চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাংসারিক টানাপড়েনেও অসম্ভব দৃঢ়তা

চেতনায় অম্লান দীপ্তি: শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব

কিন্তু পরিবারে হঠাৎ করে ছন্দপতন ঘটে যখন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বামীর সঙ্গে জার্মানি চলে যান, সাথে শেখ রেহানাও চলে যাওয়ায় বাড়ির প্রত্যহ পরিবেশ পরিবর্তন হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর কতিপয় বিশ্বস্তদের মধ্যে মনুষ্যত্ববোধের অভাবের কারণে তিনিও মানসিকভাবে অনেকটা ভেঙ্গে পড়েন। পরম সুহৃদ হাসিনা চলে যাওয়ায় বঙ্গবন্ধু ভেঙ্গে পড়েন মানসিকভাবে। পাশাপাশি পরম সখা ও সচিব হাসিনা চলে যাওয়ায় রেণুও বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন, কেননা স্বামীর অনুপস্থিতিতে হাসিনাই তার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হয়ে উঠেছিল। পারিবারিক নানা সমস্যা, টানাপোড়েন, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সব চিন্তার আধার ছিলেন হাসিনা। ফজিলাতুন নেছা মুজিবও হালকা হওয়ার জন্য সব বিষয়েই হাসিনার সাথে পরামর্শ করতেন পরম মমতায়। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা একসাথে জার্মানি চলে যাওয়ার পর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের চিরচেনা রূপ অনেকটা বিবর্ণ হয়ে পড়ে। তাছাড়া, স্বাধীনতার পূর্বে ও পরে নেতাকর্মীদের পরিবর্তিত আচার-আচরণ ফজিলাতুন নেছাকে ব্যাপকভাবে আহত করেছিল।

শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা চলে যাওয়ার পরে ফজিলাতুন নেছা মুজিবের প্রাত্যহিক প্রত্যক্ষতায় অনেকটা নির্জীব রূপ পায়। কামাল ও জামালের বিয়ে হওয়াতে কামাল আর আগের মত গলা ধরে আবদার জানায় না, জামালও তার খেলার সঙ্গী পেয়েছিল। ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ইচ্ছে ছিল শেখ রেহানার বিয়ে দিবেন, কিন্তু সে ইচ্ছে আর পূরণ হয়নি। আর শেখ রাসেলের পূর্ণ দায়িত্ব নিবেন শেখ কামাল। পরে তিনি আর বঙ্গবন্ধু একটু অবসরে যাবেন।

বিজ্ঞাপন

তা আর হল কই, অনেকবারই ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশে যেতে হয়েছে, কিন্তু প্রত্যেক সময়েই অসুস্থ বঙ্গবন্ধুর শয্যাসঙ্গী হয়ে। বিনোদনের জন্য ফজিলাতুন নেছা মুজিব কখনো ভ্রমণের সুযোগ পাননি। তিনি চেয়েছিলেন সব দায়িত্ব শেষ করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কমপক্ষে গোপালগঞ্জ ঘুরবেন। তা আর হল না। বঙ্গবন্ধু ব্যস্ত হয়ে পড়লেন বাকশাল নিয়ে। তারপরও আজীবন স্বামীভক্ত ফজিলাতুন নেছা মুজিবের স্বামীর চিন্তা চেতনার সাথে কখনো কোন সমস্যা হয়নি। যে বাকশাল দেশের আপামর জনগোষ্ঠীর মঙ্গলের জন্য হয়েছিল, তা নিয়ে মানুষের বিদ্রুপ প্রচারণায় ফজিলাতুন নেছা মানসিকভাবে কষ্ট পেয়েছিলেন।

ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়ির সাথে অনেকের আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ঐ পরিবারের ঘরনী ফজিলাতুন নেছার ব্যক্তিত্ব, মমতাবোধ এবং পরমতসহিষ্ণুতার কারণে তিনি সকলের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ আমিনুল হক বাদশা ফজিলাতুন নেছা মুজিব সম্বন্ধে বর্ণনা করেন এভাবে- ‘বেগম মুজিব সবসময়ই নিজ হাতে রান্না করতেন। আমি দেখেছি, বেগম মুজিব হেশেলে বসে প্রচণ্ড গরমে খড়ি জ্বালিয়ে রান্না করতেন। সেসময় গ্যাসের প্রচলন ছিল না। বঙ্গবন্ধু কারাগারে আটক থাকার সময় বেগম মুজিবের রান্না করা খাবার টিফিন ক্যারিয়ারে করে নিয়ে যাওয়া হতো। বেগম মুজিব সব সময় এমনকি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি থাকার সময়ও নিজ হাতে রান্না করে স্বামীকে খাইয়েছেন। তার বাড়িতে সরকারি লোক ছিল না। বঙ্গবন্ধুর প্রিয় খাবার ছিল কই মাছ, লতি, ডাল আর সাদা ভাত। তিনি খাবার শেষে একটি আঙ্গুল দিয়ে এগ পুডিং খেতেন। এসব মুখরোচক খাবার আমি মুজিব পরিবারের সঙ্গে কতদিন খেয়েছি তার হিসাব নেই।’

প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের সততা ও নিষ্ঠার চিত্র ফুটে ওঠে তাদের নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদার মাধ্যমে। সাংসারিক টানাপড়েনের মধ্য থেকেও ফজিলাতুন নেছা তার পরিবারটিকে সকল ধরণের রাহুগ্রাস (লোভ, লালসা ও দুর্নীতি) থেকে মুক্ত রেখেছিলেন।

বিজ্ঞাপন

বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র প্রখ্যাত সাংবাদিক এবিএম মূসা নানামাফিক প্রয়োজনে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ির সাথে একটি চমৎকার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বঙ্গমাতার স্বাভাবিকতা ব্যাখা করেছেন এভাবে-‘রাজনীতির উন্মাদনায় ছুটে বেড়ানো শেখ মুজিবের পত্নীকে আমি দেখেছি, আবার কোন কোন প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পত্নী ‘ফার্স্ট লেডিকেও’ দেখেছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবের পত্নীকে আটপৌরে কাপড়ে বাটা-পান হাতে সাজাতে দেখেছি, কিন্তু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর পাশে গাড়িতে দেখিনি, বিমানে করে রাষ্ট্রীয় সফরে যেতে দেখিনি। একদিন সুদূর গ্রাম থেকে যে গ্রাম্য ছাপটি মুখে নিয়ে শহরে এসেছিলেন, সেই ছাপটি কোনদিন মুছে যায়নি বলে তিনি ‘ফার্স্ট লেডি’ হতে পারেননি। ৩২ নম্বরের দোতলায় গেলেই দেখতে পেতাম বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে জাঁতি দিয়ে সুপারি কাটছেন, মুখে পান। যে কেউ সামনে এসে সালাম করলে প্রথমেই বলতেন, নিন-পান খান। মনে আছে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে সুর করে বলতেন, ‘বাটা ভরে পান দেব গাল ভরে খেও।’এই ছিল মুজিব গিন্নির ঘরোয়া রূপ। শুধু এই জন্যই যে তাঁকে মনে রাখতে হবে তা বলছি না। এই রূপটিও সবাই দেখেননি।’ ফজিলাতুন নেছার চরিত্রায়নে গ্রামের একজন সহজ-সরল সাধারণ বধূর চিত্র ফুঠে উঠেছে।

শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবের চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়। প্রখ্যাত কলম সৈনিক, ভাষাসংগ্রামী আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী ফজলুল কাদের চৌধুরীর কাছে ফজিলাতুন নেছা মুজিবের চারিত্রিক দৃঢ়তার প্রশংসা শোনেন এবং তার লেখনির মাধ্যমে নিয়ে আসেন। গল্পটির সারসংক্ষেপ এমন- ছয় দফার আন্দোলন বন্ধ করার জন্য আইয়ুব খান ফজলুল কাদের চৌধুরীকে দায়িত্ব দেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি বলেন আমি শেখ মুজিবকে চিনি, টাকা পয়সা দিয়ে কোনভাবেই শেখ মুজিবকে বশে আনা যাবে না। মন্ত্রীত্বের অফার দিয়েও শেখ মুজিবকে স্বাধীকার আন্দোলনের পথ থেকে সরিয়ে আনা যায়নি। ফজলুল কাদের চৌধুরী মোনায়েম খাঁকে সরিয়ে শেখ মুজিবকে গভর্নর করার পাশাপাশি গান্ধারা ইন্ডাস্ট্রিজের ফোরটি নাইন পার্সেন্ট শেয়ার শেখ মুজিবের নামে বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আসেন। প্রস্তাব শুনে শেখ মুজিব মুচকি হেসে জানান, ‘দেখি হাসুর মায়ের সঙ্গে একটু আলাপ করে।’

কথা শুনে ফজলুল কাদের চৌধুরী আশান্বিত হয়ে ফিরে আসেন। কিছুদিন যাওয়ার পর শেখ মুজিবের কাছ থেকে কোন সাড়া না পেয়ে নিজেই একদিন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে যান তিনি। শেখ মুজিব তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে বসার ঘরে বসতে দিলেন। যেই না ফজলুল কাদের চৌধুরী তার আনিত প্রস্তাব নিয়ে কথা বলতে যাচ্ছেন ঠিক সেই সময়েই নাশতার ট্রে হাতে নিয়ে প্রবেশ করলেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব। বেগম মুজিব নমনীয় স্বরে বললেন, ‘ভাই আপনাকে একটা অনুরোধ জানাব। শেখ মুজিবকে আইয়ুব খান আবারো জেলে ভরতে চান আমার আপত্তি নেই। আমাদের এই বাড়িঘর দখল করতে চান, তাতেও দুঃখ পাব না। আপনাদের কাছে আমাদের দু’জনেরই অনুরোধ, আমাদের মাথা কিনতে চাইবেন না। শেখ মুজিবকে মোনায়েম খাঁ বানাতে চেষ্টা করবেন না।’

এমন গুণবতী নারী যে স্বামীর ঘরে থাকবে সে স্বামী নিঃসন্দেহে ভাগ্যবান। শেখ মুজিবকে আইয়ুব খান বহুবার বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে কিনে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন কিন্তু কখনোই সে প্রলোভনে পা দেননি জাতির জনক। ফজিলাতুন নেছার সততা আর নিষ্ঠা বঙ্গবন্ধুকে আরও ব্যক্তিত্বশীল করে তুলেছিল। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্ট মোকাবিলা করতে হয়েছে কিন্তু কখনোই লোভ বা তাড়নার কাছে বিক্রি হননি তিনি।

চলবে…

Bellow Post-Green View