চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্থানীয় সরকারে শিক্ষাগত যোগ্যতার ধূম্রজাল দূর করবে কে?

সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে সামনের নির্বাচনের আগেই পরিবর্তন আসছে । স্থানীয় সরকার আইনে সিটি কর্পোরেশনকে ‘মহানগর’; পৌরসভাকে ‘নগর ও নগর সভা’ এবং ইউনিয়ন পরিষদকে ‘পল্লী পরিষদ’ করার প্রস্তাবনা দেয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এ সংক্রান্ত আইনের খসড়াও তৈরি করে ফেলেছে৷ অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা নিয়ে শুরু হয়েছে এক ধূম্রজালের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে আবার নির্বাচন কমিশন বলছে তারা এব্যাপারে কিছুই জানে না। তারা আরও বলছে, শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয় ইসির নয়। এটা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের। আবার তারা একথাও বলছেন, প্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা দরকার। তাহলে প্রশ্ন দরকার তো করছেন না কেন?

স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম বাংলায় রূপান্তর করা হচ্ছে। এ রূপান্তরে সিটি মেয়রকে মহানগর আধিকারিক; পৌরসভাকে নগর ও নগর সভা, মেয়রকে পুরাধ্যক্ষ বা নগরপিতা; কাউন্সিলরকে পরিষদ সদস্য; ওয়ার্ডকে মহল্লা; উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানকে উপজেলা পরিষদের প্রধান, উপ-প্রধান নামে নামকরণের প্রস্তাব করা হচ্ছে।আর ইউনিয়ন পরিষদের নামকরণ হচ্ছে পল্লী পরিষদ । উল্লেখ্য ১৮৮৫ সাল থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত বর্তমান ইউনিয়ন পরিষদের নাম ছিল ইউনিয়ন কমিটি। এরপরে ইউনিয়ন কমিটি ভেঙে নতুন কমিটির নামকরণ করা হয় ইউনিয়ন বোর্ড। এরপরে ইউনিয়ন বোর্ডের নাম পরিবর্তন করে ইউনিয়ন কাউন্সিল করা হয়। ১৯৭১ সালে ইউনিয়ন কাউন্সিলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ত্রাণ কমিটি। ১৯৭২ সালের ১ জানুয়ারি ত্রাণ কমিটি হতে ইউনিয়ন পঞ্চায়েত ও ১৯৭৩ সালে ইউনিয়ন পঞ্চায়েত হতে ইউনিয়ন পরিষদ নামকরণ করা হয়৷

বিজ্ঞাপন

১৮৭০ সালের গ্রাম চৌকিদারি আইনের মধ্য দিয়েই আজকের এই ইউনিয়ন পরিষদের সৃষ্টি৷
প্রতিটি গ্রামে পাহাড়া টহল ব্যবস্থা চালু করার উদ্দেশ্যে কতগুলো গ্রাম নিয়ে এই ইউনিয়ন গঠিত হয়। নামকরণে কখনো ইউনিয়ন বোর্ড, কখনো ইউনিয়ন কাউন্সিল, কখনো ইউনিয়ন পঞ্চায়েত ও সর্বশেষে করা হয় ইউনিয়ন পরিষদ। ১৯৭৩ সাল হতে ইউনিয়ন পরিষদের প্রত্যক্ষ ভোটে ১ জন চেয়ারম্যান,১ জন ভাইস চেয়ারম্যান ও ৯ জন সদস্য নির্বাচিত হতে থাকে। পরবর্তীকালে ১৯৭৬ সালের স্থানীয় সরকার অধ্যাদেশে ভাইস চেয়ারম্যান পদটিকে আবার বিলুপ্ত করা হয়। আর দুজন মহিলা সদস্য ও দুজন কৃষক প্রতিনিধি সদস্য যুক্ত করা হয়। এভাবে বারবার ইউনিয়নের নামকরণ ও পরিষদ টিমের বদল হতে থাকে। এখন আবার কৃষক প্রতিনিধি সদস্যও নেই। ইউনিয়ন পরিষদে ভাইস চেয়ারম্যান পদটি বিলুপ্ত হলেও উপজেলা পরিষদে তা রয়েছে। কিন্তু এসব পরিবর্তনে কি প্রাতিষ্ঠানিক কোন লাভ হলো?

সিটি কর্পোরেশনকে মহানগর, পৌরসভাকে নগর ও নগর সভা, ইউনিয়ন পরিষদকে পল্লী পরিষদ,ওয়ার্ডকে মহল্লা, সিটি মেয়রকে মহানগর আধিকারিক, পৌর মেয়রকে পুরাধ্যক্ষ বা নগর পিতা, কাউন্সিলরকে পরিষদ সদস্য এসব পরিবর্তনে কি প্রাতিষ্ঠানিক গুণগত মানের কোন উন্নয়ন হবে? আর অতীতের এসব পরিবর্তনে কি গুণগত মানের কোন উন্নয়ন হয়েছে? দেশজুড়ে মানুষ ধোঁয়শায় এসব গণপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয় নিয়ে। কেউ তার পক্ষে কেউ বিপক্ষে। কেউ কেউ বলছেন ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক। সেক্ষেত্রে চেয়ারম্যানের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকবে ৫ম শ্রেণি ৮ম শ্রেণি তা কী করে হয়? নামকরণ বদলে কি এসব সমস্যার কোন সমাধান হবে? শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টা অস্পষ্ট না রেখে তা স্পষ্ট করা উচিত ছিল। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি কাম্য নয়। আরও কাম্য নয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জন বাদ দিয়ে অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন ও পরিমার্জন।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পরিবর্তন করে উপজেলা পরিষদের প্রধান ও উপপ্রধান করলে কি সচিব বিষয়ক ধূম্রজাল দূর হবে? জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সুস্পষ্ট সচিব রয়েছে কিন্তু উপজেলা পরিষদের তা নেই। উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা সাচিবিক দায়িত্ব পালন করতে রাজী নয়। তারা উপজেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করে চলছে। তবে কি উপজেলা পরিষদ সচিব বিহীন এভাবেই চলবে? নাম বদলের চেয়ে কি এই অস্পষ্টতা দূর করাই মুখ্য ছিলোনা? আর উপজেলা চেয়ারম্যানকে যে নামেই ডাকা হোক তার শিক্ষাগত ও প্রাসঙ্গিক অন্যান্য যোগ্যতা কী কী থাকতে হবে তা পরিষ্কার করা উচিত। এই শিক্ষাগত যোগ্যতা না থাকার জন্যই বুঝি অনেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার উপজেলা পরিষদের সচিব হতে চান না। এটার একটা ফায়সালা করা জরুরি নয় কি?

কী চলছে ইউনিয়ন পরিষদে। কোটি টাকা বরাদ্দের বিল্ডিং গুলো অপরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।অধিকাংশ অফিসেই চালু নেই তথ্য কেন্দ্র, গ্রাম আদালত৷ অনেক ইউপি চেয়ারম্যান এসব অফিসে বসেনও না। তবে কেন কী উদ্দেশে এতো টাকা খরচ করে এই অফিস নির্মাণ?

চেয়ারম্যান,সচিব,মেম্বার,চৌকিদার দফাদার নিয়ে কি তাদের নিয়মিত অফিসে বসা উচিত নয়? উচিত নয় ইউনিয়ন অফিসে তথ্যকেন্দ্র চালু করা? নাম বদলের চেয়ে এসব বিশৃঙ্খলা দূর করাই কি বেশী দরকারি ছিলোনা? ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ডিগ্রী পাশ আর চেয়ারম্যান হবে ৫ম, অষ্টম শ্রেণি বা স্বাক্ষরজ্ঞান সম্পন্ন তা হতে পারেনা। এমন কথাও বলছেন অনেকে। এটাকেও একটা পর্যায়ে আনা উচিত। দেশবাসী অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তন নয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তনটাই প্রত্যাশা করে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)