চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্মৃতি খুঁজে ফেরেন অভিনেত্রী নূতন

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালী যুগের জনপ্রিয় নায়িকা নূতন। মূল থেকে পার্শ্ব প্রায় তিন শতাধিক ছবিতে অভিনয় করেছেন। সত্তর-আশির দশকে সুজাতা, সুচন্দা, কবরী, শাবানা, ববিতার ভীড়ে তিনিও এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে এসেছিলেন। মিষ্টি চেহারা আর নৃত্যব্যঞ্জনায় দর্শক পরিচিতি আর জনপ্রিয়তা পেতে সময় লাগেনি তার। দ্রুতই তাই সময় আর দর্শকদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি। ১৩ নভেম্বর সোশাল মিডিয়াতে ভেসে উঠতে থাকে জনপ্রিয় অভিনেত্রী নূতনের জন্মদিনের শুভেচ্ছা বার্তা। ভক্ত, দর্শককূল তাকে সিক্ত করতে থাকেন নানা কথামালায়। সেই সূত্রেই ফোনে যোগাযোগ করা হয় একসময়ের হার্টথ্রব নূতনের সাথে। কিন্তু প্রথমেই বিনয়ের সাথে বলেন, ‘আজ জন্মদিন নয়। জন্মদিন ১ মার্চ। জন্মক্ষণের এদিনটি এবছরও পালন করেছি ঘরোয়াভাবে। তবুও যারা শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন তাঁদের জন্য অবিরাম শুভকামনা।’ জন্মদিন প্রসঙ্গ এড়িয়ে তাই জীবন প্রসঙ্গে আসি। সূচনাতেই বললেন, ‘আল্লাহর রহমতে সবার দোয়ায় ভালো আছি। এভাবে থাকতে পারলেই হলো।’

স্বাধীনতার আগেই সিনেমাতে অভিষেক ঘটেছিল ময়মনসিংহ শহরের এই মেয়েটির। নূতন নামের আগে রমা বা রত্নাবতী চক্রবর্তী হিসেবেই আপন বলয়ে পরিচিত ছিলেন। আকষর্ণীয় চেহারার এই তরুণীর তখন স্বপ্ন ছিল গায়িকা হবেন। তাই গানই ছিল তার প্রিয়, গানের তালিম নিতেন নিজ শহরেই। কিন্তু ৬৯ সালে মুস্তফা মেহমুদ পরিচালিত ‘নতুন প্রভাত’ ছবিতে তার অভিষেক ঘটলে স্বপ্নের পথ পাল্টে যায়। নতুন এক দরজাও যেন উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পরে অভিনেত্রী হিসেবে বড় বেশি আলোচ্য হয়ে ওঠেন তিনি। চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ছবি ‘ওরা ১১ জন’ ছবিতে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে সর্বমহলে তার পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। এই ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে নায়ক খসরুর বিপরীতে তিনি অভিনয় করেন। নূতনের সেই মুগ্ধময় অভিনয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথার মণিমুক্ত হয়ে আছে।

এরপর কত না ছবিতে তিনি অভিনয় করেছেন। ‘রাজনর্তকী’, ‘পাগলা রাজা’, ‘রাজলক্ষী শ্রীকান্ত’, ‘বসুন্ধরা’, ‘প্রাণসজনী’ ‘প্রেমবন্ধন’, ‘স্ত্রীর পাওনা’, ‘মানসী’, ‘রাজমহল’, অবিচার’, ‘ফকির মজনু শাহ’, ‘বদলা’, ‘ননদভাবী’, ‘রাঙাভাবী’, ‘অলংকার’, ‘বদনাম’, ‘শাহজাদা’, ‘কন্যাবদল’, তাজ ও তলোয়া’, ‘কাবিন’, সোনার চেয়ে দামী, ‘ বাঁশিওয়ালা’, ‘সত্য-মিথ্যা’, পাহাড়ী ফুল, অশান্ত, ‘মালামতি’ ‘বাঁশিওয়ালা’, ‘আবদুল্লাহ’। প্রায় সব ছবিতেই বিশেষত্ব পেয়েছেন অপূর্ব নৃত্যশৈলীর কারণে। কীর্তনিয়া, শাস্ত্রীয়, কত্থক, ভারতনাট্যম, সর্পনৃত্য, বাউল, ফোক, আধুনিক, ওয়েষ্টার্ন-চরিত্র অনুযায়ী নানা ধরনের নৃত্য সমাহারে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন। তার প্রাণময়, গতিশীল নৃত্য সিনেমা দর্শকদের স্মৃতি থেকে একবিন্দু হারিয়ে যায়নি। নূতনের পরে যারাই এসেছেন তারা কেউ যে তাঁকে টপকাতে পারেনি তা বলাই বাহুল্য। সেই টপকাতে না পারার অন্যতম কারণ তার বৈচিত্র্যময় নৃত্য উপস্থাপন। এখনও তাই চলচিত্রের নৃত্যে তাঁকে আলাদা করে স্মরণ করতে হয়। অভিনেত্রী নূতন বলেন, ‘আমি সবসময় নাচে বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করেছি। নাচতে গিয়ে অবর্ণনীয় কষ্ট করেছি। পরিচালক আর ড্যান্স ডিরেক্টদের নির্দেশে দিনের পর দিন রিহার্সেল করতে হয়েছে। অনেক নাচেই আমি আমার মতো করে সৃজনশীলতা দেখাতে হয়েছে।’

আশির দশকে ‘মানসী’ ছবিতে তিনি রুনা লায়লার গাওয়া ‘মন চায় প্রতিদিন, তুমি আমি একদিন’ গানে লিপ করেছিলেন। রুনা লায়লার গাওয়া ভীষণ মেলোডিয়াস এই গানটি তিনি দর্শক হ্নদয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন প্রাণবন্ত সৌন্দর্যময় এক নাচ উপহার দিয়ে। নূতনের ভক্তদের কাছে এই নাচ এখনও স্বর্গসম। আশির দশকে নায়ক রাজ রাজ্জাক পরিচালিত ‘পাগলা রাজা’ ছবি সুপারহিট হয়েছিল। এই ছবিতে রুনা লায়লার কণ্ঠে নায়িকা অলিভিয়ার লিপে ‘বনে বনে যত ফুল আছে’ গানটিতে তিনি যে নাচ উপহার দিয়েছিলেন তা স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

সেই সময় ‘এক্রোবেটিক’ নাচে তিনি অসম্ভব প্রতিভার সাক্ষর রেখেছিলেন। আশির দশকে তার এক নাচেই নায়িকা ‘নূতন’ দর্শকদের হ্নদস্পন্দন বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ প্রযোজনার ছবি ‘অবিচার’ এ ভারতের নায়ক মিঠুনের সাথে আশা মুঙ্গেশকরের কণ্ঠে লিপ করেছিলেন ‘নাগর আমার কাঁচা পিরিত পাকতে দিল না’। গানে-নাচে অভিনেত্রী নূতন যেনো আকাশে উড়ে গিয়েছিলেন। আবার বুলবুল আহমেদ পরিচালিত ‘রাজলক্ষী শ্রীকান্ত’ ছবিতে সাবিনা-সুবীর নন্দীর গাওয়া ‘বিধি কমলও করিয়া পাঠালো আমায়, লাগলাম নাতো কারো পূজাতে’-এই গানে তার বাউল নৃত্য অসম্ভব এক শিল্পীত রুপ পেয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

একটা প্রশ্নও তাকে নিত্য কুঁড়ে খায় এইভেবে- যে শিল্পের পেছনে তিনি জীবনের সব ক্ষণ-দিন পার করলেন কী পেলেন সেখান থেকে? দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছেন-কিন্তু রাষ্ট্রীয় স্বীৃকৃতি খুব একটা মেলেনি। অভিজ্ঞ অভিনেত্রী বলেন, ‘নৃত্য এক সৃজনশীল কলামাধ্যম। কত কষ্ট করতে হয় এখানে। শরীরকে ভেঙেচুড়ে উপস্থাপন করতে হয়। কিন্তু আমরা উপেক্ষিত। চলচিত্রের নাচের শিল্পীদের স্বীকৃতি নেই, মর্যাদা নেই।’

দীর্ঘ অভিনয় জীবনে নাচতে গিয়ে অনেক বাধা-বিপত্তি আর ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছেন তিনি। বলেন, আড়ালে-আবডালে থাকা সে সব দীর্ঘনিশ্বাসের কথা কেউ জানে না। জীবন বিপন্নের খবরও কেউ রাখেনি। সবাই শুধু চেয়েছে যেনো চরিত্র অনুযায়ী পারফেক্টলি নাচ উপস্থাপনটা করতে পারি। মনে আছে একবার জামসেদুর রহমান পরিচালিত ‘ননদভাবী’ ছবির একটি গানের শুটিং এ প্রায় আগুনে পুড়ে মরতে বসেছিলাম। গানটি ছিল রুনা লায়লার কণ্ঠে ‘মনেরও মানুষ পেলে..’।

এই গানটিতে মোমবাতির ব্যবহার ছিল। মোমের মধ্যে আগুন ছিল, সেই আগুনে মরতে বসেছিলাম। শ্রদ্ধেয় পরিচালক ইবনে মিজানের কথা স্মরণে এনে বলেন, ‘‘উনি আমাকে ‘মা’ বলে ডাকতেন। খুব পারফেক্টলি সবকিছু চিত্রায়ন করতেন। উনার ডিরেকশন ছিল চমৎকার। উনি ‘রাজনর্তকী’ ছবিতে আমাকে নায়িকা বানিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় প্রিয় অভিনেতা নায়ক রাজ রাজ্জাকের সাথে। এই ছবিতে আমাকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছিল প্রতিটি গানকে নাচের সাথে সৌন্দর্যময়ভাবে উপস্থাপন করার জন্য।’’ অভিনেত্রী নূতন বলেন, জীবনের প্রতিটি সময়েই কাজকেই ভীষণ গুরুত্ব দিয়েছি। কিন্তু জীবন চলার পথে উপেক্ষা, অবহেলা, ষড়যন্ত্রও দেখেছি। তবে সফলও হয়েছি। স্মৃতি থেকে বললেন, নব্বই দশকে পরিচালক তোজাম্মেল হোসেন বকুল যখন ‘আব্দুল্লাহ’ ছবি নিমাণ করবেন তখন দিলদারের বিপরীতে নায়িকা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কেউ ঝুঁকি নিতে চায় না। আমি ঝুঁকি নিলাম। দিলদারের নায়িকা হলাম আমি। ‘আব্দুল্লাহ’ ছবি সুপার হিট হলো সেই সময় ছবিটি তিন থেকে চার কোটি টাকার ব্যবসা করলো।

জীবন চলার পথে তিনি অনেককেই মান্য করেন তিনি। স্মরণে-শ্রদ্ধায়, প্রার্থণায় রাখেন তাদের। বলেন, ‘অভিনেত্রী সুমিতা দি’র কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। এই অসাধারণ অভিনেত্রীর হাত ধরেই আমার চলচিত্রে উত্থান। আমি কলাবাগানে উনার বাসায় থাকতাম। সেই স্বাধীনতার আগে ঢাকায় এলে উনার বাসায় উঠতাম। শুটিং করে আবার ফিরে যেতাম ময়মনসিংহে। দিদির এই ঋণ কোনোদিন শেষ হবে না।’

অভিনেত্রী নূতন এখনও নাচকেই সর্বজ্ঞান মনে করেন। নাচের বাইরে আর কিছু ভাবেন না। বলেন, ‘আমি কৈশরে ময়মনসিংহ বাফাতে গান ও নাচ শিখতাম। আমার ওস্তাদজী ছিলেন পূর্ণ চন্দ্র সরকার। এই মানুষটিকে সারাজীবন শ্রদ্ধার আসনে রেখেছি। তাকে আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না, ভুলবো না। ওস্তাদজী পূর্ণ চন্দ্র সরকার ভালো তবলা বাজাতেন। পরে ওস্তাদ মিথুন দে’র কাছেও আমি গান শিখেছি।’ সবশেষে অভিনেত্রী নূতন বলেন, ‘যত ছবিতেই অভিনয় করি ‘ওরা ১১ জন’ ছবিটি আমার আত্মার সাথে মিশে আছে। এই ছবির স্মৃতিগুলোই জীবনের এক বড় সঞ্চয়। এই ছবিই আমাকে বাঁচিয়ে রাখবে এদেশের সব সবার মাঝে।’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন