চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সার্ক সহযোগিতা কি থমকে গেল?

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সার্ক নেতাদের ভিডিও কনফারেন্সে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন গত ১৫ মার্চ। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশ নিয়ে গঠিত এ সংস্থা বছরের পর অনেকটাই নিষ্ক্রিয়। করোনার ভয়ঙ্কর বিপদ মোকাবেলায় ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ আশা জাগিয়েছিল। একটি অভিন্ন তহবিলও গঠিত হয়েছিল। তবে গত এক মাসে এ জোট এ ভূখণ্ডের প্রায় দু’শ কোটি মানুষের কাছে দৃশ্যমান কিছু করতে পারেনি। ভেতরে ভেতরে কি কাজ চলছে?

এ সময়ে আইএলও’র দেশগুলো যার যার মতো করোনা বা কোভিড-১৯ মোকাবেলার চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বহুলাংশে থেমে আছে। লকডাউন রয়েছে প্রতিটি দেশেই। বিশেষ হাসপাতাল চালু হয়েছে। করোনায় কেউ আক্রান্ত কী-না, কম সময় ও কম ব্যয়ে তার পরীক্ষার পদ্ধতি উদ্ভাবন বিষয়ে কাজ চলছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছেন। আবার চিকিৎসা কর্মীদের কেউ কেউ যথেষ্ট ভয় পেয়েছে। এমন ভয় তো করোনায় আক্রান্ত রোগীদের পরিবারের সদস্যরাও পাচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পুরাতন ভৃত্য’ কবিতায় রয়েছে গুটি বসন্তে আক্রান্ত হলে পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে যায়, কেবল পাশে থেকে দিনরাত সেবা-যত্ন করে ‘কেষ্ট বেটা’। শেষ পর্যন্ত মনিবকে সে সারিয়ে তোলে, কিন্তু নিজের প্রাণ যায় ওই ভয়ঙ্কর রোগে।

বিজ্ঞাপন

অতীতে প্লে­গ ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত এলাকা থেকে লাখ লাখ মানুষের পালিয়ে যাওয়ার বিবরণ মেলে বাংলা ও অন্য ভাষার সাহিত্যে। করোনাকালের বিবরণও মিলবে, তাতে সন্দেহ নেই। কেউ হাতে লিখবেন, কেউ কম্পিউটারে। টিভি ফুটেজ ও মোবাইল ফোনেও ধরা থাকবে ইতিহাস।

সার্ক দেশগুলোর নেতাদের কাছে অনুরোধ থাকবে, তারা যে উদ্যোগ নিয়েছিলেন, সেটাকে এগিয়ে নিতে আরও কিছু করুন। ইউরোপ-উত্তর আমেরিকায় এ ভাইরাসের যেভাবে সংক্রমণ ঘটেছে, সার্ক দেশগুলোতে সে তুলনায় এখন পর্যন্ত তেমনটি দেখা যায় না। এর পেছনে কি বিজ্ঞানের কোনো ব্যাখ্যা আছে? নাকি পরিবেশ কিংবা জীবনযাত্রাই এখন পর্যন্ত আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে? এটাও হতে পারে যে প্রকৃতি একে একে হানা দিচ্ছে এলাকা ধরে।

সার্ক দেশগুলোর নেতৃত্ব ১৫ মার্চ পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে একমত হয়েছেন। করোনার প্রকোপ ও প্রতিকার নিয়ে সমন্বিত গবেষণা পরিচালনায় কোনো উদ্যোগ শুরু হয়েছে কি?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন টিকা ও প্রতিষেধক আবিষ্কারের জন্য। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তানের কোনো প্রতিষ্ঠানে কি এ ধরনের কাজ চলছে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণাগার রয়েছে। ওষুধ কোম্পানিগুলোর গবেষণাগার রয়েছে। সার্ক দেশগুলো কি সহযোগিতা শুরু করেছে?

করোনাকালে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিষিদ্ধ রয়েছে। কিন্তু ভিডিও কনফারেন্সে বাধা নেই। রাষ্ট্রনেতা, সংসদ সদস্য, চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, এমনকি বিনোদন ও সাহিত্য জগতের সেলিব্রিটিরা তথ্য-প্রযুক্তির সহযোগিতা নিতে পারেন। লকডাউনের সময়ে কোটি কোটি মানুষ ঘওে বন্দি। এ সময়ে টেলিভিশনে কেবল করোনা আর করোনা। খবরে আশার আলো নেই, কেবল অনিশ্চয়তা ও হতাশা। মানুষ বিনোদন পেতে পারে, টেলিভিশনের এমন অনুষ্ঠান ভাবা হচ্ছে?

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সব ধরনের পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য প্যাটেন্ট নিতে হয়। যে ব্যক্তি বা কোম্পানির কোনো পণ্য উৎপাদনের প্যাটেন্ট রয়েছে তার কাছ থেকে বৈধ-লিখিত অনুমোদন ব্যতিরেকে কেউ উৎপাদন বা বিপণন করতে পারে না।

বিজ্ঞাপন

করোনার মতো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস মোকাবেলার ক্ষেত্রেও কি এমনটি হবে? যদি এমনটিই হয়, তাহলে আমরা যে বদলে যাওয়া করোনা-উত্তর বিশ্বের স্বপ্ন দেখছি তা পূরণ হবে না। করোনা এমন এক ব্যাধি, যা কোনো দেশ পৃথকভাবে মুক্ত হতে পারবে না।

চীনের একটি এলাকায় এ ব্যাধির প্রকোপ শুরু হয়। তারা কঠোরভাবে ‘ঘরো থাকা’ বা লকডাউন কার্যকর করে করোনা ঠকিয়ে দিয়েছে। কিন্তু দেখা গেল, চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া ব্যাধিটি অন্য দেশ থেকে ফের চীনে আসতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ, ভারত বা পাকিস্তানের মধ্যে অবাধ সীমান্ত। বিমান-রেল-সড়ক যোগাযোগ কতদিন ঠেকিয়ে রাখবেন? পায়ে হাঁটা পথে চলাচল কতদিন ঠেকিয়ে রাখবেন? এক দেশ মুক্ত হলে অন্য দেশ থেকে সংক্রমণ ঘটবে না, তার সামান্য নিশ্চয়তাও নেই। ওষুধ নিয়ে গবেষণা ও উৎপাদন ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা অবশ্যই মনে রাখতে হবে। এ ধরনের ভাইরাস কিন্তু সীমান্ত মানে না।

সার্ক দেশগুলোর নেতারা ভিডিও করফারেন্স করেছেন। এ সব দেশের গবেষক ও ওষুধ উৎপাদকরা তেমন সম্মেলন কি করতে পারেন না? বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা আলোচনা করতে পারেন না?

সার্ক দেশগুলো ইউরোপ-আমেরিকার মতো শিল্পায়িত নয়। অর্থনীতিতেও ওই সব দেশের তুলনায় পিছিয়ে। এমনকি এশিয়ার চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও অর্থনীতিতে পাল্লা দিতে পারছে না। করোনার ধাক্কায় কি সার্ক দেশগুলো এ পর্যন্ত যে টুকু এগিয়েছে, সেখান থেকেও পিছিয়ে পড়বে? এক পা আগে, দুই পা পিছে এটা রাজনীতির কথা। অনেক সময় আগাতে হলে পিছিয়ে যেতে হয়। সার্কভুক্ত দেশগুলোতে জীবনযাত্রার মান কিন্তু সাধারণভাবে খুব একটা ভাল অবস্থানে নেই। দু’শ কোটির মতো মানুষের মধ্যে প্রায় অর্ধেক কার্যত স্বাভাবিক সময়েই ভাল ছিল না। বছর বিশেক আগে এক অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, আইএলও’র মানুষের ট্রাজেডি হচ্ছে, তিলে তিলে চেষ্টায় যে টুকু আগায় এক অসুখ বা প্রাকৃতির রোষে মুহূর্তে সব শেষ হয়ে যায়। করোনা কি তেমন কিছু ঘটাবে?

এটা যেন না ঘটতে পারে, সেজন্যই চাই সম্মিলিত প্রয়াস। এককভাবে কোনো দেশ এ বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে পারলে সমস্যা নেই। কিন্তু সেটা তো পারছে না। বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক বছরে যে শক্ত ভিত পেয়েছে তার মূলে ছিল কৃষি, রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ কাজ করা লাখ লাখ লোকের পাঠানো রেমিট্যান্স। এভাবে অনেক মানুষের হাতে অল্প হলেও নিয়মিত কিছু অর্থ আসছে। প্রবাসে যারা কাজ করে, তাদের খাবার ও বাসস্থানের চাপ সহ্য করে কর্মসংস্থান করা দেশ। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, কুয়েত, দুবাই থেকে যদি লাখ লাখ বাংলাদেশী ফিরে আসে করোনার বিপর্যয় শেষে? যদি ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা ঘটে? ভারত ও পাকিস্তান, উভয় দেশের হাতে পারমানবিক বোমা আছে। এ ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র কি তাদের অর্থনীতির বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারবে?

আইএলও’র বড় সম্পদ কৃষি এবং প্রাণী ও মৎস সম্পদ। প্রকৃতির রোষে মাঝেমধ্যে সমস্যা হয় বটে, তবে খাদ্যে এখন তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ। উন্নত দেশগুলোর মতো এখানের প্রতিটি পরিবারের মাছ-মাংস-দুধ-ডিম প্রতিদিন পর্যাপ্ত জোটে না, কিন্তু ভাত বা রুটি এবং সবজি-ডাল কমেবেশি সব পরিবারের জুটে যায়। করোনার গ্রাস যেন এ সুবিধা কেড়ে নিতে না পারে, সে জন্য সম্মিলিত প্রয়াস চাই। পেটের চাহিদা মিটলে অন্য সমস্যার সমাধানেও আমরা মনোযোগী থাকতে পারব।

রফতানি বাণিজ্যে এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। বিপন্ন হয়ে পড়তে থাকা শ্রম বাজারও আমাদের পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে করোনার টিকা আবিস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের প্রতি সমান মনোযোগ কাম্য।

সার্ক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে কী ধরনের সহযোগিতা করতে পারে, সেটা চিহ্নিত। করোনা মোকাবেলায় এ ক্ষেত্র আরও সম্প্রসারিত করা যায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর প্রস্তাবে সীমিত পরিমাণ অর্থ জমা করা হয়েছে। এ অর্থ বাড়ানো উচিত। প্রতিটি দেশ অবশ্যই নিজেদের মতো করে স্বাস্থ্য ও অর্থনীতির নানা দিক নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু প্রতিটি দেশের প্রতিটি মানুষের বিপদ যেখানে ঘটতে পারে এবং পরস্পরকে সংক্রমণ করার শঙ্কাও যেখানে প্রবল, সেখানে কেবল নিজেকে নিয়ে থাকার অবকাশ কোথায়?

শুধু সার্কভুক্ত দেশসমূহ নয়, বিশ্বের সকল দেশের জন্যও এ ধরনের সহযোগিতার বিকল্প আছে কি? এটা বিস্ময়ের যে করোনাকে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর মানবজাতির সবচেয়ে বড় ও ভয়ঙ্কর সঙ্কট বলা হলেও এখন পর্যন্ত উন্নত বিশ্বের নেতৃবৃন্দ এর প্রতিকারের উপায় নিয়ে কোনো আলোচনায় বসেননি। এখন একত্র বসে আলোচনার সুযোগ নেই। কিন্তু ভিডিও সম্মেলনে কেন বসেন না? পরিস্থিতির আর কতটা অবনতির জন্য তারা অপেক্ষা করে আছেন?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)