চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাহেদকাণ্ড ও আমাদের রাজনীতি

আইনপ্রণেতার মূল কাজই হচ্ছে আইন প্রণয়ন করা, প্রচলিত আইনের যাচাই বাছাই করা, প্রয়োজনে আইনের সংশোধন ও সংযোজন করা কিন্তু অবশ্যই সেটি রাষ্ট্রের জনগণের মঙ্গলের জন্য। রাষ্ট্রে আইন প্রণয়ন করা হয়ে থাকে জনগণের চাহিদাকে সামনে রেখে, যথার্থতাকে বিবেচনাই নিয়ে; যার পরিপ্রেক্ষিতে উক্ত সরকারের জনগণ সরকারি সুযোগ সুবিধা কিংবা বিধিনিষেধ মানার ক্ষেত্রে সমান মর্যাদা ও বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে থাকে। আইন সকলের জন্যই সমান এ মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী হয়েই সংসদ সদস্যদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া বাঞ্ছনীয়। কাজেই আইন প্রণেতাদের স্ব স্ব বিষয়ে একাডেমিক ডিগ্রী ও জনগণের জন্য কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতার মিশেলে রাজনীতিতে অংশগ্রহণের যৌক্তিকতাই একটি পূর্ণাঙ্গ সংসদের আবির্ভাব ঘটাতে সক্ষম হবে। একটি সমীক্ষায় জানা যায়, উন্নত বিশ্বের আইনসভায় সংসদ সদস্যদের শতকরা ৭০ ভাগের উপরে আইন বিষয়ে একাডেমিক ডিগ্রী থাকে এবং অধিকাংশের রাজনীতি করার পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকে। একটি কার্যকর সংসদের জন্য সংসদ সদস্যদের পূর্বোক্ত যোগ্যতা থাকা অবশ্যম্ভাবী, যে বিষয়টি রাজনীতির যাত্রাকে মসৃণ ও সহজলভ্য করে তোলে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে সংসদ কার্যকরের উপযুক্ততা সহজেই নির্ণয় করা সম্ভব হয়, সদস্যদের একাডেমিক যোগ্যতা ও রাজনীতির পঠন-পাঠনের যোগ্যতাই একজন সংসদ সদস্যকে জনগণের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত করতে পারে।

আমাদের দেশের একজন প্রথিতযশা রাজনীতিবিদ প্রায়শই বিভিন্ন সভা সেমিনারে রাজনীতির মাঠের উন্মত্ততা নিয়ে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে থাকেন। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সহিত উল্লেখ করেন, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই, চলে গেছে ব্যবসায়ীদের হাতে, সামগ্রিক বিষয়টি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথকে অথৈই সাগরে নিপতিত করবে। মানব ও অর্থ পাচারের অভিযোগে কুয়েতে সংসদ সদস্য কাজী পাপুল গ্রেফতার, আর যাই হোক; বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের একজন সংসদ সদস্যের গ্রেফতারের সচিত্র প্রতিবেদন বিশ্বের নামকরা সব মিডিয়াতে প্রকাশিত হয় এবং বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে বহির্বিশ্বে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। সংসদ সদস্যরা একটি উপজেলার সমগ্র জনগণের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে সেক্ষত্রে সংসদ সদস্যরা যদি কোনভাবে নেতিবাচক এবং বিবেকহীন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায় তাহলে প্রকারান্তরে উক্ত এলাকার জনগণের ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মধ্যে পড়ে যায়। কেননা উক্ত সংসদ সদস্যকে কিন্তু ঐ এলাকার জনগণ ভোট দিয়েই নির্বাচিত করে সুতরাং দায়ভার কিন্তু তাদের উপর বর্তায়।

বিজ্ঞাপন

(Politicization of Criminal)-রাজনীতির মাঠে অপরাধীদের অন্তর্ভুক্তি বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অচলাবস্থার জন্য দায়ী। অনেকাংশে দেখা যায়, রাজনৈতিক প্রার্থীর পূর্বেকার ইতিহাস বিবেচনায় না নিয়েই রাজনৈতিক দলগুলো অনেককে রাজনীতি করার সুযোগ প্রদান করে থাকে এবং সেটি রাজনীতির ভবিষ্যৎ মাঠের জন্য বেদনার ও অশনিসংকেত। দাগী আসামীদেরও রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে মনোনয়ন দিয়ে বিশেষত অপরাধীদের প্রলুব্ধ করে থাকে, অপরাধকে যদি আপনি আপাত দৃষ্টিতে কোন না কোন কারণে মেনে নেন তাহলে কিন্তু সুশাসন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কথা কাগজে কলমে বাঘের থাবার ন্যায় দৃষ্টিপাত করলেও কার্যক্ষেত্রে সেটি অসুর মনে হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুমুখী সংস্কার অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রের অনুসরণ ও অনুকরণ করা অবশ্য পালনীয় কিন্তু অত্যন্ত জোরের সহিত বলা যায় প্রকৃতঅর্থে নানামাফিক কারণে রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় গঠনতন্ত্রের জলাঞ্জলি দিয়ে দলগুলো পরিচালনা করছে। দলের নীতি নির্ধারণই ফোরাম, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পরেও আহবায়ক কমিটি দিয়ে দিনের পর দিন দল পরিচালনা করা কোনভাবেই সমীচীন নই। যার কারণে উপযুক্ত ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে না এবং রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। এ অচলাবস্থা নিরসনে রাষ্ট্রের প্রত্যেক সচেতন মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে স্ব স্ব জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরী বলে মনে করি।

বিজ্ঞাপন

সাহেদ(Criminalization of Politics)-রাজনীতির মাঠে যে ধরনের সুস্থ ধারার প্রতিযোগিতা বিরাজমান ছিল কালের বিবর্তনে সেটি বিলুপ্তপ্রায়, একটা সময় ছিল রাজনৈতিক নেতাদের সাধারণ জনগণ অত্যন্ত মর্যাদা ও ইজ্জতের সহিত বিবেচনায় নিতেন এবং সামাজিক যে কোন সমস্যায় সুষ্ঠু সমাধানের জন্য তাঁদের দ্বারস্থ হতেন। বর্তমানে কিন্তু ঐ ধরনের ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিচারকাজ ক্রমশই তলানির দিকে যাচ্ছে বিশেষ করে রাজনীতিতে যখন অনুপযুক্তদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হয় ঠিক তখনই রাজনীতির স্বাভাবিক গতিপথ ম্রিয়মাণ হয়ে যায় এবং দেশের অধিকাংশ জনগণ আশাহত হয়ে যায়। আত্মীয়করণ, আনুগত্যতা, অর্থ-কড়ি, জনবিচ্ছিন্নতা, ক্রিমিনাল টেনডেন্সি, ক্রিমিনোজনিক মাইন্ড, অপরাধের ইতিহাস, শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী (পদে উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনায় রাখা) ইত্যাদি বিষয়কে সামনে রেখে আপনি যখন দলীয় পদে কাউকে পদায়ন করবেন সেখানে কিন্তু সুস্থ ধারার রাজনীতির চর্চা পরিলক্ষিত হবে না। রাজনীতিতে অপরাধ এবং অপরাধীদের পদায়নের ক্ষেত্রে উক্ত প্রত্যয়টি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে এবং উক্ত প্রত্যয়ের অব্যাহত চর্চা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে ভবিষ্যতের কল্যাণকর বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বার্থে।

বিজ্ঞাপন

সুস্থ ও সাবলীল রাজনৈতিক চর্চার ঘাটতির জন্যই বাংলাদেশের রাজনীতিতে অপাঙক্তেয় ব্যক্তিদের আগমনে রাজনীতির মাঠে কলুষতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যার ধরুণ রাজনীতি নিয়ে সকলের মধ্যে অনিহা ও বিরক্তি স্পষ্টতই ফুটে উঠে। কোন সচেতন নাগরিক তার ছেলে-মেয়েকে কখনোই রাজনীতিতে সংযুক্ত হতে উৎসাহ প্রদান করে না। হলফ করে বলতে পারি; সাধারণ পরিবারের কোন ছেলেমেয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার গড়ার ক্ষেত্রে রাজনীতিকে প্রাধান্য দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এ বাস্তবতাকে পদদলিত করে রাজনীতির মাঠকে মসৃণ ও সকলের জন্য নিরাপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে ভবিষ্যতের কল্যাণকর রাষ্ট্রের জন্য। স্বাভাবিকভাবে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোতে গণতন্ত্রের চর্চা হয় না, কিন্তু পত্রিকা ও টেলিভিশনের পাতায় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণ দলে অব্যাহত গণতন্ত্রের চর্চার কথা সবিস্তারে উল্লেখ করেন। এমপি পাপুলের সংসদ সদস্য হওয়ার পেছনের কাহিনী জানলেই অনুধাবন করতে পারলেই বোঝা যাবে আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কতটা সংস্কার জরুরী হয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, এমপি পাপুল তার স্ত্রীকে সংরক্ষিত মহিলা এমপি হিসেবে নির্বাচিত করতে সমর্থ হয়েছেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বারংবার বলেছেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই আওয়ামী লীগের প্রাণ। সেখানে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তৃণমূলের কর্মীরা কখনোই পাপুলদের আওয়ামী লীগে যোগদানকে স্বাগত জানাবে না।

আওয়ামী লীগে সহ-সম্পাদক পদের ছড়াছড়ি ছিল এক সময়, এখন জানামতে সে পদটি বিলুপ্ত। পদটি বিলুপ্ত কেন হয়েছে সেটির মূল অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে সেখানে নানা অনিয়ম ও দলের শৃঙ্খলা বিরোধী নানা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন নামে বেনামে ব্যবহার করা সহ-সম্পাদক পদটি। বিশেষভাবে বললে বলা যায়, পদটির এমন অবস্থা হয়েছিল যেটিকে লাগাম ধরে টেনে রাখা সম্ভব হয়নি। কারণ, দলের সঙ্গে কখনো কোন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত না থেকেও অনেকেই সহ-সম্পাদক পদে আসীন হতে পেরেছিলেন যেটি অত্যন্ত অবমাননাকর ছিল দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের জন্য। সাহেদের যে উত্থান সেখানে কিন্তু আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদটি অবশ্যই বিভিন্ন জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে এবং বিশেষ করে টকশোতে টিভি স্ক্রলে সাহেদের নামের পাশে আওয়ামী নেতা পদটি ব্যবহৃত হতো।

টকশোর কথা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বলা হচ্ছে সংবাদ মিডিয়াতে প্রতারক সাহেদের উত্থানের পেছনে, কারণ হিসেবে বলা হয় সাহেদ উপস্থাপকদের টাকা দিয়ে বিভিন্ন প্রোগ্রামে আলোচক হিসেবে উপস্থিত থাকতেন হালের প্রতারক সাহেদ। নির্বাচন কমিশনে নাম পরিবর্তনের আবেদনের ফরমে টকশোর পরিচয় উপস্থাপন করা হয়েছিল। সংবাদ মাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের সমাজের দর্পন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় সেখানে একজন সাহেদের উত্থানের পিছনে সংবাদকর্মীদের ভূমিকার বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করে প্রকৃত হোতাদের খুঁজে বের করে সমাজের সামনে উপস্থাপন করা উচিত। কেননা সঠিক তদন্ত ও বিচারকাজ সম্পন্ন হলে এরকম অনেক সাহেদ যেমন বের হবে ঠিক তেমনিভাবে হোতাদের ঘাপটি মেরে থাকা প্রতারণার চিত্রও বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণের সামনে উঠে আসবে।

আমার তো মনে হচ্ছে, ঐ রকম দলীয় পদে (উপকমিটির সদস্য) পদায়ন পেতে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক মুখ্য প্রভাবক হিসেবে কাজ করে থাকে দলীয় পদে আসীন হবার জন্য। কেননা, সাহেদের তারেক রহমানের সাথে স্কাইপিতে ফোনালাপের বিষয়টি সর্বাগ্রে আলোচিত হচ্ছে অর্থাৎ তার মানে দাঁড়ালো বিএনপির সাথেও সাহেদের সখ্য সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলো যদি গণতন্ত্রের চর্চা রাখতো তাহলে সাহেদের মতো কালপ্রিটদের রাজনীতির মাঠে অন্তর্ভুক্তি সম্ভবপর হতো না। মোদ্দাকথা হচ্ছে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো যদি পদ/পদবীতে পদায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিত তাহলে সাহেদের মতো প্রতারকদের রাজনীতির মাঠে প্রবেশাধিকার সহজ হতো না। কাজেই রাজনৈতিক দল, সরকার সহ রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিকের নিকট আমাদের প্রত্যাশা হচ্ছে সুষ্ঠু, সুন্দর ও নিরাপদ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বার্থে প্রতারক ও তাদের দোসরদের মুখোশ উন্মোচন করে কঠিন শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)