চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

সুচিত্রা সেনের স্মৃতি রক্ষায় করণীয়

বিজ্ঞাপন

বাংলার চলচ্চিত্রকে বিশ্ব অঙ্গনে মর্যাদা সম্পন্ন পরিচিতির গৌরবটি ছিনিয়ে এনেছিলেন সুচিত্রা সেন। সে কালের তরুণ সমাজের সিনেমা দেখার যে বিশেষ প্রবণতা ছিল- তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ আকর্ষণ ছিলেন তিনি। আমি নিজেও বাল্যকালে সুচিত্রা-উত্তম অভিনীত কোন ছবি এলে তা দেখতে বাদ দিতাম না। কখনও কখনও একাধিকবারও কোন কোন ছবি দেখতে অনুপ্রাণিত হয়েছি, দেখেছি।

সুচিত্রা-উত্তমের রোমান্টিক জুটির অভিনয় আকর্ষণ করেনি সে কালের দর্শকদের মধ্যে তেমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই সুচিত্রা সেন আজ কার্যত: উপেক্ষিত-উভয় বাংলাতেই।

pap-punno

সুচিত্রা সেনের বিবাহ পূর্ব নাম ছিল রমা দাশগুপ্ত। তার বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত প্রথমে শিক্ষকতা করতেন নিজ গ্রামে প্রধান শিক্ষক হিসেবে। পরবর্তীতে চলে আসেন পাবনা শহরে। চাকরি নেন পাবনা পৌরসভায়। রমা দাশগুপ্তর মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন একজন গৃহিনী মাত্র কিন্তু প্রকৃত অর্থেই তিনি একজন রত্নগর্ভা। রমা দাশগুপ্ত (সুচিত্রা সেন) ছিলেন পাবনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ছাত্রী। ওই বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীতে অধ্যায়নকালে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ এবং উগ্র সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নানা স্থানে সংঘটিত হওয়ায় আত্মরক্ষার্থে এবং পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে কলকাতা চলে যান। সেখানেই তারা স্থায়ী হন ও অবশেষে ভারতের নাগরিকত্ব অর্জন করেন। রমা দাশগুপ্তের বিয়ে হয় কলকাতার সে সময়কার একজন ধনাঢ্য শিল্পপতি দিবানাথ সেনের সাথে। সেই থেকে তিনি হলেন রমা সেন। অত:পর চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে গিয়ে তার অভিনয় শিল্পী হিসেবে নামকরণ করা হয় সুচিত্রা সেন।

সুচিত্রাসেন ও উত্তম কুমার রোমান্টিক অভিনয় দেখলে প্রথমেই ধারণা হতো- দুজন হয়তো বা স্বামী স্ত্রী অথবা প্রেমিক-প্রেমিকা। এমন ধারণা সৃষ্টি হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ ছিল ছবিতে দুজনের অন্তরঙ্গতা এবং স্বামীর নাম কদাপি প্রচারণা না হওয়া। আর দ্বিতীয়ত সুচিত্রা অন্য কোন নায়কের সাথে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করতে চাইতেন না যদিও বাংলা চলচ্চিত্রের সেই যুগে প্রখ্যাত এবং সকল নায়ক হিসেবে অভিনয় করার মত অভিনেতার কমতি ছিল না। আর ওই দুজনকে মানাতোও খুব।

সুচিত্রা সেনের বাবা পাবনা পৌরসভায় চাকুরী করাকালে পাবনার দিলালপুর মৌজার হিমসাগর লেনে একটি পাকা বাড়ী নির্মাণ করেছিলেন। এবং দেশত্যাগের আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেছিলেন সপরিবারে। এই থেকে অনেকে দাবী করেন তিনি পাবনার সন্তান। কথাটা যেমন ঠিক তেমনই, আবার তা বেঠিকও। কারণ করুণাময় দাশগুপ্তের পৈত্রিক বাড়ী ছিল তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমাধীন বেলকুচি থানার ভাঙাবাড়ী। সেসময় সিরাজগঞ্জ ছিল পাবনা জেলার অন্যতম মহকুমা, যা আশির দশকে একটি পৃথক জেলায় পরিণত হয়। তবুও তিনি সর্বত্র স্বীকৃত পাবনার মেয়ে হিসেবে। পাবনাবাসীর কাছে সুচিত্রা সেন অসাধারণ গৌরবের, আদরের ও শ্রদ্ধার-দলমত-ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে।

সুচিত্রা সেন বহকাল ধরে কলকাতা থাকায় যতটুকু তিনি এদেশের মানুষের চোখেল অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন, তার আকস্মিক মৃত্যুর পরে তিনি তদধিক উজ্জ্বলতায় সবার সামনে চলে আসেন। তবে দুর্ঘটনা ঘটে যায় একটা। পাবনার জামায়াতে ইসলামী একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় নামে সরকারের কাছ থেকে বাড়ীট লিজ নিয়ে সেখানে একটি মাদরাসা গড়ে তোলে। হিন্দুর সম্পত্তি হওয়ায় পাকিস্তান সরকার বাড়ীটিকে শত্রু সম্পত্তি ও স্বাধীনতার পরে আওয়ামী লীগ সরকারও অর্পিত সম্পত্তি বলে ঘোষণা করায় বাড়ীটি জেলা প্রশাসন আশির দশকে লিজ দেন। কেউই খোঁজ নিলেন না বাড়ীটি কার এবং সুচিত্রা সেন ওই বাড়ীর মালিকানায় গৌরবের অধিকারী সমগ্র বাংলাদেশের মানুষ।

ইতোমধ্যে প্রায় ১০/১৫ বছর আগে থেকে পাবনার সংস্কৃতি কর্মীরা সাইদুল হক চুন্নু, জাকির হোসেন প্রমুখের নেতৃত্বে প্রতি বছর পাবনার অধুনা পিবলুপ্ত টাউন হল ময়দানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সুচিত্রা সেন অভিনীত চলচ্চিত্র প্রদর্শন এবং বাড়ীটির লিজ বাতিল করে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার আহবান জানাতে থাকেন। জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন জানালে এক পর্যায়ে তিনি ওই বাড়ীর লিজ বাতিল করেন। ওটা এক সনা লিজ ছিল প্রতি বছর লিজ নবায়ন করার আইন থাকলেও জামায়াত নবায়নের ধার ধারেনি।

এই লিজ বাতিল আদেশের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামী হাই কোটে রিট আবেদন দায়ের করে। দীর্ঘ দিন পর উভয় পক্ষের শুনানী অন্তে মহামান্য হাইকোর্ট লিজ বাতিল আদেশ বৈধ বলে ঘোষণা করেন।

বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাহীন জামায়াত ইসলামী মরিয়া হয়ে বাড়ীট দখলে রাখতে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করে। শুনানী অন্তে মহামান্য সুপ্রিম কোর্টে আপিল দায়ের করে। শুনানী অন্তে মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট হাই কোর্টের আদেশ বহাল রাখে।

এর পরেও তারা বাড়ী না ছাড়ার লক্ষ্যে নানা টালবাহানা করতে থাকে। অবশেষে জেলা প্রশাসন পুলিশের সহায়তায় বাড়ীটি দখলমুক্ত করেন এবং বাড়ীট চলে যায় প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ।

যে সাধারণ মানুষ বাড়ীটি উদ্ধারের জন্য সুদীর্ঘ আন্দোলন ও আইনী লড়াই চালিয়ে বাড়ীট দখলমুক্ত করলেন- তারা কিন্তু আজও আন্দোলনে আছেন ওই বাড়ীটির ব্যাপক উন্নয়ন করে সুচিত্রা সেনের স্মৃতি যথাযোগ্য মর্যাদায় রক্ষা করতে দাবী জানাচ্ছেন। এযাবৎ যা করা হয়েছে তা হলো বাড়ীটির ভেঙে যাওয়া অংশ মেরামত, চারিদিকে সীমানা প্রাচীর গড়ে তোলা, সুচিত্রা সেনের বাড়ী বলে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো (তাতে লেখা আছে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে) এবং বাড়ীটির দালানে নতুন করে রং করে সুচিত্রা সেনের একটি ছবি টাঙানো।

নানা জায়গা থেকে দূর দূরান্ত থেকে বহু মানুষ দর্শনার্থী হিসেবে এসে বাড়ীটি দেখে হতাশ হয়ে চলে যান। তবে মাঝে মধ্যে মনের টানে স্থানীয় কেউ কেউ বাড়ীট দেখতে আসেন।

একবার প্রাক্তন সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এসেছিলেন বাড়ীটি দেখতে। তার কাছে পাবনা বাসীর পক্ষ থেকে আন্দোলনকারীরা যথাযথভাবে সুচিত্রা সেনের মর্যাদা রক্ষার্থে বাড়ীটির উন্নয়ন, ব্যাপক সংস্কার, উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করে সেখানে সংস্কৃতি কেন্দ্র গর্ভে তোলা প্রভৃতির মাধ্যমে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবী জানান।

Bkash May Banner

এ ব্যাপারে সরকারী শৈথিল্যে দিনে দিনে পাবনার মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। কেউ কেউ বলেন, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগে সরকার বাড়ীটি হস্তান্তর করতে পারে। এমন চিন্তা আদৌ সচেতন কোন ব্যক্তির কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইতোমধ্যে পাকিস্তান বা বৃটিশ আমল থেকে অন্তত: পাবনা জেলায় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের হাতে যে কয়টি বাড়ী বা স্থাপনা হস্তান্তর করেছে- তার সামান্যতম রক্ষণাবেক্ষণও নেই। সব দালানকোঠা ভেঙে পড়ছে এবং ধীরে ধীরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে।

এমতাবস্থায় সকলের দাবী
এক. সুচিত্রা সেনের বাড়ী অর্পিত সম্পত্তির তালিকা থেকে মুক্ত করে তা সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ ট্রাস্ট গঠন করে ওই ট্রাস্টের হাতে প্রদান করা হোক।

দুই. ট্রাস্টি বোর্ড বাড়ীট সংরক্ষণও তার উন্নয়ন সাধনে তৎপর হবেন;

তিন. ট্রাস্ট বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দিয়ে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকবেন;

চার. বাড়ীর চৌহদ্দী কম হওয়ায় আশপাশ থেকে কমপক্ষে এক একর জমি অধিগ্রহণ করে ট্রাস্টি বোর্ডকে দেওয়া হোক;

পাঁচ. আগামী ছয় মাসের মধ্যে ট্রাস্ট গঠন ও তার বিধিমালা প্রণয়ন করে সরকারের পক্ষ থেকে আপাতত: ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে হাত দেওয়া হোক;

ছয়. ব্যাংক চেকের মাধ্যমে ট্রাস্টি বোর্ডের পক্ষ থেকে উৎসাহী জনগণের কাছ থেকেও অর্থ সংগ্রহ করবেন;

সাত. সুচিত্রা সেনের বাড়ীর প্রাঙ্গনে তার জন্ম ও মৃত্যু দিবসে নানাবিধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজনও তাতে দেশের প্রখ্যাত অভিনেতা-অভীনেত্রীদের এবং সঙ্গীত ও নৃত্য শিল্পীদেরকে অনুষ্ঠান প্রদর্শনের জন্য পাবনাতে আয়নের ব্যবস্থা করা হোক এবং

আট. সুচিত্রা সেনের বাড়ী দেখার জন্য দেশ-বিদেশের পর্যটকদের পাবনাতে আসা ও প্রয়োজনে থাকার ব্যবস্থা করে, বাড়ীটির যথাযথ উন্নয়ন করে বাড়ীতে প্রবেশ ফি ৫০ বা ১০০ টাকাও ধার্য্য করা যেতে পারে। বিদেশীদের জন্য ১০ মার্কিন ডলার ও প্রবেশ ফি হিসেবে ধার্য্য করা সম্ভব।

এ জাতীয় কর্মসূচী নিয়ে বাড়ীটির উন্নয়ন ও তা দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে পারলে দেশী বিদেশী অজস্র দর্শক আসতে আকৃষ্ট হবেন।

উন্নয়ন পরবর্তী বাড়ী সুচিত্রা সেনের কন্যা অভিনেত্রী মুনমুন সেনকে আসা এবং কোলকাতা ও নানাস্থানে তার যা পাওয়া যায় তা এনে পাবনাতে সংরক্ষণের ববস্থা করা যায়। মুনমুন সেনকে দিয়ে উন্নয়ন পরবর্তীকালে বাড়ীটি উদ্বোধন করা যেতে পারে সুচিত্রা সেন স্মৃতি কেন্দ্র হিসেবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ও ভারত সরকার যৌথ উদ্যোগও নিতে পারেন কালবিলম্ব না করে- তবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে এ ব্যাপারে দ্রুততার সাথে এগিয়ে আসতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন

Bellow Post-Green View
Bkash May offer