চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সব দেশ কি একই সময়ে পাবে করোনা ভ্যাকসিন? 

আশঙ্কা করা হচ্ছে দরিদ্র দেশগুলো এক্ষেত্রে পেছনে পড়ে যাবে

করোনা মহামারীতে পর্যদুস্ত সারাবিশ্ব। এরই মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ৫ কোটি ৭৯ লক্ষাধিক মানুষ। মৃত্যু হয়েছে ১৩ লাখ ৭৭ হাজারেরও অধিক মানুষের। প্রথম ধাপের আক্রমণ শেষ করে দ্বিতীয় ধাপে আরও আগ্রাসী হয়েছে ভাইরাসটি। এমন দুঃসময়ে মানুষের আশা, ভ্যাকসিন আসবে। এ মহামারী থেকে নিস্তার পাবে।

বিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনাভাইরাসের একমাত্র সমাধান হলো, বৈশ্বিক একতা। তথা ঐক্যবদ্ধভাবে সমাধান। সেটা ভ্যাকসিন প্রয়োগে হোক কিংবা অন্য যেকোনো সমাধানের পথ হোক। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

তবে মূল সমাধান হলো ভ্যাকসিন। সব আশার একটাই আশা হিসেবে এখন ভ্যাকসিনেই আশা দেখছেন বিশ্ববাসী।

বিশ্বজুড়ে ১৫০টির বেশি ভ্যাকসিন তৈরি ও পরীক্ষার কাজ চলছে। বর্তমানে অনেকগুলো ভ্যাকসিন মানবদেহে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে রাশিয়ার ‘স্পুটনিক ভি’ ভ্যাকসিনের পর যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজার ও মডার্না অনুমোদনের অপেক্ষায়।

বায়োএনটেক ও ফাইজার বলেছে, তাদের ভ্যাকসিন ৯৫ শতাংশ সফল। আর মডার্নাও বলছে, তাদের তৈরি ভ্যাকসিন ৯৫ শতাংশ নিরাপদ। যদিও এসব ভ্যাকসিনের কোনোটাই চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।

কিন্তু ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ভ্যাকসিনের অগ্রীম অর্ডার দিয়ে দিয়েছে ও দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, ভারত, রাশিয়া, চীন প্রভৃতি প্রথম সারির দেশ এক্ষেত্রে এগিয়ে। ভারত যেমন নিজেরা ভ্যাকসিন তৈরিতে অংশীদার, তেমনি অন্যদের ভ্যাকসিনেও অর্ডার দিয়েছে।

মার্কিন এক গবেষণা সংস্থা বলছে, সম্ভাব্য ভ্যাকসিনগুলোর ৪.৮ বিলিয় ডোজ ইতোমধ্যে কেনা হয়েছে এবং আরও ৩.২ বিলিয়ন চুক্তির পথে।

বিবিসি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার মানে বুঝা যাচ্ছে যে, প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি অর্থ পরিশোধ করতে পারবে, সেসব দেশের লোকজনই সবার আগে ভ্যাকসিন পাবেন। এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে যে, উচ্চ আয়ের দেশগুলো এক্ষেত্রে এগিয়ে। তবে উৎপাদন ক্ষমতায় অগ্রসর কিছু মধ্যম আয়ের দেশও চুক্তির সঙ্গে কিছুটা সম্পৃক্ত হতে পারছে। যেমন ব্রাজিল এবং মেক্সিকো। কারণ এসব দেশে বিভিন্ন ভ্যাকসিনের ক্লিনিক্যাল ট্রাযাল করা হয়েছে। ব্রাজিল অক্সফোর্ড ও আস্ট্রাজেনিকার অংশীদার হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে ভ্যাকসিন সংগ্রহের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। একইভাবে চীনা ভ্যাকসিন তৈরির সংস্থার সঙ্গে অংশীদার হয়েছে ইন্দোনেশিয়া।

যেহেতু কেউ জানে না যে কোন ভ্যাকসিন পুরোপুরি কাজ করবে, তাই কিছু দেশ একাধিক বিকল্প উপায় গ্রহণ করেছে। যেমন ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং যুক্তরাজ্য। তাদের রয়েছে সর্বাধিক ডোজ সংগ্রহের সুযোগ।

প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ভ্যাকসিন নিয়ে তুমুল এই প্রতিযোগিতার মাঝে সব একই সময়ে দেশ কি পাবে ভ্যাকসিন? বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলো? আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, দরিদ্র দেশগুলো এক্ষেত্রে পেছনে পড়ে যাবে।

ডিউক অ্যানালাইসিস এ নেতৃত্বদাতা অ্যান্দ্রেয়া টেইলর বলছিলেন যে, ক্রয়ের সক্ষমতা এবং পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে কত পরিমাণ ভ্যাকসিনের ডোজ তৈরি হবে তার হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে যে, ধনী দেশগুলো এগিয়ে থাকবে এবং দরিদ্র দেশগুলোর প্রবেশের সম্ভাবনা নেই।

বিশেষজ্ঞদের মতামত এই যে, কত পরিমাণ ভ্যাকসিন বাজারে আসবে এবং কখন সহজলভ্য হবে তার নিশ্চিত খবর নেই। পরীক্ষা ও চুক্তি এখনো চলমান। এখনো অনেক প্রশ্ন বাকি।

বিজ্ঞাপন

‘দরিদ্র দেশগুলোর ভ্যাকসিন পাওযা নির্ভর করছে কত পরিমাণ ভ্যাকসিন উৎপাদন হবে, কত দ্রুত এবং কোথায় উৎপাদন ও সরবরাহ করা হবে তার ওপর’।

সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভলপমেন্ট থিঙ্ক-ট্যাঙ্কের নীতি বিশ্লেষক রেচেল সিলভারম্যান বলেছেন, সর্বাধিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ভ্যাকসিনগুলো বেশিরভাগ ধনী দেশের দ্বারা উন্নত ক্রয়ের চুক্তিতে আবদ্ধ। তবে, বড় কথা হলো, যদি পর্যাপ্ত সফল ভ্যাকসিন পাওয়া যায়, তবে প্রচুর পরিমাণে সরবরাহ করা যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফাইজার ও মডার্নার ভ্যাকসিন ব্যতিক্রমী দিক। এগুলোর পর্যাপ্ততা কত দ্রুত হয় তা বলা যায় না। খুব সামান্য সম্ভাবনা আছে যে, আগামী বছরের শেষের দিকে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে গণটিকা প্রদান করা যাবে। এই বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।

যদিও ফাইজার বলছে, ২০২০ সালে ৫০ মিলিয়ন ডোজ এবং ২০২১ সালে ১.৩ বিলিয়ন ডোজ  ভ্যাকসিন তৈরি করবে তারা। আর তার মধ্যে প্রতিটি ব্যক্তির জন্য দুটি ডোজ প্রয়োজন হবে। মডার্নাও একই রকম আশাব্যঞ্জক ফলাফর দেখিয়েছে। তবে তাদের ভ্যাকসিন ঠাণ্ডা স্থানে সংরক্ষণ করার জন্য যে অর্থ ব্যয় হবে তা দরিদ্র দেশগুলোর জন্য, বিশেষত উষ্ণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বিভিন্ন দেশের নেতারা প্রথমে তাদের নিজস্ব লোকদের রক্ষা করতে চান-কারণ তারা তাদের নাগরিকদের কাছে দায়বদ্ধ। তবে মহামারী মোকাবেলায় প্রচেষ্টা অবশ্যই সম্মিলিত হতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নেতৃত্বে একক ভ্যাকসিন নীতির জন্য যে কোভাক্স জোট গঠিত হয়েছে, তাতে কাজ যুক্ত আছে ১৮৬টির মতো দেশ। ঐক্যবদ্ধ প্রক্রিয়ায় ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করতে চাইছে সংস্থাটি। এই জোট নিজেদের জনসংখ্যার কমপক্ষে ২০ শতাংশ ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন সংগ্রহ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে বিশ্ব সংস্থা সংস্থা।

এই কর্মসূচি এমনভাবে গ্রহণ করা হয়েছে যে, ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোকে সহায়তা করতে সম্মত হয়।

কোভাক্স ইতোমধ্যে কয়েক মিলিয়ন ডোজ ভ্যাকসিন ক্রয়ের চুক্তি করেছে। অক্সফোর্ডের সাথে ভ্যাকসিন তৈরির অংশীদার অ্যাস্ট্রাজেনিকা এই উদ্যোগের অংশ।

অ্যাস্ট্রাজেনিকা’র সিও পাস্কাল সরিওট বলছেন, তাদের এই উদ্যোগ প্রত্যেকেটি দেশকে একই সময়ে কম বেশি ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে সক্ষম হবে।

আরও বলছেন যে, মহামারী চলাকালীন তারা ভ্যাকসিন থেকে কোনো লাভ করবেন না।

ফাইজার কোভাক্স উদ্যোগে এখনো চুক্তি করেনি। তবে আলোচনা চলছে। তারাও বলছে যে, ভ্যাকসিনে সবার প্রবেশ নিশ্চিত করার ব্যাপারে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মহামারী মোকাবেলায় বিশ্বব্যাপী ভ্যাকসিন নিশ্চিত করার ব্যাপারে সব পক্ষকে আরও বেশি কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারনশ্যানাল ও অক্সফামসহ বিভিন্ন সংস্থা।

বিভিন্ন দেশে সংক্রমণ, মৃত্যু ও স্বাস্থ্যবিধি পৃথক হলেও বিম্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনা মোকাবেলায় সকল দেশের ভ্যাকসিন পাওযা দরকার। এটি এমন এক মহামারী যে, যদি সব দেশ সুরক্ষিত না হয়, তাহলে কোনো দেশই নিরাপদে থাকতে পারবে না’।