চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বপ্ন দেখতে প্রস্তুত যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান

গত সপ্তাহে কাবুলজুড়ে আচমকাই স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান থেকে প্রচণ্ড গুলির আওয়াজ। পুরো শহরের বাসিন্দারা আরেকটি সন্ত্রাসী হামলার ভয়ে তখন কাঁপছিল। পরে জানা যায়, সেই শব্দ সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলি থেকে ছিল না। শব্দ তৈরি করেছিল আফগানিস্তানের ক্রিকেটপ্রেমীরা।

কারণ, তার অল্প সময় আগেই বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ম্যাচে পাকিস্তানকে হারিয়েছিল আফগানরা। জয়ের আনন্দে পিস্তল, শটগান এবং একে-৪৭ থেকে গুলি ছুঁড়ে রাতের আকাশে বিস্ফোরণ ঘটায় সমর্থকরা।

ক্রিকেট বিশ্বকাপে প্রস্তুতি ম্যাচে জয়েই ফুটে উঠেছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ থেকে আসা খেলোয়াড়রা কতদূর যাবে! যার আঁচ পাওয়া যায় কাবুলের ১৮ বছরের এক কিশোরের কথায়ও। একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে তরুণ বশির আহমেদ বলেন, ‘যদি আফগানিস্তান দল ভালো খেলতে পারে তবে সেটা সমস্ত জাতিগোষ্ঠী এবং সমগ্র জাতির জন্য গর্বের মুহূর্ত হবে।’

আফগানিস্তান এবার আসলেই চমক দিতে তৈরি। মোহাম্মদ নবি এবং রশিদ খান তো বিশ্বক্রিকেটে এখন অন্যতম সেরা মুখ। বিশেষ করে রশিদ। তার স্পিন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন বিশ্বের তাবড়-তাবড় ব্যাটসম্যানরা। অস্ট্রেলিয়ার গ্লেন ম্যাক্সওয়েল পর্যন্ত বলেছেন, রশিদকে সামলানো বেশ কঠিন।

আইসিসি বাছাইতে আয়ারল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয়া আফগানিস্তানের প্রথম ম্যাচ আবার ম্যাক্সওয়েলের দল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ব্রিস্টলের ম্যাচের আগে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে তারা যেটা দেখিয়েছেন, তা একটি ভালো গল্পের চেয়েও বেশিকিছু।

গত এশিয়া কাপে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কাকে হারানোর পর চ্যাম্পিয়ন ভারতের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল আফগানরা। তবে বিশ্বকাপের জন্য ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখার আগে বেশ বিতর্কেও জড়িয়ে যায় সেদেশের ক্রিকেট।

গত মাসেই হঠাৎ করে আগের অধিনায়ক আসগর আফগানকে সরিয়ে অল্প পরিচিত গুলবাদিন নায়েবকে অধিনায়ক করে আফগান বোর্ড। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সব জায়গাতেই এর সমালোচনা হয়।

রমজানের কারণে তাদের অনুশীলনেও খামতি পড়েছে কিছুটা। দলের সব খেলোয়াড়ই রোজা রাখছেন এবং তারাবীহ নামাজ আদায করছেন। এই তথ্য জানিয়েছেন আফগান ক্রিকেট বোর্ডের মুখপাত্র ফরিদ হোতাক।

অনুশীলনে একটু কমতি হলেও তা দলে তেমন প্রভাব ফেলবে না বলেই মনে করেন সমর্থকরা। ১৭ বছরের ক্রিকেটভক্ত জিয়ারমাল, যিনি নিজেও ক্রিকেট খেলেন। দল তাকে অনুপ্রেরণা দেয় এবং ক্রিকেট দেশে শান্তি ফেরাচ্ছে বলে জানান, ‘আফগানিস্তান ক্রিকেটে দুর্দান্ত উন্নতি করেছে। জাতীয় দল আমার জন্য একটি অনুপ্রেরণা। ক্রিকেট শান্তির বার্তা নিয়ে আসে, মানুষকে আনন্দ দেয়, ঐক্য ও ভালোবাসা নিয়ে আসে।’

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টির একনম্বর বোলার এখন রশিদ খান। দেশে রীতিমতো সুপারস্টার তিনি। রশিদের আগে থেকেই ক্রিকেটে পরিচিত মুখ নবি। তাদের নিয়ে সমর্থকদের ভাষ্য, ‘ রশিদ খান এবং মোহাম্মদ নবিসহ আমাদের জাতীয় দলে অনেক খেলোয়াড় রয়েছেন যারা আমাদের দলের ম্যাচ উইনার।’

পাকিস্তানের শরণার্থী ক্যাম্পে বেড়ে উঠেছে আফগানিস্তানের এমন একটি নতুন প্রজন্মকে ক্রিকেটজুজু ধরা হয়েছে। এমনকি তালেবানরাও এই ক্রিকেটের ভক্ত, যারা নিজেদের শাসনামলে সবধরনের খেলাধুলাকে নিষিদ্ধ করেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিদ্রোহী এই গ্রুপের কর্মকর্তারা বলেছেন, তারা ক্রিকেটকে সমর্থন করে যাবেন।

গত কয়েকবছরে চোখে লাগার মতো উন্নতি করেছে আফগানিস্তান ক্রিকেট। বর্তমানে টি-টুয়েন্টি র‌্যাঙ্কিংয়ে সাত নম্বরে আছে তারা। শনিবার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ খেলাকে তাই গর্ব হিসেবেই দেখছেন আফগানরা।

এক সমর্থক বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া যখন বিশ্বকাপ ট্রফি জিতেছে আফগান দল এমনকি তাদের অস্তিত্বও ছিল না। কিন্তু এখন আমরা তাদের বিরুদ্ধে খেলছি।’

কাবুলের এক মুদি দোকানদার জানান, আফগানিস্তান দল যখন মাঠে খেলে, তখন পুরো পরিবার নিয়েই টেলিভিশনে খেলা দেখেন তিনি। বলেন, ‘ক্রিকেট ম্যাচ দেখা আমাদের সকলের জন্য অনেক সুখ ও আনন্দ নিয়ে আসে।’

গত মাসে একজন আফগান ঘাস থেকে বিশ্বকাপ ট্রফির প্রতিলিপি তৈরি করেছিলেন, তার কাজের ওই চিত্র দ্রুতই ভাইরাল হয়ে গিয়েছিল এবং তা জাতীয় সংবাদমাধ্যমেও ব্যাপকভাবে সাড়া পায়।

ব্যবসায়ী এবং অপেশাদার শিল্পী আমানউল্লাহ কালীওয়ালও পাথর থেকে ট্রফি তৈরি করে এমন কিছু করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার শৈশব থেকে ক্রিকেট ভালোবাসি এবং আমি এর একজন বড় ফ্যান। আমি ভবিষ্যতে আমাদের জাতীয় ক্রিকেট দলের কাছে উপহার দিতে পারি এমনকিছু করতে চেয়েছিলাম এবং তাই আমি এটা তৈরি করেছি। আমরা আশাবাদী, আমাদের দলকে আমরা বিশ্বাস করি, কারণ দলটি খুবই শক্তিশালী, সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা হলে আমরা বিশ্বকাপ জিততে পারি।’

বিশ্বকাপে ফলাফল যাই হোক না কেনো, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান তাদের ক্রিকেটারদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতে প্রস্তুত। অস্ট্রেলিয়া শক্তিতে অনেক এগিয়ে থাকলেও অঘটনের আশায় মজে আছে আফগানরা।

শেয়ার করুন: