চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাংবাদিকতার পড়ালেখায় অর্থনীতির বিস্তর আলোচনা নেই

প্রতিদিনই পত্রিকার পাতায়, টেলিভিশনের স্ক্রিনে ভেসে আসছে নতুন নতুন ব্যবসার ভেঞ্চার চালুর খবর। এই করোনার মধ্যেও যেসব উদ্যোক্তা নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলছেন তাদেরকে সাহসী বলতেই হবে। অবশ্য অর্থবিদ্যার ভাষায় খুব সহজেই বলে ফেলা যায়, পণ্য বা সেবার চাহিদা আছে বলেই হয়তো সরবরাহের তাগিদ অনুভব করছেন উদ্যোক্তারা।

কিন্তু অর্থনীতির সেই পরিমাণ ব্যাপ্তি না হলে কি আর চাহিদা তৈরি হতো? গত এক দশকে এ দেশের অর্থনীতিতে যে দূর্বার এক গতি দেখা গেছে, মহামারি করোনা সেটাকে সাময়িক সময়ে জন্য হয়তো কিছুটা কমিয়েছে, কিন্তু দমাতে পারবে না বলেই আমার বিশ্বাস। এ দেশের মানুষের মনোবল অর্থনীতিতে আবার ঝড়ো গতি এনে দেবে, প্রবৃদ্ধি আবার ত্বরান্বিত হবেই। অতীতে বহুবার এ তথ্য প্রমানিত হয়েছে। বিভিন্ন দুর্যোগের পর ভেঙ্গে পড়েছে মানুষ দুর্বল হয়েছে অর্থনীতি, কিন্তু আবারো ঘুরে দাড়িয়েছে দেশের কৃষক, ছোট বড় ব্যবসায়ী এবং উদ্যোক্তারা। আর এই মনোবলই আমাদের মূল শক্তি।

বিজ্ঞাপন

দেশের অর্থনীতি তথা উন্নয়ন কিভাবে আসছে, কিভাবে আসবে আরো গতি, কী আছে সরকারের পরিকল্পনার ঝুলিতে, দেশের কোন কানাচে বসে কী করছে বেসরকারি খাত, সেই খবরের পেছনে ছুটছেন একদল অর্থনৈতিক সংবাদকর্মী, তাদের মাধ্যমেই জানা যাচ্ছে সেসব গল্প। যা হয়তো অনুপ্রেরণার বটিকা হিসেবেও কাজ করছে দেশের অর্থনীতির সম্প্রসারণে। যেমনটা আগেও হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে অর্থ-বাণিজ্য সাংবাদিকতাকে আমাদের অগ্রজরা এগিয়ে নিয়ে গেছেন অনেকটাদূর। বিভিন্ন পত্রিকায় আলাদা অর্থ- বাণিজ্য পাতাও রয়েছে। এমনকি টিভি চ্যানেলগুলোতে অর্থ-বাণিজ্য রিপোর্টকে দেয়া হচ্ছে ভালো গুরুত্ব। এমনকি বর্তমানে লিড, সেকেন্ড লিড বা হেডলাইন হচ্ছে অর্থ-বাণিজ্য সংবাদ। তবে আমার মনে হয় এখানেই শেষ নয়। প্রতিদিনই যুগ এগিয়ে যাচ্ছে, সবক্ষেত্রে আসছে আধুনিকতা, আর এর বাইরে নেই অর্থ-বাণিজ্য সাংবাদিকতা। আর এ ক্ষেত্র পড়ালেখার বিকল্প নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাংবাদিকতা বিভাগগুলোর কোর্স কারিকুলামে কতটুকু রয়েছে অর্থনৈতিক সাংবাদিকতা পড়ানোর বিষয়টি?

অর্থনীতি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে আমি দেখেছি, সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, যেমন- ব্যাংকার, শুল্ক কর্মকর্তা, বীমা কর্মকর্তা, বেসরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা প্রায়ই সংবাদকর্মীদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। যা অপমানজনক হলেও আমাদের দুর্বলতা যে একেবারে নেই তাও নয়। সংবাদকর্মী হিসেবে আমি নিজেও দেখেছি, অনেকসময় কেউ কেউ সঠিকভাবে অর্থনৈতিক সংবাদ পরিবেশন না করায় এমন বিব্রতকর মন্তব্যের কথা শুনতে হয়েছে আমাদের। আবার অনেকে না বুঝে ভুল রিপোর্ট করায় দেশের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়েছে। আবার বাণিজ্য সাংবাদিকতায় ছদ্মবেশি বিজ্ঞাপন এক মারাত্মক ভ্রম। সংবাদকর্মীর দুর্বলতার কারণে অনেক সময় বিজ্ঞাপন আর সংবাদ একাকার হয়ে যাচ্ছে। এতে ফাঁকিতে পড়েন পাঠক। সংবাদের মান নিয়েও ওঠে প্রশ্ন। আমার মনে হয় এ সমস্যা কাটাতে পড়ালেখাটা বাড়াতে হবে আমাদের সাংবাদিক ভাইবোনদের।

বিজ্ঞাপন

বাজেট, বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, মুদ্রানীতি, রাজস্ব আদায়, এমন অনেক টপিক আছে যেসব টপিকের ওপর নতুন সংবাদকর্মীদের অনেকেরই পর্যাপ্ত জ্ঞান থাকে না, সেক্ষেত্রে অনেক সময় সংবাদের মধ্যে এমন কিছু ভুল তথ্য চলে আসে যা পরিহার করতে হবে। অনেকে বলে থাকেন, কাজ করতে করতে শিখে যাবে, কিন্তু আমি মনে করি প্রতিযোগিতার এ যুগে হবে সেই ভরসায় আর থাকার সুযোগ নেই।

বর্তমানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এত প্রসারিত হয়েছে যে, অর্থনীতির খবর প্রতিদিনই কোনো না কোনো সংবাদ মাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হচ্ছে। প্রতিটি সংবাদ মাধ্যমের বড় একটি অংশ জুড়ে থাকছে অর্থনীতির খবর। আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে অর্থনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। আর তাই ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে কাজ করা একক পত্রিকা বা অনলাইন পোর্টাল গড়ে উঠতে দেখা যাচ্ছে, ঠিক যেসময় অনেক পুরোনো জাতীয় পত্রিকা বা অনলাইন মিডিয়া হোঁচট খাচ্ছে। এছাড়া চ্যানেলগুলোর সংবাদে ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে আলাদা অংশ থাকছে। নিউজ চ্যানেলগুলোতে শুধু অর্থ বাণিজ্য নিয়ে আলাদা সংবাদই প্রচার হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন অনুষ্ঠান টকশো প্রচারিত হচ্ছে অর্থ-বাণিজ্য নিয়ে।

কিন্তু দু:খের বিষয় হচ্ছে, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে সাংবাদিকতা বিভাগের পড়ালেখায় অর্থনৈতিক প্রতিবেদন তৈরির উপর সেভাবে পাঠদান কার্যক্রম ততটা বাড়ানো হয়নি।

আশির দশকে আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতায় লেখাপড়া করেছি তখন তো অর্থনীতি নিয়ে আলাদা করে কিছু শেখানোই হতো না। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্য সাংবাদিকতার ওপর একটি কোর্স নেওয়ার রীতি দেখা যাচ্ছে। তবে তাও যথেষ্ট নয়। খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪র্থ বর্ষ বা অষ্টম সেমিস্টারে গিয়ে বাণিজ্য সাংবাদিকতা নামে একটি বিষয় রয়েছে। সেটিও রয়েছে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে।

আমার মনে হয়, এখন সময় এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাংবাদিকতার পড়ালেখায় অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্য সাংবাদিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো। প্রয়োজনে অর্থনীতির বিভিন্ন শাখায় অভিজ্ঞ এবং অর্থনীতি সাংবাদিকতায় যারা পথিকৃত হিসেবে কাজ করছেন তাদের দিয়ে খন্ডকালীন ক্লাস নেওয়া যেতে পারে। এমনকি প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ পিআইবিও এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)