চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সঙ্কট সময়ে ত্রাণ চুরি: প্রশ্নবিদ্ধ নেতৃত্ব

সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সারা বিশ্বে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ২০ লাখ ছাড়িয়েছ এবং মৃত্যুবরণ করেছেন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার জন। বাংলাদেশে ইত্যবসরে করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দেড় হাজার জন এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ৫০ জন। কাজেই, পরিসংখ্যান দেখে অনুধাবন করা যাচ্ছে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে করোনা ভাইরাস খুবই তীব্রভাবে বিশ্ববাসীর উপর ঝেঁকে বসেছে এবং প্রতিনিয়ত ভাইরাসটির রূপ, গতি প্রকৃতি ও প্রবাহের স্বতস্ফূর্ততা বিজ্ঞানী এবং গবেষকদের দুশ্চিন্তার মধ্যে নিপতিত রাখছে। কেননা, এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে প্রতিকারে তেমন কোন কার্যকর ভ্যাকসিন কিংবা মেডিসিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই বলা যাচ্ছে করোনার সঙ্কট গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে এবং সঙ্কট থেকে পরিত্রাণের জন্য সতর্কতার বিকল্প নেই।

করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা ও এর ফলে উদ্ভূত সঙ্কট একটি বৈশ্বিক সমস্যা, ফলশ্রুতিতে সমগ্র বিশ্বের লক্ষ কোটি জনতা করোনার কারণে অসহনীয় যন্ত্রণা ও খারাপ সময় অতিবাহিত করছে। সময়ের আবর্তনে করোনা ভাইরাসের প্রভাবে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি যেমন হচ্ছে ঠিক তেমনিভাবে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও সামগ্রিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ৮ মার্চ ২০২০ থেকে বাংলাদেশে করোনার রোগী সনাক্ত হওয়ার পর থেকেই মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয় এবং পরবর্তীতে সরকারের সাধারণ ছুটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে সরকারিভাবে করোনাকে মোকাবেলার জন্য নানারকম উদ্যোগ ও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। মসজিদ মহল্লায় মাইকিং এর মাধ্যমে জনসাধারণকে সচেতনতায় উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

করোনার সংকটে সাধারণ ছুটি ঘোষণার কারণে দেশের একটি বিরাট অংশ বেকারে পরিণত হয়েছে এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে কোটি কোটি শ্রমিক চাকুরি হারিয়ে বেকার জীবন যাপন করছে। পরিস্থিতি অবলোকন করে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবার জন্য সরকারিভাবে কিছু জেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে আবার কিছু কিছু জায়গায় সচেতন সমাজ নিজেরা উদ্যোগী হয়ে লকডাউন পালন করছে। তবে লকডাউন কেমন কাজে আসছে তার উপর ভিত্তি করেই করোনা প্রতিরোধ কর্মকান্ড পরিমাপ করা সম্ভবপর হবে। লকডাউন কাজে আসছে না কারণ লকডাউনের নিয়মকানুন কেউই মানতে চাচ্ছে না। লকডাউন হচ্ছে যে যেখানে আছেন সেখানেই থাকতেই হবে, চলাচল স্থবির করে দিতে হবে, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে পারবে না। কিন্তু আমাদের যত সমস্যা ঘরে থাকা নিয়ে, সারাদিন ঘরে কোন রকমে থাকা সম্ভব হলেও সন্ধ্যার পরে একটুখানি বের না হলেই নয়। গ্রামের বাজারের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ, ঢাকার কাওরান বাজারের চিত্রও শঙ্কার সৃষ্টি করে থাকে।

বিজ্ঞাপন

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে পুলিশের সঙ্গে জনগণের চোর-পুলিশ খেলা, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাড়ির ছাদে জামায়াতে নামাজ আদায় করা, পাড়া-মহল্লায় চায়ের স্টল চালু রাখা, সন্ধ্যার পর দল বেঁধে আড্ডা দেওয়া ইত্যাদি কাজগুলো লকডাউনের মধ্যে চলছে। আবার দেখা যায়, করোনার উর্বরভূমি নারায়নগঞ্জ ও ঢাকা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে এবং নতুন করে সঙ্কট ও সমস্যা ঘনীভূত হচ্ছে। কেননা নারায়নগঞ্জ ও ঢাকা থেকে আসা কর্মজীবী মানুষেরা করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রদত্ত নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা করছে না। কাজেই বলা যায়, করোনার ভয়াবহতা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা কোন কাজেই আসবে না যতক্ষণ না পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে একীভূত হয়ে জনগণ করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে অগ্রনী ভূমিকা পালন না করে।

করোনার সংকট মোকাবিলায় সরকার নানা পেশা শ্রেণির মানুষের জন্য প্রণোদনা সহ জনমুখী প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে যারা শ্রমজীবী, দিনমজুর, রিকশাচালক, চা স্টলের দোকানদার, গার্মেন্টস কর্মী অর্থাৎ দৈনিক আয় করে সংসার পরিচালনা করে থাকে তাদের জন্য ত্রাণ সরবরাহ করা জরুরী হয়ে পড়েছে। কেননা ঘোষিত ও অঘোষিত লকডাউনের মাধ্যমে দেশে প্রায় ১ মাস ধরে অচলায়তন বিরাজ করছে। শহরে যারা শ্রমজীবী মানুষ বসবাস করে তাদের জন্য ত্রাণ সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে এবং ইতিমধ্যে দেশের বড় শহরগুলোতে ত্রাণের দাবিতে মানুষের মধ্যে বিক্ষোভ পরিলক্ষিত হচ্ছে। ত্রাণ না পেয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভের বহি:প্রকাশ সংবাদের শিরোনামে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত মানুষের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত ছিল করোনা রোগীর চেয়ে বাংলাদেশে ত্রাণ চুরের সংখ্যা বেশি। দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত চাল চুরির ঘটনা ফলাও করে প্রচার করছে। চাল চুরির ঘটনা খুব বেশি পরিমাণে ঘটায় সরকার ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির ব্যবস্থা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

সরকারের ঘোষিত; করোনা মোকাবিলায় যে বিশাল অংকের প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে তা যদি যথাযথভাবে জনগণের মাঝে বিতরণ করা যায় তাহলে জনগণ সহজেই লকডাউন মেনে নিবে। অর্থাৎ করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ও শক্তিশালী নিয়ামক হচ্ছে ঘরে থাকা, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা এবং নিরাপদে থাকা। কিন্তু পেটের তাড়নায় কাজের সন্ধানে মানুষকে ঘরের বাইরে যেতে হচ্ছে এবং করোনা ভাইরাসের বাহককে বহন করতে হচ্ছে এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেকেই সংক্রমিত হচ্ছে। উপর্যুক্ত ঘটনাগুলোর কারণে বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এ কথায় সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নিয়েছে, সরকার করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় যে বিশাল অংকের প্রণোদনা ঘোষণা করেছে তা যদি যথাযথভাবে জনগণের মধ্যে বন্টন করে দেয়া যায় তাহলে মানুষ উপকৃত হবে। কিন্তু সরকারের ঘোষিত প্রণোদনা জনগণের হাতে কি সুষ্ঠুভাবে পৌঁছাচ্ছে, এটাই বড় প্রশ্ন হয়ে জনমনে নিরাশার সৃষ্টি করেছে। পত্রিকার পাতায় মোটা দাগে দেখলে দেখা যায়, বিভিন্ন এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা চাল চুরির ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এবং সরকার কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ভিন্ন দৃষ্টি দিয়ে দেখলে দেখা যায় রাজনৈতিক দলের সদস্যরাও চাল চুরির ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং রাজনৈতিক দলের সদস্যদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিতে দেখা গেছে।

তবে এসব নেতা নির্বাচন এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণের দায় রয়েছে। কেননা, জনগণের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনের মাধ্যমেই নেতা এবং জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়ে থাকে। ভোটের সময় দেখা যায় কতিপয় জনগণ সামান্য টাকার বিনিময়ে ভোট বিক্রি করতে পিছপা হয় না। ভোট যে মানুষের পবিত্র অধিকার সেটা তারা বেমালুম ভুলে যায় এবং যার খেসারত বর্তমান সংকটের সময় জনগণকে দিতে হচ্ছে। কাজেই ভুল নেতা এবং ভুল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের দায়ভার জনগণকে নিতেই হবে এবং করোনা সংকটে সঠিক নেতৃত্বের অস্ফুট ও প্রায়োগিক নেতৃত্বের বিকাশের বিষয়টি সামনে চলে আসছে। সুতরাং করোনা সংকট থেকে জনগণকে সুরক্ষায় বহুমুখী বিষয় সম্বন্ধে অনুধাবন করার সুযোগ যেমন সৃষ্টি হয়েছে ঠিক তেমনিভাবে ইতিবাচক বিশ্বায়নের পক্ষেও জোরালো সমর্থন জোগাবে।

সমস্যা ঘনীভূত হওয়ায় সরকার ১০ টাকা কেজি দরের চাল বিক্রি বন্ধ রেখে আবার চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব বাজারে পড়তে শুরু করেছে। এ কথাও জোরের সঙ্গে বলতে হচ্ছে দেশের সব ইউনিয়নে সরকারের ত্রাণ সরবরাহ যথাযথভাবে সম্ভব হয়নি কিংবা সব ইউনিয়নে ত্রাণ সরবরাহ করা হয়নি। ত্রাণ সরবরাহের পূর্বে সরকারের উচিত ছিল সঠিকভাবে ম্যাপিং করে অতি দরিদ্র এলাকার জনগণের মাঝে ত্রাণ সরবরাহ এবং বিতরণ করা। বিশেষ করে গ্রামের যে সকল পরিবারে গার্মেন্টস শ্রমিক রয়েছে এবং তাদের পরিবারের কর্তা ব্যক্তি কৃষি পেশার সঙ্গে সম্পৃক্ত ঐ সকল পরিবার ২-১ মাস লকডাউন থাকলেও জীবন চালিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু যারা দিন আনে দিন খায় তাদের পরিবারে ইতিমধ্যে অভাব অনটন শুরু হয়েছে। তাদেরকে অনতিবিলম্বে ত্রাণ সরবরাহ করা না হলে বিশৃঙ্খলা শুরু হবে অচিরেই এবং করোনার প্রাদুর্ভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।

পরিশেষে বলা যায়, পুলিশ এবং আর্মির যৌথ উদ্যোগে সরকারের ত্রাণ সুষ্ঠু এবং পরিকল্পিত প্রক্রিয়ায় জনগণের মধ্যে বন্টনের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে একীভূত করে ত্রাণ বিতরণ ও সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে যার প্রেক্ষিতে জনগণ লকডাউন মেনে চলতে সচেষ্ট হয় এবং করোনা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ আলোর মুখ দেখে। জোরের সঙ্গে বলতে হয় ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে বিশদ কাজ করার সুযোগ রয়েছে এবং জবাবদিহীতামূলক সরকার ব্যবস্থাপনার কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে সরকার, জনগণ, সংবাদ মাধ্যম, দেশি বিদেশী সংস্থা প্রত্যেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্বশীল ও জনগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার ক্ষেত্রে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)