চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সিটি নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন কেন?

একজন কূটনীতিকের কাজ কী? এর সহজ উত্তরে বলা যায়, কূটনীতিক হলো কোনো রাষ্ট্র কর্তৃক কূটনীতিবিদ্যায় প্রশিক্ষিত ও কূটনৈতিক পদমর্যাদাসম্পন্ন মনোনীত ব্যক্তি। তার প্রধান কাজ- অন্য কোনো দেশে বা আন্তর্জাতিক সংস্থায় নিজ দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং অক্ষুণ্ণ রাখার লক্ষ্যে কোনো কিছু উপস্থাপন করা। এখন প্রশ্ন হলো- খুলনা কিংবা গাজীপুর সিটি নির্বাচন কিভাবে এবং কোন যুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংরক্ষণ বা তাদের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখার পর্যায়ে পড়ে?

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ডিপ্লোমেটিক করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিকাব) আয়োজিত অনুষ্ঠানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া ব্লুম বার্নিকাটের মন্তব্যে বিপরীতে প্রশ্ন তোলা যায়, ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বিষয়ে। সেবার ফ্লোরিডায় জর্জ বুশ ও আল গোরের মধ্যে ভোট গণনা নিয়ে এক মহাকেলেঙ্কারি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত সিদ্ধান্তে বুশকে নির্বাচিত বলে ঘোষণা করেছিল। ওই রায়কে যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই বিতর্কিত বলেছিল। কারণ বুশ সত্যি সত্যি গোনা ভোটে জয়লাভ করেননি। মার্কিনীরা আল গোরকে ভোট দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু ওই ভোট হিসাবে ধরা হয়নি। সেই কারচুপির জোরে বুশ জিতেছিল, তাও আবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ে। প্রশ্ন হলো, ফ্লোরিডায় মার্কিন ভোটারের মন থেকে কি সেই ভোটবিতর্ক শেষ হয়েছে ? কী উত্তর দেবেন তিনি?গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বার্নিকাটের কাছে আরো একটা প্রশ্ন করা যায়। যুক্তরাষ্ট্র তো উন্নত সমৃদ্ধ গণতন্ত্র চর্চার দেশ, ২০১২’তে সেই দেশে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে যেসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান পার্টি ক্ষমতায় ছিল, তারা কেন আদাজল খেয়ে নেমেছিল প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাটদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়া আটকাতে? পাশাপাশি কেন নতুন ভোটার আইডি কার্ড বানানোর চেষ্টা করেছিল তারা? ছুটির দিনে আগাম ভোটের নিয়ম বাতিল করা হয়েছিল কেন? ডাকে ভোট দেওয়ার পুরনো নিয়মেও কেন তারা পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল? এছাড়া তার দেশে ২০১৫ সালে স্থানীয় একটা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় কিভাবে ৫০ শতাংশ প্রার্থী বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছিল?

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচিত হওয়ার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কী হয়েছে বা না হয়েছে সেসব নিয়ে বললেও অনেক বলা যাবে। কাজেই সেসব নিয়ে বলছি না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে বেশ কঠোর নীতিতে বিশ্বাসী। তাদের অভ্যন্তরীণ ম্যাটারগুলো শুধু তারাই জানে। বাইরের পৃথিবীর কেউ যেন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় না জানে সেজন্য তাদের গণমাধ্যমও বেশ সোচ্চার। সিএনএন, এবিসির মত গণমাধ্যমগুলো স্থানীয়ভাবে ব্রডকাস্ট করে, যা আন্তর্জাতিকভাবে সম্প্রচার হয় না। আর সিএনএন-এবিসির আন্তর্জাতিক ভার্সনে যা প্রচারিত হয় তা মার্কিন মুল্লুকের লোকালে সম্প্রচার হয় না। মোটকথা বাতির নিচে অন্ধকার পলিসি!

বিজ্ঞাপন

বার্নিকাটের অবশ্যই অবগত থাকা উচিত যে, উনি বাংলাদেশে নিযুক্ত একমাত্র রাষ্ট্রদূত নন যে কূটনৈতিক নিয়ম কানুন ভেঙেচুড়ে চুরমার করে দেবেন! শুধুমাত্র একটি দলের মৌখিক রাজনৈতিক অভিযোগগুলো যাচাই-বাছাই না করে রাজনৈতিক দলের ভাষায় প্রতিক্রিয়া দেওয়া যেন তার জন্য ফরজ। তাছাড়া বৈশ্বিক রাজনীতির ছলাকলায় নিজেদের সমস্যায় জর্জরিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামনের দিনগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে বার্নিকাটের উচিত সেসব বিষয়ে মনযোগী হওয়া।

বার্নিকাটের বক্তব্যের পর বাংলাদেশে কাজ করছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া এমন দু’জন সাংবাদিকের সাথে কথা বলেছি, তাদের দু’জনের কাছে প্রশ্ন ছিল, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের ওই অনুষ্ঠান কাভার করতে তারা কেউ গিয়েছিল কিনা? উত্তরে তারা বলেছেন, না। কেন যাননি? উত্তর, এই খবর পাঠালেও নিউজরুম পার হবে না। সুতরাং গিয়ে লাভ নাই। অথচ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে এটাই ছিল গতকালের সেকেন্ড লিড নিউজ!গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন

খুলনা, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে অভিযোগ যদি কারো থাকে তার পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করে দাবী জানানোর অধিকার অবশ্যই অংশগ্রহণ করা রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির রয়েছে। এতে কোন সন্দেহ নাই। কথা হচ্ছে, সেই অভিযোগ করার দায়িত্ব বার্নিকাটকে কে দিয়েছে? তিনি কি মেয়র পদে নির্বাচন করেছিলেন? নাকি বাংলাদেশে কোন রাজনৈতিক দলের নেত্রী উনি? তাহলে তার মুখ থেকে কেন শুনতে হবে খুলনা বা গাজীপুর সিটি নির্বাচন কেমন হয়েছে? এটা কোন ধরনের জার্নালিজম?

আসলে আমরা অন্যদের কাছ থেকে রাজনীতির ‘এটা-ওটা’ খুঁজে বেড়াই। বাস্তবিকভাবে আমরা নিজেরা যে অবক্ষয়ের মধ্যে আছি সেই বিষয়ে আমাদের কোন ভাবনা নাই। তাই বলছি, আমাদের দেশ আমাদের। রাজনীতি আমাদের। এখানে যুক্তরাষ্ট্রকে নাক গলানোর সুযোগ দিতে হবে কেন? সকল বন্ধু দেশ তাদের স্বার্থে নাক গলাবে আমাদের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে, এটা হতেই পারে। তার মানে এই নয় যে, আমাদের সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন নির্বাচনগুলোও তাদের স্বার্থ রক্ষা করবে। হিসাব দেশের সঙ্গে দেশের। অন্য দেশের সঙ্গে আমাদের সিটি কর্পোরেশনের নয়।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন