চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

স্তুতিবাজরাই যুগে যুগে সর্বনাশের কারণ

এক রক্তাক্ত যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ। রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলো স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তখন গণতন্ত্রের অন্যতম সংকট সৃষ্টি করলো বিরোধী দলের অনুপস্থিতি। আওয়ামী লীগে শুরু হলো আভ্যন্তরীন সংকট। একত্রে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী আওয়ামী লীগের একটি অংশ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান তুলে গঠন করলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ। জাসদের বেরিয়ে যাওয়াতেও আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব শেষ হলোনা। যার চরম বহির্প্রকাশ ঘটলো ১৯৭৫ সালে। বঙ্গবন্ধুর স্তুতিতে ব্যস্ত থাকা আওয়ামী লীগের মন্ত্রীপরিষদের সদস্যদের একটা অংশ খন্দকার মুশতাক আহমদের নেতৃত্বে নতুন সরকারে যোগ দিল। যে সরকার গঠিত হলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার মধ্য দিয়ে। জেলখানায় জীবন দিতে হলো সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমেদ, মুনসুর আলী ও কামারুজ্জামানকে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এই পরিবর্তন হলে ইতিহাসের এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞটি ঘটতো না। দেশ পরিচালনায় একক সদিচ্ছায় দেশ রক্ষা যে হয়না তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ১৯৭৫ সালের হত্যাযজ্ঞ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহায় হয়ে উঠেছিলেন দেশের কথা ভাবতে ভাবতে। অরাজকতা, অনিয়ম, দলীয় শৃংখলা ভঙ্গ ও ক্ষমতার ঔদ্ধ্যতে অতিষ্ঠ হয়ে বাকশাল গঠনে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু হলোটা কী? বিরোধী দল নয় নিজ দলের বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্তেই সপরিবারে জীবন দিতে হলো এই মহান মানুষটিকে। তার সহচরদের অনেককেই তখন দেখা গেল ঘাতকের ভূমিকায়। রাতারাতি পাল্টে গেল সব। যারা আওয়ামী লীগকে চেটেপুটে খেয়ে গতরের চর্বি বাড়ালো। যারা সরকারকে ও বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত করলো তারা কোথায় গেল সেদিন? দ্বিধাহীন চিত্তে মিশে গেল খুনী নয়া সরকারের সাথে। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে টু শব্দটি করলোনা তারা। বঙ্গবন্ধুর আমলে অন্যান্য দল ছিল, জাসদ, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ। আরও ছিলো সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি, সাম্যবাদী দল প্রভৃতি। বেশ কিছু এলাকায় সর্বহারা পার্টি ও সাম্যবাদী দলের সাথে সশস্ত্র লড়াই হয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের। সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদারকে সে সময়েই হত্যা করা হয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু জীবদ্দশায় যাদেরকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবতেন তারা কিন্তু এই খুনের সাথে ছিলনা। যারা ছিলো তার সঙ্গে থেকে ক্ষমতার স্বাদ নিয়েছে তারাই। সেজন্যই হয়তো জেলখানায় জীবন দেয়া তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, মুজিব ভাই জীবদ্দশায় জেনে যেতে পারলেন না কে তার মিত্র ছিল, আর কে তার শত্রু  ছিল। ইতিহাসের ট্রাজেডি এখানেই। তোষামোদকারী খুনী চক্র অত্যন্ত চতুরভাবে তাজউদ্দীনকেও বঙ্গবন্ধুর নিকট থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। যেমনভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার নিকট থেকে তাজউদ্দীন পুত্র সোহেল তাজকে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন শত ফুল ফুটতে দেয়া। গণতন্ত্রের বাগানে হরেক রকম রাজনীতির চারার পরিচর্যা হবে ও হরেক রকম ফুল ফুটবে এমনটাই সুস্থ রীতি। এর ব্যত্যয় ঘটলেই অসুস্থ জীবাণুর অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলা যায়। কিন্তু বর্তমানে কী ঘটতে চলেছে? চট্টগ্রামের সিটি নির্বাচনে ২২.৫২% ভোটার ভোট কেন্দ্রে গেল। এমন ভোটেও অনিয়মের অভিযোগ তুলল আওয়ামী লীগ দলীয় একজন বিজয়ী পৌর মেয়র। নোয়াখালীর বসুর হাট পৌরসভার এই মেয়র দেশের অনেক জাতীয় নেতা ও এমপি মন্ত্রীর সমালোচনা করে চলছেন। তিনি সমালোচনা করে চলছেন নির্বাচনের। এর আগে নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমালোচনা করে তোপের মুখে পড়েছিলেন ১৪ দল শরীক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন। এ নিয়ে ১৪ দলে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সে সভায় মেননকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের ভাই মীর্জা কাদের লাগাতার সমালোচনা করে চলছেন। এ নিয়ে জেলাতেও কোন সভা হলোনা। কেন্দ্রেও সভা হলোনা। অথচ ওবায়দুল কাদের বলে যাচ্ছেন, দল করলে সকলকে দলের শৃংখলা মেনে চলতে হবে। নইলে কাউকে ছাড় দেয়া হবেনা। তবে কি তাও শুধু বলার জন্য বলা?

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নির্বাচনের সমালোচনা করে আসছেন। কই এ নিয়েতো নির্বাচন কমিশনের শৃংখলা ভঙ্গ হলোনা। তিনিও নির্বাচনের সমালোচনা করে চলছেন আবার নির্বাচন কমিশনার হিসাবে বেতন ভাতা, বাড়ি গাড়িসহ সরকারী সকল সুযোগ সুবিধা ঠিকই নিচ্ছেন। তবে কি এগুলোও কেবলই বলার জন্যই বলা? আসলে কী ঘটতে চলেছে বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্যাকাশে? বিরোধী দলের সাথে সরকার দলের দ্বন্দ্ব। সরকার পন্থী জোট ১৪ দলে প্রধান শরীকের সাথে অন্যান্য শরীকদের দ্বন্দ্ব। নির্বাচন কমিশনে দ্বন্দ্ব। আওয়ামী লীগে আভ্যন্তরীন দ্বন্দ্ব। আর সে দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে যাচ্ছে কেন্দ্র থেকে জেলা উপজেলায়। অনেক জেলাতেই সভাপতি একদিকে সাধারণ সম্পাদক আরেক দিকে। আবার এমপি একদিকে কেন্দ্রীয় নেতা আরেক দিকে। কোথাও দল একদিকে দল কর্তৃক নির্বাচিত জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অন্যদিকে। দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক জেলা সফরে গিয়ে বর্ধিত সভা করলেও সে বর্ধিত সভাও হয় এক পক্ষ বর্জনের। এগুলো কি দলীয় শৃংখলা ভঙ্গ নয়? আবার এরই মাঝে চলছে ক্ষমতার চাটুকারিতাও। বঙ্গবন্ধুর স্তুতি করতো যেমন তার ক্ষমতার মধু লুটতে এবার তার কন্যার বেলাতেও তাই ঘটতে চলেছে। সকলেই শেখ হাসিনার নামে স্তুতি করছে কিন্তু তার রাজনীতির ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে কেউ প্রয়াসী হচ্ছেনা।

আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখন তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ছিল। ছিল ১৪ দল। তার রেশ ক্ষমতায় যাওয়ার প্রথম প্রথম কিছুটা ছিল। যতই দিন যাচ্ছে রাজনৈতিক কর্মসূচী হ্রাস পাচ্ছে। বাড়ছে স্তুতি ও স্তুতিবাজদের সংখ্যা। প্রধানমন্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কও অনেক জায়গায় ছাড়িয়ে যাচ্ছে রাজনৈতিক সম্পর্ককেও। রাজনৈতিক কর্মীরাও হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের অধিকারীর প্রতি। সবাই যেন দলীয় চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে ছুটছে ক্ষমতা স্তুতির দিকে। একা হয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। একা হয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার প্রতি স্তুতিবাজরা আদর্শিক টানে স্তুতি করেনা, করে ক্ষমতার টানে ও নিজের ক্ষমতার সিঁড়িকে পাকাপোক্ত করতে। ক্ষমতা না থাকলে কয়জন স্তুতি করে সেটাই ভাবার বিষয়। কিন্তু তিনি কি পারবেন স্তুতিবাজদের পরিহার করে চলতে? অতীত কী বলে? বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের লাশ সিঁড়িতে পড়ে থাকলো। আর সবাই চুপসে গেল কেউ টু শব্দটি করলো না। স্তুতিবাজরা যুগে যুগেই থাকে। আগে বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে ছিল। এখন তার কন্যাকে ঘিরে। এরা সবসময় ক্ষমতাধরের স্তুতিতেই ব্যস্ত থাকে। আর অনেকের সর্বনাশের কারণ হয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)