চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সত্যজিতের হাতে গড়া তারা

বাঙালির এক বিস্ময় সত্যজিৎ রায়। আজও এই নামের কোনও উত্তরসূরি নেই বাংলা সিনেমায়। গুণী এই নির্মাতার আজ ১০০তম জন্মদিন। অসাধারণ সব চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি খ্যাতি পেয়েছেন পুরো বিশ্ব জুড়ে। তার ছবিতে প্রতিষ্ঠিত মুখের পাশাপাশি দেখা গেছে নতুন নতুন মুখ। তিনি নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন বহু তারকাকে।

কোনো সিনেমা নির্মাণের আগে তার কল্পনায় থাকতো চরিত্রগুলো। অনেক সময় চরিত্রদের স্কেচ করে রাখতেন খাতায়। এরপর মনে গেঁথে থাকা সেই রূপের সাথে মিল আছে এমন মানুষকে খুঁজে নিতেন সিনেমার জন্য। ছবি মুক্তি পেলে অবাক হয়ে যেত দর্শক। চরিত্রের সাথে এতটা মিলিয়ে শিল্পী বেছে নেয়ার এই ক্ষমতায় মুগ্ধ হতেন দর্শকরা। প্রশ্ন উঠত, নতুন শিল্পীদের কী করে এত নিখুঁত অভিনয় শিখিয়ে নিতেন তিনি?

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সত্যজিৎ রায় প্রতিষ্ঠিত অভিনেতাদের কাছ থেকে যেমন নতুন ধরণের কাজ আদায় করে নিতে জানতেন, তেমনই নতুনদের দিয়েও দক্ষ অভিনেতার মতো কাজ করিয়ে নিতে পারতেন।

‘পথের পাঁচালী’র ইন্দির ঠাকরুনকে খুঁজে খুঁজে পতিতালয় থেকে বৃদ্ধা চুনিবালাকে পাওয়ার ইতিহাস সকলেরই জানা। ‘পথের পাঁচালী’ মুক্তি পাওয়ার আগেই চুনিবালা দেবী মারা যান। সেটা আগাম বুঝতে পেরে তার কাছে গিয়ে প্রজেক্টরে ছবিটি দেখিয়ে এসেছিলেন সত্যজিৎ। তাকে দিয়ে ওই অসামান্য অভিনয় করিয়ে নেওয়া যেন এক রহস্য।

‘প্রতিদ্বন্দ্বী’র অভিনেতা ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, “সত্যজিৎ রায়ের দুই ধরনের রীতি ছিল। এক ধরনের অভিনেতাদের ছেড়ে দিতেন। তারা নিজেদের মতো করে করতেন। আর আরেক ধরনের অভিনেতাদের একদম অভিনয় করে দেখিয়ে দিতেন।” দেখিয়ে দিলেই বা সবাই এত নিখুঁত করে অভিনয় করতেন কী ভাবে? ধৃতিমান একটি তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলেছেন এই প্রসঙ্গে, “অভিনেতা নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরেই তিনি চিত্রনাট্যের রচনায় হাত দিতেন। এটা আমার ধারণা। কোন অভিনেতা বাস্তব জীবনে কিভাবে কথা বলেন সেটা মাথায় রেখেই সংলাপ লিখতেন।”

সত্যজিতের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। এ বিষয়ে জানা যায় নানা ঘটনার কথা। ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র আদিবাসী কন্যা দুলির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন সিমি গারেওয়াল। তাকে সত্যজিৎ প্রথম দেখেছিলেন রাজ কাপুরের বাড়িতে। অন্য কাজে গিয়েছিলেন। কিন্তু সিমিকে দেখার পর তিনি যে তাকে বিশেষ ভাবে লক্ষ করছেন, এটা সিমির চোখে পড়েছে। শুধু এটা নয়, উপস্থিত অনেকেরই নজরে পড়েছিল বিষয়টি। তখন সকলেই বলেছিলেন যে, সত্যজিৎ তাকে বিশেষভাবে লক্ষ করছেন মানে তিনি হয়ত কোনও ছবিতে ডাক পাবেন। হয়েছিলও তাই। কিন্তু অভিজাত ও শহুরে সিমিকে কেন তিনি আদিবাসী মেয়ের চরিত্রে নির্বাচন করলেন, সেটা সকলের কাছে বিস্ময়ের।

স্মিতা পাতিলের গ্ল্যামার ভেঙে ‘সদগতি’- তে তিনি স্মিতাকে যে অস্পৃশ্য নারী চরিত্রে ব্যবহার করলেন তা আজও সকলের মনে গেঁথে আছে। স্মিতার অভিনয়ের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে সত্যজিৎ ‘ঝুরিয়া’ চরিত্রটি গড়ে তুললেন।

বিজ্ঞাপন

সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরেই অভিনয়ে এসেছেন শর্মিলা ঠাকুর। ‘অপু’ সৌমিত্রের বিপরীতে শর্মিলা ঠাকুর প্রথম অভিনয় করেছেন। এরপর ‘দেবী’ করে সেই অভিনেত্রী মুম্বাই গেলেন ‘কাশ্মীর কি কলি’ করতে। বাংলা ছবি ও বলিউড পেল নতুন এক অভিনেত্রীকে।

মাধবী মুখোপাধ্যায়কে ‘চারুলতা’ ছবিতে আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকাতে বলে একটি আলাদা ছবি তুলেছিলেন সত্যজিৎ। তখন বুঝতে না পারলেও পরে অভিনেত্রী দেখেন সিনেমায় সেটি একটি দারুণ শট।

সবসময়েই যে খুব সহজেই মনের ভেতরের ছবির সাথে মিলিয়ে অভিনয়শিল্পী পেয়ে গেছেন সত্যজিৎ, তা নয়। মন মতো শিল্পী না পাওয়ায় একটি সিনেমার জন্য অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে তাকে। ‘পথের পাঁচালী’ বানানোর আগেই তার ভাবনা ছিল রবীন্দ্রনাথের ‘ঘরে বাইরে’ নিয়ে। কিন্তু বিমলার চরিত্রে কে অভিনয় করবে, সেটা খুঁজেই চলেছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত থিয়েটার অভিনেত্রী স্বাতীলেখা সেনগুপ্তকে দেখার পর ১৯৮১ সালের নভেম্বরে ‘ঘরে বাইরে’ ছবির শুটিং শুরু করেন।

আবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আলোচনা থেকে জানা যায়, ‘অপরাজিত’ ছবির জন্য সৌমিত্রকে তিনি ডেকেছিলেন। তাকে দেখেই ‘ওহ, বড় হয়ে গেছ!’, বলে ওঠেন সত্যজিৎ। সে বার সৌমিত্র সুযোগ পাননি, কিন্তু অপু ট্রিলজির তৃতীয় ছবি ‘অপুর সংসার’-এর জন্য সেদিনই তিনি সৌমিত্রকে মনে মনে নির্বাচন করে রাখেন। ‘গুপী গাইন ও বাঘা বাইন’-এর চিত্রনাট্য শুনে সৌমিত্র নিজে থেকেই গুপীর চরিত্রটি করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সত্যজিৎ কিছুতেই রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত খুঁজে খুঁজে তপেন চট্টোপাধ্যায়কে নির্বাচন করেন। তারপর তো ইতিহাস।

তুলসী চক্রবর্তী ও রবি ঘোষকে আন্তর্জাতিক মানের অভিনেতা মনে করতেন সত্যজিৎ। এই দু’জনকেই যোগ্য চরিত্র দিয়ে গেছেন তিনি। তুলসী চক্রবর্তীকে প্রধান চরিত্রে রেখে ‘পরশপাথর’ নির্মাণ করেন আর রবি ঘোষ ‘বাঘা বাইন’ হিসেবে সারা বিশ্বে সমাদৃত।

শেষবেলায় ‘আগন্তুক’-এ নতুন রূপে উৎপল দত্তকে উপস্থিত করেন নির্মাতা। খুঁজে পেয়েছেন কানু বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্তোষ দত্ত, করুণা বন্দ্যোপাধ্যায়, কণিকা মজুমদার, প্রদীপ মুখোপাধ্যায়দের। অল্পবয়সী সুবীর-উমা-কুশল-চন্দনাদের। জীবন থেকে গল্পের মানুষ খুঁজে খুঁজে বের করে তিনি সিনেমায় রাখতেন জীবনের প্রতিরূপ।

আনন্দবাজার