চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সম্প্রীতির বন্ধন, বঙ্গবন্ধু ও ভূপেন হাজারিকা

বঙ্গবন্ধু ও ভূপেন হাজারিকায় সওয়ার হয়ে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে এলেন আসামের লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ড. সৌমেন ভারতীয়া…

২ জুলাই। মঙ্গলবার। তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ঢাকার আকাশে মেঘ-রোদের মান-অভিমান পর্ব তখন চরমে। ঠিক একই সময়ে বিশ্বকাপে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সুদূর ইংল্যান্ডের কড়া রোদের মাঠে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটাররা। খেলা শুরুর আগেই ভারতবর্ষকে শোষণ করা সাম্রাজ্যবাদীদের সেই আখড়াতেই বেজে উঠলো ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’, একটু থেমে ‘জনগণমন-অধিনায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!’

দুটি দেশের জাতীয় সংগীত একই ব্যক্তির লেখা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন বাঙালি। এবারের ক্রিকেট বিশ্বকাপকে উপলক্ষ্য করে বাংলাদেশের বাঙালি কিংবা ভারতীয় বাঙালির এই সময়টুকু ছিলো নিঃসন্দেহে গর্বের!

বিজ্ঞাপন

বাঙালির এমন গর্বভরা বিকেলে সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে চ্যানেল আইয়ের কার্যালয়ে হাজির ভারতের আসাম রাজ্যের দুই ব্যক্তি! একজন ড. সৌমেন ভারতীয়া এবং অন্যজন ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ আসামের প্রেসিডেন্ট বিভুতি দত্ত। তাদের হাতে মোড়ানো পেট মোটা দুটি বই। বই দুটি প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক ও ইমপ্রেস টেলিফিল্ম-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরের হাতে পৌঁছে দিতে এসেছেন। কিন্তু বই দুটি কী, তা খোলাসা করলেন না!

চ্যানেল আইয়ে এসে আসামের এই দুই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব খোঁজ করলেন অভিনেতা ও সংগঠক শহিদুল আলম সাচ্চুর। তাকে পেয়ে উচ্ছ্বাস আর ধরে না তাদের। সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের বদৌলতে বহু আগেই পরিচয় তাদের। তাদের কথপোকথনের এক পর্যায়ে ব্যাগে মোড়ানো বই দুটি বের করলেন সৌমেন ভারতীয়া। মোড়ক খুলেই অবাক! দুটি বইয়ের মলাটেই বঙ্গবন্ধুর ছবি! একটি বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং অন্যটি ‘কারাগারের রোজনামচা’! কিন্তু এটি বাংলায় নয়, বরং অসমীয়া ভাষায় লেখা! এরমধ্যে কারাগারের রোজনামচা বইটি অসমীয়া ভাষায় নাম দিয়েছেন ‘কারাগারের দিনলিপি’!

এরপর বই দুটি অসমীয় ভাষায় কেন অনুবাদ করলেন, সেসব কথা বলতে শুরু করলেন সৌমেন ভারতীয়া। তার আগে জানালেন, অসমীয়া ভাষায় অনুবাদকৃত বঙ্গবন্ধুর এই দুটি বই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিতেই বাংলাদেশে এসেছিলেন কয়েক সদস্যের একটি দল। কিন্তু বাংলাদেশে এসে দেখেন, প্রধানমন্ত্রী তখন রাষ্ট্রীয় সফরে চীন দেশে। কিছুটা আক্ষেপ থাকলেও শিগগির আবার বাংলাদেশে এসে প্রধানমন্ত্রীর হাতে বই দুটি তুলে দেয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন সৌমেন। কারণ বই দুটির অনুবাদকও তিনি নিজে!

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী অসমীয় ভাষায় অনুবাদ করতে কোন বিষয়টি অনুপ্রাণিত করেছিলো সৌমেন ভারতীয়াকে? এমন প্রশ্ন করা হলে সোজাসাপ্টা এককথায় তিনি জবাব দেন, ‘ভূপেন হাজারিকা।’

এরপর তিনি বললেন: বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে মূল ভূমিকা রেখেছেন উপমহাদেশের বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ভূপেন হাজারিকা ই। কারণ তার ৯০তম জন্মদিবস পালনের এক অনুষ্ঠানে ২০১৬ সালে আমি ঢাকায় আসি। তখন ভূপেন হাজারিকাকে নিয়ে অনুষ্ঠান করার পর দেখলাম যে, তার প্রতি বাংলাদেশের মানুষের যে সম্মান, যে শ্রদ্ধা সেটা কুর্নিশ করার মত এবং এও টের পেলাম পেলাম আসামের লোকের বাংলাদেশ নিয়ে প্রচুর ভ্রান্ত ধারণা আছে, আবার বাংলাদেশের লোক যেন ভারতবর্ষের কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি সম্পর্কে যতটুকু জানে তার এক শতাংশ ও আসাম সম্পর্কে জানে না। তো তখনই আমার মাথায় এলো আসাম এবং বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে সম্পর্কটা কীভাবে উন্নয়ন করা যায়।

কথা না থামিয়ে সৌমেন বলতে থাকেন, তখন সংস্কৃতিমন্ত্রী ছিলেন আসাদুজ্জামান নূর ভাই। উনাকে বললাম যে আসাম এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে কাজ করতে চাই। একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের জায়গায় আমরা পৌঁছাতে চাই। এরপর নূর ভাইয়ের সম্মতি এবং বাংলাদেশ ও গোয়াহাটি শিল্পকলার সঙ্গে জড়িতদের সহায়তায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত গোয়াহাটি এবং ঢাকার মধ্যে অন্তত ৪০০ শিল্পীর আদান-প্রদান হয়েছে। কালচারালি আদান-প্রদান। এরমধ্যে গোলাম কুদ্দুস তাঁর দল সেখানে গিয়ে পারফর্ম করেছেন, হাসান আরিফ তাঁর দল নিয়ে গেছেন এবং একই ভাবে আমাদের গোয়াহাটি থেকেও ঢাকায় দল এসেছে।

‘গোয়াহাটিতে আমরা গত ১২ বছর ধরে একুশে ফেব্রুয়ারি পালন করে যাচ্ছি। যা ভারতবর্ষে আর কোথাও হয়না। আসাম এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের সীমাবদ্ধতা থেকে আরো বড় জায়গায় নিয়ে যেতে চাইলাম। সেই জায়গায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করলো বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী। ২০১৭ সালে আমি বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ ৩২ নম্বরের বাড়িতে গিয়েছিলাম। সে বাড়িতে যে জাদুঘর সেটা দেখতেই মূলত আমরা গিয়েছিলাম। তখন সেখানকার এক নারী অফিসার আমাকে বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি উপহার দিয়েছিলেন। এই বইটা যখন আমি পড়তে শুরু করলাম তখন মনে হলো আমি নতুন কিছু একটা আবিষ্কার করতে পেরেছি। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেই এই বইটা আমরা অসমীয়া ভাষায় অনুবাদ করবো। কাউকে না জানিয়ে এটা আমরা অনুবাদ করা শুরু করে দিলাম। বইটা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে এটা আমাদের বৃহত্তর অসমীয়ার মানুষের মধ্যে পৌঁছে দেয়ার দরকার,তাদের জানা দরকার বাংলার প্রকৃত ইতিহাস। তাদের জানা দরকার, বাংলাদেশের হিরোকে। আর বঙ্গবন্ধুতো শুধু বাংলার নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিশ্বনেতা!’-বাংলায় লেখা অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি কীভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, সেটাই বলছিলেন সৌমেন।

এরপর বঙ্গবন্ধুর আরো একটি বইয়ের সন্ধান করেন বাংলাদেশের বন্ধুদের কাছ থেকে। সেটা হল ‘কারাগারের রোজনামচা’। এটিও অনুবাদের উদ্যোগ নিয়েছেন সৌমেন। এ বিষয়ে তিনি জানান, গোয়াহাটিতে ‘ফ্রেন্ডস অফ বাংলাদেশ’-এর অফিসের তরফ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অফিসিয়ালি লেটারে জানালাম যে বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী আমরা অসমীয়া ভাষায় করেছি, এবং কারাগারের রোজনামচা বইটিও অনুবাদ করতে চাই। তার জন্য আপনাদের অনুমতি যেমন লাগবে তেমনি আর্থিক সহযোগিতাও আমাদের প্রয়োজন। ‘ফ্রেন্ডস অফ বাংলাদেশ’-এর বাংলাদেশ অংশের সভাপতি মেজর শামসুল আরেফিন-এর সৌজন্যে এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম-এর সৌজন্যে সহযোগিতা ও অনুমতি আমরা পেয়ে যাই। তখন ‘কারাগারের দিনলিপি’ নামে আমরা বইটি অনুবাদ করি।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বইটি নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে সৌমেন বলেন,২০১৮ সালের ডিসেম্বরে গোয়াহাটির গ্রন্থমেলায় ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি অসমীয়া ভাষায় উন্মোচন করি। এই বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এসেছিলেন পার্শ্ববর্তী রাজ্য মেঘালয়ের রাজ্যপাল তথাগত রায়। বাংলাদেশ সম্পর্কে যার অগাধ জ্ঞান ও পান্ডিত্য রয়েছে। বাংলাদেশ নিয়ে তার একটি বইও আছে, বইটির নাম ‘যা ছিল আমার দেশ’। প্রায় চারশো পৃষ্ঠার বই। গোয়াহাটি গ্রন্থমেলায় বঙ্গবন্ধুর নামে একটি স্টলও ছিলো এবং এটা শুনে আশ্চর্য হবেন যে প্রায় দশ দিনের এই গ্রন্থমেলায় প্রায় ২৯৫টির মত ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি বিক্রি হয়। আসামের জন্য এটা আমরা বিরাট বড় ঘটনা মনে করি। আর গত সাত মাসে এই বইটির দুই হাজার কপি শেষ হয়ে গিয়েছে। শিগগির দ্বিতীয় প্রকাশনা প্রকাশ পাবে।

‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান এখনো হয়নি জানিয়ে এই লেখক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব বলেন, ‘কারাগারের রোজনামচা’ বইটির আসামের বাসায় নাম দিয়েছি ‘কারাগারের দিনলিপি’। এটি আমরা আগামী ১৯ জুলাই মোড়ক উন্মোচন করতে চাই এবং একটা বিষয় খেয়াল করেছি যত জায়গায় বঙ্গবন্ধুর বইটি নিয়ে যাচ্ছি সবাই খুব পজিটিভলি বিষয়টিকে দেখছেন। এটা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণার।

আর এ সমস্ত কিছুর জন্য আসামের এই লেখক কৃতজ্ঞতা জানাতে চান পশ্চিম বাংলার জনপ্রিয় ব্যান্ড দল ‘দোহার’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত কালিকাপ্রসাদকে। কারণ তিনিই বাংলাদেশে ভূপেন হাজারিকার জন্মদিবস পালন অনুষ্ঠানে অসমীয় শিল্পীদের নিয়ে আসার বন্দ্যোবস্ত করে গিয়েছিলেন।

সংস্কৃতির আদান-প্রদানের মাধ্যমে আসামের সাথে বাংলাদেশের মানুষের সম্প্রীতির বন্ধন তৈরী হবে, এই আশায় সৌমেন বলেন: আমরা চাই মানুষে মানুষে যে সম্পর্ক সেটা ত্বরান্বিত হোক। বহু আগেই ভূপেন হাজারিকা বাংলার টান অনুভব করেছিলেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভূপেন হাজারিকার গাওয়া গানে বাংলার বীর মুক্তিযোদ্ধারাও অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। এখনো তাই তাঁকে শ্রদ্ধাভরে বাংলার মানুষেরা স্মরণ করেন। এগুলো কাজে লাগিয়ে আসাম ও বাংলার মানুষের মধ্যে একটা সম্প্রীতির বন্ধন তৈরী হোক, এটা মনে প্রাণে চাই।

Bellow Post-Green View