সম্পাদকীয়

সেই অবাক নাম ভিয়েতনাম

সেই অবাক নাম ভিয়েতনাম

তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ভিয়েতনামের রাষ্ট্রপতি ত্রান দাই কুয়াং গতকাল বাংলাদেশে আসেন। জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর আজ সকালে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পৌঁছালে শেখ হাসিনা তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান। দুই নেতার মধ্যে একান্ত বৈঠক শেষে শুরু হয় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। সেখানে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন শেখ হাসিনা, ভিয়েতনামের পক্ষে তাদের ত্রান দাই কুয়াং। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের করবী হলে দুই নেতার উপস্থিতিতে তিনটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেসময় জানান, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকবে ভিয়েতনাম। আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষায় দুই দেশ অভিন্ন অবস্থানে থাকবে বলে উল্লেখ করেন ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভিয়েতনাম ছিল একটি প্রেরণার নাম। প্রায় বিশ বছর যুদ্ধ করে সবচে শক্তিশালী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে বিশ্বে এক অনন্য নজির স্থাপন করে ভিয়েতনামীরা। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে ভিয়েতনামের রয়েছে এক আবেগের সম্পর্ক। ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রাম আমাদের প্রেরণা দিয়েছে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে। দেশটির প্রিয় নেতা হো চি মিন আজ কিংবদন্তিতুল্য জননেতা হয়ে বিশ্বের জনগণের কাছে বেঁচে আছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও হো চি মিন থেকে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেরণা নেন। ভিয়েতনামের রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯ শতকের শেষ দিকে ফ্রান্স ভিয়েতনাম আক্রমণ করে। ফরাসিরা দেশটিকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করে এবং অঞ্চলগুলিকে কম্বোডিয়া ও লাওসের সাথে যুক্ত করে ইন্দোচীন ইউনিয়ন তথা ফরাসি ইন্দোচীন গঠন করে। ফরাসিরা নিজেদের সুবিধার জন্য ভিয়েতনামের সম্পদ আহরণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর (১৯৩৯-১৯৪৫) ভিয়েতনামে উপনিবেশ বিরোধীরা সাম্যবাদী দলের নেতৃত্বে ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ১৯৫৪ সালে দিয়েন দিয়েন ফু-তে ভিয়েতনামী সেনারা ফরাসি সেনাদের যুদ্ধে পরাজিত করে। এরপর ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে দুইটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়- উত্তর ও দক্ষিণ। উত্তর ভিয়েতনামে একটি সাম্যবাদী সরকার এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামে সাম্যবাদ বিরোধীরা শাসন করা শুরু করে। পরবর্তী ২০ বছর ধরে উত্তর ভিয়েতনামের নেতৃত্বে ভিয়েতনাম একত্রীকরণের একটি আন্দোলন শুরু হয় এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় সামরিক আগ্রাসন চালায়। গেরিলা যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ১৯৭৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সেনা সরিয়ে নেয়। ১৯৭৬ সালে দুই ভিয়েতনামকে একত্রিত করে একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ঐতিহাসিক। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে তাদের অকুণ্ঠ সমর্থনের মতো সম্প্রতি রোহিঙ্গা ইস্যুতেও ভিয়েতনাম সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। ষাটের দশকের শেষ ভাগে ছাত্র নেত্রী হিসাবে ভিয়েতনামে সামরিক অগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি এখনও সেই দিনগুলির কথা মনে করি। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং বলেন, তার এই সফরে দুই দেশের সম্পর্কের উৎসাহব্যাঞ্জক অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা করছেন। দুই দেশে ব্যবসায়িক বিনিয়োগ বাড়বে বলেও আশা করেন তিনি। দুই দেশের জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে তারা একমত হয়েছেন। আমরা চাই ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক যেনো অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সম্পর্ক সৃদৃঢ় ঐক্যে সুসংহত থাকে।

পরবর্তী সংবাদ প্রস্তুত হচ্ছে…