চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সমাজের হালহকিকত!

করোনায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও সমাজ ও রাষ্ট্রের অন্যান্য নিয়মিত কার্যক্রম ঠিকই পরিচালিত হচ্ছে। গ্রামেগঞ্জে শীতের আবহকে পুরোপুরি উপভোগ করবার নিমিত্তে বিভিন্ন এলাকায় দেশীয় খেলাধূলার প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে। তারই ধারাবাহিকতায় শীতের রাতে বিবাহিত ও অবিবাহিতদের মধ্যকার হাডুডু খেলার প্রতিযোগিতার জমজমাট আসর দেখতে উপস্থিত হয়েছিলাম। হাজারের উপরে দর্শক উপস্থিত হয়ে খেলোয়াড়দের উৎসাহ উদ্দীপনা প্রদান করে মোটামুটি কোন ধরনের ঝামেলা ব্যতিরেকে খেলাটি সুসম্পন্ন হয়।

ঝামেলার কথা এ কারণেই বললাম, গ্রামে-গঞ্জে খেলাধূলা পরিচালিত হলে সাধারণভাবেই কথা-কাটাকাটি হয়ে থাকে। আবার হাডুডু খেলা হলে গন্ডগোল হওয়ার আশংকা খুব পরিমাণে থাকে বৈকি, কেননা খেলাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এবার আসা যাক মূল আলোচনায়, হাডুডু খেলা কিসের ভিত্তিতে জাতীয় খেলার অন্তর্ভুক্ত হলো সে আলোচনায় না গিয়ে বলা যায়, স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে তুমুল জনপ্রিয় কাবাডিকে (হাডুডু) জাতীয় খেলা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। ঐ দিনের হাডুডু খেলা চলাকালে পরিচিত স্কুল শিক্ষককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার, হাডুডু খেলা কেন জাতীয় খেলা হলো; এর সদুত্তর দিতে পারেন? তিনি হাসিচ্ছলে বলেছিলেন; একজনকে টেনে নামাতে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তাই হাডুডু বাংলাদেশের জাতীয় খেলা। তিনি তার কথার যুক্তি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের চরিত্রও এমন, কেউ যদি সামান্য উপরের দিকে উঠতে চায় তাহলে অন্যরা যে কোন মূল্যে তাকে টেনে হেঁচড়ে নিচে নামাতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন নজিরের চিত্র অহরহ দেখা যায়। কয়েকদিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কবাডি কেন জাতীয় খেলা হলো এর উত্তরে পূর্বোক্ত উত্তরটিই চোখের সামনে ভেসে আসে বিভিন্ন জায়গায়।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সমাজ কিন্তু রাষ্ট্রের বাইরে নয়, সুগঠিত ও সম্পূর্ণ সমাজব্যবস্থার পূর্ণরূপ আনয়ন ব্যতীত রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমাজব্যবস্থাকে নড়বড়ে রেখে রাষ্ট্রের যতই উন্নয়ন সম্পন্ন করা হোক না কেন সেই উন্নয়নের ব্যবহার ও স্থিতাবস্থা প্রদান খুব বেশিদিন স্থায়িত্ব লাভ করে না। কাজেই, সমাজব্যবস্থার উন্নয়নে সকলকেই মনোযোগ দেওয়া উচিত। সামাজিক জীবনে রাষ্ট্র যে বিষয়টাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করবে সমাজের অধিকাংশ মানুষই সে বিষয়টাকে আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করবে, সে কারণেই কিন্তু যে কোন উপায়ে সেটিকে গলাধ:করণ করার চেষ্টা করবে। বর্তমানে সমাজব্যবস্থায় দেখা যায়, টাকাই সব কিছুর নিয়ামক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কাজেই, সমাজ যেহেতু টাকাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করেছে সেখানে সমাজে বসবাসরতরা যে কোন মূল্যে টাকা উপার্জনের চেষ্টা করে থাকে। যে কোন উপায় বলতে সাধারণত অর্থ উপার্জনের অবৈধ মাধ্যমকে বোঝানো হয়েছে। কানাডার বেগম পাড়ার খবরে বেশ তোলপাড় হয়েছে সারাদেশে, দীর্ঘদিন ধরে এ দেশ থেকে বাইরের দেশে অবৈধভাবে টাকা পাচার হচ্ছে বিরতিহীনভাবে। সঠিকভাবে খোঁজ করলে এরকম বেগম পাড়ার সন্ধান পাওয়া যাবে দেশে বিদেশে অনেক। তবে চিন্তার বিষয় হচ্ছে; গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো যেভাবে আলোচনায় জায়গা দখল করে রাখে, নির্দিষ্ট সময় পরে সেসব আবার আলোচনার বাইরে চলে যায়। এখানেও কি টাকা নিয়ামক হিসেবে কাজ করে থাকে, সেটাও কিন্তু আলোচনার বিষয়বস্তু হওয়া উচিত। এহেন পরিস্থিতি চলমান থাকলে দেশের ভবিষ্যৎ খুব বেশি একটা সুখকর জায়গায় পৌঁছাবে বলে মনে হয় না।

বিজ্ঞাপন

ইদানিং একটি ট্রেন্ড দাঁড়িয়েছে বিশেষ করে প্রোগ্রাম কিংবা কোন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে। যারা এতদসংক্রান্তে প্রোগ্রামের পৃষ্ঠপোষকদের বেশি টাকা প্রদান করতে পারে তাদেরকে মূলত অতিথি করা হয়। আবার অতিথিদের মধ্যে যিনি বেশি টাকা প্রদান করবে তাকে প্রধান অতিথির আসন দেওয়া হয়। সেখানে ব্যক্তির যোগ্যতার চেয়ে টাকাকেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। বিষয়টি মোটেই শোভনীয় নয়। কেননা, এহেন অবস্থা চলমান থাকলে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা শিক্ষা গবেষণার চেয়ে অর্থ উপার্জনের দিকে বেশি মনোনিবেশ করবে, একবার ভাবা যায় বিদেশীরা বাংলাদেশে চাকুরি করে কোটি কোটি ডলার নিয়ে যাচ্ছে। অথচ আমরা উপযুক্ত শিক্ষিত নাগরিক তৈরি করতে পারছি না যার ধরুন এ দেশে অবস্থিত দেশী এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ কিছু পদের বিপরীতে বিদেশীদের নিয়োগ প্রদান করে থাকে।

ভাল/মন্দ বিচার করার বোধশক্তি আমাদের মধ্য থেকে দিনকে দিন কমে আসছে। উপযুক্ত মানুষকে মূল্যায়ন করতে আমাদের যত শঙ্কা, এটা অন্য দেশে আছে বলে মনে হয় না। অমুক ভাল সাংবাদিক তাতে আমার কী? এমন হাবভাব দেখা হয় বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজে। আরে ভাই, আপনি নিজেই কিছু করতে পারছেন না কিন্তু অন্যকে মূল্যায়ন করতে কিসের সংকোচবোধ আপনার? আমার কথা হচ্ছে, একজন ভাল সাংবাদিককে আরো বেশি পরিমাণে উৎসাহ প্রদান করা উচিত যাতে করে তার দ্বারা সমাজের সংকট, সমস্যাকে তুলে ধরে সমাধানের জন্য যথার্থ কর্তৃপক্ষকে চাপ প্রয়োগ করা যায়। তা না করে আমাদের সমাজ সাংবাদিক নিয়ে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে থাকে। যে বিষয়টা বলা যায় তা হলো, অন্যের পেশার প্রতি হিংসাত্মক মনোবৃত্তি পোষণ না করে মূল্যায়ন প্রদান করে নিজের পেশায় কিভাবে সর্বোচ্চ সফলতা পাওয়া যায় সে দিকে নজর প্রদান করাই হবে প্রকৃত মানুষের কাজ।

গ্রামীণ সমাজে দেখা যায়, একজন অন্যজনের বিরুদ্ধাচারণ করতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে সন্ধ্যার পরে চায়ের দোকানে আড্ডাখানা বসে মানুষজনের। সেখানে বেশিরভাগ মানুষই অন্যজনের চরিত্রহননের দায়িত্ব নিয়ে বসে পড়ে, কিন্তু একটিবারের জন্যও নিজের অবস্থার ব্যাপারে ঘুণাক্ষরে চিন্তা ভাবনা করার অবকাশ পায় না। নিজের অবস্থার কথা, ছেলেমেয়েদের সর্বোপরি পরিবার পরিজনের মঙ্গলার্থে কি করা করণীয় কিংবা জীবনমান উন্নয়নে যা করতে হবে সে ব্যাপারে ভাববার অবকাশ নেই। হিংসা, জিঘাংসা তথা পরশ্রীকাতরতা প্রত্যেকটি সমাজে জ্বাজ্জল্যমান যার পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যথার্থ দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে বিভিন্নভাবে বাঁধা পেয়ে থাকে এবং উক্ত সমাজকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভুক্তভোগী হতে হয়। কাজেই বলা যায়, সমাজের উন্নয়ন তথা সমাজের পরিবর্তনের দায়িত্ব সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের। হিংসা বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে স্ব স্ব জায়গায় দায়িত্ব পালন করার মানসিকতাই একটি সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে থাকে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন