চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বামীর কৃষি জমিতে হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার আছে: হাইকোর্ট

স্বামীর রেখে যাওয়া কৃষি জমিতে হিন্দু বিধবা নারীর অধিকার রয়েছে বলে একটি রিভিশন মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছেন হাইকোর্ট।

এই রায়ের আইনী প্রেক্ষাপট তৈরি হয় দুই যুগ আগে। খুলনার বটিয়াঘাটার হালিয়া গ্রামের অভিমন্যু মণ্ডল মারা যাওয়ার পর তার কৃষি জমি বিধবা স্ত্রী গৌরী দাসীর নামে রেকর্ড হয়ে যায়। তবে সেই রেকর্ড সংশোধনের জন্য ১৯৯৬ সালে খুলনার সহকারি জজ আদালতে মামলা করেন গৌরী দাসীর দেবর জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু আদালত ১৯৪১ সালের ইন্ডিায়ার ফেডারেল কোর্ট ও বাংলাদেশ হাইকোর্টের বিভিন্ন রায় অনুসরণ করে জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডলের আবেদন খারিজ করে দেন।

বিজ্ঞাপন

সেই সাথে আবার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, গৌরী দাসী তার স্বামী অভিমন্যু মণ্ডলের কৃষি সম্পত্তিতে অধিকার পাবেন না।

সহকারি জজ আদালত জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডলের আবেদন খারিজ করার পর তিনি সেই রায়ের বিরুদ্ধে খুলনার যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আপিল করেন।

কিন্তু এই আদালতও ২০০৪ সালের ৭ মার্চ জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডলের আবেদন খারিজ করে দেন। তবে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলেন, বিধবা গৌরী দাসী তার স্বামীর রেখে যাওয়া কৃষি সম্পত্তি পাবেন।

এছাড়াও যুগ্ম জেলা জজ আদালতের ওই রায়ে বলা হয়, ‘যেহেতু (১৯৭১ এর পর) বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ধরন পরিবর্তন হয়েছে এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সরকার এককেন্দ্রীক এবং কৃষি জমি সংক্রান্ত আইন প্রণয়নে জাতীয় সংসদের আইনী কোনো অযোগ্যতা নেই, তাই ১৯৪১ সালে দেয়া ইন্ডিয়া ফেডারেল কোর্টের রায় আমাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।’

বিজ্ঞাপন

যুগ্ম জেলা জজ আদালতের দেয়া এই রায়ের বিরুদ্ধে জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডল হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন।

সেই আবেদনের শুনানি নিয়ে জ্যোতিন্দ্রনাথ মণ্ডলের করা আবেদন (রিভিশন মামলা) খারিজ করে বুধবার রায় দেন বিচারপতি মো. মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরীর হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আদালতে আবেদনকারী পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. আব্দুল জব্বার। অন্যপক্ষে ছিলেন আইনজীবী নাফিউল ইসলাম। আর অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) হিসেবে এই মামলায় আদালতে মতামত দিয়েছেন আইনজীবী উজ্জ্বল ভৌমিক।

রায়ের পর উজ্জ্বল ভৌমিক চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘আজকের রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, বাংলাদেশে প্রচলিত (১৯৩৭ সালের ‘দ্য হিন্দু ওমেন’স রাইট টু প্রোপার্টি অ্যাক্ট’) যে আইন আছে, সেই আইনে স্বামীর রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে কোনো পার্থক্য (কৃষি বা অকৃষি) করেনি। ফলে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী স্বামীর রেখে যাওয়া কৃষি জমিতে তার বিধবা স্ত্রী অধিকারের দাবিদার।’

‘‘সুতরাং হাইকোর্টের রায়ের এই পর্যবেক্ষণের আইনগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দেশের নিম্ন আদালত এই পর্যবেক্ষণ মানতে বাধ্য। আর এই রায়ের ফলে দেশের হিন্দু বিধবা নারীরা (যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন) তার স্বামীর রেখে যাওয়া কৃষি জমি ভোগ দখল করতে পারবেন। এতদিন বিধবা নারীরা শুধুমাত্র অকৃষি জমির অধিকারী ছিলেন।’’

হিন্দু বিধবা নারীদের সম্পত্তির অধিকারের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তনি বলেন, ‘১৯৩৭ সালের আগে হিন্দু বিধবারা সম্পত্তির অধিকার পেত সন্তানের অবর্তমানে। কিন্তু ১৯৩৭ সালে ‘দ্য হিন্দু ওমেন’স রাইট টু প্রোপার্টি অ্যাক্ট’ করার পরে স্বামীর রেখে যাওয়া যেকোনো (কৃষি-অকৃষি) সম্পত্তিতে ছেলে সন্তানের সাথে হিন্দু বিধবা নারীকে অধিকার দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালের এই আইনটি চ্যালেঞ্জ করলে ইন্ডিয়ার ফেডারেল কোর্ট ১৯৪১ সালে কৃষি জমির অধিকারের ক্ষেত্রে হিন্দু বিধবাদের অধিকার বাতিল করে দেয়।

বাতিলের রায়ে বলা হয়, ১৯৩৫ সালের আইন অনুযায়ী কেন্দ্রীয় সরকার শুধুমাত্র অকৃষি জমি নিয়ে আইন করতে পারত। যেহেতু ১৯৩৭ সালের আইনটি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। সেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারে এখতিয়ার নাই কৃষি জমি নিয়ে আইন করার।’

আইনজীবী উজ্জ্বল ভৌমিক আরও বলেন, ‘১৯৭২ সালের আগে ইন্ডিয়ার ফেডারেল কোর্টের রায় অনুযায়ী বিধানই আমাদের এখানে চলে আসছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর ১৯৩৭ সালের সেই ‘দ্য হিন্দু ওমেন’স  রাইট টু প্রোপার্টি অ্যাক্ট’ গ্রহণ করে বাংলাদেশ সরকার।’