চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘সেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, আমরা ১৪৪ ধারা মানব না’

গবেষণামূলক ও সাক্ষাতকারভিত্তিক গ্রন্থ ‘ভাষা সংগ্রামীর বাংলাদেশ’ থেকে সংক্ষেপিত

ভাষা সংগ্রামী বাহাউদ্দিন চৌধুরী। পুরো নাম সাইফুল ইসলাম বাহাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ১৯৩১ সালের ৩১ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন এই ভাষা সংগ্রামী। তার স্ত্রী প্রফেসর আমিনা চৌধুরী। দুই সন্তান তাদের। এদের মধ্যে শহীদুল ইসলাম আশফাক আহমদ চৌধুরী গ্রেট ব্রিটেনে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেন। আর প্রফেসর শাহেদুল ইসলাম নুসরাত আহমদ চৌধুরী আমেরিকা প্রবাসী।
২০১২ সালের ১৬ মে মৃত্যুবরণ করেন ভাষা সংগ্রামী।

পরিচিতি: ভাষা সংগ্রামী বাহাউদ্দিন চৌধুরী বাংলাদেশ সরকারের প্রথম তথ্য সচিব। ১৯৬৬ সালে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন তিনি। তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী। বাহাউদ্দিন চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ থানার উলানিয়া গ্রামে। পিতা আলাউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ছিলেন উলানিয়ার জমিদার। মাতা সৈয়দা জামিলুন নেছা সুলতানা চৌধুরী ছিলেন বরিশালের সায়েস্তাবাদের নবাব বাড়ির কন্যা।

১৯৪৪ সালে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় তিনি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে ভূমিকা রাখেন। বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হিসেবে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে হরতালে অংশগ্রহণ করেন, মারাত্মক আহত ও গ্রেপ্তার হন এবং মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শে এক মাস পর মুক্তি পান।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকা অবস্থায় দৈনিক ইনসাফ, দৈনিক সংবাদ, দৈনিক মর্নিং নিউজ ও ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। ১৯৪৯ সালে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী আন্দোলনে গ্রেপ্তার হয়ে ৬ মাস কারারুদ্ধ থাকেন।

১৯৫১ সালে রাজনৈতিক কারণে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়। সেই বছর তিনি ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের প্রমোদ-সম্পাদক হিসেবে ঢাকায় প্রথমবারের মতো বাংলা নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানের আয়োজনে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
১৯৬৬ সালে তনি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল সভায় বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

১৯৭১ সালে তিনি দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ’৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানি সেনারা তার ধানমণ্ডি ৩১ নাম্বার সড়কের বাড়ি ভাংচুর করে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘বাণিজ্য বিতান’ ও কারখানা জ্বালিয়ে দেয়। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু তার বাড়িতে গিয়ে ডেকে এনে বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব পদে নিয়োগ দেন। কয়েক সপ্তাহ পরে তাকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব পদে নিযুক্ত করা হয়।

১৯৭৬ সালে তাকে ওএসডি করা হয়। ১৯৮০ সালে তিনি সরকারি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি নেন। ১৯৮০ সালে তিনি গণকণ্ঠ পত্রিকায় যোগ দিয়ে আবারো সাংবাদিকতায় ফিরে আসেন। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ও উপদেষ্টা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, দৈনিক গণকণ্ঠ, দৈনিক বার্তা, দৈনিক আজাদ। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং বাংলাদেশ জাতীয় প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন তিনি।

২০১১ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মগবাজারে কমিউনিটি হাসপাতালে ভাষা সংগ্রামী বাহাউদ্দিন চৌধুরীর সাক্ষাতকার গ্রহণ করেন তারিকুল ইসলাম মাসুম। তখন কিডনি রোগে আত্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

বাহাউদ্দিন চৌধুরী: গণ-পরিষদের সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান গণ-পরিষদে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুললেন ১৯৪৮ সালে। তখন তাকে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দিন থেকে শুরু করে সবাই গালিগালাজ করে। নানা রকম কটূক্তি করে।
এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তমদ্দুন মজলিশের সাধারণ সম্পাদক, অধ্যক্ষ আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে একটা প্রতিবাদ সভা হয়। সেই প্রতিবাদ সভায় ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে অভিনন্দন জানানো হয়। এই সেই সভা থেকেই একটা সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। সেই সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদেই ১১ মার্চ (১৯৪৮) হরতাল, বিক্ষোভের ডাক দেয়।

আমি তখন কমিউনিস্ট পার্টি করতাম। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব ছিলেন অন্য দলে। অবশ্য আমরা একসঙ্গে পিকেটিং করেছি। সেক্রেটারিয়েট গেটে আমি পিকেটিং করতে গিয়ে, আমার তো বয়স কম ছিল, ১৭-১৮ বছর বয়স হবে।
আমি সেক্রেটারিয়েট গেটে শুয়ে পড়ে চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমেদের গাড়ি আটকে দিয়েছিলাম। চিফ সেক্রেটারিকে সেজন্য পায়ে হেটে অফিসে যেতে হয়েছিল।

আর পুলিশরা হয়ে গেল মারমুখো। আমাকে বেধড়ক মার দিল। মারের ফলে আমার এই (উচু করে বাম হাত দেখিয়ে) বাম হাতের শোল্ডারটা ভেঙে গেল। ঝুলতেছিল হাত, হাত আলগা হয়ে গেল। সেই অবস্থায়, আমার সঙ্গে অবশ্য শেখ মুজিবুর রহমান অ্যারেস্ট হয়ে গেলেন। ছাত্রলীগের আব্দুল ওয়াদুদ অ্যারেস্ট হলেন, অলি আহাদ অ্যারেস্ট হলেন। আমাকে এই ভাঙা হাতে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করল, পুলিশ পাহারায় অ্যারেস্ট করে।

রিলিজ পেলাম এক মাস পর। তারপরে চিকিৎসা চলল, তারপরে বার বার আন্দোলন হয়, আন্দোলন তো হতেই থাকল। এরপরে ১৯৪৯ এ অ্যারেস্ট হয়েছি, এই ভাষার দাবিতে আন্দোলনে। তাতে ৬ মাস জেলে ছিলাম। ৫০ এ আট মাস জেলে ছিলাম।
তা ই মাসুম: একই দাবিতে?
বাহাউদ্দিন চৌধুরী: নানান কারণে, তখন তো ভাষার সঙ্গে স্বায়ত্তশাসন, অন্যান্য আরো অনেক দাবিতে আন্দোলন করেছি, গণতান্ত্রিক অধিকার সবকিছু এক হয়ে গেছে। তখনতো একটা, পাকিস্তান সরকার এই শাসনতন্ত্রের বেসিক প্রিন্সিপালস বলে একটা কমিটি করেছিল। একটা কতগুলো, তাতে বাংলা ভাষার, বাংলার, বাঙালির কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তার প্রতিবাদ হল।

আরবি হরফে বাংলা, বাংলা আরবি হরফে প্রচলনের চেষ্টা হল। তার প্রতিবাদ হল। নানান রকম প্রতিবাদ হল। তখন প্রতিবাদমুখর দেশ। এবং ছাত্ররা সব আন্দোলনে ছিল। এবং আমি তাদের মধ্যে অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলাম। ১৯৫১ সালে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে প্রমোদ সম্পাদক হিসেবে প্রথম বাংলা নববর্ষ উদযাপনের আয়োজন করি ফজলুল হক হলে। হল কর্তৃপক্ষ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অনুমতি দিলেন না। এবং আমাদেরকে কোনো হল ব্যবহার করতে দিলেন না।

আমরা তখন খোলা মাঠে নিজেরা কোদাল দিয়ে মাটি খুঁড়ে একটা পাহাড়ের মতো করলাম। কুঞ্জবনের মতো। সেখানে একটা শুভ্র গাছ এনে লাগালাম। তখন সব ছাত্ররা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, সেই সঙ্গে মেডিকেল কলেজের, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ছাত্ররা যোগ দিল। তখন তো ঢাকায় গান-বাজনা করতো বেতার শিল্পীরা। বেতার থেকে তাদের হুকুম দেওয়া হল, আমাদের অনুষ্ঠানে গেলে তাদের ব্ল্যাক লিস্ট করা হবে।

তখন আমরা ছাত্র-ছাত্রীরা মিলেই, নিজেরাই গান-টান রিহার্সেল দিলাম।আমাদেরকে তখন শিক্ষা দিয়েছিলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ডা. আব্দুল কাদের, পরে প্রফেসর হয়েছিলেন। এবং আমার স্ত্রী মিনা হোসেন নাম ছিল তখন, তিনিও গান-টান গাইতেন। তারপরে মেডিকেল কলেজের ছাত্র শাহজাহান হাফিজ, রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন, তিনি আসলেন। তারপরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের একজন ছাত্র ছিলেন উনিও রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন, উনি ঐ সরকারি আদেশের পরোয়া না করে, এই দুইজন ছাত্র আমাদের সঙ্গে গান গাইলেন। গান-বাজনা হল। আমরা আলেখ্য অনুষ্ঠান করলাম।

বিজ্ঞাপন

আমি আবৃত্তি করলাম, আমার স্ত্রী গান গাইলেন। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বাইরে দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের অনুষ্ঠান দেখলেন। এমনি, আর বাধা-টাধা দেন নাই।
কিন্তু আমার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হল একান্নোতে (১৯৫১ সালে)। তো, আমি যেহেতু আমি কমিউনিস্ট পার্টি করতাম, আমার পার্টির নির্দেশ ছিল গ্রেপ্তার হওয়া যাবে না। আমি আত্মগোপন করলাম। এই আত্মগোপন অবস্থাতেই ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে যোগ দিলাম। যেহেতু আমার ওপর হুলিয়া ছিল আমি, প্রকাশ্য শোভাযাত্রায় যোগ দিতে পারি নাই।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে একটা মাইক ছিল, ঢাকা মেডিকেল কলেজে একটা মাইক ছিল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে আরেকটা মাইক ছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ব্যারাকের উল্টা দিকেই কিন্তু জগন্নাথ হল ছিল। যেখানে অ্যাসেম্বলি সেশন হচ্ছিল। প্রাদেশিক অ্যাসেম্বলি সেশন হচ্ছিল। সেই সেশনের জন্যই তো আমরা আন্দোলনের জন্য ওখানে যাব। তখন আমি ঐ ব্যারাক থেকে, আমি শহীদুল্লাহ কায়সার আমাদের নেতা ছিলেন, তার নেতৃত্বে আমরা অনবরত বক্তৃতা করলাম। উদ্দীপনামূলক বক্তৃতা দিতে থাকলাম।

সেই সময় গুলি হল। আবুল বরকত আমার সহপাঠী ছিলেন, তিনি মারা গেলেন। মেডিকেল কলেজের, উনি কিন্তু বাইরেও যান নাই, মেডিকেল কলেজের সামনের ব্যারাকের বারান্দায় উনি মারা গেলেন। তারপরে তো আরো কয়েকজন মারা গেল। তারপরে ছাত্ররা উত্তাল হয়ে উঠল। তার পরে তো ম্যাচাকার হয়ে গেল।

তারপরে গায়েবানা জানাযা হল (২২ ফেব্রুয়ারি)। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক আসলেন, মাওলানা ভাসানী আসলেন গাবোনা জানাযায়। আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ প্রাদেশিক গণ-পরিষদ থেকে পদত্যাগ করলেন। আবুল কালাম শামসুদ্দিন পদত্যাগ করলেন। পদত্যাগ করে এসে বক্তৃতা করলেন।

তারপরে ২২ তারিখে, ২২ তারিখে তখন তো থমথমে অবস্থা ঢাকা শহরে। তখন মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা একটা শহীদ মিনার বানাবার চেষ্টা করল (২৩ ফেব্রুয়ারি)। মেডিকেল কলেজে তখন কিছু নির্মাণ কাজ চলছিল। সিমেন্ট ছিল, ইট ছিল, ঐ ইট নিয়ে ডা. বদিউল আলম, উনি নকশাটা করেছিলেন প্রথম শহীদ মিনারের। তো, ওটা ওরাই, মেডিকেল কলেজের ছাত্ররাই বিশেষত শহীদ মিনারটা তৈরি করল। আবুল কালাম শামসুদ্দিন এটার উদ্বোধন করেন। পরের দিন ওটা ভেঙে ফেলল পুলিশ (২৬ ফেব্রুয়ারি)। এরপরে আন্দোলনটা স্তিমিত হয়ে গেল। অনেকটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ওখানে বরাবরই চলে।

৫২’র ভাষা আন্দোলনের প্রধান প্রাণপুরুষ ছিলেন অলি আহাদ। উনি যুবলীগ করতেন, যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। অলি আহাদ, যিনি প্রধান নেতা ছিলেন। আজকাল তার নাম কেউ বলে না। তিনিই প্রধান নেতা ছিলেন এই আন্দোলনের এবং তিনি এখন মুমূর্ষু অবস্থায়, অসুস্থ অবস্থায় আছেন। চিকিৎসাও ঠিকমতো করতে পারছেন না অর্থাভাবে।

এরকম কয়জন ২০ (২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২) তারিখে সন্ধ্যাবেলা, রাত্রি বেলা।
ফজলুল হক হলের ওখানে একটা পুকুর আছে, ঐ পুকুর পাড়ে বেশকিছু ছাত্র সমবেত হলেন, আমিও ছিলাম। সেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল আমরা ১৪৪ ধারা মানব না। আমরা আমতলায় মিটিং করব। পরের দিন, সেদিনই সিদ্ধান্ত হয় গাজীউল হক সাহেবকে সভাপতি করা হবে। এম আর আখতার মুকুল, উনি এটা প্রস্তাব করলেন। আর কমরুদ্দিন শহুদ বলে সলিমুল্লাহ হলের একজন ছাত্র এটা সমর্থন করলেন।

তো, গাজীউল হক সাহেব একটা টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করলেন।
আচ্ছা, তখন আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক সাহেব থেকে শুরু করে সবাই এসে ১৪৪ ধারা না ভাঙার পক্ষে বক্তৃতা দিতে থাকলেন। তাদের বক্তব্য ছিল ১৪৪ ধারা ভাঙলে নির্বাচন হওয়ার কথা আছে, ওরা সরকার নির্বাচন করবে না, নির্বাচন পিছিয়ে দিবে।

কিন্তু ছাত্ররা সেটা মানতে রাজী হয় নাই। কবি হাসান হাফিজুর রহমান, সে জুতা নিয়ে গিয়ে শামসুল হককে পেটাল। সেই মঞ্চের ওপরে উঠে, উত্তেজিত হয়ে।
তখন ছাত্ররা সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে, না, আমরা ১৪৪ ধারা ভাঙব। ঠিক হল ৫ জন ৫ জন করে বেরুবে। এই রকম ৫ জন ৫ জন করে বেরুতে গিয়ে হুড়-মুড় করে সবাই বেরুতে থাকল এবং অ্যারেস্ট হতে থাকে। ওদেরকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গিয়ে, কিছু দূর নিয়ে গিয়ে, তখনতো তেজগাঁ অনেক দূরে ছিল, ওখানে নিয়ে ছেড়ে দিল সন্ধ্যাবেলা। আর দিনের বেলা তো এখানে গুলি-গোলা চলল। এরপরে ভাষা আন্দোলন প্রায় স্তিমিত হয়ে যায়।

ভাষা আন্দোলনের প্রথম দিকে উদ্যোগী ছিল তমদ্দুন মজলিশ। কিন্তু তমদ্দুন মজলিশ মূলত আবেদন, নিবেদন, দরখাস্ত এরমধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবং তারা, যখনই (ভাষা আন্দোলন) জঙ্গী রূপ নিয়ে নিল তারা চুপচাপ হয়ে গেলেন। তারা সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিলেন।

একটা কথা মনে রাখতে হবে, তারা ভাষা আন্দোলন করেছে, তারা কেউ পাকিস্তান বিরোধী ছিল না। তারা কেউ পাকিস্তান ভাঙতে চায় নাই। তারা পাকিস্তানের মধ্যেই বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা, একমাত্র নয় উর্দুর সঙ্গে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়েছিল।

এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ্যতার হিসেবে আমরা ৫৬ শতাংশ ছিলাম। আমাদের বাংলাই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিৎ ছিল। হতে পারেনি আমাদের এই বাঙালি মেরুদণ্ডহীন কতগুলি নেতার জন্য। এরা জোর দাবি জানায় নাই বাঙালির পক্ষে।
আমার স্ত্রীকে নাটক করার জন্য ইউনিভার্সিটি থেকে তাকে এক্সপেল করেছিল, বহিষ্কার করেছিল। ছেলেমেয়ে একত্রে নাটক করার জন্য, এটা ১৯৫৪ সালে।
তো, আমি, ’৫২ সালে আমার এমএ (পরীক্ষা) দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু সেটা আমি ’৫৪ সালে দিয়েছি। এই যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের পর। কারণ এগুলির প্রস্তুতি হিসেবেই কিন্তু যুক্তফ্রন্ট আসল।

এখানে একটা বলি, শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব ’৫২’র আন্দোলনে তিনি উপস্থিত থাকতে পারেন নাই। কারণ তিনি তখন জেলে ছিলেন। উনি জেলে থেকেই আমাদেরকে চিরকুট পাঠাতেন। নির্দেশ পাঠাতেন। উনি অনশনও করেছিলেন জেলে থেকে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে। অনেকে বলে, তার বিরোধী যারা, শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনের বিরোধী ছিল। কথাটা অত্যন্ত মিথ্যা। উনি জেলে ছিলেন, জেলে থাকার ফলে আন্দোলনে আসতে পারে নাই।
তা ই মাসুম: স্যার বাংলা ভাষার দাবি, বাংলা ভাষা অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেল ১৯৬৫ সালে, কীভাবে পেল?
বাহাউদ্দিন চৌধুরী: ’৫৬ সালে পাকিস্তান গণ-পরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা স্বীকার করে নেওয়া হয়। ’৫৪’র নির্বাচনের পরে ফজলুল হক সাহেব প্রধানমন্ত্রী হলেন, উনি এসে এই শহীদ মিনার নতুন করে তৈরির আবার উদ্যোগ নেন। তখন নভেরা আহমেদ ও হামিদুর রহমান, এরা নকশা করল। স্থপতি নভেরা আহমদ আর হামিদুর রহমান পেইন্টিং শিল্পী, নকশা করল এবং ফজলুল হক সাহেব এসে উদ্বোধন করলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে এই নকশা অনুসরণ করা হল না। নকশা কিছুটা করেই বাদ দিয়ে দেওয়া হল। এইটুকই হল। ওর মধ্যে অনেক বড় কমপ্লেক্স একটা করার কথা ছিল, পাঠাগার করার কথা ছিল, চিত্রশালা করার কথা ছিল, নানান রকম আরো ব্যবস্থাদি করার কথা ছিল কিন্তু তা হয় নাই। এরপরে এই আইয়ুব আমলে আরেকবার এই শহীদ মিনার ভেঙে ফেলা হয়।
তা ই মাসুম: জ্বি।
বাহাউদ্দিন চৌধুরী: আইউব শাহ, আইউব খান পাওয়ারে আসার পরে এখানকার গভর্নর মোনায়েম খান, তারা জারি করল মহিলাদের টিপ পড়া যাবে না। টিপ পড়ে হিন্দুরা। এটা…
তা ই মাসুম: ১৯৫৮’র পরে?
বাহাউদ্দিন চৌধুরী: হ্যাঁ, ’৫৮’র পরে। ও, এর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে, আমি তখন ’৫১ সালে, আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লাম। আমার যক্ষা হয়েছিল। ঐ চিকিৎসা ইসেতে আমার, খুব দরবার করে, আমার হুলিয়া প্রত্যাহার করিয়ে নেয়।
তখন আমি আবার সাংবাদিকতায় ফিলে আসি।
তা ই মাসুম: স্যার ঐ সময় (ভাষা আন্দোলনের) সংবাদপত্র কীভাবে ভূমিকা রেখেছিল ভাষা আন্দোলনের সময়?
বাহাউদ্দিন চৌধুরী: ভাষা আন্দোলনের সময় সংবাদপত্রগুলো, সংবাদ তো মুসলিম লীগের কাগজ ছিল, তারা মুসলিম লীগের পক্ষে ছিল। তাছাড়া বাকী আজাদ ছিল তাও মুসলিম লীগ সমর্থক ছিল, কিন্তু তারা এই ভাষা আন্দোলনের সময় ছাত্রদের আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। এবং আজাদের সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন, উনি সংসদ (গণ-পরিষদ) সদস্যও ছিলেন, উনি পদত্যাগ করেছিলেন এর (২১শে ফেব্রুয়ারি ’৫২ গুলির) প্রতিবাদে।

তখন ঢাকায় ইনসাফ বলে একটা দৈনিক পত্রিকা বেরিয়েছিল, এই ইনসাফ এই ভাষা আন্দোলনের জন্য খুব তারা সংগ্রাম করেছে, লড়াই করেছে। পরে এটা সরকার বন্ধ করে দেয়। আর সবচাইতে গৌরবজনক ভূমিকা পালন করে তমদ্দুন মজলিশের সৈনিক, সাপ্তাহিক পত্রিকা সৈনিক। সৈনিক ছিল সাপ্তাহিক পত্রিকা।
আর এটার প্রাক্তন সম্পাদক মাওলানা আব্দুল গফুর, এখনো বেঁচে আছেন। উনি ইনকিলাবে চাকরি করেন। এই প্রথম, এই সৈনিকই বাংলা ভাষার এই আন্দোলন শুরু করে।

কিন্তু তাদের বাংলা ভাষাটা খানিকটা আরবি মিশ্রিত ছিল। ‘তমদ্দুন’ নামটাই তো বুঝতে পারছেন, ‘কৃষ্টি’ তমদ্দুন। তখনকার একটা বাংলা বেতার ভাষণের অনুবাদ আপনি শুনেন, ‘শাহেন শাহ এলিজাবেথ, আফ্রিকা থেকে লন্ডন তশরিফ এনেছেন’। এই হচ্ছে বাংলা…
তা ই মাসুম: অনুবাদ।
বাহাউদ্দিন চৌধুরী: এই রকম ভাষায় বাংলার চেষ্টা হয়েছিল। এবং তারপরে ফজলুর রহমান সাহেব, তখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন। এই যে আমাদের বেক্সিমকোদের বাবা। তিনিও এই আরবি হরফে বাংলা প্রচলনের চেষ্টা করেছিলেন। এবং আমাদের সৈয়দ আলী আহসানের মতো লোক পর্যন্ত এটা সমর্থন করেছিল। বিভিন্ন জায়গায় গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করে আরবি নামে বাংলা চালানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেন নাই।
তা ই মাসুম: এটা কি ’৫৪’র পরে, না আগে?
বাহাউদ্দিন চৌধুরী: না, এটা ’৫৪’র আগে।
তা ই মাসুম: মুসলিম লীগ সরকারের আমলেই।
বাহাউদ্দিন চৌধুরী: হ্যাঁ, মুসলিম লীগ সরকারের সময়ই।
সত্যিাকার অর্থে আমাদের এখানে, সত্যিকার স্বাধীনতার ইতিহাস সেইভাবে লেখা হয় নাই।

চলবে…

বিজ্ঞাপন