চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সরকারের কঠোর সমালোচনায় ইমরান ও সুলতানা কামাল

গণতন্ত্র ও বাক স্বাধীনতা ইস্যুতে সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার এবং মানবাধিকার কর্মী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা  অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। সোমবার সন্ধ্যায় শাহবাগ চত্ত্বরে গণজাগরণ মঞ্চের পাঁচ বছর ‍পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন প্রস্তাবের বিষয়সহ নানা বিষয়ে সমালোচনা করেন।

দেশে যে ‘কাগুজে গণতন্ত্র’ রয়েছে তা বিলুপ্ত করে দিয়ে একনায়কতন্ত্র বা রাজতন্ত্র ঘোষণা করে দিলেই ভালো হয় বলে মন্তব্য করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।

বিজ্ঞাপন

সুলতানা কামাল বলেছেন: এখন যারা ক্ষমতায় বসেছেন, তারা মুক্তিযুদ্ধকে বেঁচে বেঁচে, নিজেদের জীবনের সমস্ত সুযোগ-সুবিধাগুলো নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যেটা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এবং সেটারই একটা উপায় কিন্তু মানুষের বাক স্বাধীনতা বন্ধ করে দেওয়া।

সোমবার সন্ধ্যায় শাহবাগ চত্ত্বরে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে ইমরান এইচ সরকার বলেন: আমি মনে করি, আজকে যেভাবে দেশ চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, যেভাবে মানুষের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, স্তব্ধ করে দেওয়া হচ্ছে, তাতে আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের সংবিধান মোতাবেক (রাষ্ট্রের) মূল স্তম্ভের একটি হচ্ছে গণতন্ত্র। সেই গণতন্ত্র বিলুপ্ত করে দিয়ে একনায়কতন্ত্র বা রাজতন্ত্র ঘোষণা করে দিলেই ভালো হয়। তাতে আমরা সান্তনা পাই যে, বাংলাদেশে তো গণতন্ত্রই নেই সুতরাং এখানে আমরা আর কথা বলবো কীভাবে?

‘‘একদিকে গণতন্ত্রের কথা বলবেন, মানুষের অধিকারের কথা বলবেন, অন্যদিকে আমাদের আমাদের কণ্ঠরোধ করে দেবেন, আমাদের রাস্তায় নামতে দেবেন না, কথা বলতে দেবেন না, তাহলে এই গণতন্ত্র কাগজে কলমের গণতন্ত্র ছাড়া আর কিছুই হবে না।’’

`মত প্রকাশে বাধা, সাম্প্রতিক কালাকানুন: কোন পথে বাংলাদেশ?’ শীর্ষক এ আলোচনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করে তিনি বলেন: ৫৭ ধারা বিলুপ্ত হয়েছে। এখন আমাদের সামনে হাজির করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। এই আইনের মাধ্যমে শুধুমাত্র যারা অন্যায়ের প্রতিবাদ করে তাদের মুখই বন্ধ করা হবে না, যে সকল গণমাধ্যম কর্মীরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন, দুর্নীতির খোঁজ-খবর করেন, সেগুলোর বিরুদ্ধেও আজকে আইন পাশ করা হচ্ছে। আজকে বোঝাই যাচ্ছে, একদিকে রাস্তায় প্রতিবাদ করতে দেওয়া হচ্ছে না, মত প্রকাশ করতে দেওয়া হচ্ছেনা, সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে, গণমাধ্যমে লিখতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে গণমাধ্যম কর্মীদেরও মুখ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

সোমবারের অনুষ্ঠান আয়োজন করতেও অনেক বাধা পেতে হয়েছে বলে জানান ইমরান এইচ সরকার।

বিজ্ঞাপন

ভিআইপিদের জন্য সড়কে আলাদা লেন করার প্রস্তাবের সমালোচনা করে  সুলতানা কামাল বলেন: আজকের রাজনৈতিক শক্তিগুলো এদেশটাকে একটা বিভাজিত শক্তির দেশ হিসেবে তৈরি করছে। আর সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হচ্ছে, যারা ন্যায্যতার সঙ্গে, বৈধতার সঙ্গে, অত্যন্ত সততার সঙ্গে দাবি করতে পারেন যে বাংলাদেশের সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলনে এবং মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর মত অবিসংবাদিত নেতা এদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তার দল যখন ক্ষমতায়, তার কন্যা যখন আজকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী, সেই সময়ে মন্ত্রীসভায় প্রস্তাব আসে যে ভিআইপিদের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন করে দেওয়া হোক।

‘‘কিছু কুলাঙ্গার ব্যতীত সাড়ে সাত কোটি মানুষ যে দেশটি মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন করেছে সেই দেশেরই মন্ত্রীসভায় প্রস্তাব আসে তাদের জন্য রাস্তায় আলাদা লেন করে দিতে হবে, কোথায়? রাজপথে। অনেক সুযোগ-সুবিধাই তারা নিয়েছেন, অনেক জায়গাই তারা নিজেদেরকে বিশেষ বিশেষ অবস্থানে নিয়ে যেতে পেরেছেন; অর্থের দিক থেকে, ক্ষমতার দিক থেকে। আমাদের যেকোনভাবে অস্বীকার করে, অবহেলা করে, গালাগাল করে, তারা যে কোন জায়গায় নিজেদের জায়গাটা করে নিয়েছেন। এখন যে রাজপথ, যেখান দিয়ে সাধারণ মানুষ চলাফেরা করে, এখানেও তাদের জন্য আলাদা জায়গা করে দিতে হবে।যদি  মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের চিত্র তাদের মনের মধ্যে থেকে থাকে, তাদেরকে ধিক্বার জানাই।

‘‘তাদেরকে বলতে চাই যে তারা মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে নিজেদের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ আমাদের উত্তরাধিকার। সুঅধিকারী কোনদিন তার উত্তরাধিকারকে বেঁচে না। কিন্তু এখন যারা ক্ষমতায় বসেছেন, তারা উত্তরাধিকারকে বেঁচে বেঁচে, নিজেদের জীবনের সমস্ত সুযোগ-সুবিধাগুলো নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যেটা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এবং সেটারই একটা উপায় কিন্তু মানুষের বাক স্বাধীনতা বন্ধ করে দেওয়া।’’

সত্যজিৎ রায়ের গুপি গাইন বাঘা বাইন সিনেমার উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন:  গুপি গাইন বাঘা বাইন যখন হাল্লা রাজার দেশে গিয়ে নামলো, তারা দেখলো যে সেই দেশের মানুষ কথা বলে না।  কেন কথা বলে না? কারণ হাল্লা রাজা সেই দেশের প্রজাদের জিহবাগুলো কেটে দিয়েছে।

‘‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেকে হাল্লা রাজার দেশে পরিণত হতে দিতে পারি না। দিব না।’’

গণজাগরণ মঞ্চ জয়বাংলা স্লোগান ফিরিয়ে এনেছে দাবি করে সুলাতানা কামাল বলেন: যে সময় স্বাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে আমরা সবাই মনে করতে শুরু করেছিলাম যে এই দেশটা মুক্তমনা মানুষের হাত ছাড়া হয়ে গেল। এই দেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে আছেন তারা নিপীড়িত হচ্ছেন, কোণঠাসা হয়ে যাচ্ছেন, সেই সময় গণজাগরণ মঞ্চ জয়বাংলা স্লোগান ফিরিয়ে এনেছিল।  আমরা মনে করতে পারি সেই সময়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের ছেলেরাও জয়বাংলা স্লোগান দেওয়ার সাহস পেত না। জয়বাংলা স্লোগান গণজাগরণ মঞ্চ ফিরিয়ে এনেছিল।

‘‘আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছি যে পিতা তার পূত্র হত্যার বিচার চায় না, যারা ধর্ষিত অত্যাচারিত হয় তারা বিচার চায় না, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বলে, বাবা আমাদের ছেড়ে দাও, আমরা কোনরকম এদেশ ছেড়ে চলে যাই, আমাদের ওপর যে অত্যাচার হয়েছে আমরা সেটার কোন বিচার চাই না।ন্যায় বিচার তো নাইই, ন্যায় বিচারের প্রত্যাশাও মানুষের মন থেকে চলে যাচ্ছে।’’

একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে উঠা গণজাগরণ আন্দোলনের পঞ্চম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ‘রঙ তুলিতে স্বপ্নের বাংলাদেশ’ এর পর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শোভাযাত্রা বের করা হয়।

Bellow Post-Green View