চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বামীসেবী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব

চেতনায় অম্লান দীপ্তি: শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব

বাংলায় একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রবাদ রয়েছে “একজন পুণ্যবতী রমণী তার স্বামীর মাথার মুকুটস্বরূপ।” কবিদের দৃষ্টিতে ফজিলাতুন নেছা মুজিব এ প্রবাদের উৎকৃষ্ট পরিচায়ক। সতি সাধ্বী, পুণ্যবতী, ক্যারিশমার অধিকারী, সুযোগ্য সহধর্মিণী ফজিলাতুন নেছা স্বামীর নিকট আশীর্বাদ হিসেবে এসেছিলেন। আর সেই আশীর্বাদের ফলস্বরূপ আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। বিশ্বের নিপীড়িত, নির্যাতিত, অসম, শোষিত-বঞ্চিত, পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ বঙ্গবন্ধুর সীমাহীন প্রেরণার জীবন্ত কিংবদন্তি ছিলেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কাজে অফুরান উৎসের আধার, প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রত্যেকটি কাজেই বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর দর্শন-মনন, রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে যে মানুষটি নীরবে নিভৃতে অবদান রেখেছেন তিনিই ফজিলাতুন নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরণের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন তিনি, বিপদে পাশে থেকে সাহচর্য দিয়েছিলেন, সহযোগিতা করেছেন, অনুপ্রেরণার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।

মহীয়সী, আপোসহীন নেত্রী হিসেবে নিরবিচ্ছিন্ন এবং নিরলস প্রয়াসে আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর পাশে ছায়া হয়ে থেকেছেন, কখনো সামান্যতম বিরক্ত প্রকাশ করেন নাই বিপুল কর্মযজ্ঞের ভেতরেও। স্বামীর রাজনৈতিক চেতনা নিজের ভিতরে সর্বদা লালন করতেন তিনি। ইতিহাসের এক উজ্জ্বল শিরোমণি হিসেবে বাঙালি জাতির জন্মলগ্নে ভূমিকার কারণে আদর্শ হয়ে রইবেন অনন্তকাল। ফজিলাতুন নেছা মুজিবের পতিপ্রেম, অনুপ্রেরণা, উৎসাহ জাতির পিতা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে স্বীকৃতি পেতে এবং আমাদের আত্মপরিচয়ের সুযোগ দেওয়ায় ফজিলাতুন নেছা বেঁচে থাকবেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। পাশাপাশি বাঙালির প্রতিটি নারীর কাছে উদাহরণস্বরূপ হয়ে রইবেন পতিব্রতা রমণী হিসেবে। শুধু কী বাংলাদেশ; বিশ্বের অন্যতম অনুকরণীয়, অনুসরণীয় পতিব্রতাদের মধ্যে অনন্য হয়ে রইবেন। মাত্র ৪৫ বছরের জীবদ্দশায় ফজিলাতুন নেছার অর্জন, স্মৃতির মানসপটে অমলিন থাকবে বাঙালি জাতির জীবনে অনন্তকাল।

বিজ্ঞাপন

শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে রাজবন্দী থাকা অবস্থায় কুখ্যাত মোনায়েম সরকার জেলকোডের সকল বিধি ভঙ্গ করে রেকর্ড করেছিলো। শেখ মুজিবকে অন্য কোন রাজবন্দী কিংবা দলের কোন নেতাকর্মীর সাথে থাকতে দিতো না কিংবা দেখা করতে দিতো না। খুব অসহায় অবস্থায় জেলের দিনগুলো কেটেছে মহানায়কের। নিজের চিন্তা বাদ দিয়ে কারাগারে অন্য রাজবন্দীদের ডিভিশন না হওয়া, সি ক্যাটাগরির সেলে থাকতে দেওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো খুব পীড়া দিতো শেখ মুজিবকে। এসব কারণেই রাতের বেলায় ঘুম হতো কম (প্রায়শই মাথা ব্যাথা থাকতো), ঘুম হওয়ার জন্য অনেক সময় স্যারিডন খেতেন। কিন্তু বেগম মুজিব বিষয়টা খুবই অপছন্দ করতেন, কারণ এর কারণে হার্টের সমস্যা হয়ে থাকে। এক জায়গায় বঙ্গবন্ধু উল্লেখ করেছেন; “রেণু স্যারিডন খেতে দিতো চাইতো না। ভীষণ আপত্তি করত। বলত, হার্ট দুর্বল হয়ে যাবে। আমি বলতাম আমার হার্ট নাই, অনেক পূর্বেই শেষ হয়ে গেছে। বাইরে তার কথা শুনি নাই। কিন্তু জেলের ভিতর তার নিষেধ না শুনে পারলাম না।”

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশের জন্য একটি অবিস্মরণীয়, ঐতিহাসিক ও আনন্দঘন দিন। সেদিন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান থেকে লন্ডন হয়ে ভারতে যাত্রাবিরতি দিয়ে বাংলাদেশে আসেন। অন্যান্য বাঙালির ন্যায় দিনটি ফজিলাতুন নেছা মুজিবের কাছে অনন্য ছিল। সে এক আবেগতাড়িত দৃশ্য, যখন শেখ মুজিব বঙ্গজননীর বন্দিদশায় অবস্থান করা ধানমন্ডির ১৮নং রোডের বাড়িতে প্রবেশ করেন। সেদিন বঙ্গজননী বঙ্গবন্ধুকে গভীর আলিঙ্গনে জড়িয়ে রাখেন। দৃশ্যটি তাদের মধ্যকার গভীর ভালবাসার উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হয়ে এক নান্দনিক ও নয়নাভিরাম প্রতীক হয়ে রয়েছে আজও। ক্যামেরায় ধারণকৃত সে দৃশ্য বাঙালি জাতির জীবনে এক অমূল্য সম্পদ। দীর্ঘ বিরতির পর স্বামীকে কাছে পেয়ে সব বাঁধ ভেঙ্গে সেদিন ফজিলাতুন নেছা আবেগকে দমাতে পারেননি, বাস্তবের নিরিখে ফিরে এসেছিলেন। অবশ্য সেদিনও তিনি পরিবারের সবাইকে শান্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

স্বামীর প্রতি অসম্ভব আসক্ত ছিলেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব, যেটি বঙ্গ ললনার নামান্তর। বঙ্গবন্ধু-বঙ্গ জননীর প্রতি ভালবাসার গভীরতা মাত্রাহীন থাকায় অনেকেই ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু কোন কিছুতেই তাদের সম্পর্কে ছেদ পড়েনি। স্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধু গলব্লাডারের রোগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। লন্ডনে অপারেশনে যাওয়ার সময় স্বামীর সেবা যত্ন করার জন্য সফরসঙ্গী হিসেবে ফজিলাতুন নেছা মুজিবও গিয়েছিলেন। অপারেশনের পরে ফজিলাতুন নেছা মুজিব রাত-দিন স্বামীর সেবা শুশ্রুষা করে স্বামীকে সুস্থ করে তুলেছিলেন। বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছেন স্বামীর জন্য, একটি বারের জন্য ক্লান্তি আসেনি তার চেহারায় ও কর্মকাণ্ডে। চিরায়ত গ্রাম বাংলার রমণীর অনুকরণে স্বামী সেবায় মত্ত ছিলেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব, ঐ সময়ের সংরক্ষিত পারিবারিক ছবিগুলোতে চোখ ভুলাতেই সহজেই অনুমান করা যায় বঙ্গবন্ধুর শিয়রে বসে স্বামী সেবায় মগ্ন একজন সতী-সাধ্বী রমণী। স্বামীর প্রতিটি কাজে তিনি ছায়ার মত লেগে থাকতেন এবং ঐ সব কর্মকাণ্ডে কারো অংশীদারিত্ব গ্রহণের সুযোগ ছিল না। স্বামীর প্রতিটি কাজকে নিজের দায়িত্ব হিসেবে মেনে নিতেন অবলীলায়।

বিজ্ঞাপন

লোকায়ত বাংলার চিরায়ত রমণীর ন্যায় কখনোই নিজের চাহিদার কথা কাউকে জানতে দিতেন না, কিন্তু স্বামীর পছন্দের রুচির প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন সর্বক্ষণ। শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় পছন্দের বিষয়গুলো সামনে উপস্থাপনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খাদ্যবস্তু সযত্নে রান্না করে সবসময় পরিবেশন করতেন। স্বামীকে বা কাছেই কতদিন পেয়েছেন, কখনও সেভাবে এক মাস একসাথে থেকেছেন সে সুযোগও কম ছিল এ পত্নীর জীবনে। আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়েই বঙ্গবন্ধু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং ঘন ঘন কারাগারে যেতে হতো সে সুবাদে। কারাগারে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে কখনো একা আবার কখনো ছেলেমেয়েদের নিয়ে হাজির হতেন। বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমার বেগমের দৌলতে কোন জিনিসের তো আর অভাব নাই। বিস্কুট, হরলিকস, আম, এমনকি মোরব্বা পর্যন্ত তিনি পাঠান।”

বিশেষ বিশেষ দিন ও উৎসবের সময় যেমন জন্মদিন, রমজান মাস এবং ঈদেও ছেলেমেয়েদের সকলকে নিয়ে জেলগেটে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতেন। এমনি এক জন্মদিনের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন শেখ মুজিব। “ছোট মেয়েটা আর আড়াই বৎসরের রাসেল ফুলের মালা হাতে করে দাঁড়াইয়া আছে। মালাটা নিয়ে রাসেলকে পরাইয়া দিলাম। সে কিছুতেই পরবে না, আমার গলায় দিয়ে দিল। ওকে নিয়ে আমি ঢুকলাম রুমে। ছেলেমেয়েদের চুমা দিলাম। দেখি সিটি আওয়ামী লীগ একটা বিরাট কেক পাঠাইয়া দিয়াছে। রাসেলকে দিয়াই কাটালাম, আমিও হাত দিলাম। জেল গেটের সকলকে কিছু কিছু দেওয়া হলো। কিছুটা আমার ভাগ্নে মণিকে পাঠাতে বলে দিলাম জেলগেট থেকে। ওর সাথে তো আমার দেখা হবে না, এক জেলেও থেকে। আর একটা কেক পাঠাইয়াছে বদরুন, কেকটার উপর লিখেছে ‘মুজিব ভাইয়ের জন্মদিনে’। বদরুন আমার স্ত্রীর মারফতে পাঠাইয়াছে এই কেকটা।” কাজেই, বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার মধ্যকার আমৃত্যু রসায়ন আমরা জীবন প্রবাহের নানা ঘটনার মাধ্যমে জানতে পেয়েছি। এমনকি বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ খাবারও ফজিলাতুন নেছা মুজিব নিজ হাতে রান্না করে পরিবেশন করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ব্যবহৃত পাইপগুলোও নিজ হাতে পরিষ্কার করতেন অবলীলায়।

নাটক, মুভি, কবিতা, উপন্যাস, গল্পে এবং কল্পকাহিনীতে দাম্পত্য প্রেম নিয়ে নানা ধরনের মুখরোচক গল্প প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে আমরা সেরকম দেখতে পাই না, ভিন্ন কেবল বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গমাতার প্রণয়োপ্যাখ্যান। ১৫ আগস্ট ঘাতকের বুলেটের আঘাতে বঙ্গবন্ধু আর বঙ্গ জননীর যুগলবন্দীর জীবনাবসান ইতিহাসের গল্পকেও হার মানায়। নাটকীয়তায় পরিপূর্ণ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ফজিলাতুন নেছা মুজিব স্বামীর প্রতি আনুগত্য, বিশ্বাস, ভালবাসা আর অনুকরণের যে মাহাত্ম্য স্থাপন করে গেছেন তা সত্যিই বিরল। সৃষ্টিকর্তা নিয়তি ঠিক করেই রেখেছিলেন একজনকে ছাড়া যেন অন্যজন বেমানান। দুইজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফসলই আমাদের প্রিয় স্বাধীনতা। ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অনুকরণে বড় হয়ে ওঠা বর্তমানে জীবিত বঙ্গবন্ধু-বঙ্গ জননীর দুই সন্তান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা এখনো বাঙালি জাতির আশা আকাক্সক্ষার প্রতীক হয়ে তাদের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন নিষ্ঠার সাথে। বাংলাদেশের মর্যাদাকে বিশ্বের বুকে সম্মানজনক পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন সর্বত্রই।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান নেতাদের বক্তব্যে জানা যায় বঙ্গ জননীর অনেক গুণই তাদের দুই কন্যার মধ্যে দেখা যায়। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফের সাথে কথা বলে জানা যায়, যেকোন রাজনৈতিক কর্মী পূর্বানুমতি না নিয়েই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে অবলীলায় দেখা করতে পারেন যে গুণটি তিনি তার মমতাময়ী মায়ের কাছ থেকে পেয়েছেন। যেখানে অন্য রাজনৈতিক দলের প্রধান কিংবা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিবর্গের সাথে দলের সিনিয়র নেতারাই সহজে দেখা করতে পারেন না, সেখানে কর্মী-সমর্থকদের দেখা-সাক্ষাত পাওয়ার বিষয়টি কল্পনার বাইরে।

চলবে…

Bellow Post-Green View