চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সৈয়দ লুৎফুল হক: একজন আত্মপ্রত্যয়ী শিল্পীর প্রতিচ্ছবি

সৈয়দ লুৎফুল হক
জন্ম ১৬ মার্চ, ১৯৪৯, ময়মনসিংহের ইশ্বরগঞ্জে,
মৃত্যু ২৭ জানুয়ারি, ২০২১

১.
প্রেস ক্লাবে যে ক’জনকে দেখলে মন ভালো হয়ে যেত তার মধ্যে সৈয়দ লুৎফুল হক অন্যতম- আমাদের প্রিয় লুৎফুল ভাই। প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী হিসেবে দেশব্যাপী খ্যাত ছিলেন এই মানুষটি। সব সময় নিজেকে অন্যের চেয়ে আলাদা রাখতেই পছন্দ করতেন। নিজের জগতে নিজের মতন থাকতে ভালবোবাসতেন। দৈনিক বাংলার সাত ভাই চম্পা’র সম্পাদক আফলাতুন ভাইয়ের ওখানে, ১৯৮৭ সাল থেকে তাঁর সঙ্গে পরিচয়- তখন থেকে তাঁকে একইরকম দেখছি।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সবসময় জিনসের প্যান্ট পরতেন, পরতেন রঙিন বাহারি হাল জমানার চোখ কাড়া পোশাক। হাতের কব্জিতে থাকত দুর্লভ এবং দামী ঘড়ি আর মাঝে মাঝে মাথায় মুকুটের মতো সুন্দর সুন্দর ডিজাইনের ক্যাপ না হয় টুপি থাকত।

দেখা হলেই কাছের স্বজনের মতন কিশোরগঞ্জের টানে ভালোবাসা মিশ্রিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করতেন, মাহবুব, কেমন আছো?

সেই লুৎফুল ভাই আজ সকালে মারা গেছেন। শুনে মন খারাপ হয়ে গেল।

২.
খুব সাদাসিধে মানুষ ছিলেন লুৎফুল ভাই। ছিলেন চিত্রশিল্পী। ছিলেন মু্ক্তিযোদ্ধা, চিত্রকর, সাংবাদিক, গবেষক-লেখক, কবি ও সমালোচক।  প্রকাশিত গ্রন্থ ৩০। জাতীয় প্রেসক্লাব, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিমানবন্দরসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থাপনায় শোভা পাচ্ছে তাঁর শিল্পকর্ম। গোলাপী এখন ট্রেনে, সুন্দরী, কসাই, দুই পয়সার আলতা, সূর্যদীঘল বাড়ী, সখিনার যুদ্ধ’, শুভদাসহ অসংখ্য চলচ্চিত্রের সফল শিল্প নির্দেশক ছিলেন।

৩.
কয়েক বছর ধরে নিজের আত্মজীবনী লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের খুব প্রিয় ছাত্র ছিলেন তিনি। মাঝে মাঝে ক্লাবের আড্ডায় লুৎফুল ভাই সেসব দিনের কথা আমাকে বলতেন। ষাট দশকের নানা ঘটনার কথা বলতেন। আর্ট কলেজের জীবনের অনেক স্মৃতির কথা বলতেন। ছাত্রজীবনের নানা দুষ্টুমির কথা বলতেন। শাহনেওয়াজ ছিল তাঁর হল জীবনের জানি-দোস্ত। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই যুদ্ধে শাহনেওয়াজ শহীদ হয়েছিল। পরবর্তীতে তার নামে হলের নাম রাখা হয় শাহনেওয়াজ হল।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধ দিনের অনেক কথা লুৎফুল ভাই বলতেন। বলতেন কত অভিজ্ঞতার কথা। বলতেন কত অজানা সত্য।

বলতেন কত কত বিখ্যাত মানুষের চরিত্র বদলে যাওয়ার ইতিহাস। লুৎফুল ভাই অকপট কথা বলতেন।

৪.
করোনার এই দুঃসহ ক্রান্তিকালে সকল রকমের ভয়, আতংক আর অনিশ্চয়তা নিয়েও প্রতিদিন ক্লাবে যাই। এই ক’মাসে কত কাছের মানুষ রোগশোক আর করোনায় আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন। কখনো কখনো ক্লাবের মাঠে তাদের জানাজায় দাড়াই। ক্লাবে গেলে আর লুৎফুল ভাইকে দেখতে পাবো না।

ঝলমলে বাহারি পোশাকে আর দেখব না তাঁকে। তাঁর উচ্চ মাত্রার হাসির শব্দ শুনতে পাবো না- শুনতে পাবো না তাঁর মায়াময় কণ্ঠের জিজ্ঞাসা, মাহবুব, তুমি কেমন আছো?

৫.
এই তো গত মাসে, প্রেস ক্লাব নির্বাচনের কয়েক দিন আগে ক্লাবের বারান্দায় কবি মাহবুব হাসান আর আমি আড্ডা দিচ্ছিলাম চা খেতে খেতে। মাহবুব হাসান অনেকদিন পর আমেরিকা মুল্লুক থেকে দেশে এসেছেন। সেদিনই প্রথম এসেছেন ক্লাবে- আমার সঙ্গে দেখা হতেই মাহবুব ভাইয়ের সঙ্গে আড্ডা জমে গেল।

এর মধ্যে লুৎফুল ভাই এসে যোগ দিলেন। মাহবুব হাসান আর লুৎফুল ভাই মিলে চলে গেলেন পুরনো দিনে। তারপর সেই আড্ডা রুপ নিল মহা আড্ডায়। কত কত প্রসঙ্গ, কত কত বিসয় আশয় সেই আড্ডায় প্রাণ ফিরে পেল। এক ফাঁকে লুৎফুল ভাই আলোকচিত্রি শিল্পী বুলবুল আহমেদকে দেখে বললেন, বুলবুল, কতদিন পর মাহবুব হাসান আসছে আবার কবে না কবে দেখা হয়- একটা ছবি তোলেন আমাদের।  বুলবুল ভাই আমাদের ছবি তুললেন।

৬.
প্রিয় লুৎফুল ভাই,
আমরা নিশ্চিত আপনি যেখানেই যাবেন, যেখানেই থাকবেন সেখানে আপনি আপনার মতন আপনার জগত নিয়ে আনন্দে থাকবেন। সুখে থাকবেন। স্বর্গের প্রশস্ত উদ্যানে আপনার বিচরণ হোক আনন্দের।

বিজ্ঞাপন