যেমন এতো শুচিবাই থেকেও করোনাভাইরাসের ভয়ে জীবনটাই শুষ্ক মরুময়। অথচ এই আমি এমন ছিলাম না। অফিস থেকে ফিরে শাওয়ার নেওয়া বরাবরের অভ্যাস হলেও নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখার এমন বাতিক জীবনেও ছিল না। বরং আমি তো সেই ছেলে যে স্কুলজীবনে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের মাঠে ফুটবল বা ক্রিকেট খেলে হাত-পা না ধুয়েই বাটারবন খাওয়া মানুষ ছিলাম। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চপ-পুরি-সিঙারা খাওয়ার আগে কখনোই হাত ধোয়ার কথা ভাবিনি, বরং খাওয়ার পর হাত মুছে ফেলেছি জিন্সের প্যান্টে।

নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বিশেষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক
নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে বিশেষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক

শুধু একটু সতর্ক হয়েছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতেই জন্ডিস এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পরপর টাইফয়েডে ভুগে। ওই দুটি অভিজ্ঞতা আমাকে পানির বিষয়ে অনেক সতর্ক করেছিল, কিন্তু এর বাইরে নিজেকে নিরাপদ রাখতে এখন যা করছি তার ভগ্নাংশও কখনো করিনি বা করতে হয়নি। তারপরও ভয়ে থাকি সারাক্ষণ।

এটা যে শুধু আমার অভিজ্ঞতা, এমনটা নয়। আমাদের মতো যাদের ঘরের বাইরে যেতে হচ্ছে, সকলেরই প্রায় এমনটা হচ্ছে হয়তো। এভাবে চোখে দেখতে না পারা এক ভাইরাস আমাদের জীবনকে বদলে দিচ্ছে। শুচিবাইও করে ফেলছে অনেককে। এ ভাইরাস কবে দূর হবে জানি না। তবে, এটা বুঝতে পারছি করোনা চলে গেলেও আমাদের জীবন আচরণে যে পরিবর্তন আসছে, তার প্রভাব হবে দীর্ঘস্থায়ী। হয়তো হাত আমরা এতোবার ধোবো না, অতোটা শুচিবাইও হয়তো থাকবো না, কিন্তু কে জানে কিছুটা শুচিবাইগ্রস্ততা হয়তো থেকেই যাবে, হয়তো স্থায়ীই হয়ে যাবে মাস্কের ব্যবহার। ভবিষ্যতে যাই হোক, আপাতত প্রার্থনা একটাই: দ্রুত বিদায় হোক করোনাভাইরাস।

চ্যানেল আই অনলাইন টিমের সাথে ভার্চুয়াল কনফেরেন্স
চ্যানেল আই অনলাইন টিমের সাথে ভার্চুয়াল কনফেরেন্স