চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সারদামণির মৃত্যুশতবর্ষ এবং ‘ বেগম’র তিয়াত্তর বছর

বিশ জুলাই। কয়েক বছরের ব্যবধানে এই তারিখটি বাঙালি জীবন আর সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত একটি তারিখ। ১৯২০ সালের ২০ জুলাই জীবনাবসান ঘটে সারদামণি দেবীর। ব্যক্তি পরিচয়ে তিনি সমন্বয়ী সাধনার বর্তমান যুগের এক প্রতীক শ্রীরামকৃষ্ণ জায়া। সেই ব্যক্তি পরিচয়কে অতিক্রম করে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন ধর্মীয় সংকীর্ণতা আর জাতপাতের উর্ধ্বে উঠে, আধুনিক মনষ্কতার এক অনুপম প্রতিমূর্তি হিসেবে।

এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসানের ঠিক সাতাশ বছর পরে, অর্থাৎ; ১৯৪৭ সালের ২০ জুলাই কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয় সম্পূর্ণভাবে মহিলাদের দ্বারা পরিচালিত, সম্পাদিত পত্রিকা ‘ বেগম’। সম্পাদনা করেন সুফিয়া কামাল। প্রথম সংখ্যার সম্পাদকীয়তেই তিনি লেখেন;” সুধী ব্যক্তিরা বলেন, জাতিগঠনের দায়িত্ব প্রধানত নারী সমাজের হাতে, কথাটা অনস্বীকার্য নয় এবং এই গুরু দায়িত্ব পালন করতে হলে পৃথিবীর কোনোদিক থেকেই চোখ ফিরিয়ে থাকলে আমাদের চলবে না। একথাও মানতে হবে, শিল্প-বিজ্ঞান থেকে আরম্ভ করে গৃহকার্য ও সন্তানপালন সবক্ষেত্রে আমরা সত্যিকারের নারীরূপে গড়ে উঠতে চাই।”

বিজ্ঞাপন

নারীর এই আত্মোৎবদ্ধনের ঊষালগ্নে জীবনাবসানের মাত্র কয়েকদিন আগে মানবসমাজের প্রতি শেষ প্রকাশ্য উচ্চারণে সারদামণি বলেছিলেন অন্নপূর্ণার মা নামক এক নারীকে;” যদি শান্তি পেতে চাও, কারো দোষ দেখো না। দোষ দেখবে নিজের। জগৎকে ভালোবেসে আপনার করে নাও। কেউ তোমার পর নয়। জগৎ যে তোমার।”

বিজ্ঞাপন

যে সময়কালে হিন্দু ব্রাহ্মণঘরের বিধবারা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশিতে বিচারের সমস্ত স্রোত পথকে গ্রাস করে ফেলছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে সন্তানপ্রতিম শরৎকেও যেভাবে তিনি পাতপেড়ে বসে খাওয়াচ্চেন, নিজের হাতে তাঁর এঁটো পরিষ্কার করছেন, সেই একই আচরণ তিনি করছেন, তাঁর অপর সন্তান প্রতিম আমজাদের প্রতিও। শরৎ বা স্বামী সারদানন্দ ছিলেন উচ্চশিক্ষিত মানুষ। রামকৃষ্ণ মিশনের বরিষ্ঠ সন্ন্যাসী। আর আমজাদ হলেন পেশায় একজন ডাকাত। জয়রামবাটী সন্নিহিত অঞ্চলে চৌর্যবৃত্তি করে যে পেট চালায়।

উনিশ – বিশের গ্রাম বাংলার সামাজিক অন্ধকার ভেদে সারদামণির এই যাপনচিত্র আর দাঙ্গাক্লিন্ন বাংলায়, দেশভাগের বিভৎসার মুখে দাঁড়িয়ে নারীর , বিশেষ করে নানা ঐতিহাসিক কারণে অনেকখানি বেশি পিছিয়ে থাকা মুসলমান নারীর, আত্মমর্যাদায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে ‘ বেগম’ পত্রিকার ভিতর দিয়ে একটি সমাজবদলের স্বপ্ন দেখা- হিন্দু- মুসলমানের এই সন্মিলিত স্রোতই যেন রবীন্দ্রনাথের ভাষায়;’ বরিষধরা মাঝে শান্তির বারি।’ জাতপাত আর ধর্মের সংকীর্ণতায় বিদীর্ণ বাঙালি সমাজে জন্মসূত্রে খ্রিস্টান মার্গারেট নোবেল, যিনি বিশ্ববন্দিতা হলেন ভগিনী নিবেদিতা নামে, তাঁর সঙ্গে একথালায় ভাগ করে খাবার খাচ্ছেন সারদা দেবী। আর রক্ষণশীল মুসলমান সমাজ যখন ‘ ছবি’কে নিষিদ্ধ বস্তু বলে চালাতে চাইছে, তখন ‘বেগম’ পত্রিকার প্রচ্ছদে নারীর আলোকচিত্র দিচ্ছৃণ সুফিয়া কামাল, স্টুডিও তে বোরখা না পড়ে , মাথায় ঘোমটা দিয়ে ছবি তুলে, সেই ছবি ছাপছেন’ বেগমে’ ।

রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ্যবাদী পরিবেশে বড়ো হওয়া মেয়ে সারদা, প্রথাগত শিক্ষা না পেয়েও ,’ আমার ধর্ম ঠিক আর অপরের ধর্ম বেঠিক, এটা মতুয়ার ( ডগমাটিজিম) বুদ্ধি ‘ বলে চিহ্নিত শ্রীরামকৃষ্ণ জায়া হিসেবে, ব্রাহ্মণ্যবাদের সংকীর্ণতাকে অস্বীকার করছেন, স্বামীর মৃত্যুর পর তথাকথিত বৈধব্যের পরিমন্ডলে না থেকে। জয়রামবাটীর মতো প্রত্যন্ত গ্রামে ও তিনি বাড়ির জগদ্ধাত্রী পুজোর পঙতি ভোজে জাতের, ধর্মের বেড়াজাল ভাঙছেন। সেই জন্যে গ্রামের রক্ষণশীল সমাজ তাঁকে জরিমানা করছে। তবু ময়নাপুরের বাগদি রমণী তাঁর কাছে এসে, অসুস্থতার কারণে বিছানা নষ্ট করে ফেললে, পাছে কেউ সেই মহিলাকে ভৎসনা করে, সারদামণি সকালে কেউ উঠবার আগে নিজের হাতে সেই বৃদ্ধার ময়লা করা বিছানা পরিস্কার করেন।

বিজ্ঞাপন

‘৪৬ এর দাঙ্গা বা তার আগে ‘৪৩ এর মন্বন্তর- প্রতিটি পর্যায়ে ‘বেগম’ সম্পাদিকা সুফিয়া কামালের ভূমিকা যেন মনে করিয়ে দেয়, দুর্ভিক্ষক্লিন্ন জয়রামবাটীর বুকে রাম মুখার্জীর নিজের শষ্য ভান্ডার উন্মুক্ত করে দেওয়া আর অভূক্ত মানুষ, মূলত নিম্নবর্গীয় হিন্দুদের পাতে খরম খিচুড়ি পড়বার পর, সেই খিচুড়ি ঠান্ডা করতে কিশোরী সারদার প্রাণপণশক্তিতে পাখার বাতাস করবার ঘটনা।
দুই নারী। জন্মসূত্রে একজন উচ্চবর্ণের হিন্দু। অন্যজন উচ্চবর্ণের মুসলমান। সারদামণি আর সুফিয়া। দুজনেই পরম ঈশ্বরবিশ্বাসী। আবার দুজনেই নিজের বিশ্বাসকে দৃঢ়তা দিতে অপরের ধর্মবিশ্বাসের উপর অন্তহীন শ্রদ্ধাশীল।নিজ ধর্মের মানুষদের হৃদয়কে অনরধর্মের মানুষদের জন্যে প্রসারিত করার শিক্ষা দুজন ভিন্ন প্রেক্ষিতের নারী, নিজেদের যাপনচিত্রের ভিতর দিয়ে আগামী পৃথিবীর কাছে নিদর্শন হিসেবে রেখে গেলেন।

সারদামণির ঘনিষ্ঠ পরিমন্ডলের কিছু নারী, গোলাপমা, যোখীনমা, রাধু, পাগলী মামী, নবাসনের বৌ, নলিনী– এঁরা যখন তাঁর ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে থেকেও জাতপাত- ছোওয়াছুইয়ির বেড়াজালে আবদ্ধ থেকেছেন, গর্জে উঠতে পিছপা হননি সারদামণি। সুফিয়ার ঘনিষ্ঠ বৃত্তের নারীরা যখন কেউ কোনো রকম ধর্মভিত্তিক, ভাষাভিত্তিক, জাতি- লিঙ্গ ভিত্তিক সঙ্কীর্ণতা দেখিয়েছেন, ছোট্ট খাট্ট, মাতৃহৃদয়ের জ্যান্ত প্রতিমূর্তি সুফিয়াকে, তখন যে ভাবে শান্ত- কোমল প্রতিরোধী হতে দেখা গেছে, তা সমাজজীবনে চিরদিন আদর্শ হয়ে থাকবে।

ব্রাহ্ম পরিমন্ডলের বাইরে হিন্দু সমাজের নারী শিক্ষা ঘিরে তেমন হেলদোল নেই। নিবেদিতা মেয়েদের জন্যে ইস্কুল করলেন। প্রথাগত শিক্ষার সুযোগ কখনো জীবনে পাননি সারদামণি। কিন্তু তিনি উপলব্ধি করলেন, মেয়েদের মাথা উঁচু করে বাঁচতে গেলে আধুনিক শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আধুনিক শিক্ষার বাইরে সে যুগের মতো করে প্রযুক্তি বিদ্যা এবং নার্সিং শেখার আবশ্যকতাকে স্বীকৃতি দিয়ে একাধিক দিন নিবেদিতার ইস্কুলে সশরীরে উপস্থিত থেকে মেয়েদের উৎসাহিত করলেন সারদা। রক্ষণশীল সমাজের আড়ষ্টতাকেও ভাঙতে নিজে উদ্যোগী হলেন। সরলাবালা সরকারের নার্সিং শিক্ষাকে নিজে উৎসাহ দিলেন। কার্যত নারীশিক্ষা বিস্তারে এই পর্বে সারদামণির ভূমিকাকে বেগম রোকেয়ার কর্মকান্ডের পূর্বসূচনা বলেও উল্লিখিত করা যায়। নারীকে যে অর্থনীতির মূলস্রোতে এসে আত্মনির্ভর হতে হবে, এইপর্বে অভিজাত- অনভিজাত বাঙালি সমাজের ভিতর সেই বোধের উন্মোচনে সারদামণি একটি ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।

নারীর এই আত্মনির্ভরতার দিকটিই ছিল ‘বেগম’ পত্রিকা, তার প্রথম পর্যায়ের সম্পাদিকা সুফিয়া কামাল এবং পরবর্তী সম্পাদিকা নূরজাহান বেগমের কর্মকান্ডের প্রধান বিষয়। সারদামণির জীবনাবসানের সময়কাল আর রোকেয়ার কলকাতার বুকে মেয়েদের জন্যে ইস্কুল প্রতিষ্ঠার সময়কাল প্রায় পিঠোপিঠি।’ বেগম’ এই দুই সময়কাল কে, সময়ের নির্যাসকে যেন বুকে ধারণ করে তার কার্যক্রমকে পরিচালনা করেছিল। নারীর স্বনির্ভরতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যে একদম আধ্যাত্মিক পরিমন্ডলে থাকা সারদামণির জীবনের শেষপ্রান্তে একটা বড়ো জায়গা করে নিয়েছিল, তা তাঁকে ঘিরে স্মৃতিকথাগুলো পড়লেই বোঝা যায়। এমনকি নিবেদিতার ঘনিষ্ঠ সহযোগী গণেন্দ্রনাথ, তাঁর সেবক হওয়াতে তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবীপর্ব সম্পর্কেও ওয়াকিবহাল হয়ে উঠেছিলেন, একথা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়।

নারীর স্বাধিকারে, একটা উন্মুক্ত আকাশ ছিল ‘ বেগম’ র কাম্য। সেই পরিমন্ডল রচনা তাঁরা করেছিলেন কলকাতার বুকে বসে। সেই আকাশকে তাঁরা আরো বিস্তৃত করেন পরবর্তীকালে ঢাকাতে স্থানান্তরিত হয়ে। ভাষা আন্দোলন থেকে মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীর পূর্ণাঙ্গ অংশগ্রহণের পরিমন্ডল রচনাতে যে সলতে পাকাবার কাজ সুফিয়া কামাল শুরু করেছিলেন, সেই কাজটিই পরবর্তীতে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে নূরজাহান বেগম একটি সার্বিক পরিপূর্ণতা দিয়েছিলেন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)