চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

সাংবাদিকতায় জীবনের ৬৮ বছর

Nagod
Bkash July

এ যুগের পাঠক-পাঠিকা, এমনকি দেশজোড়া সাংবাদিকেরাও আমাকে কলাম লেখক, সাংবাদিক হিসেবে জানেন। ইন্টারনেটের কল্যাণে আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া ইংল্যান্ড, জার্মানী এবং গোটা পৃথিবীর বাঙালিরাও তা-ই জানেন। কথাটি তো মিথ্যা নয়। আমি কলাম লিখি আজ ৩০ বছর যাবৎ। তার আগে ১৯৫৩ থেকে শুরু করে ১৯৯১ পর্যন্ত আমি ছিলাম রিপোর্টিং বিভাগের সাংবাদিক। অর্থাৎ রিপোর্টার।

Reneta June

১৯৫৩ তে যে পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকতা শুরু করি তা হলো বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের পক্ষের চাইতে বিপক্ষের খবরই বেশী প্রকাশ হচ্ছিল বলে মনে হয়েছিল। তাই স্থির করলাম গণ আন্দোলন ও শোষিত মানুষের পক্ষে লেখালেখি করবো কোন সংবাদপত্রে। তখন ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। হঠাৎ ছাত্র ইউনিয়ন কার্যালয়ে সিলেটের প্রগতিশীল সাংবাদিক ‘নওবেলাল’ এক কপি বুকপোষ্টে যোগে পেলাম। শুরু করলাম নওবেলাল দিয়েই। কিন্তু রাজনৈতিক-সাপ্তাহিক পত্রিকার পাঠক তো পাবনায় তখন ছিল না। তাই ৫ কপির এজেন্সী নিয়ে একজন শিক্ষক, এক কপি পাবলিক লাইব্রেরী ও বাকী তিনটির গ্রাহক হলেন সহকর্মীরাই। ১৯৫৫ থেকে সংবাদ, তারপর অবজার্ভার, নিউনেশন, দ্য ডেইলী স্টার, কলকাতার সত্যযুগ পত্রিকায় রিপোর্ট পাঠাতাম।

এসে গেল ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন। নেতৃত্বে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর মত অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং তুমুল জনপ্রিয় তিনজন জননেতা। প্রার্থী নির্বাচনের পালা শেষ হওয়ার পর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারাভিজান চালানোর জন্য ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের সমবায়ে অনেকগুলি টিম বা স্কোয়াড। এমন একটি টিমের নেতৃত্ব নিতে হলো আমাকে। দায়িত্ব পড়লো সুজানগর-বেড়া নির্বাচনী এলাকায় যুক্তফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থীর সপক্ষে প্রচারকার্য চালানোর। সে অনুযায়ী সহকর্মীদের নিয়ে সুজানগর চলে গেলাম। বাসায় বাবা সামান্য জ্বরে ভুগছিলেন।

৪ ফেব্রুয়ারি সুজানগর হাইস্কুল ময়দানে ঐ প্রার্থীর অনুকূলে বিশাল জনসভা। আমাকে করা হয়েছিল শেষ বক্তা। মাগরিবের নমাযের পর মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘণ্টাব্যাপী বক্তৃতা দিয়ে নামতেই সভার সভাপতি হাতে ছোট্ট একটি স্লিপ ধরিয়ে দিলেন। খুলে দেখি পাবনা থেকে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা নূরুউদ্দিন আহম্মেদ চিঠি পাওয়া মাত্র পাবনা ফিরতে বলেছেন। উল্লেখ করেছেন পাবনাতে আমার জরুরী দরকার।

রাত ১০টার দিকে পাবনা ফিরে অপেক্ষমান নূরুদ্দিন ও শাজাহান মাহমুদের সাথে পাবনা শহরের মেইন রোডের ধারে দেখা হলো। উভয়ের মুখ চিন্তাগ্রস্ত। কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে কিনা জানতে চাইতেই উত্তর পেলাম, “হ্যা, আপনার বাবা নেই”। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। জিজ্ঞেস করলাম, মরদেহ কি বাসাতেই? উত্তরে বললো-“কাকার মৃত্যু হয় আজ সকালে। সারাদিন অপেক্ষা করা হয় আপনার জন্য। কিন্তু না আসাতে অন্যরা সবাই শ্মশানে নিয়ে গেছেন।” সেদিকে রওনা হতেই দেখি শ্মশান যাত্রীরা ফিরে আসছেন। সবাই যার যার বাড়ী ফিরে গেলেন। ছোট ভাইদের নিয়ে বাসায় ফিরে ক্রন্দনরত মাকে থামানো দুস্কর হয়ে পড়ে।

পরদিন ধর্মমতে যা যা করণীয় সব কিছু করে নেতাদেরকে গিয়ে বললাম, আমি কি এখন সুজানগর ফিরে যাব? তারা বললেন “না”। আমার বদলে অন্য একজনকে ওখানে পাঠানো হয়েছে। শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন হলে একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানালা শেষ করে ২২ ফেব্রুয়ারি সুজানগর যাওয়া।

শ্রাদ্ধাদি শেষ হলো। একুশের দিনভর গভীর রাত পর্যন্ত একটানা নানাবিধ অনুষ্ঠানাদি শেষে রাত ১১ টার দিকে বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়ি। ভোরে মা ডেকে বললেন, পুলিশ এসে বাসা ঘিরে ফেলেছে। দরজা খোলার পর পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, “আপনি গ্রেফতার।” সেদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নানাবিধ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিশাল জনসমাবেশের উপস্থিতিতে অত্যন্ত সাফল্যের সাথে কর্মসূচী শেষ করে রাত এগারটার দিকে বাসায় ফিরলাম। ভোরে মা ডেকে বললেন, পুলিশ বাড়ীটা ঘিরে রেখেছে-আমাকে ডাকছে। পরিশ্রান্ত শরীর। একটু দেরী করেই উঠলাম। ঘরে তল্লাসী করলো। মা চা করে দিলেন। শেষ করে মায়ের আর্শীবাদ নিয়ে চললাম পুলিশের বিশাল বাহিনীর সাথে। থানায় গিয়ে দেখি আরও ৪/৫ জন আগেই এসে থানা হাজতে আছেন। বেলা ১০ টা নাগাদ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেলো অত:পর আদালতে হাজিরা। সেখান থেকে জেল।

কোথায় সুজানগর যাব-এলাম জেলখানায়। সিরাজগঞ্জ, কুষ্টিয়া তখন মহকুমা- ছিল সাব জেল। তাই ঐ দুই স্থানে যারা গ্রেফতার হয়েছেন তাদেরকেও আনা হলো পাবনা ডিস্ট্রিষ্ট জেলে। মোট ৮০ জনের মত রাজবন্দী পাবনা জেলে।

বাইরে নির্বাচনী প্রচারণা-গগনবিদারী শ্লোগানে মুখরিত শহর। জেলখানার কাছে এসে ওই শ্লোগান আরও উচ্চস্বরে উঠে। ভেতর থেকে আমরাও শ্লোগান দেই বাইরে থেকে সে শ্লোগানের সহস্র কণ্ঠে জবাব আসে। এইভাবে ভালই কাটছিল জেলজীবন। নির্বাচন শেষ হলো। এক এক দিন এক এক এলাকার ফল গণনা শুরু হলো পাবনা জেলা স্কুলে। গণনার ফল নির্ঘাত যুক্তফ্রন্ট প্রার্থীর বিজয়। অবশেষে দু’একদিনের মধ্যে সন্ধ্যার পর জেলের এক জমাদার এসে খবর দিলেন মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিন পরাজিত। আনন্দ আর দেখে কে? সারারাত নেচে গেয়ে কাটলো। পরদিন মুক্তি পেলাম সবাই। গণসম্বর্ধনাও পেলাম তার পর দিন।

যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হলো শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে। নিয়মিত ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে যাই। কলেজের ক্লাশে নিয়মিত উপস্থিত থেকে পড়াশুনা করি। দিন কাটছিল প্রচণ্ড রাজনৈতিক উদ্দীপনায়।

হঠাৎ আকশে কালো ছায়া। মুসলিম লীগ কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ক্ষমতায় বসার ৫৮ দিনের মাথায় বাতিল করে দিয়ে কেন্দ্রীয় শাসনাধীনে নিয়েছে। কিন্তু এ খবর জানতাম না। বিকেলের দিকে এক ছাত্র ইউনিয়ন অফিসে এসে দেখি একটা চিঠি। পাকিস্তান অজার্ভারের নিয়োগপত্র পাবনা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে। খামটা বন্ধ করতেই পুলিশ এসে হাজির। বললো, আপনাকে গ্রেফতার করা হলো।

চললাম থানায়। পাশের দোকানদারদের ডেকে বললাম, সদ্য বাবা মারা গেছেন। ভাই বোন ছোট ছোট। কেউ একজন দ্রুত মাকে খবর দিয়ে আসবেন আমাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। ভয় নেই, শিগগিরই ছাড়া পাব।

থানায় সন্ধাবেলায় গেলে ফটক খুলে দিল। মেঝেতে চাটাই পেতে দিয়ে বসতে দিলো। রাত ১০টার মধ্যে আরও অনেকে আসায় মশার কামড় খেয়ে সবাই বিনিদ্র রাত কাটালাম। অবশ্য পুলিশ কিছু খাবার হোটেল থেকে এনে দিল ভাত, এক হাঁড়ি জল ও একটা গেলাস দিয়ে গেল। ওই খেয়েই বসে বসে রাত কাটাতে হলো। সাংবাদিক অসাংবাদিকে কোন বৈষম্য নেই। প্রস্রাব-পায়খানার ব্যবস্থা ছিল না। পাকিস্তান পরবর্তী ঐ যুগে কলকাতা থেকে ভারতের আনন্দবাজার, ষ্ট্রেটস্যম্যান, অমৃতবাজার, যুগান্তর ও সত্যযুগ প্রভৃতি নিয়মিত পরদিন সকালে পাবনা পৌঁছাতো। সত্য যুগ ছিল অত্যন্ত প্রগতিশীল আমাদের ভাষা আন্দোলনের পক্ষে, অনেক খবর ও সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে এ ব্যাপারে। আমি সত্যযুগের নিয়োগপত্র পেয়ে খবর পাঠাতাম ছাপাও হতো।

এসে গেল আইউব খানের অভিনব আবিষ্কার মৌলিক বা বুনিয়াদী গণতন্ত্র। ইউপি চেয়ারম্যান-মেম্বররাই শুধু ভোটার পার্লামেন্ট নির্বাচনে। ভোটের দিন সন্ধ্যা থেকে পাবনা শহরে হঠাৎ লেখে গেল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-রাত তিনটা পর্যন্ত চললো। ৩১ জনের মৃত্যু, অসংখ্য আহত, হাজার পাঁচেক বাড়ীঘর, হাজার দেড়েক দোকানপাট পুড়ে ছাই হলো। কোনভাবে অন্যত্র আশ্রয় নিয়ে নিজেরা সপরিবারে বেঁচে গেলাম।

পরদিন সারা শহর ঘুরে খবর সংগ্রহ করে প্রেস টেলিগ্রাম পাঠালাম সংবাদ ও অবজার্ভারে। ছাপা হলো না। কারণ? টেলিগ্রামটিকেই যেতে দেয়নি পাবনার ডি.এস.বি। আনোয়ার পাঠিয়েছিল ইত্তেফাকে- ফলাফল একই। এর পরদিন ভাষা একটু নরম করে দু’জনই আবার পাঠালাম প্রেস টেলিগ্রাম নিজ নিজ পত্রিকায়। এবারও একই কারণে ছাপা হলো না।

দুদিনের মধ্যেই পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গর্ভনর আজম খান পশ্চিম পাকিস্তানে বদলির আদেশ পেয়ে প্রদেশের সকল জেলায় হেলিকপ্টার যোগে বিদায়ী সাক্ষাতে বেরিয়ে পাবনা এসে দাঙ্গার ভয়াবহ খবর শুনে বেরিয়ে পড়লেন সারা শহরটি সচক্ষে দেখতে। তখনও বাস চলাচল, অন্যন্য যান বাহন কাঁচা বাজার সহ সব কিছু বন্ধ। গ্রাম থেকে দুধ, শাক-শবজি, তরীতরকারী নিয়ে কেউ শহরে আসে না। পাবনা তখন স্তব্ধ, নিঃশব্দ, নিঝুম একটি শহর।

আজম খান সামরিক বাহিনীর একজন জেনারেল কিন্তু তিনিও পাবনা শহরের চেহারা দেখে চোখের জল ধরে রাখতে পারেন নি। তিনি হুকুম দিলেন ক্ষতিগ্রস্ত সকলকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে আর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সকল দুস্কৃতিকারীকে গ্রেফতার করতে। এর পরপরই গভর্নরের সফর ও তার বক্তব্য সহকারে আবার প্রেস টেলিগ্রাম পাঠালাম সবাই মিলে। না, এবারও কোন পত্রিকায় খবরটি ছাপা হলো না। বুঝলাম, গভর্নরের চাইতেও ডি.এস.বি কত বেশী শক্তিশালী।

হাঠাৎ এক পুলিশ কর্মকর্তা দিন কয়েক পর ডা. অমলেন্দু দাক্ষীর ডিসপেন্সারীতে এসে আমাকে না পেয়ে বলে গেলেন, আমি এলেই যেন থানায় গিয়ে এস.পির সাথে দেখা করি। উপেক্ষা করে বাইরে গেলাম। এরপর ঐপুলিশ কর্মকর্তা বার তিনেক ওখানে এসে না পেয়ে একই কথা বলে গেলেন-বললেন এস.পি সাহেব ওনার সাথে কথা বলবেন। ডা. দাক্ষীর অনুরোধে সন্ধ্যার দিকে আনোয়ার সহ থানায় গিয়ে দেখি বহু পুলিশ কর্মকর্তা থানার সবুজ লইনের পাশে চেয়ার পেতে বসে আছেন। সেখানে যেতেই সমানে দুটি চেয়ার দিয়ে বসতে বললেন।

ডি. আইও ওয়ান বললেন, রণেশ বাবু, আপনি তো একজন প্রখ্যাত সাংবাদিক ও একজন বিশিষ্ট হিন্দু নেতা। কয়দিন আগে হঠাৎ ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার সবই জানেন। ঐ খবর কলকাতার আনন্দবাজারে অনেক বাড়িয়ে প্রকাশ করেছে। আপনারা এর বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ যুক্ত বিবৃতি আকারে দিন। বললাম, আনন্দবাজারটা দেখি।

এদিকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কয়েক ট্রাক বোঝাই ইপি আর অফিসার ও জওয়ার এসে শহরে টহল শুরু করলো। পথে ঘাটে যাকে পেল তাকেই গ্রেফতার করা হলো। ইপিআর দিন কয়েক পরে চলে গেলে আটক সকল দুস্কৃতিকারী যথারীতি খালাসও পেয়ে গেল। বাড়ীঘর দোকানপাট নির্মাণ ও ক্ষতিপূরণ দানের কথাও হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। এত খবর। গভর্নরের বক্তব্য সহ ঘটনাবলী আবার প্রেস টেলিগ্রাম করে পাঠালাম। পরদিন তাও যখন ছাপা হলো না। লেফটেন্যান্ট জেনারেল গভর্নরের সফর ও বক্তৃতার খবর হওয়া সত্ত্বেও। তখন কৌশলে পাঠালাম।

তখন সাদা কাগজে দাঙ্গা শব্দের বদলে “সাম্প্রতিক ঘটনাবলী” উল্লেখ করে শহর অগ্নিদগ্ধ হওয়া, অনেকের এক রাতে মৃত্যু ঘটা, ঘটনার রাত্রি থেকে যানবাহনে চলাচল, হাটবাজার, দুধ মাছে তরীতরকারি সরবরাহ বন্ধ থাকা সহ জনজীবনে নেমে আসা দুর্যোগের কাহিনী বড় করে লিখে সাদা খামে পুরে বুক পোষ্টে (টিকিট না লগিয়ে) ‘সংবাদ’ এর বার্তা সম্পাদকের নাম লিখে ‘বার্তা সম্পাদক’ পদবীটা উল্লেখ না করে অফিসের ঠিকানা লিখে একটি রিকসাওয়ালার হাতে একটি টাকা দিয়ে বললাম, টেবুনিয়া পোষ্ট অফিসে গিয়ে ডাকবাক্সে ফেলে দিতে। এইবার যথারীতি খবরটা সংবাদের বার্তা সম্পাদক তোয়াব খানের হাতে পৌঁছালো এবং বড় বড় দুই কলাম শিরোনামে তা প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হলো। গুজব তো সর্বত্র আগেই রটিয়ে পড়েছিলো কিন্তু অবস্থার ভয়াবহতা ‘সংবাদ’ পড়েই মানুষ জানতে পারলো। খামে পোস্টকার্ডে পেলাম দেশের নানা অঞ্চল ও ‘সংবাদ’ এর সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকের কাছ থেকে অজশ্র অভিনন্দন।

ঘটনার এখানেই ইতি হলো না। একদিন বেলা ১১টার দিকে ডা. দাক্ষীর ডিসপেন্সারীতে সবাই বসে আড্ডা ও চা খেতে খেতে আমি কেন যেন বাইরে গেলাম। একজন ডিএসপি অত:পর ওখানে এসে আমাকে না পেয়ে ডা. দাক্ষীকে বললেন, রণেশ বাবু এলে তাকে থানায় পাঠিয়ে দেবেন। এমপি সাহেব ওনার সাথে আলাপ করবেন। আমি ফিরে এসে দাক্ষীর কাছে শুনলাম। বললাম, যাক না। এরকম ২/৩ বার ঐদিন এডিএসপি (এখন এডিশনাল সুপারিন্টেন্ডেন্ট অব পুলিশ) এসে একই কথা বললেন কিন্তু ঘটনাচক্রে আমার অনুপস্থিতিতে। সন্ধ্যার দিকে দাক্ষীর ওখানে আড্ডা দিতে গেলে চা খেতে খেতে জানলাম ডিএসপি একটু আগে আবার এসে অবশ্যই যেন থানায় গিয়ে এসপির সাথে দেখা করি। দাক্ষী তা আমাকে জানিয়ে বললেন, রণেশ, যাও থানায়। এস.পি. এতবার ডাকছে না যাওয়াটা ঠিক হবে না। সবাই একই কথা বললো। রওনা হলাম দাক্ষী আনোয়ারকে সঙ্গে পাঠালেন এই আশংকায় পুলিশ যদি আমাকে আটক করে ফেলে।

দু’জন থানার গেটে দিয়ে (পুরাতন) ঢুকে দেখি ডানদিকের লনে অনেকগুলি চেয়ার পাতা। সাদা পোশাকে ও ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন পুলিম অফিসার বসা। বিনয়সহকারে একজন আমাদেরকে বসতে বললেন আর জানালেন এসপি সাহেব একটু আগে উঠে গেছেন। ডি.আই.ও ওয়ান সাহেব আপনার সাথে কথা বলবেন।

তিনি কুশল বিনিময় করে ভদ্রভাষায় বললেন, পাবনায় তো দিন কয়েক আগে কিছু “গণ্ডগোল” হয়েছে জানেন তো? আমি বললাম- তাই নাকি? জানি না তো? আপনি কোথায় পেলেন? এইবার ডি আই. ও ওয়ান মুখ খুললেন। বললেন, আপনি তো পাবনার একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও হিন্দু নেতা। আমাদের অনুরোধ, পত্রিকায় অপরাপর হিন্দু নেতাদের সাথে আপনি একটা যুক্ত বিবৃতিতে স্বাক্ষর করুন। বললাম কী উপলক্ষে? উনি বললেন, পাবনার গণ্ডগোলের খবর ফলাও করে কলকাতার আনন্দবাজারে অত্যন্ত বাড়িয়ে প্রকাশ করেছে। প্রকাশনার থেকেও পত্রিকায় (হিন্দী) অবিকল তা ছেপে দিয়েছে তাতে হিন্দু নারী ধর্ষণ, জোর করে গো-মাংস খাওয়ানো এবং অন্য অনেক কথা লিখেছে যা সত্য নয়। তারই প্রতিবাদে যুক্ত বিবৃতি দেবেন।

বললাম, কী কী প্রকৃত প্রস্তাব সেদিন ঘটেছে, কেন ঘটেছে, কারা ঘটিয়েছে পুলিশের ভূমিকা কী ছিল সব আপনাকে পাঠাই আপনি দেশের সকল পত্রিকায় অবিকৃতভাবে তা প্রকাশের ব্যবস্থা করবেন অথবা আমি প্রেস টেলিগ্রামে সত্য ঘটনাগুলি লিখে পাঠাব তা ছাপা হলে তখন যদি দেখি আনন্দবাজার বাড়তি কিছু লিখে থাকে তবে নিশ্চয়ই তার জোরালো প্রতিবাদ জানাবো। আপনারা আনন্দবাজারটা দেখান। ওঁরা বললেন আনন্দবাজার নেই তবে ‘জং’ এর কার্টিং আছে। বললাম ঊর্দু পড়িনি বুঝিনা তাই ওতে হবে না আনন্দবাজার আনুন তার আগে পাবনার প্রকৃত খবর পূরোপূরি পাঠানোর ব্যবস্থা করুন।

ভয় দেখানোর সুরে ডি.আই.ও ওয়ান বললেন, “বুঝলাম-তা হলে আপনি সই দেবেন না”। বললাম যা খুশী বুঝুন তবে আমার কথা, আমি খোলামেলা বলেছি। আর একটা কথা, আমি সাংবাদিক, ‘হিন্দু’ নেতা না। আমি বিবৃতি দিলে সাংবাদিক হিসেবে দেব আপনারা হিন্দু নেতাদের আলাদা বিবৃতি সংগ্রহ করে ইচ্ছে করলে পাঠাবেন।

বাষট্টি সালের দাঙ্গার ও তার নিউজ প্রকাশ সংক্রান্ত কাহিনীর এখানেই সমাপ্তি। স্মরণীয়, ১৯৬১ সালের মে মাসে পাবনাতে পূর্ব পাকিস্তান মফ:স্বল সাংবাদিক সম্মেলন, ১ মে পাবনা প্রেসক্লাব গঠন। আর বাষট্টিতে দাঙ্গা ও তার কষ্টসাধ্য রিপোর্টিং দিয়ে নতুন যাত্রা শুরু ।

সামরিক শাসনামলে সামরিক কর্তারাও ছাড়েননি। একদিন বাসার চেম্বারে (পাবনা থানার সন্নিকটে) বসে থাকাকালে এক সেপাই এসে খবর জানালো ডাক বাংলোতে মেজর সাহেব ডেকে পাঠিয়েছেন। প্রশ্ন করলাম কেন? উত্তর জানি না। এ বলতেই দেখি মীর্জা শঅমসুল , রবি সহ আরও কয়েকজন সাংবাদিক চেম্বারর এসে হাজির হলো। সবাই মিলে রিকশা নিয়ে গেলাম। মেজর বসে আছেন তার চেয়ারে আমাদের বললেন, দয়া করে বসুন। আমরা বসার পর পরিচয়ে পালা শেষ হলে মেজর বললেন, এ খবর আনোয়ারা পাঠিয়েছে?

কোন খবর জিজ্ঞেস করতেই তিনি দু’জন আওয়ামী লীগ নেতারা গ্রেফতার খবর প্রকাশ হয়েছে এমন কয়েকটি পত্রিকা দেখালেন। বললাম, আমরা পাঠিয়েছি।। মেজর বললেন জানেন না দেশে মার্শাল ল? বললাম জানি- খবর পাঠানো প্রকাশ নিষিদ্ধ না। এ ব্যাপারে কোন অর্ডার ও নেই। তাই খবর পাঠাতে থাকবো এভাবেই।

একই দৃষ্টিভঙ্গীতে রিপোর্টি নয় কলাম লিখে অব্যাহত রেখেছি।

সাংবাদিকতা বাংলাদেশে আরও উন্নত হলে, আরও সমৃদ্ধ হলে, আরও বিকশিত হলে অত্যন্ত আনন্দের ব্যাপার হবে। তবে সে দায়িত্ব নিতে হবে আজকের প্রজন্মের তরুণ সাংবাদিককেই ।

BSH
Bellow Post-Green View