চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সতেরো আগস্টের বোমা সন্ত্রাসের ১৪ বছর: জঙ্গিবাদের শেষ কোন পথে?

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। সকাল থেকে সারাদেশ কেঁপে উঠলো একযোগে বোমা হামলায়। মুন্সীগঞ্জ বাদে বাকি ৬৩ জেলার পাঁচ শতাধিক স্থানে আকস্মিক বোমা সন্ত্রাস। মূল লক্ষ্য আদালত, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন অফিস পাড়া। রাজধানীর ১৮ জায়গায়। জেলা থেকে উপজেলায়ও। দুইজন নিহত। আহত সারাদেশে কয়েকশ’। একযোগে এই হামলায় বাংলাদেশে সে সময়ে জঙ্গিবাদের উত্থান ও বিকাশের সব চেহারা দাঁত বের হয়ে পড়ে। এর আগে থেকেই দেশে উগ্র সশস্ত্র সাম্প্রদায়িক জঙ্গিবাদের উত্থান সম্পর্কে অভিযোগ ছিলো। নানা ঘটনা ঘটেই চলেছিলো একের পর এক। কিন্তু সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফ থেকে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব সরাসরি অস্বীকার করে আসা হচ্ছিলো। কিন্তু এবার আর  অস্বীকারের কোনো পথ থাকলো না। জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি) ঘোষণা দিয়েই তাদের অস্তিত্ব জানান দিলো। সারাবিশ্বে আলোচিত হলো সেদিনের দেশব্যাপী বোমা সন্ত্রাসের ঘটনা। সরকারও এই পর্যায়ে বাধ্য হলো জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে।
বাংলাদেশে এই উগ্র সশস্ত্র জঙ্গিবাদের সূচনা আরো আগেই। বোধ করি, নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই। কিন্তু তখন এরা এতো বেশি সংগঠিত ছিলো না। আফগান যুদ্ধফেরত জিহাদীদের একাংশ জামায়াত-শিবিরের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদে সংগঠিত হয়। তারা তখন ভেতরে ভেতরে সংগঠিত হতে থাকে। কিন্তু প্রকাশ্যে তেমন কোনো তৎপরতা ছিলো না তাদের। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম সরকার ক্ষমতায় আসার পর এরা আস্তে আস্তে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। সম্প্রতি ফাঁসির দণ্ড কার্যকর হওয়া জঙ্গিনেতা মুফতি হান্নানের বিভিন্ন মামলায় দেওয়া জবানবন্দীগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সে সময়কার প্রধান এই জঙ্গিনেতা হরকাতুল জিহাদ (হুজি) নামের সংগঠনের ব্যানারে জঙ্গিবাদী তৎপরতা সংগঠিত করে। শেখ হাসিনাকে ইসলামের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে হত্যার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তারা। সে অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ওই দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ২০০০ সালের জুলাইয়ে কোটালিপাড়ায় তার সমাবেশে দূর নিয়ন্ত্রিত শক্তিশালী বোমা পুতে রেখে তাকে হত্যার চেষ্টা চালায়। এছাড়া ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে সিলেট ও বাগেরহাটে তাকে হত্যাচেষ্টা চালানো হয়।
শেখ হাসিনার ওই শাসনামলেই রমনার বটমূলে ছায়ানটের বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান,যশোরে উদীচীর সম্মেলন,পল্টন ময়দানে সিপিবি’র সমাবেশ-সহ বিভিন্ন সাথে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, সিনেমা হল, মাজার, মন্দির, গির্জা ইত্যকার স্থানে বোমা হামলা হতে থাকে। সরকারের তরফ থেকে জোর চেষ্টা চালানো হয় এসব ঘটনা প্রতিরোধ করতে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবেও তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার খুব একটা শক্তিশালী ছিলো না। কোটালিপাড়ায় বোমা পুতে রেখে শেখ হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার মামলা-সহ অন্যান্য বোমা হামলাগুলোর ক্ষেত্রে দায়েরকৃত মামলা পরবর্তীতে বিএনপি-জামাত জোট সরকার ক্ষমতায় এসে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা’ হিসেবে খারিজ করে দেয় কিংবা বিচারপ্রক্রিয়াকে ডিপ ফ্রিজে নির্বাসিত করে।

২০০১ সালের ১ অক্টোবরের বিতর্কিত নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে বিএনপি-জামাত-বিজেপি-ইসলামী ঐক্যজোটের সরকার। সেবার জামাতের দুই শীর্ষ নেতা তথা দুই শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী করেন বেগম খালেদা জিয়া। তারা দু’জন সরাসরি জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে পৃষ্ঠপোষকতা জোগান। এর বাইরে বিএনপি’র আরো কয়েকজন নেতা আদর্শগত কারণে এবং স্থানীয় রাজনীতিতে ক্ষমতাবলয় শক্তিশালী করার প্রয়োজনে সশস্ত্র জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলোকে প্রশ্রয় দেন। আর বিএনপি’র দ্বিতীয় প্রধান নেতা তারেক রহমান বিপক্ষ রাজনৈতিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার মারাত্মক প্রতিহিংসায় মত্ত হয়ে এসব জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীগুলোকে কোলে তুলে নেন। ফল হিসেবে জঙ্গিবাদী সংগঠনগুলো সে সময় সরাসরি রাষ্ট্রীয় ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে।

বিজ্ঞাপন

ওই সময়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ও জলসীমা ব্যবহার করে দশ ট্রাক অস্ত্র আসে ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফা নামের সংগঠনের কাছে হস্তান্তর করার জন্য। বগুড়ায়ও আটক হয় আরো চার ট্রাক অস্ত্র। বর্তমান সরকারের আমলে এসব অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার তদন্ত ও বিচার করতে গিয়ে তারেক রহমান, তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি-জামাত আমলের ক্ষমতার বিকল্প ভরকেন্দ্র হাওয়া ভবনের ঘনিষ্ঠ হারিছ চৌধুরী, জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বেশকিছু শীর্ষ কর্মকর্তার জড়িত থাকার প্রমাণ উঠে আসে।

বিএনপি-জামাত আমলে জঙ্গিবাদের মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার অভিযোগ বারবার উচ্চারিত হয় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর তরফ থেকে। সে সময়কার গণমাধ্যমেও এসব বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। কিন্তু তৎকালীন সরকারের তরফ থেকে বারবার এসব অভিযোগকে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু রাজশাহী অঞ্চলে জেএমবি’র সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই এবং শায়খ আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে ভয়ংকর ও নৃশংস জননির্যাতন শুরু হলে দেশের সর্বমহলে তোলপাড় ওঠে। কিন্তু তখনও নিজামীসহ অন্যান্য মন্ত্রীরা এবং এমনকি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘দেশে কোনো জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই’ বলে বাগাড়ম্বর করেন। এমনকি একে ‘মিডিয়ার সৃষ্টি’ বলেও উড়িয়ে দেন। কিন্তু পরবর্তীতে বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমান গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাদের জবানবন্দীতে পরিষ্কার জানা যায়, ওই সরকারের মন্ত্রী নিজামী, মুজাহিদ, ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, ফজলুর রহমান পটল, এমপি নাদিম মোস্তফা, আলমগীর কবির, আবু হেনা তাদের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এসব মন্ত্রী-এমপিদের সাথে তাদের একাধিক আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয় ঢাকা, রাজশাহী ও নাটোরে।

পরবর্তীতে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ইতিহাসের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা সংঘটিত হয়। সে যাত্রায়ও শেখ হাসিনা প্রাণে বেঁচে গেলেও বেগম আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন পাঁচশোর বেশি মানুষ। তখনও এ ঘটনায় জঙ্গিবাদীদের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও বিএনপি-জামাত জোট সরকারের তরফ থেকে একে ‘আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব’ ও ‘সাজানো নাটক’ বলে জঘন্য মিথ্যাচার করা হয়। ২১ আগস্টের সে গ্রেনেড হামলার বিচার নিম্ন আদালতে ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। দেখা গেছে, তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর, আলী আহসান মুজাহিদদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনে ও পরিকল্পনায় ওই ঘটনা বাস্তবায়ন করে মুফতি হান্নানের মতো জঙ্গিরা।পরের বছর ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশের পাঁচ শতাধিক স্থানে একযোগে বোমা বিস্ফোরণের দিন জঙ্গিরা তাদের লিফলেট ছড়িয়ে যায়। তাতে লেখা ছিলো- রাষ্ট্রের এই তাগুদি আইনকানুন তারা মানে না। তারা ইসলামের শাসন চায়। তারা এই বাঙালি শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিক্ষা সবকিছুর ধ্বংস চায়। তারা ইসলামের নামে তথাকথিত জিহাদের সৈনিক। তারা সেদিন আরো হামলার হুমকিও দেয়।

বিজ্ঞাপন

এবার আর কোনোভাবেই বিএনপি-জামাত জোট সরকার জঙ্গিবাদকে মিথ্যা অভিযোগ কিংবা মিডিয়ার সৃষ্টি বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ পায়নি। কারণ ততোক্ষণে সারা দুনিয়ার টনক নড়েছে। বাংলাদেশের জঙ্গিবাদ দমনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কঠোর আহ্বান উচ্চারিত হয়েছে।
এরপর ওই বছরই ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারক সোহেল আহমেদ চৌধুরী ও জগন্নাথ পাঁড়ে হত্যার ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন তোলে। ওই সময় বোমা হামলাকারী জেএমবি সদস্য ইফতেখার হাসান আল মামুন হাতে-নাতে ধরা পড়ে। তখন আর সরকারের ঢাক ঢাক গুড় গুড় করার সব সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এ দুই বিচারক হত্যা মামলায় জেএমবি প্রধান শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইসহ সাতজনের ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ রাতে আল মামুন ছাড়া ছয়জনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।
এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও জাতীয় পার্টিসহ সম্প্রসারিত মহাজোট। নীতিগত ও আদর্শগতভাবে শেখ হাসিনার এই সরকার জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। সারাদেশে জঙ্গিবাদের নেটওয়ার্ক গুড়িয়ে দেওয়া সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছে এই সরকার। টানা তৃতীয় মেয়াদে এখন এই সরকার ক্ষমতায়। কিন্তু এর মধ্যেও গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে ভয়ংকর জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে গেছে। সে ঘটনায় বেশ কয়েকজন বিদেশি নাগরিকও হত্যার শিকার হয়েছেন। শোলাকিয়ার ঈদ জামাতেও জঙ্গি হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তবে সরকারের তরফ থেকে বা রাষ্ট্রীয় কোনো পৃষ্ঠপোষকতা জেএমবি, হুজি বা অন্য কোনো জঙ্গি সংগঠন পাচ্ছে না। এসব জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রধান পৃষ্ঠপোষক জামায়াতে ইসলামী ও তাদের দক্ষিণপন্থী রাজনীতির প্রধান মিত্র বিএনপি আজ কোনঠাসা। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াতের প্রধান সব নেতা এবং বিএনপিরও একাধিক শীর্ষ নেতার বিচার করে মৃত্যুদণ্ডসহ অন্যান্য দণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ইতোমধ্যে।
কিন্তু রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ আর ক্ষমতার মারপ্যাঁচে সরকার উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদী অন্যান্য গোষ্ঠীর সাথে রাজনৈতিক আপোসের ভয়ংকর খেলায় মেতেছে। আজ জামায়াতে ইসলাম ও ছাত্র শিবির দুর্বল হয়েছে। কিন্তু সরকারের আস্কারায় শক্তিশালী হয়েছে হেফাজতে ইসলাম। যারা মনে করছেন, হেফাজত আর জামায়াতের মধ্যে পার্থক্য আছে, তারা ভুল করছেন। যারা মনে করছেন, হেফাজত কওমী মাদ্রাসাপন্থী বলে জামায়াতের সাথে তাদের দূরত্ব আছে, তারা ভুল করছেন। আদতে জামায়াতে ইসলামী যখন দুর্বল হয়, তখন তারা ভিন্ন কোনো প্লাটফরমে মাথা গোঁজার আশ্রয় খুঁজে নেয়। এক্ষেত্রে এখন তাদের আশ্রয় হেফাজতে ইসলাম। আর জামায়াতের নেতাকর্মিরা তো ঝাঁকের কইয়ের মতো আশ্রয় নিয়েছে আওয়ামী লীগের নৌকায়ও। এরা সুযোগসন্ধানী শয়তানের দল। অপেক্ষায় আছে সুযোগের- ছোঁবল মারবে বলে।

আর হেফাজতে ইসলাম আদর্শগতভাবে যা ধারণ করে, তা কোনোভাবেই মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের মূলনীতির সাথে যায় না। হেফাজতে ইসলাম বাঙালি সংস্কৃতি-শিক্ষা মানে না। অথচ তাদের আব্দার রেখেই শেখ হাসিনার সরকার পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যপুস্তক পাল্টে ফেলে, তাদের কথামতোই ভাস্কর্য অপসারণ করে, তাদের হাতে সরকারি জমি তুলে দেয়, তাদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা করে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাঙালির মনে দগদগে ঘা তৈরি করে এই বাংলার আশার আলো বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা গণভবনে ডেকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের নেতাদের আপ্যায়ন করেন, তাদের দেওয়া সংবর্ধনা সভায় যোগ দেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন, সেই সোহরাওয়ার্দীতেই শেখ হাসিনা যান স্বাধীনতাবিরোধী, মানবতাবিরোধী, বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে সংবর্ধনা নিতে।

আওয়ামী লীগের জন্যও এ লজ্জার, শেখ হাসিনার জন্যও এ লজ্জার।
এই হেফাজতে ইসলামই যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ সাজার দাবিতে গড়ে ওঠা তারুণ্যের শাহবাগ আন্দোলনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী এক চরম নৈরাজ্য ও অরাজকতার জন্ম দিয়েছিলো। সেদিন বিএনপি-জামাত আর এরশাদের আনুকূল্য নিয়ে এই হেফাজতে ইসলামই কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশের দখল নিতে চেয়েছিলো। এই আওয়ামী লীগ সরকারই ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলে হেফাজতের দেশবিরোধী তৎপরতা দমন করেছিলো। সেই আওয়ামী লীগ যখন হেফাজতে ইসলামের সাথে আপোস করে পাঠ্যবিষয় পাল্টে ফেলে, রবীন্দ্রনাথকে বাদ দিয়ে দেয় শিক্ষাক্রম থেকে, তখন বিপদের আশঙ্কা থেকেই যায়। তখন জঙ্গিবাদ দমনের আশা দূরাশায় পরিণত হওয়ার সুযোগ থেকে যায়।
কারণ জঙ্গিবাদ কেবল অস্ত্র ধরে তথাকথিত জেহাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং শিক্ষা-সংস্কৃতি-মনন-চেতনার সবটুকু দখর করাই ওদের লক্ষ্য। ওরা সেই লক্ষ্যে এগোচ্ছে। কিন্তু কেবলমাত্র ক্ষমতার রাজনীতির মারপ্যাঁচের হিসাবনিকাশ কষতে গিয়ে আওয়ামী লীগ তাদের হাতেই মনন পরিবর্তনের অস্ত্র তুলে দিচ্ছে। আওয়ামী লীগেরও মনে রাখতে হবে, এই জঙ্গিবাদের দ্বারা সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত তারাই। ফিদেল ক্যাস্ত্রোর পরে শেখ হাসিনাই সম্ভবত কোনো রাষ্ট্রনায়ক যাকে এতোবার হত্যার চেষ্টা করেছে এই বাংলাদেশবিরোধী জঙ্গিরা।

আওয়ামী লীগকে মনে রাখতে হবে, যে ইসলামপন্থী ভোটের আশায় আর নৈরাজ্যিক পরিস্থিতি থেকে শান্তি বজায় রাখার কৌশল হিসেবে এই হেফাজতে ইসলাম কিংবা যুদ্ধাপরাধী চরমোনাই পীরের ইসলামী আন্দোলনের মতো অপশক্তিকে আজ রাজনৈতিক স্পেস করে দেওয়া হচ্ছে, তা একদিন বুমেরাং হবে। সুযোগ পেলেই ওরা ছোবল দেবে, নৈরাজ্য আর অশান্তির চরম পরাকাষ্ঠা দেখাবে। আর ভোটের বাক্সে কোনোদিনই একজন মৌলবাদীর ভোটও নৌকা প্রতীকে পড়বে না। ভোট দেবার ন্যূনতম সুযোগটুকু পেলেই দাঁড়িপাল্লা খুঁজে না পেলে তারা ধানের শীষেই তাদের সিল দেবে। এটাই বাস্তবতা। ধর্মের আবরণ দিয়ে ধর্মতান্ত্রিক অপশক্তিকে মোকাবিলা করার কোনো পথ নেই।

বরং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে সংঘটিত মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক মানবিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা, তা দিয়েই এই পাকিস্তানপন্থী ধর্মতান্ত্রিক অপশক্তিকে মোকাবিলা করতে হবে। জঙ্গিবাদকে চূড়ান্তভাবে পরাস্ত করতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একশন দিয়েই হবে না, বরং মননে জঙ্গিবাদের শিকড় আর যাতে একজন বাঙালিরও গেড়ে বসতে না পারে, সেই মনস্তাত্ত্বিক লড়াই শুরু করতে হবে। এ ভিন্ন আর কোনো পথ খোলা নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।) 

Bellow Post-Green View