চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

হলি আর্টিজান: ভাগ্যাহত মানুষের স্বজনদের শান্তির অপেক্ষা

হত্যাযজ্ঞের চার বছর

২০১৬ সালের এই দিনে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় হত্যার ঘটনায় করা মামলার রায়ে আদালত বলেছিলেন: আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা প্রদানের মাধ্যমে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করলে ভাগ্যাহত মানুষের স্বজনরা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।

দেশের ইতিহাসে ঘটা ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ও নৃশংস হত্যাযজ্ঞের চার বছর পর এসে ভাগ্যাহত মানুষের স্বজনদের শান্তির অপেক্ষায়ই থাকতে হচ্ছে। কারণ, বিচারিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৭ জঙ্গির দণ্ড কার্যকর করতে এখনো অনেকটা আইনি পথ পাড়ি দিতে হবে। পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানি হাইকোর্টে শুরু হবে। তবে ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য প্রয়োজনীয় পেপারবুক (মামলার বৃত্তান্ত) প্রস্তুতের কাজ এখন বিজি প্রেসে শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে চ্যানেল আই অনলাইনকে জানিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক বিচারিক আদালতের দেওয়া কোন মৃত্যুদণ্ডের রায় অনুমোদনের জন্য মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স আকারে হাইকোর্টে পাঠাতে হয়। সে অনুযায়ী গত ডিসেম্বরে হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৭ জঙ্গির ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে।

এর আগে গত বছরের ২৭ নভেম্বরে ৭ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করেন ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মজিবুর রহমান। ঐতিহাসিক সে রায়ে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্তরা হলো: জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ, আব্দুস সবুর খান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশিদ রিপন।

বিজ্ঞাপন

দেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞের ঘটনার রায় দিতে গিয়ে আদালত বলেন: ‘বাংলাদেশে তথাকথিত জিহাদ কায়েমের লক্ষ্যে এবং জননিরাপত্তা বিপন্ন করার ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস’র দৃষ্টি আকর্ষণ করতে জেএমবির একাংশ নিয়ে গঠিত নব্য জেএমবির সদস্যরা হলি আর্টিজান বেকারিতে নারকীয় ও দানবীয় হত্যাকাণ্ড ঘটায়।’

আদালত তার রায়ে আরো বলেন: ‘ওই হামলার মধ্য দিয়ে জঙ্গিবাদের উন্মত্ততা, নিষ্ঠুরতা ও নৃশংসতার জঘন্য বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। নিরপরাধ দেশি-বিদেশি মানুষেরা যখন হলি আর্টিজান বেকারিতে রাতের খাবার খেতে যায়; তখনই আকস্মিকভাবে তাদের উপর নেমে আসে জঙ্গিবাদের ভয়াল রূপ। জঙ্গি সন্ত্রাসীরা শিশুদের সামনে এ হত্যাকাণ্ড চালায়। মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য নিথর দেহগুলোকেও তারা ধারাল অস্ত্র দিয়ে কোপায়। মূহুর্তের মধ্যে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় হলি আর্টিজান।

এ হত্যাকাণ্ডের ফলে শান্তি ও সম্প্রীতির জন্য পরিচিত বাংলাদেশের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষুণ্ন হয়েছে মন্তব্য করে আদালত বলেন: ‘তাই সাজা প্রদানের ক্ষেত্রে আসামিরা কোনো ধরনের অনুকম্পা বা সহানুভূতি পেতে পারে না। এক্ষেত্রে আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা প্রদানই ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবে, আর এতে ভাগ্যাহত মানুষের স্বজনরা কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।’

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত ৯টার দিকে রাজধানীর গুলশান-২-এর ৭৯ নম্বর সড়কের পাশে অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গিরা হামলা চালায়। তারা অস্ত্রের মুখে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। পরে রাতেই ওখানে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা রবিউল করিম ও সালাউদ্দিন খান নিহত হন। এছাড়াও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ ৩১ সদস্য ও র‌্যাব-১ এর তৎকালীন পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তুহিন মোহাম্মদ মাসুদসহ ৪১ জন আহত হন। পরদিন ২ জুলাই ভোরে সেনা কমান্ডোদের পরিচালিত ‘থান্ডারবোল্ট’ নামের অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হয়। এরপর পুলিশ সেখান থেকে ১৮ বিদেশিসহ ২০ জনের লাশ উদ্ধার করে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন রেস্তোরাঁকর্মী। আর কমান্ডো অভিযানের আগে ও পরে ৩২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

দেশের মানুষকে হতবাক করে দেয়া সেই হামলার তিন দিন পর গুলশান থানার এসআই রিপন কুমার দাস সন্ত্রাস দমন আইনে গুলশান থানায় মামলা করেন। এরপর ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির দুই বছর তদন্ত করে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এরপর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ২১১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থনে আসামিদের বক্তব্য উপস্থাপন এবং উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায় ঘোষণা করেন আদালত।