চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে বলছি

এই সেই ময়দান, যেখানে একদা একটি মুজিবরের কণ্ঠ লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠ স্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি হয়ে বেজে উঠেছিল। এই সেই জায়গা, যেখানে একদিন আকাশে বাতাসে রণিত হয়েছিল একটি জাতির নামে একটি দেশের নাম, ‘বাংলাদেশ’। এই ছায়ায় মায়ায় ঘেরা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পথের বাঁকে বাঁকে আজও রণিত হয় সেই দীপ্ত দরাজ স্বর…..

‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।’

উনিশশো একাত্তরের পথ বেয়ে, পঁচাত্তরের রক্তনদী মাড়িয়ে এতগুলো বছর পেরিয়ে আজ আবার বঙ্গবন্ধু কন্যার ভাষণ আমাদের চেতনাকে আরো একবার নাড়া দিয়ে গেল। যেন বঙ্গবন্ধু কন্যা আজ তাঁর বাবার অসমাপ্ত কাজকে পূর্ণ করতে এলেন। জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান বাঙ্গালীকে দেয়া ‘দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ’- এই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পেরেছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতা বিরোধী ঘাতকদের নির্দয় নির্মম বুলেটে ক্ষতবিক্ষত হয়ে ডানা জাপটে মরণকে বরণ করে নিতে বাধ্য হয়েছিল বাংলাদেশকে তার নিজ হাতে গড়ার স্বপ্ন কারিগর। বঙ্গবন্ধু কন্যার আজকের ভাষণ যেন আবার সেই স্বপ্নের দীপ জ্বালিয়ে দিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ৪ নভেম্বরের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদ্রাসাগুলোর সর্বোচ্চ সংস্থা ‘হাইআতুল উলয়া লিল জামিয়াতুল কওমিয়া বাংলাদেশ’র ব্যানারে আয়োজিত এই শোকরানা সমাবেশকে ঘিরে একটা বিশাল অস্থিরতা আগে থেকেই টের পাওয়া যাচ্ছিল। কওমি মাদ্রাসার শিক্ষাকে স্বীকৃতি দেওয়ায় সে সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই সম্মতি নিয়েও বিচ্ছিন্নভাবে বহু লেখালেখি, আলোচনা নজর এড়াইনি কারো। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম প্রধান একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে, অন্যান্য ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিবেচনায় রেখে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের ভাষিক বিষয়বস্তু নির্ধারণ আমার বিবেচনায় মোটেও সহজতর ছিল না। সারাবিশ্বে যখন সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে এবং একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক মহলের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক শীতল যুদ্ধে জঙ্গিবাদের সাথে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের উপর যখন অদৃশ্য যুদ্ধ কামান তাক করে রাখা, ঠিক সেই সময়, এমন একটি উপলক্ষ বাংলাদেশের মানুষের মনে এক ধরণের উত্তেজনা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেবে, সেটা অপ্রত্যাশিত নয়।কওমি

কিন্তু এখানেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আবারো প্রমাণ দিলেন তিনি বঙ্গবন্ধু কন্যা। একজন সমাজভাষাবিজ্ঞানীর চোখ দিয়ে যদি দেখি তাহলে বলব, আজকের আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট, সামাজিক বাস্তবতা, নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, ধর্মকেন্দ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার অনুমোদন, রাষ্ট্রের ধর্মানুভূতি, নির্বাহী প্রধানের নিজ ধর্মবিশ্বাসকে সাথে নিয়ে, সকল দিক থেকে ভারসাম্য বজায় রেখে প্রতিটি শব্দচয়ন, বাক্য বিন্যাস, রূপকের ব্যবহার, বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতা রক্ষা করে দ্ব্যার্থহীনতা পরিহার পূর্বক অর্থের সুস্পষ্টতা নিশ্চিত করা- খুব সহজ কাজ ছিল না! সার্বিক বিবেচনায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণকে পরিমিত, যথাযথ, এবং একই সাথে সংক্ষিপ্ত পরিসরে সমৃদ্ধ ও সম্পূর্ণ একটি ভাষণ বললে একেবারেই অত্যুক্তি করা হবে না।

এবার ফিরে আসি আগের জায়গায়। চলুন একসাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ৪ নভেম্বরের ভাষণের কিছু উল্লেখযোগ্য দিকে তৃতীয় নয়নে নজর দেয়া যাক।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণের প্রথমেই ইসলামী মূল্যবোধ প্রচার ও প্রসারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদানের কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন। যেটি টার্গেট শ্রোতার আইস ব্রেকিং বা সহজ কথায় মনোযোগ কাড়ার জন্য একেবারে টু দি পয়েন্ট বা যথাযথ বলে আমার মনে হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘এখন টঙ্গিতে যে বিশ্ব ইজতেমা হয় সেটি শেখ মুজিবুর রহমান করেছিলেন। ওআইসির স্বীকৃতি লাভও তার সময়ে হয়েছিল। জাতির জনক কওমি শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেটা তিনি করার সুযোগ পাননি। ১৯৭৫ সালে আমি পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি। ১৯৭৭ সালে যারা ক্ষমতায় এসেছিল তারা কওমির স্বীকৃতি দেওয়ার পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি অবাক হয়েছিলাম।’ … মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই অভিসন্দর্ভ প্রমাণ করে যে, তিনি তাঁর পিতার অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি বঙ্গবন্ধু কন্যা হিসেবে পালন করেছেন।

এরপর তিনি মুসলিম প্রধান এ ভূখণ্ডের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের শিক্ষা গ্রহণ করবার একমাত্র প্রথম উপায়ই ছিল কওমি মাদ্রাসা। কওমি মাদ্রাসার মধ্য দিয়েই মুসলমানরা শিক্ষা গ্রহণ শুরু করে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি কওমি মাদ্রাসা যারা সৃষ্টি করেছিলেন তারা ওই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কাজেই তাদের সব সময় আমরা সস্মান করি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। স্বাধীনতার পর জাতির পিতার নেতৃত্বে ইসলাম শিক্ষার উন্নয়নের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাব্যবস্থার সংজ্ঞায়ন করতে গিয়ে যথেষ্ট প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা যে শিক্ষার নীতিমালা ঘোষণা করেছিলাম সেই নীতিমালায় ধর্মীয় শিক্ষাকে স্বীকৃতি দিয়েছি। কারণ, একটা শিক্ষা তখনই পূর্ণাঙ্গ হয় যখন ধর্মীয় শিক্ষাও সেই সাথে গ্রহণ করা যায়।

তিনি কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতি প্রসঙ্গে আরও বলেন, এটা শুধু স্বীকৃতি নয়। আমাদের দেশের লাখ লাখ ছেলেমেয়ে যে মাদ্রাসায় শিক্ষাগ্রহণ করছে। তাদের যারা শিক্ষা দেন, তাদের অবদানকে বড় করে দেখে তিনি তাঁদের সম্মান দেখান। তিনি এ বিষয়ে বলেন, সব থেকে বড় কাজ আপনারা করছেন। যখন যারা এতিম হয়ে যাচ্ছে, যারা একেবারে হতদরিদ্র, যাদের কোথাও যাওয়ার জায়গা নাই। আপনারা তাদেরকে আশ্রয় দেন। তাদেরকে খাদ্য দেন। তাদেরকে শিক্ষা দেন। অন্তত তারা তো একটা আশ্রয় পায়। এতিমকে আশ্রয় দিচ্ছেন, এর থেকে বড় কাজ আর কি হতে পারে?

Advertisement

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কওমি মাদ্রাসার স্বীকৃতিকে স্থায়ী করণের লক্ষ্যে সংসদে আইন পাস করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, আজকে আমরা সংসদে আইন পাস করে দিলাম হয়ত কালকে আর কেউ ক্ষমতায় এলে সেটা আবার ওই ১৯৭৭ সালের মতো বন্ধ করে দিতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী কাওমি শিক্ষাব্যবস্থার স্বীকৃতির পাশাপাশি তাদের কর্মসংস্থানের মত সুদূরপ্রসারী চিন্তা করেছেন। তিনি বলেন, এই সনদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা চাকরি পাবে, দেশে বিদেশে কাজ করতে পারবে— এই সুযোগটা আমরা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য করে দিয়েছি, যাতে তারা সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে।

এর পাশাপাশি ইসলামের প্রসারে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য কল্যাণ ট্রাস্ট করে দিয়েছি, যাতে তারা যে কোনো সময় এই ট্রাস্ট থেকে সাহায্য নিতে পারে। মসজিদ ভিত্তিক উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছি। মসজিদে যারা শিক্ষা দেন তাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রায় ৮০ হাজার ওলামা এ থেকে উপকৃত হচ্ছেন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজকের বাংলাদেশে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম কেন্দ্রিক নানা রকম অপপ্রচার ও ধর্মানুভূতিতে আঘাতের কারণে দেশে যে ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টিসহ যে অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে আমরা যাচ্ছি তার দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নানা রকম অপপ্রচার করা হয়। এগুলো বিশ্বাস করবেন না। এসব অপপ্রচার ঠেকাতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে। অন্য কোন মাধ্যমে ধর্ম বা মহানবীকে নিয়ে কটূক্তি করলে আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় তাদের বিচার করব। আমরা আইন নিজের হাতে তুলে নেব না।

লক্ষ্য করুন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ‘আপনারা‘ না বলে নিজেকে শরিক করে ‘আমরা‘ বলে অত্যন্ত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন । তার উপরের উক্তিমালা বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতিতে একজন যথার্থ অভিভাবকের মতন দায়িত্ব নেয়ার ইঙ্গিত বহন করে। এছাড়াও লক্ষ্য করুন, তিনি এখানে কেবল ইসলাম ধর্মকে নিয়ে কটূক্তির বিচার করা হবে শুধু তাই বলেননি। তিনি বলেছেন ধর্ম নিয়ে কটূক্তি ও অবমাননাকে বিচারের আওতায় আনা হবে। যদিও টার্গেট শ্রোতা ইসলাম ধর্মের অনুসারী ছিল তথাপি, এখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে অন্যান্য ধর্মের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিবেচনায় তিনি কেবল ধর্ম বলেছেন। এখানে তার ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান ফুটে উঠেছে।

সারাবিশ্বে যখন সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মাথা চারা দিয়ে উঠেছে এবং এর সাথে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার অপপ্রয়াসকে শক্ত হাতে মোকাবেলা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন দৃঢ় চিত্তে। তিনি বলেন, যারা সন্ত্রাসী তাদের কোনো দেশ নাই, ধর্ম নাই, দল নাই। তাদের একটাই পরিচয়— তারা সন্ত্রাসী, জঙ্গিবাদী। আর জঙ্গি-সন্ত্রাসের ও মাদকের স্থান বাংলাদেশের মাটিতে হবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করার আহ্বান জানান। কারো ক্ষতি বা অমঙ্গল চিন্তা না করে আমরা সবসময় মানুষের মঙ্গলের কথা ভাবার কথা বলেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের একটি মানুষও যাতে ক্ষুধার জ্বালায়, রোগে ভুগে কষ্ট না পায় সেজন্য সবাইকে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে হবে।

‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়‘ এই ধারণাকেও তিনি তার নিজ ধর্ম বিশ্বাসের জায়গাটি দেখিয়ে আমাদের বুঝিয়েছেন। তিনি সকল সময়ে আল্লাহর উপর তার অকৃত্রিম বিশ্বাস ও ভরসার কথা অকপটে বলেছেন।

বঙ্গবন্ধু কন্যা তার পিতা জাতির জনকের কাছে যে ধর্ম শিক্ষা পেয়েছেন তা বলতে গিয়ে বলেন, আমার বাবার কাছ থেকে শিখেছি, একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করবে না এবং তিনিও করতেন না। আমিও তা করি না। আমার পিতা আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষের সেবা করো। আর সাধারণভাবে জীবনযাপন করো।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে আলেম-ওলামাদের দোয়া চান। তিনি বলেন, আল্লাহ যদি চান আবারও ক্ষমতা এসে মানুষের সেবা করবো।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইসলাম ধর্মের মূল কথা বলতে গিয়ে ভ্রাতৃত্ব, সৌহার্দ্য ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি দেশবাসীর জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া চান। তিনি বলেন, ইসলাম ধর্মের মূল কথা শান্তি। আমরা চাই বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধ একটি দেশ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)