চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সড়ক জয় করা এক সাহসী নারী বাইকারের গল্প

এক প্রত্যয়ী নারী স্কুটি নিয়ে চলেছেন সড়ক পথে। চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। এ দৃশ্য এখন প্রায়ই চোখে পড়ে রাজধানীতে। গণপরিবহনের ঝামেলা এড়িয়ে জ্যাম ঠেলে নারীরা নিজস্ব বাহনে চলেছেন কর্মস্থল বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। এরকম অনেক নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সাহস ও প্রেরণা যুগিয়ে সড়ককে জয় করতে সহায়তা করছেন আতিকা রোমা।

রোমা একজন নারী বাইকার, একজন সাহসী নারী। যিনি সড়ককে জয় করে অনেক নারীকে পথ দেখিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীতে গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানির খবর আর হয়রানির চিত্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে ব্লেড দিয়ে মেয়েদের পোশাক কেটে দেয়ার ভিডিও ভীষণভাবে নাড়া দেয় আতিকা রোমাকে। ভাবতে থাকেন কীভাবে এ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। হঠাৎ মাথায় আসে মেয়েদের স্কুটি প্রশিক্ষণ দেয়ার বিষয়টি। এরপরই শুরু হয় তার ‘যাব বহুদূর’ নামে স্কুটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের যাত্রা।

এপ্রিল মাসের এক তারিখে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাঝেই প্রায় ১২টি ব্যাচে ৬৩ জন নারীকে স্কুটি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত করে তুলেছেন তিনি।

যাব বহুদূর নিয়ে আতিকা রোমা বলেন: ‘মেয়েদের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার এক অন্যতম উপায় হলো মেয়েদের জন্য নিরাপদ সড়কপথ। আর এক্ষেত্রে প্রতিটি মেয়ে যদি স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে চলাচল করতে শেখে তাহলেই সার্থক হবে আমার এ প্রয়াস। মেয়েদের নিয়ে যাব বহুদূর। যেতে চাই বহুদূর।’

প্রতিদিনের রাস্তার ঝামেলা এড়াতে রোমা স্কুটি চালানো শুরু করেন ২০০৯ সালে। বিশ্বাস করেন যাত্রাপথে নারীরা স্বাবলম্বী হলে নারী স্বাধীনতার পথে তারা এগিয়ে যাবে আরো একধাপ। যাব বহুদূর নিয়ে রোমার অনেক স্বপ্ন।

নামমাত্র ফি নিয়ে যাব বহুদূরের মাধ্যমে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেন তিনি। যার মধ্যে প্রায় ৮০-ভাগই চাকুরিজীবি এবং ৮৫ ভাগ মেয়েই কোনদিন সাইকেল চালায়নি। সেইসব নারীদের প্রথম হাঁটতে শেখার মতো হাঁটি হাঁটি পা পা করে স্কুটি চালানো শেখান তিনি। এ কাজে তার ধৈর্য্য সীমাহীন।

বিজ্ঞাপন

এ কাজে তাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন তার মা। একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন আতিকা রোমা। সেখান থেকে মায়ের অনুপ্রেরণায় চাকরি ছেড়ে গড়ে তোলেন ‘যাব বহুদূর’ নামক প্রতিষ্ঠানটি। যেখানে ৭টি প্র্যাকটিকাল ক্লাস ও একটি থিওরিটিক্যাল ক্লাসের মাধ্যমে মেয়েদের স্কুটি শিক্ষায় পারদর্শী করে তোলা হয়।

আতিকা রোমা তেজগাঁওয়ে স্কুটি চালনা প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকেন। তার এখানে প্রশিক্ষণ নিতে আসা মেয়েদের এক এক জনের জীবনে রয়েছে এক এক রকম গল্প। ফয়সাল বাপ্পা, অভি মুরশিদ ও সাদ সালমান নামে ৩ জন পুরুষ প্রশিক্ষক যাব বহুদূরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে রোমার সঙ্গে রয়েছেন। যারা মূলত বাইকার। ওই ৩ প্রশিক্ষকের আন্তরিক প্রশিক্ষণে দক্ষ হয়ে উঠছেন রাজধানীর নারী বাইকাররা।

যাব বহুদূরকে প্রশিক্ষণের জন্য বিনামূল্যে স্কুটি দিয়েছে টিভিএস অটো বাংলাদেশে। এজন্য প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন অাতিকা রোমা। নিশাত জাহান রানা, নামের আরেকজন মানুষের কাছেও কৃতজ্ঞ তিনি। যিনি রোমাকে সার্বক্ষণিক বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছেন এবং প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছেন।

তবে এখন পর্যন্ত এ কাজে কোন বাধা আসেনি তার। বরং পরিবার পরিজন সহ বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে পেয়েছেন বিস্তর ভালবাসা।

আতিকা রোমা বাইক নিয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১২৫০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছেন। তিনি স্কুটি চালিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম-বান্দরবান-কক্সবাজার-টেকনাফ-কক্সবাজার হয়ে পুনরায় ঢাকা ফিরেছেন। এতে তার সময় লেগেছে তিন দিন।

আতিক রোমা বাংলাদেশের প্রথম নারী বাইক রাইডার যিনি ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে স্কুটি চালিয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সড়ক এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সড়ক থানচি আলী কদম যাওয়ার রাস্তায় ডিম পাহাড় সড়ক অতিক্রম করেছেন।

আতিকা রোমা স্বপ্ন দেখেন ১ বছর পর তার কাছে প্রশিক্ষণ নেয়া সব মেয়েদের নিয়ে একসাথে স্কুটি চালিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাবার। শুধু তাই নয় আতিকা রোমা তার এই কার্যক্রম ছড়িয়ে দিতে চান সারা বাংলাদেশে। আর এ লক্ষ্যে দেশের বিভাগীয় শহরে ৭ দিন করে দুই সেশনে ১৪ দিন করে মেয়েদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার।

Bellow Post-Green View