চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সত্যিকারের বারী সিদ্দিকী হয়ত অজানাই থেকে যাবেন: আহমাদ মাযহার

লাখো ভক্ত ও কাছের মানুষকে চোখের জলে ভাসিয়ে বারী সিদ্দিকী চলে গেছেন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে। তাঁকে নিয়ে টুকরো টুকরো নানা স্মৃতি, তাঁর অনেক গল্প সবার সাথে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন তাঁর পরিচিতজনেরা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এই মুহূর্তে নিউইয়র্কে অবস্থানরত শিশু সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক, গবেষক আহমাদ মাযহারও বারী সিদ্দিকীকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেছেন তাঁর ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে।

গায়ক বারী সিদ্দিকীর আড়ালে বংশীবাদক ও বাঁশির কারিগর বারী সিদ্দিকী যে হারিয়ে গিয়েছিলেন তা জানা যায় আহমাদ মাযহারের কথা থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল্যের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতোকত্তর সম্পন্ন করা বারী সিদ্দিকী শুধুমাত্র বাঁশির প্রতি ভালবাসা থেকেই বিটিভির বংশীবাদকের ছোট পদে চাকুরি করেছেন বলে মনে করেন তিনি। শুধু লোক, মরমী নয়, উচ্চাঙ্গ সংগীতে বারী সিদ্দিকীর যে দখল, সেই কথাও অনেকের অজানা বলেই অনেক ক্ষেত্রে প্রাপ্য সম্মান তিনি পানি নি বলেই অভিমত আহমাদ মাযহার এর। তাঁর ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হল-

বিজ্ঞাপন

‘হালে বাংলাদেশে উচ্চাঙ্গ সংগীতের চর্চাকে কিছুটা সম্মান দেয়া শুরু হয়েছে। কিন্তু একজন সাধকেরও এখনো বাংলাদেশে সংগীত সাধনা করে টিকে থাকতে পরার মতো অবস্থা গড়ে ওঠেনি। আমি যখন বারী সিদ্দিকীকে দেখতাম তখনই এমনটা মনে হতো। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমরা কয়েকজন প্রাচ্যীয় সংগীত আস্বাদন করার জন্য প্রয়াসী হয়েছিলাম। বাংলাদেশ টেলিভিশনের হাবীব আহসান আমাদের ঐ অভিযানের অধিনায়ক ছিলেন। বারী সিদ্দিকীর কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত শিখতেন তিনি তখন। সে সময় কয়েক বছর ধরে আমরা নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে আলাপচারিতা ও ওয়ার্কশপের মতো করে সংগীতকে বুঝবার চেষ্টা করতাম। তখন অনুভব করেছি তাঁর সাধনার স্তর কতটা উচ্চে।
বাংলাভাষার বেশকিছু সাংগীতসাহিত্যও আমরা তখন পড়েছিলাম। বারীভাইয়ের কথা থেকে বুঝতাম আধুনিকতা ও হিন্দুস্তানি সংগীতের পথরেখা ধরে কতটা দূরে তিনি গিয়েছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে দীর্ঘকাল তিনি ছোট পদের বংশীবাদকের চাকরি করতেন কেবল সংগীতসাধনা করবেন বলে। না হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে মাস্টার্স করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছোটমাপের চাকরিতে পড়ে থাকবেন কেন? আমাদের সমাজ সংগীত সাধনাকে সাধারণ মাপের কেরানিবিদ্যার সঙ্গে তুলনা করে বলে বারীভাইকে দীর্ঘকাল ঐ ছোটপদের চাকরি করতে হয়েছে। অনেকেকে এমনও দেখেছি চাকরির মাপে তাঁকে মাপতে। বড় বেদনাদায়ক আমাদের সমাজের সম্মান মাপার মানদণ্ড!
বারীভাই সাধনা করতেন বাঁশির। বংশীবাদকদের মধ্যে পথিকৃৎ পূর্বসূরী পান্নলাল ঘোষের মতোই তিনিও নিজহাতে বাঁশি বানাতেন। মনের মতো সুর বের করার জন্য কতো সাধনা ছিল তাঁর! নব্বইয়ের দশকে তাঁকে দেখেছি সত্যিকারের একজন সাধনানিমগ্ন মানুষ হিসেবে। বাঁশি নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মাঝেমধ্যেই কণ্ঠেও তুলতেন সুর। গানের মাটি নেত্রকোণায় জন্ম তাঁর। সেই সূত্রে ছোটবেলা থেকেই সে অঞ্চলের বড়বড় গুণীসাধকের রচিত বহু গান তো তিনি এমনিতেই জানতেন। আনুষ্ঠানিক পরিবেশনের উদ্দেশ্যে তেমন গাইতেন না! গান তিনি গাইতেন খুবই ভালো, কিন্তু তাঁর সাধনা ছিল বাঁশিতে। আমরা লক্ষ করেছি কণ্ঠের তুলনায় বাঁশিবাদনে তাঁর সিদ্ধি কতটা উচ্চে! তিনিই আমাদের বুঝিয়েছিলেন কেউ একবার সুরের গভীরে পৌঁছে যেতে পারলে তার সমস্ত সত্তা সুরের দাস হয়ে যায়! যিনি কণ্ঠস্বর দিয়ে সুরসৃষ্টির সাধনা করেন না তিনিও যখন কণ্ঠে গেয়ে উঠবেন তখন তা এমন সুরলোক সৃষ্টি করতে পারে যে অন্যদের বিস্মিত হয়ে যেতে হয়।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে হুমায়ুন আহমেদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা হলে তিনি তাঁর ছবিতে একটি গানের ব্যবহার করেন। সম্ভবত হুমায়ূন আহমেদের একটি দুটি টিভি অনুষ্ঠানেও বারীভাই গান গাইলে গায়ক হিসেবে পরিচিতি পেতে থাকেন। ততদিনে জীবিকার জন্য বাঁশি সংগত করা তিনি ছেড়ে দিয়েছেন। এর পর থেকে বাঁশিসিদ্ধ বারী ভাই হারিয়ে যেতে থাকলেন গায়ক বারী সিদ্দিকীর আড়ালে! তখন থেকে গায়ক হিসেবে তাঁর স্বতন্ত্র জন্ম হয়। লোকজ ও মরমি সুরের সঙ্গে তাঁর উচ্চাঙ্গ সংগীতের উচ্চতর শিক্ষা যুক্ত করে নিজস্ব এক গায়কী উদ্ভাবন করেন। মাঝে মাঝে বাঁশিকে স্বতন্ত্রভাবে যোগ করে তাকে করে তোলেন বারীয় গায়কী।
হায়, বারী সিদ্দিকীর গায়নে লোকগানের সঙ্গে উচ্চাঙ্গ সংগীতের সাধনার যে পরিচয় ছিল তার সম্মানও আমাদের সমাজ যথেষ্ট দিতে পারে নি। শেষের দিকে বারীভাই একধরনের ফকিরি বেশভূষা ধরেছিলেন তাঁর বিশেষ ধরনের গানের সঙ্গে ব্যক্তিত্বে সামঞ্জস্য আনবার জন্য। তবে বাঁশিতে তাঁর যে সিদ্ধি তা যদি সমাজে সম্মান পেত তাহলে হয়তো আমরা উচ্চাঙ্গ সংগীতের সাধনায় প্রতিভাবানদের আরো বেশি করে দেখতে পেতাম।
চ্যানেল আইয়ে তিনি আসতেন মাঝে মাঝে। সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে হঠাৎ হঠাৎ আড্ডায় মেতে উঠতাম আমরা। কখনো কখনো দীর্ঘ অাড্ডাও হয়েছে হাবীব আহসানসহ। অনুভব করতাম সাধনার অনেক গূঢ়কথা তিনি সুরের মধ্যদিয়ে আমাদের কাছে বলতে চাইতেন। কিন্তু আমাদের মূর্খতা পদে পদে তাঁকে থামিয়ে দিতে চাইত। ভালো সমজদার পেতেন না বলে কী যে দুঃখ তাঁর ছিল! চারপাশে যাঁদের সঙ্গে চলতে হতো তাঁদের মধ্যে তাঁর স্তরের সংগীতসিদ্ধ মানুষ প্রায় ছিলই না বলতে গেলে। ফলে তাঁর সাধনার গূঢ়তা অজানাই থেকে গেল। সাধক বারী ভাইকে মূল্যায়ন করার মানুষ বাংলাদেশে বিরল বলে সত্যিকারের বারী সিদ্দিকী হয়তো অজানাই থেকে যাবেন।
আমার সাধারণ বোধ দিয়ে লোকসংগীত থেকে উত্থিত, হিন্দুস্তানি উচ্চাঙ্গ সংগীতে সিদ্ধ, মরমীভাবে উজ্জীবিত একজন আধুনিক সাধক শিল্পী হিসেবেই তাঁকে অনুভব করি। বারী ভাই চলে গেলে কী হবে, আমার অবশিষ্ট জীবনের জন্য রেখে গেছেন তাঁর সঙ্গপ্রাপ্তির আনন্দটুকুকে! আমার অন্যতম অসম্পূর্ণতা এই যে, তাঁর সংগীতসাধনার সমজদার হিসেবে তাঁর সঙ্গী হতে পারিনি।’

চ্যানেল আই অনলাইন- আহমাদ মাযহারের ফেসবুক পোস্ট

চ্যানেল আই অনলাইন- আহমাদ মাযহারের ফেসবুক পোস্ট
  আহমাদ মাযহারের ফেসবুক পোস্ট

বিজ্ঞাপন