চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সকল অন্ধত্বের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান ও গবেষণার জয় হোক

গাছপালা, প্রাণী এবং মানবদেহের শরীরবৃত্তীয় শৃঙ্খল কিভাবে পৃথিবীর আবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলে এই রহস্যের উদঘাটন করার স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর চিকিৎসা বিজ্ঞানের নোবেল পেয়েছেন তিন আমেরিকান বিজ্ঞানী জেফরি সি হল, মাইকেল রোসব্যাশ এবং মাইকেল ডব্লিউ ইয়াং। তাদের নোবেল বিজয়ের ঘোষণার পর তাদেরকে অভিন্দন জানিয়ে প্রবাসী ডা. আমিনুল ইসলাম তার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। তিনি তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন:

অষ্টাদশ শতকে জ্যোতির্বিজ্ঞানী জ্যান জ্যাকস প্রথম ব্যাপারটা লক্ষ্য করেন। তিনি দেখেন বিশেষ একটি গাছের পত্রমঞ্জরী সূর্যোদয়ের সময় ছড়িয়ে যায় আর গোধূলী বেলায় চুপসে পড়ে। কী হবে যদি সারাক্ষণই গাছটিকে অন্ধকারে রাখা হয়? দেখা গেল কোন সূর্যালোকের ছোঁয়া না পেয়েও অন্ধকারে গাছের পাতাগুলি একই ভাবে একই সময়ে সম্প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। সে থেকে ধারণা করা হয় জীবকোষ তথা উদ্ভিদ বা প্রাণীদেহ তার অভ্যন্তরস্ত নিজেস্ব জীবঘড়ি (biological clock) এর ছন্দ মতো চলে।

বিজ্ঞাপন

দিনের কখনো আমাদের কর্মক্ষমতা থাকে বেশী, কখনো গ্রাস করে তন্দ্রা। আটলান্টিক বা প্রশান্ত পাড়ি দিয়ে নতুন টাইমজোনে নিজেকে মানিয়ে নিতে ক্ষণিকের তরে হলেও কেমন এলোমেলো হয়ে যায় শরীরবৃত্ত। নিজের অজান্তেই খুব ভোরে বা সন্ধ্যায় বা মধ্যরাত দ্বিপ্রহরে একেক সময় রক্তের একেক হরমোন থাকে বাড়বাড়ন্ত। ঘূর্ণায়মান এ পৃথিবীটার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদেরও রক্তচাপ, তাপমাত্রা, বিপাকের হারে হ্রাস বৃদ্ধি ঘটে। রোগীর বিভিন্ন ল্যাবটেষ্ট করানোর সময় জীব ছন্দের এ ব্যপারটা চিকিৎসকরা মাথায় রাখেন। উদাহরণ স্বরূপ রক্তের কর্টিসলের মাত্রা দেখতে হলে উপদেশ দেয়া হয় এটি সকালের ঠিক এই সময়ে করবেন তার দুয়েক ঘন্টা আগে বা পরে নয়। কোলেস্টরল মাপতে হবে সকালে খালিপেটে, দুপুরে বা বিকালে নয়।

এই যে সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা আসা, তারপর রাত। কখনো অমাবস্যার, কখনো ভরা পূর্ণিমার আর এর সাথে তাল মিলিয়ে ঠিক একই ছন্দে দেহবৃত্তের উঠানামা, চিকিৎসা-জীববিজ্ঞানে একে বলা হয় সার্কাডিয়ান ছন্দ। ল্যাটিন সার্কা(Cerca) মানে চক্রাকারে, ডায়েস (dies) মানে দিবস। চব্বিশ ঘন্টা জুড়ে একই সময়ে যে একই ছন্দ দেহে খেলা করে তাই সার্কাডিয়ান ছন্দ (circadian rhythm) বলে।

বিজ্ঞাপন

এই দেহন্তরগত জীবঘড়ি বিজ্ঞানের আগে থেকেই জানা বিশেষ করে চিকিৎসা বিজ্ঞানে। কিন্ত কেউ জানতোনা কোষীয় পর্যায়ে এর জৈবানুক ব্যাখ্যা কী! এর জিনগত ব্যাখ্যা দিয়ে এবছর তিন মার্কিন গবেষক চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল জয় করেছেন। তারা দেখিয়েছেন কোষীয় পর্যায়ে একটা জিন(gene) একটা প্রোটিনকে এমন একটা সংকেতে আবদ্ধ করে যার ফলে রাতের বেলা ঐ প্রোটিনটি কোষের ভেতরে জমা হয় আর দিবাভাগে এসে তা ক্ষয়ে যায়। প্রতিটা দিবস ও যামিনীতে ঠিক একই চক্র দেয়াল ঘড়িটার মতো ঠিক একই ছন্দে পুনঃপুন জীবনভর ঘটতে থাকে। 

এ যেন সেই গ্রীকদেবতা প্রমিথিউসের দুঃখের গল্পের একদম প্রতিরূপ। মানব জাতিকে গোপনে আগুন ব্যাবহারের কৌশল শিখিয়ে দেবার অপরাধে দেবতা জিউস প্রমিথিউসকে শাস্তি দেন। পর্বতচূড়ায় একটি ঈগল এসে প্রমিথিউসকে প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ক্ষতবিক্ষত করতো। সারারাত জুড়ে তার সারা দেহ আবার পুনর্গঠিত হতো। ভোরে এসে ঈগলটি আবার সারাদিন জুড়ে তাকে নিঃশেষ করে দিতো, রাতে আবার পুনর্গঠিত হতো। এভাবে একই চক্রে সার্কাডিয়ান ছন্দ (circadian rhythm) এর প্রোটিনটির মতো প্রতি রাতে সৃষ্টি ও প্রতি দিবসে ক্ষয় হয়ে যেতো প্রমিথিউস।

আমি নিশ্চিত, গ্রীক মিথলোজিতে বিশ্বাসী কেউ থাকলেও এ দাবী কেউ করে বসবেনা যে, ‘এই সার্কাডিয়ান ছন্দের আণবিক বা molecular ব্যাখ্যা আমাদের বইতেতো অনেক আগে থেকেই আছে!’ আশেপাশের অনেক মূর্খদের মতো তারা এ দাবী করেও হাস্যাস্পদ হবেনা যে তাদের দেবতা প্রমিথিউসের কাহিনী পড়েই বিজ্ঞানীরা এটি আবিষ্কার করে নোবেল পেয়েছে!

সকল প্রকার অন্ধত্বের বিরুদ্ধে বিজ্ঞান ও গবেষণার জয় হোক। জেফরি সি হল, মাইকেল রোজব্যাশ ও মাইকেল ডব্লিউ ইয়ং এ তিন নোবেল জয়ীকে তাদের অধ্যবসায়ের জন্য অভিনন্দন।