চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদনের জন্য আর কতো অপেক্ষা?

৩ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সিডও দিবস। জাতিসংঘ ঘোষিত নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ বা সিডও একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি/সনদ যাকে বলা হয় নারীর অধিকার রক্ষার আন্তর্জাতিক দলিল। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ১৯৭৯ সালে সিডও সনদ গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশ সরকার কয়েকটি ধারায় আপত্তি বা সংরক্ষণসহ ১৯৮৪ সালে সিডও সনদ স্বাক্ষর করেছে এবং এটি বাস্তবায়নে বার বার তাদের অঙ্গীকার পুর্নব্যক্ত করেছে। সার্বিকভাবে গোটা বিশ্বের শান্তি ও উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমতা স্থাপন করার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন, প্রচলিত আইনের সংস্কার, আইন প্রয়োগের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি ইত্যাদি যা কিছু প্রয়োজন, সিডও সনদে শরীক রাষ্ট্রগুলো তার সকল ব্যবস্থা গ্রহণে প্রতিশ্রুতি বদ্ধ। সিডও স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারও এই প্রতিশ্রুতি পালনে অঙ্গীকারাবদ্ধ। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার দীর্ঘদিন ধরে সিডও সনদের ধারা ২ এবং ১৬.১.গ-এর উপর সংরক্ষণ আরোপ করে রেখেছে।

বাংলাদেশের সুশীল সমাজের পাশাপাশি জাতিসংঘের সিডও কমিটির পুনঃ পুনঃ সমালোচনা এবং দাবি সত্ত্বেও, এবং বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও বাংলাদেশ সরকার এই সংরক্ষণ প্রত্যাহারে এখনো পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এতে দেশে সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি হচ্ছে, কেননা এই দুটি ধারাই হচ্ছে সিডও সনদের প্রাণ।

বিজ্ঞাপন

তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অন্যসব অর্জনের পাশাপাশি নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক স্থানে অবস্থান করছে বলে বিভিন্ন তথ্যসূত্র এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে প্রতিফলিত হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন নারীবান্ধব আইনকানুন, নীতিমালা, প্রকল্প ও অন্যান্য পদক্ষেপের পাশাপাশি দেশের নারী আন্দোলন কর্মী এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমূহের অব্যাহত সংগ্রাম ও প্রচেষ্টার ফলে আজ দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণ ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে। বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নতির সাথে তাল রেখে এগিয়ে যাচ্ছিলো নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার ইতিবাচক সংগ্রাম। কিন্তু গতবছরের ডিসেম্বরের পর থেকে ভয়াল করোনাভাইরাসের থাবায় স্থবির সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশেও অর্থনৈতিক অগ্রগতির পাশাপাশি নারী-পুরুষের সম্মিলিত অর্জনগুলি থমকে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে গত ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা করোনা মহামারীকালে বেড়েছে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা; হুমকির মুখে পড়েছে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা, গার্মেন্টসকর্মীসহ কর্মজীবী নারীদের জীবন ও জীবিকা; সংকটে পড়েছে নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য-শিক্ষা-স্বাবলম্বী হওয়ার সম্ভাবনা। সংকুচিত হয়ে পড়েছে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশগ্রহণ। নারীরা হয়ে পড়ছে দরিদ্রদের মধ্যে দরিদ্রতর। সর্বোপরি নারীর এতদিনের সংগ্রামে অর্জিত সাফল্যসমূহ ম্লান হয়ে যাবার আশংকা দেখা দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সারাবিশ্বেই যেখানে করোনার গ্রাস থেকে মানুষের জীবন এবং অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখার প্রবল প্রয়াসে লিপ্ত, সেখানে নারীর ইস্যুগুলি এখন কতোটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে তা নিয়ে সর্বত্রই খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে। উল্লেখ্য, চলতি ২০২০ সালেই নারী উন্নয়নের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক বেইজিং ঘোষণার ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতিসংঘের যে অধিবেশন হওয়ার কথা ছিলও করোনার কারণে তা খুবই সীমিত আকারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে সিডও সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে, স্বাক্ষরকারী দেশগুলিকে প্রতি চার বছর পর পর জাতিসংঘের সিডও কমিটির কাছে যে প্রতিবেদন জমা দিতে হয়, এবছর নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের সেটি জমা দেয়ার কথা থাকলেও করোনার কারণে তা খানিকটা অনিশ্চিত।

সিডও কমিটি সরকারকে সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অভিন্ন পারিবারিক আইন প্রণয়ন, বৈষম্য বিরোধী আইন প্রণয়ন, নারীর উন্নয়নে জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত ক্ষমতা, জনবল, কারিগরি ও আর্থিক সম্পদ নিশ্চিত করা এবং বৈবাহিক ধর্ষণসহ সব ধরনের নারী নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন প্রণয়নের জন্য তাগিদ দিয়েছে। সরকারের দায়িত্ব হলো সিডও কমিটির সুপারিশ তথা সিডও সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নে যথাসম্ভব উদ্যোগ নেয়া। পাশাপাশি নাগরিক সমাজের কাজ হলো সিডও বাস্তবায়নে সরকারের সহায়ক ভূমিকা পালন করা এবং এটি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কিনা তা পর্যবেক্ষণ করা। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি আমাদের দাবি হচ্ছে অবিলম্বে সিডও সনদের দুটি ধারা থেকে সংরক্ষণ প্রত্যাহার করতে হবে এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়নের জন্য যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

করোনা একসময় হয়তো পৃথিবী থেকে নির্মূল করা সম্ভব হবে। কিন্তু এর প্রভাবে নারী-পুরুষের সার্বিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হলে এবং নারীর এতদিনের কষ্টার্জিত অর্জনসমূহ ধূলিসাৎ হয়ে গেলে তা হবে এক অপূরণীয় ক্ষতি। এর কুফল আমাদের ভোগ করতে হবে যুগ যুগ ধরে।

পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে অনাদিকাল ধরে নারীর বিরুদ্ধে বৈষম্য এবং নির্যাতন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জাতিসংঘ নারীর প্রতি সকল বৈষম্য বিলোপ করার জন্য নারী এবং পুরুষের বিভেদ রদ করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। তবে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সিডও বাস্তবায়নে জাতিসংঘের পাশাপাশি রাষ্ট্র এবং তার নাগরিকদেরও সমান দায়িত্ব আছে। প্রতিটি ব্যক্তি, সমাজ এবং সর্বোপরি পুরো রাষ্ট্রের সচেতন হওয়া দরকার। আমাদের সমাজে প্রচলিত নারীর প্রতি নেতিবাচক ধ্যানধারণা, মনোভাব এবং আচার-আচরণ বদলাতে হবে এবং এটি প্রথমে শুরু করতে হবে পরিবার থেকেই। মনে রাখতে হবে বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই নারীদের বাদ দিয়ে কোনও টেকসই উন্নয়নই সম্ভব নয়। তাদেরকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদের স্বার্থেই। দেশে নারী-পুরুষ বৈষম্যের মূল উৎপাটন করে নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠায় সিডও সনদের পূর্ণ অনুমোদন ও বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। তাই সকল জাতীয় ও বৈশ্বিক সংকটের মাঝখানে দাঁড়িয়েও সরকারকে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তার অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আন্তরিক উদ্যোগ নিতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)