চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সাঁইজি তোমার আখড়া থেকে কী কী নিয়ে ফিরি

লালন সাঁইয়ের এক বড় প্রভাব রয়েছে কুষ্টিয়া অঞ্চলের মানুষের দৈনন্দিন জীবনাচারে। বহু মানুষের কাছে লালন এক আশ্রয়। এটি পুরুষদের জন্য অনেক বেশি সত্য। নারীরাও অল্প স্বল্প লালনের মাঝে তাদের জীবনের সমাধান সূত্র খুঁজে পেয়েছেন। শুধু সংসার বিবাগি হওয়ার ব্যাপার নয়, জীবনের পথকে সহজ করার ক্ষেত্রেও লালন সাঁইয়ের ভাব, বাণী, দর্শন, অনুমান সবই কাজে লাগাচ্ছেন অনেক মানুষ। যারা বহুদর্শী গবেষণা করেন তারা মূলত গবেষক পরিচয়ে লালনরাজ্যের গভীরে ঢুকে আবার গবেষক পরিচয়ে বেরিয়ে আসেন। কিন্তু যারা লালনে মিশে যান তারা আর ফেরেন না বা ফিরতে পারেন না। এমন অনেকেই আছেন যিনি একবার কোনো এক অনুষ্ঠানে লালন মাজারে এসে তারপর তার জীবনাচার পাল্টে ফেলেছেন। বিশ্বাস করে নিয়েছেন, জীবনের সঠিক পথের দিশা তিনি পেয়ে গেছেন। কেউ কেউ জীবন সংকটের অনেক সহজ সমাধান পেয়ে গেছেন লালনের মাজারে এসে। কেউ পেয়ে গেছেন কাঙ্ক্ষিত মনের মানুষ।

লালনের আখড়াবাড়িতে কী আছে? খুব বেশি কারুকার্যময় না হলেও বেশ দৃষ্টিনন্দন একটি সমাধিক্ষেত্রে শুয়ে আছেন লালন সাঁই। তার আশেপাশে নিকটতম অনুসারীদের সমাধি। এই সমাধিক্ষেত্রকে ঘিরেই একপাশে জাদুঘর, পাশে বড় আকারের একটি ভবন যার নীচটা ফাঁকা। উৎসব পার্বনে সেখানে সন্ত সাধুরা এসে বসেন। অন্যান্য দিনে সেখানে সন্ধ্যাকালে গান বাজনা হয়। এসব স্থাপনার বাইরে চত্বরটি সবুজ। বেশ সুপরিচ্ছন্ন ঘাসের গালিচা। পরিপাটি পরিবেশ, পর্যটকের চোখের আরাম। আখড়াবাড়ির বাইরে বিপনী বিতান। বাঁশ কাঠের সামগ্রী, খেলনা একতারা দোতারা থেকে শুরু করে বার্মিজ পুতুল সামগ্রী, ঝিনুকের মালা সবই পাওয়া যায়। গোটা দশেক চায়ের দোকানে দুধ চা, লাল চা চলতে থাকে সারাদিন। লালন কেন্দ্রের প্রতিদিনের দৃশ্য দেখতেই স্থানীয় বেকার অর্ধবেকার লোকজন বসে চা সিগারেট পান করেন। এর মধ্যেও জটাধারী, দীর্ঘদাড়ির মানুষ থাকেন। হঠাৎ আগন্তুক এসে যেকোনো জটাধারীর সঙ্গলাভে ব্রতী হয়ে অনেক রকমের তত্ত্বকথাও শুনতে পান।

বিজ্ঞাপন

হাবিব রহমান নামের এক শিক্ষিত তরুণের কথা বলি। প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া শেষ করে চাকরিবাকরি না খুঁজে, বিয়ে না করে যথেষ্ট তারুণ্যদিপ্তী নিয়ে লালনের মাজারে অতিবাহিত করলো জীবনের টানা বিশটি বছর। বছর তিনেক আগে তার আকস্মিক মৃত্যু হয়েছে। পরিবার থেকে ঘোর না হলেও অনেকটা আপত্তি ছিল কর্মহীন ও অর্থহীন এই জীবনাচারের ব্যাপারে। কোনো বাঁধাই মানেনি সে। প্রতিদিন নিয়ম করে অফিসে আসার মতো ভদ্রলোকী পোশাকে নিজের দামি মোটর সাইকেলে লালন মাজারে এসেছে। সকালে নাস্তা সেরে এসে শুধু পানি চা আর সিগারেটে সারাটা দিন অতিবাহিত করে রাতে বাসায় ফিরেছে। সে দুপুরে লালন সমাধির সবুজ চত্বরে সটান শুয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিত। সন্ধ্যায় লালন সমাধিতে বিশেষ প্রার্থনা করতো। এই ছিল তার জীবন। তার কাছেও অনেক মানুষ আসতেন।

অবসরপ্রাপ্ত একজন সরকারি কর্মকর্তা কুষ্টিয়া শহরে এসে হোটেল ভাড়া করে থাকতেন, আর হাবিব রহমানের পেছন পেছন ঘুরতেন, এমনটি আমিই লক্ষ্য করেছি কয়েক বছর। স্থানীয় অনেক তরুণও হাবিব রহমানরে সাহচর্য নিতে আসতো। দূর দূরান্ত থেকেও আসতো। যা হোক, এ বিষয় নিয়ে বহু কথাই বলার রয়েছে। তবে আজ এখানে নয়। অন্য কোনোখানে বলা যাবে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, হাবিব রহমানের বড় ভাই ছিল তার অভিভাবক। তিনি ছোট ভাইয়ের ওই জীবনাচারকে কখনো পছন্দ করেননি। কিন্তু বাবুর মৃত্যুর পর তারও প্রাত্যহিক নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের জায়গা হয়ে ওঠে ছেঁউড়িয়ার আঁখড়াবাড়ি। তিনি নির্দিষ্ট করে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে আসেন না বরং কখনো স্রেফ একা আবার কখনো কোনো বন্ধুকে সঙ্গে করে এনে আখড়াবাড়ির কোনো এক জায়গায় বসে টানা কয়েকঘণ্টা সময় কাটিয়ে যান। তিনি ছোটো ভাইয়ের একসময়ের বিচরণক্ষেত্রে আসেন নাকি অন্য কোনো চিন্তা থেকে আসেন এর কোনো সঠিক ব্যাখ্যা গোছাতে পারেন না। তবে এখানে এসে তিনি বেশ প্রশান্তি পান।

বছরে দুবার আখড়াবাড়িতে অনুষ্ঠান হয়। অক্টোবরের মাঝামাঝি বা কার্তিকের গোড়ার এই আয়োজনটিই বড়। এটিই মূলত লালন স্মরণোৎসব। উৎসবের কিছু নেই তারপরও অগণিত ভক্তকুল নানাভাবে উদযাপন করেন এই পর্ব। কালের বিবর্তনে এই আয়োজনের একটি অর্থনৈতিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সরকারি বরাদ্দ, প্রশাসনের উদ্যোগ কিংবা লালন একাডেমির তহবিলের অর্থ ব্যয়ের বিষয় নয়, কয়েক দিনব্যাপী সারাদেশের এমনকি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গা থেকে ভক্ত সন্তের আগমন, একাধিক দিবস-রাত্রি যাপন, স্থানীয় দোকানপাটে কেনাকাটা, পরিবহনের টিকিট বাবদ ব্যয়, রিক্সা ও অটো ভ্রমণের ব্যয়, কুষ্টিয়া শহর তথা গোটা জেলাব্যাপী আবাসিক হোটেল ও রেস্ট হাউসের বাণিজ্যিক হিসাব, রেস্টুরেন্টের আয়-ব্যয় হিসাব করলে যে অর্থ লেনদেনের হিসাব দাঁড়াবে অংকটি যে বিশাল হবে তাতে সন্দেহ নেই। পৃথিবীতে খুব কম সংখ্যক তীর্থকেন্দ্র অথবা সমাধি বা আখড়াবাড়ি আছে যেখানে এই পরিমাণ অর্থের লেনদেন হয়। প্রশ্ন হলো সাধারণ মানুষ এখান থেকে কয়েকদিনের স্মরণ বা উৎসব আয়োজন থেকে কী নিয়ে ফেরেন?

বিজ্ঞাপন

নিবিড়ভাবে দেখার চেষ্টা করেছি। শুধু যে সন্ত সাধু বা একেবারে সনাক্ত নেয়া যায় এমন মানুষ আখড়াবাড়ির অনুষ্ঠানে আসেন তাই নয়। আসেন সর্বস্তরের মানুষ। সর্বপেশার মানুষ। সকল বয়সের ও ধর্মমতের মানুষ। সাধারণভাবে মেলা বা ভীড়ভাট্টায় উপস্থিতির আগ্রহ বাঙালির স্বভাবগত। আবার একথাও বলতে হবে, শুধু ভীড় ভারী করতে এখানে আসেন এমন মানুষও খুব বেশি নয়। দেখা গেছে দূর জেলা থেকে একজন প্রান্তিক কৃষক ফসল বিক্রির টাকা জমিয়ে বছরের দুই অনুষ্ঠানের একটি ধরার চেষ্টা করেন। তিনি টানা কয়েকদিন এখানে থেকে যান। এমন একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এখানে এসে কী লাভ হয়? বলেছিলেন, “ভাল লাগে, মনে শান্তি আসে।” কীভাবে? “গান শুনে, সাধুদের কথাবার্তা শুনে”। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একাডেমির মঞ্চে যেসব প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রচলিত আনুষ্ঠানিকতা হয় সেটির প্রয়োজন আছে। এটি একটি প্রচলিত পরিকাঠামো। লালন সাঁইয়ের স্মরণ উদযাপনের এই দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা হলো আয়োজনের কেন্দ্র। এর সঙ্গে আজকালকার স্পন্সর সংস্কৃতির সংযুক্তিও যৌক্তিকভাবেই প্রয়োজনীয়। যদিও শত সহস্র সাধারণ মানুষ দূর দূরান্ত থেকে এখানে এই দাপ্তরিক আয়োজন উপভোগ করতে আসেন না। তারা আসেন নিজস্ব ইন্দ্রিয় দিয়ে অন্যকিছু অন্বেষণ করতে। বেশিরভাগ মানুষই এর ভেদ জানেন না। খুঁজতেও চেষ্টা করেন না। অজানা এক টানে এখানে ছুটে আসছেন। কখনো অন্তর পূর্ণ করে, কখনো মনে আফসোস নিয়ে, কখনো মিশ্র অনুভূতি নিয়ে ফেরেন। এটিই তার সওদা। বলা যেতে পারে ‘ভবের হাটের সওদা’।

লালন সাঁইজির বাণী ধর্ম, সংস্কৃতি, জীবনবোধ, দিব্যজ্ঞান, মানবধর্মের সামগ্রিক এলাকায় শক্তিশালী প্রভাব রাখে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থের বাণীর সঙ্গে তার বাণীর সাজুয্য রয়েছে। আবার অনেক জায়গায় রয়েছে ঘোর আপত্তি ও বিরোধীতা। এসব চিন্তা ও তত্ত্বের সাবলীল ব্যাখ্যা মানুষ জানতে চায়। কখনো নতুন শোনা একটি বাক্যই খুলে দিতে পারে সারাজীবনের জট। পাল্টে দিতে পারে জীবনধারা। সূচিত হতে পারে একটি গঠনমূলক পরিবর্তনের পথ। এর জন্যই প্রয়োজন এমন একটি আয়োজন মানুষ যেটির অপেক্ষায় থাকবে সারাবছর। যে আয়োজন আমাদের সমাজ, রাজনীতি, জীবনবোধে একটি ব্যবস্থাপত্র হিসেবে হাজির হবে।

প্রতিবছর একটি ‘লালন বক্তৃতা’ আয়োজনের তাগিদ থেকেই ওপরের অবতারণা। বছরব্যাপী সময় ধরে তৈরি হবে ‘লালন বক্তৃতা’। একটি কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত ও নির্বাচিত হবেন ‘লালন বক্তৃতা’ প্রণয়নকারী। লালন সাধু থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট গবেষক, ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ থাকবেন প্রণয়নকারী দলে। ‘লালন বক্তৃতা’র দিন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণীত বক্তৃতা প্রকাশিত হবে। আঁখড়াবাড়ি থেকে টেলিভিশনে ও অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচারিত হবে সুদীর্ঘ এ সাবলীল বক্তৃতা। যেখানে লালনের অনেক নিগুঢ় বাণীর ভেদ বিশ্লেষণ থাকবে। থাকবে ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্র জিজ্ঞাসার জবাব।

পুঁজি নির্ভর জীবন ব্যবস্থায় আমাদের ভেতর অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা ও বণিক প্রবৃত্তি বাড়ছে। আমরা বাণিজ্যিক হিসেবের জালে আটকা পড়তে পড়তে মানবিক সৌন্দর্য হারিয়ে ফেলছি। সকল কিছুর মধ্যে বাণিজ্য যৌক্তিক হয়ে ওঠায় জীবনের অমিমাংসিত অথচ অপরিহার্য অংকগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছে। এমন সময় মানুষের দৃষ্টি উন্মোচন করে দিতে পারে মানবিক ভাষা, তথ্য ও তত্ত্বে ঠাঁসা সাবলীল একটি ‘লালন বক্তৃতা’। আমাদের সমাজে প্রতি বছর এমন বক্তৃতা প্রণয়ণ, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রকাশ করার জন্য উপযুক্ত মানুষের অভাব নেই। অন্যসব প্রয়োজনগুলোও পূরণ হতে পারে সহজেই। উদ্যোগটি আসা দরকার লালন একাডেমি থেকে। তাহলে সত্যিকার অর্থেই প্রতি বছর মানুষ লালন স্মৃতি উৎসব থেকে কিছু সওদা বা রসদ নিয়ে ফিরতে পারবেন। সমাজ পরিবর্তনে এই রসদ হতে পারে অনেক দামি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

Bellow Post-Green View