চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সকলের প্রিয় কবি শামসুর রাহমান

যখন মন খুব ভারি হয়ে যায়, যখন প্রিয়জনেরা আঘাত দেয়, যখন ফেলে আসা দিনগুলো খুব তাড়া করে তখন কবি শামসুর রাহমানের কথা খুব মনে পড়ে।

যখন মেঘ জমে আকাশে, যখন শীত নামে, যখন মায়ের মুখ মনে পড়ে তখনই পাশে এসে দাঁড়ান কবি শামসুর রাহমান।

বিজ্ঞাপন

যখন পাখির মতো মনটা উড়ে যেতে চায়, যখন ঘন রাত পার হয়ে সূর্য, যখন ঘন রাত পার হয়ে সূর্য ওঠে, যখন কোন শিশুর স্পর্শে ঘুম ভাঙে আমার তখন কবি শামসুর রাহমানের কথা মনে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

যখন ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থান কিংবা যখন সত্তরের নির্বাচন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, বায়ান্ন-একাত্তর সকল বিষয়েই কবি শামসুর রাহমান অল্প বিস্তর লিখেছেন। সেসব লেখার জন্য চিরদিন তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

যখন পাখির কথা ভাবি, কিংবা ফুলের কথা ভাবি কিংবা নীল আকাশের কথা ভাবি, তখন কবি তোমার কথা মনে পড়ে যায়।

মানুষ এই যে প্রতিদিন স্মৃতির মধ্যে প্রবেশ করে এটাই মানুষ হয়ে ওঠার প্রথম শর্ত। যখন খুব স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ি তখন কবি শামসুর রাহমানের কথা মনে পড়ে। কবির সঙ্গে আমাদের চেনাজানা হয়েছে ঢাকা কলেজে পড়ার সময়। অগ্রজ কবি আবু হাসান শাহরিয়ার এবং সৈয়দ আল ফারুক তখন শামসুর রাহমানকে নিয়ে কাজ করছেন। বইয়ের নাম প্রামাণ্য শামসুর রাহমান। তখন পরিচয়। সেই পরিচয় গাঢ় হয় পরে। তিনি আমার ছড়া কবিতা পড়েছিলেন। পড়লে প্রশংসাও করতেন। দৈনিক বাংলার সম্পাদক থাকাকালীন তার রুমে দুএকবার গিয়েছি। তাকে লেখক-সাহিত্যকে ঘিরে থাকতেন। আমাদের কোনো সুযোগই হতো না তার পর্যন্ত পৌছানো।

তিনি সবাইকে ‘আপনি’ সম্বোধন করতেন। অসম্ভব বিনয়ী, লাজুক এবং ভদ্র। আমার চাচা কবি হাবীবুর রহমানের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। চাচাকে নিয়ে কিছু স্মৃতিকথাও লিখেছেন। আমার বাবাকেও চিনতেন। সেই সূত্রে আমাকে ‘তুমি’ করে বলতেন।

কবি শামসুর রাহমানকে অনেক অনুষ্ঠানে অতিথি করে নিয়ে গিয়েছি। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ছড়া পাঠের আসর, শিশুসাহিত্য সংসদের দর্শনীর বিনিময়ে ছড়াপাঠের আসর, কোনো বইয়ের প্রকাশনা উৎসব- নানা অনুষ্ঠানে তাকে অতিথি করে নিয়ে যেতাম।

আমার চ্যানেল আই কর্মজীবনে কবি শামসুর রাহমানকে নিয়ে অসংখ্য রেকর্ডিং করেছি। যে কোনো বিশেষ দিবসে কবিতা পাঠ ছাড়াও ফেরদৌস আরার একটা গানের অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেছিলাম। অতি বিনয়ী ও শিশুর মতো সরল কবি শামসুর রাহমান কোনকিছু ‘না’ করতেন। শিশুর মতো হৃদয় নিয়ে তিনি আমার সব আবদার সহ্য করতেন।

কবির শ্যামলীর বাড়িতে আমি হাজার বার গিয়েছি। কবি থাকতেন দোতলায়। ছোট্ট ঘর। চারপাশে বই আর বই। কবির স্ত্রী পাশের ঘরে। আর কবির সেবাযত্ন করতেন তার পুত্রবধূ টিয়া। আমরা তাকে ‘টিয়া আপা’ ডাকি। এখনো আমাদের সাথে টিয়া আপার যোগাযোগ আছে। চমৎকার এক মহিলা। কবির কথা বলতে গিয়ে ‘আব্বু আব্বু’ বলে তিনি কেঁদে ওঠেন।

আমরা কবিকে বেশি জ্বালাতন করতাম না। টিয়া আপা কবির জামা বদলে দিতেন। কবি রঙিন জামা কাপড় পরতে পছন্দ করতেন।

আমাদের দেখা প্রকৃত কবি হচ্ছেন শামসুর রাহমান। তার শিশুহৃদয় দেখেই আমরা বুঝতাম- তার আচরণেই কবিতার গন্ধ লুকিয়ে আছে।

ক্যামেরা প্রস্তুত। হালকা লাইট। কখনো কবিকে দিয়ে কোনো বিশেষ দিন সম্পর্কে কিছু বলাতাম। কখনো কবিতা পাঠ। খুব গাঢ়স্বরে ধীরে ধীরে কবিতা পাঠ করতেন তিনি টিয়া আপার হাতে সামান্য সম্মানীর খাম দিয়ে আসতাম। কবি খুব সলজ্জ ভঙ্গিতে বলতেন,
আমীরুল চলবে তো?
খুব ভালো পাঠ হলো না।
শরীরটা ভালো না। তোমরা ভালো থেকো।

শেষ দিকে কবি খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তবু যদি শুনতেন আমি রেকর্ডিং করতে আসব তিনি প্রস্তুতি নিতেন। গভীরভাবে শ্বাস টেনে টেনে কবিতা পাঠ করতেন। মনে হতো, কবিতা পড়তেও তার কষ্ট হচ্ছে।

কবি শামসুর রাহমান যতদিন চলৎশক্তিসম্পন্ন ছিলেন ততোদিন তাকে স্টুডিওতে নিয়ে এসেছি। চ্যানেল আই আয়োজিত বড় বড় ইভেন্টে তাকে অতিথি হিসেবে নিয়ে এসেছি। আমরা ২০০৩ সাল থেকে ইউরো শিশুসাহিত্য পুরস্কার প্রবর্তন করেছিলাম। একটানা পাঁচ বছর এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকেছেন।

বিজ্ঞাপন

ফরিদুর রেজা সাগরকে তিনি পুত্রের মতো ভালোবাসতেন। সুখ-দুঃখের নানা প্রসঙ্গ তিনি সাগর ভাইয়ের সঙ্গে পাশাপাশি করতেন।

কবির সাথে রাবেয়া খাতুনেরও গভীর বন্ধুত্ব ছিলো। কবি শামসুর রাহমান রাবেয়া খাতুনের আধুনিক মনস্ক লেখাগুলোর ভক্ত পাঠক ছিলেন।

আমরা কবির স্নেহছায়া পেয়েছি- এ তো বিরল সৌভাগ্য। চ্যানেল আইয়ের বিরুদ্ধে একবার একুশে টেলিভিশন মামলা ঠুকে দিল। নিউজ যেন না প্রচার করতে পারে চ্যানেল আই।

বুদ্ধিজীবীদের বিবৃতি প্রয়োজন ছিলো। সহাস্যে কবি শামসুর রাহমান প্রথম সই করেন সেই বিবৃতিতে।

মনে পড়ে, চ্যানেল আই এর জন্মদিনে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। সেই ক্রোড়পত্রে চ্যানেল আই বিষয়ে মূল লেখাটি লিখে দেন একবার কবি শামসুর রাহমান। খুব আন্তরিক লেখা।

সাংবাদিকতা ছেড়ে শামসুর রাহমান লেখাকেই পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। সম্পাদকীয়, ফিচার, কবিতা ও নানা রকম গদ্য লিখে তাকে জীবন ধারণ করতে হতো। এসব দেখে খারাপ লাগতো। কিন্তু আমাদের তো কোন ক্ষমতা নাই। আমরা তার জন্য কিছু করতে পারতাম না।

কবি শামসুর রাহমান এদেশের সকল মানুষের গভীর ভালোবাসা পেয়েছেন। কবি হিসেবে এটা সামান্য আয়োজন।

আমাদের দেশে নজরুল, রবীন্দ্রনাথ, জসীমউদ্দীনের পরে শামসুর রাহমানকে কবি হিসেবে সবাই জানতো।

মনে পড়ে, তার মৃত্যুর দিন। পিজি হাসপাতালের করিডোর। লোকে লোকারণ্য। মিডিয়ার ক্যামেরা ছুটছে। কাল তার শবদেহ শহিদ মিনারে যাবে।

ফরিদুর রেজা সাগর, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, গোলাম কুদ্দুস, তারিক সুজাত, মুহাম্মদ সামাদ প্রমুখ উপস্থিত হয়েছেন।

সিঁড়ির কাছ থেকে প্রচণ্ড কান্নার ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। আমি কৌতুহলবশত সেদিকে গেলাম তাকিয়ে দেখি, তরুণ লেখক ও প্রকাশক রবিন আহসান মেঝেতে গড়িয়ে কাঁদছে। উচ্চকণ্ঠে ক্রন্দন।

আমাদের আর কোনো অভিভাবক নাই। আমাদের আর কোনো অভিভাবক নাই।
আমরা নিঃস্ব হয়ে গেলাম।
আমাদের কি হবে?

রবিনের মুখে নানা রকম বুলি। কেউ রবিনকে সান্তনা দিয়ে শান্ত করতে পারছে না।

এই ছিলেন কবি শামসুর রাহমান। তরুণতম লেখকও তার বন্ধু। সবার সঙ্গেই তার সদ্ভাব। অতি সজ্জন মানুষ।

কবি শামসুর রাহমান এর মতো ব্যক্তির কোনো বিকল্প নাই। বাঙালি হৃদয়ে আপনি বেঁচে থাকবেন আজীবন।