চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের প্রতি ক্ষমতাসীনদের বৈরীতা কেন?

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল। দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য, শোষণমুক্ত সাম্যভিত্তিক গণতান্ত্রিক একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এই দলের অনেক নেতাকর্মীর ত্যাগ ও আত্মদানের বিষয়টি ইতিহাস হয়ে আছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও সিপিবির সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। মুক্তির মন্দির সোপান তলে সিপিবির অনেকের প্রাণ বলিদান হয়েছে। এক সময় ছাত্র-তরুণদের মাঝে এই দলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। সিপিবির সাফল্য-ব্যর্থতা এখনো অনেককে প্রভাবিত করে।

ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটি এখন অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু। কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে দলটি এখনও সীমিত শক্তি নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি চালিয়ে যাচ্ছে। এই দলের নেতাকর্মীরাও বর্তমান ক্ষমতাসীনদের রুদ্র-রোষ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তারাও ক্ষমতাসীনদের হামলা-মামলা-আক্রমণের শিকার হচ্ছে। সর্বশেষ জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় সিপিবির পদযাত্রায় হামলার শিকার হয়েছেন সংগঠনটির নেতা-কর্মীরা। হামলায় সিপিবির অন্তত ১০ জন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন ও সংখ্যানুপাতিক হারে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু করা, দ্রব্যমূল্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আনা এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় দখলমুক্ত করাসহ ১৭ দফা দাবিতে সিপিবির ৪ হাজার কিলোমিটার পদযাত্রার কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জামালপুর জেলা সিপিবি পদযাত্রা বের করে। জামালপুরে পদযাত্রার নেতৃত্বে ছিলেন সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা ও সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান। সেখানেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা বেপরোয়া আক্রমণ চালায়।

এ দিকে জামালপুরে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর শান্তিনগরে মিছিল বের করে ছাত্র ইউনিয়ন। সেখানেও তাদের ওপর হামলা হয়। হামলায় ছাত্র ইউনিয়নের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।

প্রশ্ন হলো, কেন এই আক্রমণ? দেশে কি বিরোধী দল বলে কিছু থাকবে না? কেউ কোনো দাবি-দাওয়া জানাতে পারবে না? মিছিল সমাবেশ করতে পারবে না? প্রতিবাদ-সমাবেশ-মিছিল বের করলেই তাদের ওপর হিংস্র ষাঁড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে? জামালপুরে ও রাজধানীর শান্তিনগরে ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা যেভাবে হামলা করেছে, তাতে সুস্থ ও বিবেকবান মানুষ মাত্রই স্তম্ভিত হয়েছেন।
সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের প্রতি আওয়ামী লীগের এই ভূমিকায় সচেতন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আওয়ামী লীগ কি সব রকম সমালোচনা-বিরোধিতা, নিয়মতান্ত্রিক প্রতিবাদ-আন্দোলনকে গায়ের জোরে দমন করতে চায়? একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কায়েম করতে চায়? দেশের সবাই কি আওয়ামী লীগের শত্রু? রাজনীতিতে কি তাদের কোনো বন্ধুর দরকার নেই?

রাজনীতিতে কিছু সাধারণ জ্ঞান আছে। কাকে সঙ্গে নেব, কাকে নেব না সে হিসেবটা থাকা দরকার। কে বন্ধু, কে শত্রু, কে প্রতিদ্বন্দ্বী, কাকে সমীহ করব, কাকে ভালোবাসব, কাকে সঙ্গে নিলে লাভ, কাকে নিলে ক্ষতি– এসব হিসেবও রাখতে হয়। যদি শক্তিপ্রয়োগের কথাই ধরি, তবুও বিবেচনা থাকা উচিত কাকে মারব, কাকে ভয় দেখাব বা কাকে প্রতিরোধ করব।

সবার সঙ্গে একই রকম আচরণ করলে বন্ধু কে হবে? বন্ধু ছাড়া কি এগিয়ে চলা সম্ভব?
বড় দলের অহমিকা থেকে কেউ কেউ বলে থাকেন, সিপিবি বা বামপন্থীদের আর কয়টা ভোট! ওদের মারলে কী আর পেটালেই-বা কী!

নীতি-নৈতিকতার প্রসঙ্গ না হয় বাদই দিলাম, ভোটের হিসেবেও কিন্তু এই মানসিকতা ভালো নয়। বিন্দু বিন্দু জল নিয়েই সিন্ধু তৈরি হয়। একটু একটু সমর্থন নিয়েই গড়ে উঠে ব্যাপক সমর্থন। আবার একটু একটু নিন্দা এবং ঘৃণা থেকেই তৈরি হয় নিন্দা-ঘৃণার প্রবল ঢেউ। দেশের জনমত কিন্তু মোটেও ক্ষমতাসীনদের পক্ষে নেই। তাদের আচরণ দিন দিন মানুষকে আরও বেশি ক্ষুব্ধ করে তুলছে। এর পরিণাম মোটেও শুভ নয়।

দল যতই ভাঙ্গাচোরা হোক না কেন, সাবেক কিংবা বর্তমান কমিউনিস্টদের আমাদের সমাজে একটা আলাদা মর্যাদা আছে। মানুষ তাদের সম্মান করে। তাদের কথা অনেকেই মনোযোগ দিয়ে শোনে। জনমত তৈরিতে তারা এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের এই শক্তির দিক উপেক্ষা করা হলে এ জন্য ভবিষ্যতে মূল্য গুনতে হতে পারে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, এখনও সিপিবিসহ বামপন্থী পরিবারগুলোর শক্তি সমাজকে নাড়া দিতে পারে। সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার নেপথ্যে ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিপিবির কর্মী-সমর্থকরা। এই গণজাগরণ মঞ্চের সুফল এককভাবে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে এবং করবে।

যুক্তির নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, ছাত্র ইউনিয়ন, কমিউনিস্ট পার্টি, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী শক্তিশালী হলে শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগেরই উপকার হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিশীলতার চর্চাকারী মানুষের সংখ্যা বাড়লে এর সুফল কোনোদিন জামায়াত-বিএনপি পায় না, হয়তো পাবেও না।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু নির্মম পরিহাস হচ্ছে, বামপন্থীরা যত না হেনস্থা হয় জামায়াত-বিএনপির সমর্থকদের দ্বারা, তার চেয়ে বেশি নিগৃহীত হয় আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের দ্বারা। ফলে সমাজ জীবনে আওয়ামী লীগের প্রতি একটি খারাপ ধারণা নিয়ে বামপন্থীরা বেড়ে উঠে। আওয়ামী লীগের অজনপ্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে যা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অথচ বামপন্থীরা আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় বন্ধু হওয়ার কথা ছিল!

দেশের সার্বিক পরিস্থিতি এমনিতেই ভালো নয়। জনমত আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলে না। গত কয়েক বছরে ভালো কাজের জন্য আওয়ামী লীগ যতটা প্রশংসিত হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি নিন্দিত হয়েছে খারাপ কাজের জন্য। ছাত্রলীগ-যুবলীগ-স্বেচ্ছাসেবক লীগের নানা কলঙ্কের বোঝা এবং সীমাহীন ব্যর্থতা কাঁধে নিয়ে এমনিতেই ধুঁকছে। তখন সিপিবির মতো পরীক্ষিত বন্ধুকে শত্রুর কাতারে নিক্ষেপ করাটা শুধু আত্মঘাতী নয়, অত্যন্ত অপরিণামদর্শীও বটে।

গত প্রায় এক দশক ধরে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, জামায়াত-বিএনপি জোট যদি আবার ক্ষমতায় ফিরে আসে তাহলে দেশে রক্তগঙ্গা বইবে, যুদ্ধাপরাধীরা রেহাই পাবে, জঙ্গিবাদ ফিরে আসবে, সাম্প্রদায়িক হানাহানি বাড়বে, বাংলাদেশ হবে তালেবান, এখানে প্রগতিশীলতার কবর রচনা হবে। ২০০১-এর নির্বাচনের পর দেশে যে রাজনৈতিক প্রতিশোধস্পৃহা ও উন্মত্ত হিংসায় আগুনে মানবতার অনুভূতি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি হিংসার উন্মত্ত দাউ দাউ আগুনে দেশে সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি জ্বলেপুড়ে ছাড়-খার হয়ে যাবে।

এই প্রচারণার মধ্যে সত্য আছে হয়তো, কিন্তু তার প্রস্তুতি কি সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নসহ বামপন্থী দলগুলোর প্রতি বৈরী আচরণ? নিরীহ সমাবেশে কাপুরুষোচিত হামলা? তাদের দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করা?

আগামী দিনে কী হবে আমরা জানি না, কিন্তু দেশে যে শান্তির সুবাতাস বইবে না, এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। গত প্রায় দশ বছরে বিএনপি-জামায়াত-শিবির কর্মীরা যেখানে যতটুকু ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ পরিস্থিতির শিকার হয়েছে, সুযোগ পেলে তারা যে কড়ায় গণ্ডায় তা ওসুল করে নিবে, তা বলার জন্য গণক হতে হয় না।

আমাদের দেশের মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতাই হচ্ছে, সুযোগের অপেক্ষায় থাকা এবং সময় বুঝে প্রতিশোধ নেওয়া। ক্ষমতাসীনদের কথাবার্তা-আচরণ এ ক্ষেত্রে বৈরীতাকেই উস্কে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে পরিত্রাণ দিতে হলে জামায়াত-বিএনপি ও তাদের দোসরদের অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। পরীক্ষিত বন্ধুদের মেরে-পিটিয়ে-অপমান করে প্রতিপক্ষ শিবিরে ঠেলে দেওয়া– এসব কি সেই প্রত্যাখ্যানের প্রস্তুতি?

নিজেদের কৃতকর্মের কারণে শাসক দল এমনিতেই এখন বন্ধুহীন। নানা সময়ে যারা আওয়ামী লীগের পক্ষে কথার খই ফুটিয়েছেন, তাদের এখন আর খুঁজে পাওয়া যায় না। দলের দায়িত্বশীল ভূমিকায় যারা রয়েছেন, তারাও অনেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখছেন, পালিয়ে থাকার চেষ্টা করছেন। দল এবং সরকারের যাবতীয় ‘অপকর্মের’ দায় নিতে তাদের অনেকেই কুণ্ঠিত, লজ্জিত।

এ অবস্থায় যারা অন্তত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হবেন না, যৌক্তিক সমালোচনার বাইরে কোনো রকম ষড়যন্ত্র করবেন না, এমন লোকদেরও যদি খেপিয়ে তোলা হয়, তাহলে তারা চরম পরিণতি এড়াবেন কীভাবে? পিঠেরই বা চামড়া বাঁচাবেন কী করে?

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের মনে রাখা উচিত, তাদের জন্য আগামী দিনগুলো মোটেও কুসুমের শয্যা হবে না।। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী মৌলবাদী অপশক্তি তৎপর রয়েছে আওয়ামীবধের মন্ত্র নিয়ে।

আওয়ামী-শাসন নিয়ে দেশের মানুষও যে খুব স্বস্তিতে রয়েছে, তা কিন্তু নয়। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে গণেশ উল্টে যেতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। এর সঙ্গে রয়েছে শাসকদলের নেতাকর্মীদের আস্ফালন, বাড়াবাড়ি। এক ছাত্রলীগ-যুবলীগের অপতৎরতা ঢাকতেই অনেক ‘ঘি-চন্দন জ্বালানো’র দরকার হবে। সেখানে আবার নতুন করে সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নসহ বামপন্থীদের মতো ‘নিরীহ’ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ আওয়ামী লীগকে বন্ধুহীন করে তুলতে পারে।

আওয়ামী লীগ কি তবে বন্ধুহীন হওয়ার আত্মঘাতী কৌশল গ্রহণ করেছে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)