চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সামনে জাতীয় নির্বাচন, আপাতত সেদিকেই চেয়ে আছি: শাকিব খান

‘এবার আমার ইলেকশন করা নিয়ে কথা ওঠেছিল। কিন্তু এখন সময় দেওয়া সম্ভব না। এর পরের বার নির্বাচনে অংশ নিতে পারি’

ঢাকাই চলচ্চিত্রের শীর্ষ নায়ক শাকিব খান। ভক্তদের কাছে তিনি ‘সুপারস্টার’। সাড়া ফেলে অনেক নতুন মুখ আসে, আবার হারিয়েও যায়; কিন্তু শাকিব শূন্যের দশক থেকেই আছেন বহাল তবিয়তে। রাজত্ব করছেন ফিল্ম বাজার। ইন্ডাস্ট্রিতে যাকে ঘিরেই প্রতি বছর লগ্নি হয় কোটি কোটি টাকা। তাকে ঘিরে ব্যবসার বীজ বুনেন প্রযোজক-হল মালিকরা। চলচ্চিত্রের মন্দার বাজারেও তিনি একাই ভরসা। বাংলাদেশ ছাড়িয়ে শাকিব খান কাজ করছেন কলকাতার লোকাল প্রোডাকশনের ছবিতেও। চলতি বছরের প্রায় পুরোটাই তিনি সিনেমায় ব্যস্ত ছিলেন। ফুরসত ছিলো না একটুও। বছরের শেষ দিকে তিনি ব্যস্ত দেশের ছবি নিয়ে। কয়েক বছর পর আবার কাজ করছেন বিজ্ঞাপনে। বৃহস্পতিবার(৬ ডিসেম্বর) থেকে শাকিব অভিনীত ওই বিজ্ঞাপনের শুটিং শুরু হয়েছে। শুটিংয়ের ফাঁকে চিত্রনায়ক শাকিব খান বর্তমান চলচ্চিত্রের সংকট, সম্ভাবপনা আর বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে কথা বললেন আরো নানা প্রসঙ্গ নিয়ে…

অনেকদিন পর বিজ্ঞাপনে কাজ করছেন। কোন ভাবনা থেকে আবারও বিজ্ঞাপনে অংশ নিলেন?
বিজ্ঞাপনে এর আগেও করেছি। মাঝখানে গ্যাপ গেছে কাজের সঠিক সুযোগ হয়নি বলে। মানুষ মনে করতে পারে, শাকিব খান কেন বিজ্ঞাপন করছে না! আসলে সুযোগ হয়ে ওঠেনি। এবার যার পরিচালনায় কাজ করছি (আদনান আল রাজীব) সে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন নির্মাতা হিসেবে ওয়ান অব দ্য বেস্ট! তাছাড়া যে টেলিকমের বিজ্ঞাপনে কাজ করছি সেটা ভালো একটা ব্র্যান্ড। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো স্টাররা তো বিজ্ঞাপন করেই। পৃথিবীর সব দেশের স্টারদের বিজ্ঞাপনে দেখা যায়। এতে করে কর্পোরেট ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সিনেমার যোগসূত্র তৈরি হয়। বাইরের দেশে এটা দেখা যায়। তাহলে আমরা কেন দূরে থাকবো? মাঝেমধ্যে এটা সব স্টারদের ভালো কাজ পেলে করা উচিত বলে আমি মনে করি। আমার এই কাজটার অ্যারেঞ্জমেন্ট ভালো। ২০ ডিসেম্বরের পরেই তো প্রচারে আসবে। তারপর সবাই বুঝতে পারবেন, কাজটি কেমন হয়েছে।

ছোটপর্দায় বারবার দেখালে বড় তারকার ইমেজে কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় আপনার?
হরহামেশাই টেলিভিশনে দেখা গেলে এতে ফিল্ম ক্যারিয়ারে কোনো প্রভাব পড়বে বলে মনে হয় না আমার। কখনও কোনো ইন্ডাস্ট্রির স্টারদের পড়েছে? প্রভাব পড়লে হলিউড, বলিউডের বড় বড় স্টারদের তো ক্যারিয়ারই থাকতো না। বিজ্ঞাপন জিনিসটাই তো স্টারদের জন্য হাহাহা..।

দেশের ছবির চেয়ে আপনি যখন কলকাতার ছবি কিংবা যৌথ প্রযোজনার ছবিতে কাজ করেন সেগুলোর আলোচনা বেশি হয়। কেন?
আমার কাছে সব ছবিই সমান। আমাদের দেশে ভালো ভালো পরিচালক আছে। সংকট হলো টেকনোলোজির ব্যবহার। টেকনিশিয়ান যারা আছে তারা তো আর ইন্টারনেটে সার্চ করে কিংবা ইউটিউব থেকে দেখে টেকনোলোজির ব্যবহার শিখতে পারবে না। এর জন্য প্র্যাকটিস দরকার। জানার আগ্রহ থাকতে হবে। শেখার কোনো ভালো প্রতিষ্ঠান নেই আমাদের। তাই টেকনিক্যাল দিক থেকে আমরা পিছিয়ে। কিন্তু কলকাতার ওরা এদিক থেকে অনেক এগিয়ে। টেকনিক্যালি রিচ করতে পারলে ভালো কাজ হবে। আর কাজ ভালো হলে আলোচনা এমনিতেই হবে।

দেশের শীর্ষ নায়ক হয়ে সরকারের কাছে এ বিষয়ে দাবি বা প্রস্তাবনা জানিয়েছেন কখনও?
অনেকবারই বলেছি। চলচ্চিত্র এফডিসি নির্ভর, সরকার নির্ভর। তাই এইদিকটাও সরকারকে দেখতে হবে। নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে আমার দাবি, বিশেষ করে ক্ষমতাবান যারা আছে তাদের কাছে বেশি দাবি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে কমপক্ষে ৬৪ জেলায় একটি করে মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ করে দেওয়ার প্রস্তাবনা থাকুক। মন্ত্রী, আমলা, সরকারী কর্মকর্তা যাদের সঙ্গে দেখা হয়, ওনারা বলেন- ভাই ছোটবেলায় মা কিংবা আত্মীয়দের সঙ্গে সিনেমা তো দেখতাম হলে গিয়ে। এর মানে হলো তখন সিনেমা দেখার মাধ্যমে পারিবারিক বন্ধন তৈরি হতো। উৎসব মুখর পরিবেশ তৈরি হতো। কিন্তু এখন আর কেউ যায় না। কারণ, সিনেমা হলে বসে ছবি দেখার পরিবেশ নেই। মান্ধাতা আমলে পড়ে থাকলে তো হবে না। যুগ পাল্টেছে। মানুষের রুচির পরবর্তন এসেছে।

তাতো বটেই…
সবকিছু আপগ্রেড হলেও আমাদের সিনেমা হলগুলো আগের অবস্থায় রয়েছে। তাই সরকারের কাছে আমার দাবি থাকলো ২০০ কিংবা ৫০০ কোটি টাকা না, অ্যাটলিস্ট প্রতি জেলায় একটি করে মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ করে দেয়া হোক। এটার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব থাক এফডিসির উপর। সেন্ট্রাল সার্ভার, ই-টিকেটিং থাকুক। সবাই দেখুক কার ছবি কেমন চলে। কোন শোতে কত দর্শক এলো। যে সরকার ক্ষমতায় আসুক, তাদের প্রথম কাজ এটাই হবে। এটাই আমার চাওয়া। এতে করে মানুষ আবার হলে আসবে। এখনকার জেনারেশন তাহলে আবার হলমুখী হবে। পারিবারিক বন্ধন তৈরি হবে। ছোটবেলায় দেখেছি, এলাকায় এলাকায় বায়োস্কোপে করে সচেতনামূলক প্রামাণ্যচিত্র তৈরী দেখানো হতো। তার মানেই তো বিনোদনের মাধ্যমে মানুষের মনে এগুলো ঢোকানো হয়। একমাত্র সিনেমাই পারে পারিবারিক বন্ধনটাকে বিনোদনের মাধ্যমে মানুষের মনের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে।

Advertisement

আপনার প্রোডাকশন (এসকে ফিল্মস) থেকে নির্মিত হতে যাচ্ছে ‘বীর’ ছবিটি। এই ছবির পরিচালক হিসেবে কাজী হায়াতকে কেন নিলেন?
হায়াত আঙ্কেলের নির্মাণে ‘বীর’ হতে যাচ্ছে ৫০ তম সিনেমা। তার অনেকদিনের ইচ্ছে আমাকে নিয়ে কাজ করবে। আমারও ইচ্ছে ছিল তার সঙ্গে একবার হলেও কাজ করি। কারণ উনি অনেক ভালো ভালো ছবি নির্মাণ করেছে এর আগে। চলচ্চিত্রে নির্মাতা হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন। আরেকটা কারণ হচ্ছে, ‘বীর’ যে ধরণের গল্পের ছবি, তেমন গল্পে বহু বছর আমাদের দেশে কাজ হয় না। আর এই ধরণের গল্পের জন্য হায়াত আঙ্কেলকে বেস্ট মনে হয়েছে। বাস্তবধর্মী ছবির নির্মাতা হিসেবে উনি অনেক উঁচুমানের।

বর্তমান ইন্ডাস্ট্রি কেমন দেখছেন? এর ভবিষ্যৎ কী?
এভাবে সিনেমা চলে না। চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি হয়ে গেছে মরভূমি। শিল্পীদের হাতে কাজ নেই। গত বছর থেকেই এই অবস্থা শুরু হয়েছে। কিছু আবোল তাবোল মানুষ তাদের স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে সবকিছু উত্তপ্ত করে ফেলছে। এতে ভয় পেয়ে অনেকেই সরে গেছে। কোটি টাকা খরচ করে ভয় পেতে কে আসবে এখানে? থানা, পুলিশ আদালতে কেন যাবে? তার চেয়ে ওই কোটি টাকা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট করে ইন্টাররেস্ট নিচ্ছে। অথবা ভালো একটা গল্প নিয়ে শখ করে ওয়েব সিরিজ বানাচ্ছে। যারা ওয়েব সিরিজ বানাচ্ছে, মেজরিটি সিনেমার পার্টি ছিল। শিল্পীর হাতে কাজ না থাকায়, টেকনিশিয়ানসও বসে আছে। তারা আগে খেতো ডালভাত, লোভ দেখানো হলো বিরিয়ানির। ওই লোভের মোহে পড়ে এখন খাবারই পাচ্ছে না তারা।

এখন যেসব ছবিগুলো হাতে নিচ্ছেন, এগুলোর কী দেখে করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন?
গল্প, স্ক্রিপ্ট, ক্যারেক্টারের ভার্সেটালিটি এবং টেকনোলোজির ব্যবহার বেশি বেশি দেখে তারপর সিনেমা হাতে নিচ্ছি। কে বানাবে, আদৌ ঠিকমতো বানাতে পারবে কিনা সেটাও খেয়াল রাখছি।

আসছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। অন্যবারের তুলনায় এবার নির্বাচনী প্রচারণায় অনেক শিল্পীকে দেখা যাচ্ছে। আপনার কথাও শোনা গিয়েছিলো?
এটা যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সবার কি এক বই, একই লেখকের বই পড়তে ভালো লাগে? এটা যেভাবে যা করছে এটা তাদের ব্যাপার। তবে আমার মতে, সংসদে সিনেমার প্রধিনিধিত্ব করার জন্য শিল্পী দরকার। আর সেই দায়িত্ব একজন ভালো মানুষকে দেওয়া উচিত। এবার আমার ইলেকশন করা নিয়ে কথা ওঠেছিল। কিন্তু এখন সময় দেওয়া সম্ভব না। এর পরের বার নির্বাচনে অংশ নিতে পারি।

নতুন বছর আসছে। কী ভাবছেন?
সামনে জাতীয় নির্বাচন, আপাতত সেদিকেই চেয়ে আছি। কী হবে দেখা যাক! তবে আমি চাইবো, যা হওয়ার একদিনেই হয়ে যাক। এটা নিয়ে আবার পরে ঝামেলা হোক চাইনা। নির্বাচন একদিনে হয়ে গেলে সবকাজে গতি ফিরে আসবে। একদিকে যেমন আতঙ্ক কাজ করছে, আবার উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। কারণ সব দল অংশ নিচ্ছে। আর সিনেমার হিসেব করলে আমি চেষ্টা করবো আগামী বছর আরও ভালো করতে। শতভাগ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, অনেক নতুন কিছু পাবেন দর্শকরা।

ছবি: শামসুল হক রিপন