চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সরকারি চাকরিই কি একমাত্র মুক্তি ও সম্মানের পথ?

বিসিএস! নামে চাকরির পরীক্ষা হলেও বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ-বাস্তবতায় এখন অন্যতম প্রভাবশালী ডিসকোর্স। এক অম্ল-মধুর দ্বন্দ্বমুখর বাস্তবতা নিয়ে আমাদের ট্র্যাডিশনাল শিক্ষিত তরুণ-সমাজের মনোজগতকে ঝাঁকুনি দিতে কিছুদিন পরপরই আসে বিসিএস। সাংবাদিকতা, নাটক, সিনেমা, শিল্পকলা, কৃষক, কৃষি, যুদ্ধ, প্রেম, বিরহ, জন্ম, মৃত্যু-সব কিছুকে কে ছাপিয়ে প্রধান বিষয় হয়ে উঠে বিসিএস।     

প্রতিটি বিসিএসের চূড়ান্ত রেজাল্ট হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণ সমাজের মনোজগৎ এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রকৃতি প্রায় একইরকম থাকে। হলে, ক্যাম্পাসে, পরিবারে, গ্রামে, বান্ধব-বান্ধবীদের মনে এক নতুন শিহরণ সঞ্চারিত হয়। বিসিএস হয়ে যাওয়ার পর নিজের কাছেই নিজেকে কেমন যেন লাগে! হলের কর্মচারী থেকে শুরু করে অত্যাচারী বড়/ছোট ভাই কিংবা বেকার রুমমেট, কেউ আর আগের মতো কথা বলেনা। নতুন এক চোখের ভাষায় সবাই সমীহ বর্ষণ করে। সারাক্ষণ চোখ পিট পিট করে। একটু পর পর স্মার্টফোনের স্ক্রিনে চোখ চলে যায়। ক্ষুদে বার্তারা সামান্য অবসরটুকু পর্যন্ত কেড়ে নেয়। ফেসবুকে যেন নোটিফিকেশন’র ‘নার্গিস’ বয়ে যায়। লাইকের পর লাইকের, উইশের পর উইশ! নিজেকে রাজা/রানী মনে হয়। কার কোন ক্যাডার হলো, সবখানে একই আলোচনা। সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয় ফরেন, এডমিন এবং পুলিশ ক্যাডার নিয়ে। বাবা-মা থেকে থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সবার কাছে এই বিশেষ ক্যাডাররা অন্যান্য ‘ব্যর্থ’ সন্তান বা ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় বিশেষ মনোযোগ এবং কদর পেয়ে থাকেন। তবে এদের সবচেয়ে বেশি খাতিরদারি করে থাকে রাষ্ট্র নিজেই।

যাদের ‘শিক্ষা’, ‘পরিবার পরিকল্পনা’ কিংবা ‘আনসার’ ক্যাডার হয় তাদের মনে ও মগজে কাজ করে আবার ভিন্ন বাস্তবতা। ফরেন, প্রশাসন এবং পুলিশ ক্যাডারের তুলনায় এই ‘শিক্ষা’, ‘আনসার’ কিংবা ‘পরিবার পরিকল্পনা’ টাইপের ক্যাডার যেন পরিকল্পনা ও ইচ্ছে ছাড়া সন্তান জন্মদানের মতো। ফেলে দেয়া যায়না। এসব নিয়ে জনমানসেও খুব একটা আগ্রহ বা বাড়তি আন্তরিকতা বা সমীহ থাকেনা, আলোচনা থাকেনা। পরিচিতরা সান্ত্বনা বৃষ্টি বর্ষণ করেন-‘এবার না হয় পুলিশ/ম্যাজিস্ট্রেট হওয়া গেলনা, চেষ্টা চালিয়ে যাও’; ‘কপালে নাই, ভাই; কোনো মামা/চাচা ছাড়া যে ভাই আনসার/শিক্ষা পাইছেন আল্লাহর কাছে শোকরিয়া আদায় করেন’। স্বপ্ন ছিল ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ঝড় তুলবেন, হয়ে গেছেন কলেজের শিক্ষক! প্রেমিকার মনে শান্তি নাই। প্রেমিকার ঝাড়ি খেয়ে তোতলা হয়ে যাওয়ার দশা- ‘কী ভেবে যে তোমায় মন দিয়েছিলাম!’, ‘কাল থেকে ক্যাম্পাসে মুখ দেখাব কীভাবে? ছাগলটাকে দিয়ে কিচ্ছু হবেনা’ টাইপের অনুভূতিতে জীবন যেন বিস্বাদ ঠেকে প্রেমিকার কাছে।

মস্তিষ্কের চেয়ে যদি মনের জোর বেশি থাকে তাহলেই কেবল সম্পর্কটা টিকে। তবে সেই সাময়িক আবেগের স্মৃতি বার বার জীবনের নানা পর্যায়ে ফলা হয়ে ফিরে ফিরে ‘দুঃখ’ হয়ে। যারা জীবনের শেষ বিসিএস দিলেন,  কিন্তু এবারো ‘ব্যর্থ’ হলেন  তারা যেন মরণের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। এ জীবন কেমনে টেনে নিবেন তারা? কী হতে চেয়েছিলেন! আর আল্লাহ তার জীবনটা কী করে দিলেন!!

সৃষ্টিকর্তার সাথে মেজাজ খারাপ করে, অদৃষ্টের অবিচারকে জীবনের অনিবার্য বাস্তবতা বলে ধরে নিয়ে আমাদের তরুণদের এক বিরাট অংশ মনের ভেতরে রাজ্যের বিষাদ আর অস্বস্তি নিয়ে সামনের দিনগুলো কোনোমতে কাটিয়ে দেয়ার আনন্দহীন প্রস্তুতি নিতে থাকেন। খুব কঠিন সে সময়। খুব একা মেহসুস হয়। নিজের কাছেই নিজেকে ‘ফালতু’ বলে মনে হয়। লাখ টাকা বেতনের এবং আকাশচুম্বী সম্ভাবনার ব্যাংকাররা পর্যন্ত মনের ঈশান কোনে রাজ্যের মেঘ নিয়ে হিসেব-নিকেশে ভুল করে বসেন। এমন একজনকে আমি জানি, যে সদ্য মাস্টার্স শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছে। ইতোমধ্যেই একটা ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী, কক্সবাজারে কটেজের মালিক, পার্বত্য চট্টগ্রামে কমলার বাগানের মালিক; কিন্তু সেই ছাত্র মা-বাবা এবং মামাদের চাপে বিসিএস পরীক্ষা দিচ্ছে। ছেলেটি অত্যন্ত মেধাবী এবং উদ্যমী। ছেলেটি ছাত্রলীগের রাজনীতিও করে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি কিংবা তদবির বাণিজ্যে না গিয়ে নিজের বুদ্ধি আর পরিশ্রম দিয়ে নিজের এবং আরও অনেকের অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রাম করছে। এত বড় কীর্তি, কিন্তু মা-বাবা বা তার মামাদের চোখে ছেলেটির এতবড় কীর্তি ধরা পড়ছেনা। কারণ ইনাদের নিজের চোখ নাই, এই চোখ সমাজের, রাষ্ট্রের চলমান বাস্তবতার।

আরেক ছেলের গল্প শুনলাম, আইডিএলসি ব্যাংকে লাখ টাকা বেতনের চাকরি করছে। কিন্তু পারিবারিক চাপ তাকে সরকারি চাকরি খুঁজতে বাধ্য করেছে। নিজেকে হারিয়ে সে এখন সরকারি চাকরি খুঁজছে। স্বপ্নের পেশা সাংবাদিকতায় থাকাকালীন, আমার গ্রামের বাড়িতে এক টেম্পু ড্রাইভার, যার সাথে ছোটবেলায় প্রতিদিন মাঠে ফুটবল খেলতাম, আমাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘এত পইড়া তুই সাংবাদিক হইলি!’। আমার গ্রামের এই বন্ধু যেন পুরো সমাজেরই প্রতিনিধি। না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পর্যন্ত কেন বলবে- ‘সাংবাদিকতা কর বুঝলাম; তো কোনো চাকরি-বাকরি করবানা!’ ডাক্তারি পড়ে পরিবারের চাপে, রাষ্ট্রের বৈষম্য থেকে বাঁচতে ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে গেছেন; ক্লাসের মাঝারি মানের ছাত্র কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে ডাক্তার হওয়া ফার্স্ট বয়/গার্লকে শাসন করছেন! অসংগতির যেন শেষ নেই!   

অন্যদিকে, নিজের সন্তানের বউ/জামাই আনতে গিয়ে আজ পর্যন্ত আমাদের লোভী পিতা-মাতারা কোনো সাংবাদিক, নাটক-চলচ্চিত্র-বিজ্ঞাপন নির্মাতা, লেখকের খোঁজ করেছেন বলে শোনা যায়নি। অফিস থেকে শুরু করে শ্বশুরবাড়ী, সবখানে এই বিসিএসঅলাদের ভালোবাসা, মনোযোগ ও সন্মানের বাড়াবাড়ি। যারা বিসিএস দেন না, যাদের হয়না, যারা সরকারী চাকরি করেন না, তাদেরকে সমাজ ফেলে দেয়না ঠিক আছে, সন্মানের সাথে গ্রহণও করেনা। 

বিজ্ঞাপন

আদতে কোনো মানুষই তো ফালতু নন। আর এই অসীম সম্ভাবনাময় তারুণ্য তো নয়-ই। নিজের জন্মদাতা বাবা-মা ও পরিবারের বেঁধে দেয়া টার্গেট, সমাজ, বন্ধুমহলের ভ্রুকুটি, অশ্রদ্ধা, অস্বীকৃতিকে মোকাবেলা করতে গিয়ে আসলে সে নিজেকে কখনোই চিনে উঠতে পারেনি। রাষ্ট্র এবং সমাজের চোখ দিয়েই সে এতদিন নিজেকে চিনতে শিখেছে, বুঝতে শিখেছে। সমাজের বাইরে গিয়ে, সিস্টেমের বাইরে গিয়ে কিছু ভাবার বা সিদ্ধান্ত নেয়ার যোগ্যতা সে অর্জন করেনি। ফলে অনেকের মনেই রাজ করে কূটনীতি, ইউনিফর্ম কিংবা মোবাইল কোর্ট। প্রকৃতিপ্রদত্ত মেধা আটকে যায় রাষ্ট্রের তৈরি ক্ষমতা-জালে। যিনি হতে পারতেন, জগত কাঁপানো ক্রিকেটার, সমাজ ও রাষ্ট্র তাকে বানিয়ে ফেলে আনুগত্য প্রকাশে চৌকস অফিসার কিংবা কর্মচারী।

একবার ভাবুন, আমাদের ক্রিকেট জাদুকর মোস্তাফিজুর রহমান সাতক্ষীরার এনডিসি হিসেবে কাজ করছেন! অথবা আমাদের তামিম ইকবাল ইউরোপের কোনো দেশে ডিপ্লোমেটের বেশে ‘রাষ্ট্রীয়’ দায়িত্ব পালন করছেন। আমাদের নিজস্ব হিরোবিহীন এই সমাজে একজন মাশরাফি, মোস্তাফিজ, সাকিব কিংবা তামিম কী বড়ত্ব নিয়ে যে মেন্টর এর ভূমিকা পালন করে চলেছেন ভাবলে উজ্জ্বল আগামী এসে গান শোনাতে শুরু করে। আমাদের কৃষকদের কথা চিন্তা করে দেখুন। রাষ্ট্র কোনো বিশেষ সম্মান দেয়না, সমাজ কোনো সমীহ দেখায়না, ছেলে-মেয়েরা পর্যন্ত পরিচয় দিতে ইতস্তত বোধ করে। এরপরেও কী পরম যত্ন আর শ্রমে দেশের ক্রমবর্ধনশীল জনগোষ্ঠীর মুখে খাবার দিয়ে চলেছেন। দেশের অর্থনীতিতে এই কৃষকদের অবদান কী বিশাল! আজ পর্যন্ত শুনেছেন, একজন কৃষক কোনো অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি বা মূল বক্তার আসন অলংকৃত করেছেন?

কয়েকদিন আগে এক মুক্তিযোদ্ধার শোকসভায় বিশেষ অতিথি হয়ে গিয়েছিলাম। মঞ্চে ৪ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, কিন্তু প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেছেন একজন সিনিয়র এএসপি! প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদের কথা বাদ দিলাম, বিদেশে দূতাবাসের একজন দ্বিতীয়/তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী যে ঠাটবাট নিয়ে চলেন, ক্ষমতার দেয়াল তুলে ডলার/রিয়াল গুনেন, সে তুলনায় আমাদের দেশে যারা প্রতিনিয়ত অর্থ পাঠিয়ে ব্যাংক রিজার্ভ বাড়িয়ে চলেছেন, সেই প্রবাসী বাংলাদেশীদের কথা একটু চিন্তা করুন। বিশেষ করে মালয়েশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যারা কাজ করেন বা তাদেরকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তারা আমার কথার মর্মার্থ বুঝতে পারবেন। 

এগুলো কিসের আলামত? সবাই যদি এভাবে কোনো বিশেষ সরকারী চাকরিকে একমাত্র অভীষ্ট লক্ষ্য হিসেবে ধরে নেন, তাহলে দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কৃষি, শিল্প, স্পোর্টস, সাহিত্য, নাটক-সিনেমার কী হবে? রাষ্ট্র যদি সবার জন্য আইনের শাসন, সুশাসন, মানবাধিকার, যোগাযোগ অবকাঠামো নিশ্চিত করতে পারত তাহলে আমাদেরকে বোধ হয় এই বাস্তবতা দেখতে হতোনা।  

ভাগ্যিস, আমাদের তরুণ-তরুণীদের সবাই পুলিশ/ম্যাজিস্ট্রেট হয়না! হয়না বলেই টিকে থাকে এদেশের শিল্প, সাহিত্য, কলা, বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য, মিডিয়া, খেলাধুলা, কৃষি; টিকে থাকে এবং এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু রাষ্ট্র বা সমাজ কি তাদের প্রাপ্য সন্মানটুকু দেয়? নেত্রকোনার কলসিন্দুর গ্রামের মেয়েদের কথা ভাবুন, এদের কারো বাবা- মা’ই সরকারী আমলা, বড় ব্যবসায়ী বা রাজনীতিবিদ নন। একেবারে গ্রামের গরীব মানুষ। অথচ, এদের মেয়েরা সমাজে কী পরিমাণ রণন সৃষ্টি করেছেন! ভারত-ইরানকে পরাজিত করে ফুটবলের নামে এরা যেন নারী তথা পুরো সমাজের মুক্তির বিপ্লবের আহবান করেছে!

কিন্তু দেশের রাষ্ট্র, প্রশাসন কী করেছে দেখুন; এদেরকে লোকাল বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। দেশে এত বড় বড় অফিসার, বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবীদের বহর; কই আপনাদের ছেলে-মেয়েরাতো দেশের জন্য কোনো সুনাম আনতে পারলনা। মাবিয়া বলেন আর মোস্তাফিজ বলেন, সবাইতো একেবারে গ্রামের বা গরীব মানুষের সন্তান। বরং বড় আমলা ও রাজনীতিবিদের ছেলেরা জঙ্গিবাদের মতো ভয়ানক অপরাধে জড়িয়ে দেশের ভাবমূর্তি শেষ করে দেয়ার অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমার ‘ নৈতিক এবং অর্থনৈতিক মুক্তি’ আদৌ আসবে কি/না জানিনা, আমার গ্রামের বন্ধু মানিক বা হাদিস ভাইয়ের কিন্তু এসেছে। তারা নিজের বুদ্ধি, পরিশ্রম দিয়ে এলাকায় মাছের চাষ করে, লেয়ার ফার্ম দিয়ে নিজের মুক্তি এনেছেন, আবার অন্য আরও দশ/বার জনের কাজের ব্যবস্থাও করেছেন। আমি কথাজীবী, তারা কর্মজীবী। কথার চেয়ে কাজের দাম কি কম?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)   

বিজ্ঞাপন