চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্বপন মামার পাশে টিএসসি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির এক কোণায় গত ৩৬ বছর ধরে চা বিক্রি করে আসছেন আবদুল জলিল ওরফে স্বপন মামা। সেই চায়ের কাপ হাতে নিয়ে আড্ডা দিতে দিতে মুক্তবুদ্ধির চর্চা, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান বের করে আনার নজির রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের। আড্ডার ফাঁকে হাতে থাকা চায়ের কাপ যে কতবার খালি হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। আর এর কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সদা হাস্যজ্জ্বল স্বপন মামা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবার প্রিয় হাসিখুশি স্বপন মামার মুখটা এখন কেমন মলিন লাগে। প্রাণোচ্ছল স্বপন মামা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেছেন। হাসিখুশি লোকটা হুট করেই তার সন্তানতূল্য শিক্ষার্থীদের সাথে রাগারাগিও করেন।

কারণ, স্বপন মামার মন ভাল নেই। নিজের প্রতিবন্ধী মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। আর এর বিচার না পাওয়ার চাপা কষ্ট বয়ে বেড়াচ্ছেন মুখরিত টিএসসির প্রাণ স্বপন মামা।

স্বপন মামার পরিবার থাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের বাসুদেব গ্রামে। টিএসসি এলাকায় ৩৬ বছর ধরে চায়ের দোকান দিয়ে সংসার চালানো স্বপন মামার ২০ বছর বয়সী প্রতিবন্ধী মেয়েকে ২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর একই গ্রামের প্রায় ৭০ বছর বয়সী বাচ্চু মিয়া ধর্ষণ করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

ওই দিনই অভিযুক্তসহ তার দুই ভাই বাহার ও আক্কাসকে আসামি করে মামলা করেন স্বপন মামা। পরে বাচ্চু মিয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর ছয় মাস পর অভিযোগপত্র জমা দেয়া হয়। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাব্যুনাল আসামিকে ২৭ নভেম্বর জামিন দিয়ে দেন। এরপর আসামিপক্ষের লোকজন স্বপন মামা, তার ছেলে রনি এবং চাচাতো ভাইকে আসামি করে প্রথমে মাদকের ও ডাকাতির মামলা করে।

এরপর থেকে প্রতিবন্ধী মেয়েকে ধর্ষণের বিচার ও নিজের ওপর করা মিথ্যা মামলার প্রত্যাহার চেয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন স্বপন মামা। মামলা চালাতে গিয়ে দেনায় জর্জরিত স্বপন এখন শুধু তার বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার চান।

স্বপন মামার এই দুঃসময়ে জেগে আছে টিএসসিও। টিএসসির সকল সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন তার পাশে দাঁড়িয়েছে।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ধর্ষণের বিচার ও মিথ্যা মামলা বাতিলের দাবিতে যৌনপীড়ন বিরোধী আলোক প্রজ্বোলন ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন করে টিএসসির সংগঠনগুলো। সেখানে ধর্ষণবিরোধী কবিতা, গান, বক্তব্য প্রদান করা হয়। পাশাপাশি মামলা চালাতে গিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়ে যাওয়ায় স্বপন মামার জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়।

এর আগে (১৫ জানুয়ারি) এই ঘটনার বিচার চেয়ে ঢাবি সাংবাদিক সমিতে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা।

প্রিয় মানুষদের পাশে পেয়ে বুকে সাহস পেয়েছেন স্বপন মামা নিজেও। তিনি এখন আশাবাদি এই ঘটনার বিচার পাবেন।

চ্যানেল আই অনলাইনকে স্বপন মামা বলেন: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যেভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে এতে আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। শুধু বর্তমান শিক্ষার্থীরা নয়, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেক আগে প্রাক্তন হয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীরা; যারা এখন প্রশাসনিক ভাবে অনেক শক্তিশালী তারাও আমার খবর নিচ্ছে।

স্বপন মামা বলেন: ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপারও এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি আমাকে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন, দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এ সবই হয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আমার প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসার জন্য।

আগামী ২৯ ফেব্রুয়ারি মামলার রায় হওয়া পর্যন্ত সকলকে পাশে থাকার আহ্বান জানান স্বপন মামা।

প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজকদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সেক্রেটারি জুবলী রহমত বলেন: আমরা সব সময় স্বপন মামার সাথে আছি, থাকব। এখানে কোন দলমত বিভেদ নেই। ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, বাম ছাত্র সংগঠন সকলে আমরা একযোগেই এর বিচার চাই। বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আমার সজাগ থাকব।

বিজ্ঞাপন

শেয়ার করুন: