চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাধুর চোখে নির্মাতা ফারুকী

গেল বছর নির্মাতা ও গুরু মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে লিখেছিলেন শিষ্য হুমায়ূন সাধু…

দেশের টেলিভিশনে গতানুগতিক ধারার কাজের বাইরে হুমায়ূন আহমেদের পর যে মানুষটির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। শুধু টিভি দর্শকের কাছে নয়, চলচ্চিত্রেও একের পর এক সেই সাক্ষর রেখে যাচ্ছেন তিনি। বলা হয় দেশের টিভি ফিকশন ও চলচ্চিত্রে একটি বিপ্লবের নাম ফারুকী।

নির্মাণের এই কারিগর ২ মে পা রাখলেন ৪৬ বছরে। তাকে নিয়ে স্মৃতিকাতর ‘ছবিয়াল’-এর নতুন পুরনোরা। তার হাত ধরে অনেকেই এই মুহূর্তে নির্মাণ জগতের বিশেষ জায়গায়। নির্মাতা  ফারুকীর ৪৫ তম জন্মদিনে তাঁকে নিয়ে চ্যানেল আই অনলাইনে স্মৃতি আওড়েছিলেন তাঁর শিষ্য অভিনেতা ও নির্মাতা হুমায়ূন সাধু। দুর্ভাগ্যজনকভাবে গুরুর ৪৬ তম জন্মদিন আসার আগে গেল ২৫ অক্টোবর অকালপ্রয়াত হন তিনি। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ফারুকীর জন্মদিনে সেই লেখাটি পুনরায় প্রকাশ করা হলো:

ফারুকী কেন মায়েস্ত্রো:
মায়েস্ত্রো মানে হচ্ছে ওস্তাদ। ফিল্মের প্রতি আগ্রহ জন্মে প্রচুর ফিল্ম দেখে। চট্টগ্রামে থাকাকালীন প্রচুর বাইরের ছবি দেখতাম। ফ্রান্সের ছবি, রাশিয়ার ছবিসহ বিভিন্ন দেশের ছবি দেখতাম। সেখানে কখনো ধরে ধরে অনেক কিংবদন্তি নির্মাতার মাস্টারপিস ছবিগুলি দেখানো হতো। তখন কোনো এক নির্মাতার নামের সাথে ‘মায়েস্ত্রো’ শব্দটা প্রথম শুনি। উনার ছবি দেখে খুব আলোড়িত হয়েছিলাম। তখন মনে হয়েছিল আমার এরকম মায়েস্ত্রো কে হতে পারে! এরপর ফারুকী ভাইয়ের কাজ এবং ফারুকী ভাইয়ের সাথে যখন আমার প্রথম পরিচয় ঘটে সেই তখন থেকে স্বপ্রণোদিত হয়েই তাকে আমি ‘মায়েস্ত্রো’ বলে ডাকি।

বিজ্ঞাপন

ফারুকীর সাথে পরিচয় যেভাবে:
তখন আমি ইন্টারমিডিয়েট পড়ি। দুই হাজার সালের কথা। দেশ-বিদেশের প্রচুর সিনেমা দেখি, সেই সময় ফারুকী ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় ঘটে চট্টগ্রামে। কাজের সুবাদে তিনি চট্টগ্রাম যান, সেখানে তার প্রচুর বন্ধু বান্ধব। তার আগে থেকেই অনলাইনে যোগাযোগ করতাম ফারুকী ভাইয়ের সাথে। তিনি যখন বিভিন্ন দৈনিকে কিছু লিখতেন, তখন নিচে ইমেইল এড্রেস দেয়া থাকতো। তখনতো হটমেইলের সময়। বা উনার নাটকগুলোতেও তখন ইমেইল এড্রেস দেয়া থাকতো। সাইবার ক্যাফেতে গিয়ে উনার সাথে চ্যাট করতাম, ইমেইল দিতাম। আমার তখন তো আর ফোন ছিল না, তাই অনলাইনে যোগাযোগ করতাম। চট্টগ্রাম আসলে দেখা করতাম, বা আমি ঢাকা গেলে ওনার সাথে দেখা করতাম।

ফারুকীর প্রতি যে কারণে এতো আকর্ষণ:
উনি প্রথম ব্যক্তি এবং উনিই শেষ ব্যক্তি, যাকে আমি ফোন দিয়ে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতাম, যার সাথে কথা বলার চেষ্টা করতাম। যার সাহচর্য পেতে চাইতাম। ফারুকী ভাই ছাড়া এই জীবনে আর কারো সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য এতো ব্যাকুলতা অনুভব করিনি। এর পরেও অনেক মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে, কিন্তু কখনোই তাদের কারো সাথে ফোন দিয়ে বা সামনাসামনি কখনো বলা হয়নি যে আপনার সাথে আমি কাজ করতে চাই। কিন্তু ফারুকী ভাইকে আমি এটা বলতাম। কারণে অকারণে তার সাথে যোগাযোগ করতাম। তখনতো আমার ফোনও ছিলো না, ১০ টাকা মিনিট কলরেটে ফোন দিয়ে উনার সাথে কথা বলতাম। প্রেমে পড়লে ফোন দিতাম, প্রেমে না পড়লে ফোন দিতাম, একটা লেখা শেষ করে ফোন দিতাম! হয়তো ফারুকী ভাই আমাদের সাথে অনেক বেশি মিশতেন, ইয়াংদের সাথে মিশতেন, চিন্তার ক্ষেত্রে ইয়াংদের ওয়ার্ম একটা ফিল দিতেন বরাবরই, তরুণদের পালস তার জানা।

‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আমার প্রথম কাজ:
আমার এটা প্ল্যানিং ছিলো যে ফারুকী ভাইয়ের সাথে থাকবো, কাজ করব। কিন্তু তখন আমার মাথায় ছিলো না যে আমি কখনো ডিরেক্টর হবো, ফিল্ম মেকার হবো। আমি শুধু বুঝতাম আমি উনার সাথে কাজ করবো! তখনো ফারুকী ভাইয়ের সাথে কাজ শুরু করিনি, মানে দেখা সাক্ষাৎ করি এই পর্যায়ের একটা পরিচয়। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় চলে আসি। এমতাবস্থায় শুটিংয়ে যাওয়ার সুযোগ দেন। এভাবে একদিন তিনি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সিনেমার অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে নিয়েছিলেন। যদিও অ্যাসিস্ট্যান্টসি কী জিনিস তখন বুঝতাম না। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ সিনেমা শুট করার অনেকদিন পর রিলিজ পায়, ছবিটি রিলিজ হওয়ার পর দেখি ওইখানে ‘এডি’ হিসেবে আমার নাম। আমি তো দেখে খুবই অবাক তখন!

অভিনেতাও ফারুকীর হাত ধরে:
আমি চট্টগ্রাম থেকে চলে আসার পর ফারুকী ভাইয়ের বারিধারায় ভাই-ব্রাদারদের সাথে একই ফ্লাটে থাকি।২০০৬-৭ সালের দিকে ফারুকী ভাই ‘ঊন মানুষ’ নাটকটি করলেন। ফারুকী ভাইয়ের কাজগুলো যদি দেখেন তাহলে দেখবেন, উনি কিন্তু উনার প্রায় সব অ্যাসিস্ট্যান্টকে দিয়ে অভিনয় করিয়েছেন। আমাদের আগে যারা সিনিয়র ছিলেন, তারা প্রত্যেকেই ফারুকী ভাইয়ের টিভি ফিকশন কিংবা সিনেমায় অভিনয় করেছেন। এটা ফারুকী ভাইয়ের নিজস্ব তরিকা। এটা ভাই-ব্রাদারদের একটা লেসন বলা যেতে পারে। সেই হিসেবে আমাকে দিয়ে প্রথম ‘ঊন মানুষ’-এ অভিনয় করান। তখনও কিন্তু আমি লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন-এর মানে খুব একটা বুঝি না। আর ‘ঊন মানুষ’ কিন্তু আমার একক নাটক না, সাথে প্রায় সব ভাই ব্রাদাররা ছিলেন। ভাই ব্রাদারদের মধ্যে এরকম একাধিক আছেন, যারা অভিনয়ের লোক না কিন্তু টানা অভিনয় করে গেছেন। মারজুক ভাইয়ের কথা যদি বলি, তিনি কিন্তু অভিনয়ের না। তিনি টানা ফারুকী ভাইয়ের কাজ করে গেছেন, নায়ক চরিত্রে। তিনি গীতিকার ছিলেন কবি ছিলেন, ছবিয়াল প্রোডাকশনের সুপারভাইজার ছিলেন। আমাদের সুপারভাইজ করতেন।

ফিল্ম ডিরেক্টর হিসেবে ফারুকীর কন্ট্রিবিউশন:
ছবিয়াল বা ভাই-ব্রাদার নিয়ে আমি যাই বলি লোকে সেটা নিজের ঘরের প্রশংসা বলে মনে করে। এরজন্য বহুদিন ছবিয়াল থেকে দূরে থেকে ছবিয়ালকে চেনার চেষ্টা করেছি। ফারুকী ভাইয়ের সিনেমা যাত্রাটা যদি কেউ দেখেন, তাহলে ফারুকী ভাইয়ের অবদান পেয়ে যাবেন। তিনি সিনেমা নির্মাণ শুরু করেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রে যখন অশ্লীলতায় ছেয়ে গেছে, তখন। সে সময়টায় ফারুকী ভাইয়ের মতো আরো অনেকের কাছে আমরা আশা করেছিলাম যে, হয়তো একের পর এক ছবি দিয়ে ভরিয়ে দিবেন। কিন্তু ফারুকী ভাই একাই সে যুদ্ধটা করে গেছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝে তিনি নিয়মিত নতুন নতুন কাজ আমাদের উপহার দিয়েছেন। সিনেমার বাজেট নাই, প্রডিউসার নাই, হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, নানা কারণ দেখিয়ে সিনেমা মুক্তি আটকে দেয়া হচ্ছে, সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক মন্দা এগুলোর মধ্য দিয়েও তিনি সিনেমা বানিয়ে গেছেন, কাজ করে গেছেন নিয়মিত। কোন সিনেমা আলোচিত হয়েছে হয়েছে, কোনোটা সমালোচিত হয়েছে। কেউ প্রশংসা করেছেন, কেউ করেননি কিন্তু এসবে কান না দিয়ে ক্রমাগত কাজ করে গেছেন তিনি।

নানা প্রতিকূলতার মাঝেও যে তিনি সিনেমা বানানো বন্ধ করেননি, তার সুফল কিন্তু এখন কিছুটা দেখা যায়। বর্তমান প্রজন্মের বিরাট একটা অংশ যারা ভালো সিনেমার সাথে বেড়ে উঠেছে, যারা সিনেমা বানাতে চায়। এই প্রজন্মটা গড়ে উঠতো না যদি ফারুকী ভাই সিনেমা বানানো জারি না রাখতেন। ফারুকী ভাইয়ের সময়ের এরকম আরও যারা মেধাবীরা ছিলেন তাদের অনেকে শুরু করেছিলেন কিন্তু কন্টিনিউ করেননি (কেউ কেউতো শুরুই করেনি), তারা যদি অনবরত প্রতিকূলতা পেরিয়ে সিনেমা নির্মাণ করে যেতে পারতেন, তাহলে অবস্থাটা আজকে আরো কী সুখকর হতো, এটা বলে বোঝানো সম্ভব না! এই হিসেবে আমি ফারুকী ভাইকে সিনেমার এক অনন্য যোদ্ধা বলে মনে করি। শত ঝড়-ঝাপ্টার মধ্যে গত কুড়ি বছর ধরে সিনেমার মাঠেই আছেন এবং অনবরত কাজ করে গেছেন। এটি বড় কন্ট্রিবিউশন আমাদের জন্য।

ফিল্ম মেকার ফারুকীর যে ছবিগুলো ভালো লাগে:
ফারুকী ভাইয়ের ছবিগুলোর মধ্যে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, ‘পিঁপড়াবিদ্যা’ ছবি দুটি ভালো লাগে। কনটেন্ট হিসেবে এ দুটি সিনেমাকে আমার মহান মনে হয়। এরপর আছে ‘থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার’ ও ‘টেলিভশন’।

নির্মাতা ফারুকীর কাছে প্রত্যাশা:
উনি টেলিভিশনে যে লেভেলের কাজ করেছেন, যে লেভেলের এক্সপেরিমেন্ট করেছেন, যে ট্রিটমেন্ট তিনি দিয়েছেন সেগুলোর অনেক ম্যাজিক এখনো বড় পর্দায় দেখানো বাকি বলে মনে হয় আমার। ওয়েটিং রুম, প্রত্যাবর্তন, কানামাছি এগুলো এক একটা যেনো সিনেমা।

একসময় ফারুকী ভাই বলতেন, তিনি অ্যাডভেঞ্চার সিনেমা বানাবেন, অ্যাকশন ফিল্ম বানাবেন। এগুলো এখনো তিনি করেননি। হয়তো তার ‘শনিবার বিকেল’-এ অ্যাডভেঞ্চার পাওয়া যাবে। আশা করি সামনে অ্যাকশন, থ্রিলারধর্মী ছবিগুলোও তিনি করবেন।