চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সংলাপ উত্তর ত্রাহিদশায় বিএনপি!

২০১৫ সালে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের জন্য পেট্রোল বোমা আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে আলোচনার মাধ্যমে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা কী হবে তা নিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপের দাবি করে আসছিল জামায়াত-বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।

গণফোরাম, বিকল্পধারা, বাম গণতান্ত্রিক জোটসহ আরও অনেকে সংবিধানে বিধিবদ্ধ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সন্তষ্ট নন। তারাও সংবিধান পরিবর্তন করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে চান।

বিজ্ঞাপন

দুর্নীতি, ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ড এবং পেট্রোল বোমা সন্ত্রাসের বিচার শুরু হলে জামায়াত-বিএনপি রাজনীতিতে কোনঠাসা হয়ে পড়ে এবং তাদের দাবির প্রতি জনসমর্থন গড়ে তোলায় ব্যর্থ হয়। এমন পরিস্থিতিতে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন গণফোরাম, আসম আব্দুর রবের জাসদ, এবং মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্যের সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে ৭ দফা দাবি নিয়ে নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে জামায়াত-বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট।

ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন চিঠি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপের আহবান জানান। প্রধানমন্ত্রী চিঠির উত্তর দিয়ে আলোচনার জন্য ঐক্যজোটের নেতাদের গণভবনে আমন্ত্রণ করেন।

১ নভেম্বর ২০১৮, সন্ধ্যা ৭টায় সে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা শেষে ঐক্যজোট নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ভাল আলোচনা হয়েছে। বিএনপি নেতা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, আমরা সন্তষ্ট নই। গণমাধ্যমে এই আলোচনা নিয়ে যেসকল খবর এসেছে তাতে বলা যায় যে দুই/একটা বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে একমত হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেনি।

জোট- জোট এবং সংলাপ- সংলাপ খেলায় জামায়াত-বিএনপি যে তিমিরে ছিল সেখান থেকেও পিছিয়ে পড়েছে। এ পর্যন্ত তাদের প্রাপ্তি হয়নি কিছুই; অপচয় হয়েছে সময়ের, ইমেজের। সামনের নির্বাচনে তাদের অংশ নিতে হবে। অংশ না নিলে দলের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। নির্বাচনের জন্য কাজ না করে তারা ড. কামালের পেছনে ঘুরছেন খালেদা জিয়ার মুক্তি, সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি আদায়ের লক্ষ্যে।

ব্যাপারটা এমন হয়ে দাড়িয়েছে যে ড. কামাল তাদের দাবি আদায়ের ব্যবস্থা করে দেবেন। কোন দেশে কোন কালে কে পেরেছে বিরোধীদের এমন সব দাবি আদায় করে দিতে? এখনো ২৫-৩০% জনসমর্থন নিয়ে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটির নেতারা আমেরিকার দালাল হিসেবে বিবেচিত, পর্দার অন্তরালের কুশীলব বলে পরিচিত ড. কামাল হোসেনের মত জনসম্পৃক্ততাবিহীন নেতার পেছনে ঘুরে  নিজেদের অবস্থান নামিয়ে ফেলেছে।

মিডিয়া এখন ফখরুল, মওদুদের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দিয়ে ড. কামালের বক্তব্য প্রচার করে। ড. কামালের কাছে এমন কোন দেশি/বিদেশি চেরাগ নেই যা দিয়ে শেখের বেটিকে ঘায়েল বা বশ করা যায়। গতকাল এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে। শেখের বেটি চিজ খাইয়ে মিষ্টি মিষ্টি কথার সঙ্গে কোকোর মৃত্যুর সময়ে তাঁকে বিএনপি নেত্রীর বাড়িতে ঢুকতে না দেয়ার কথা শুনিয়ে মুওদুদ সাহেবকে একটু ধমক দিয়ে সকলকে বিদায় করেছেন। বিএনপি যা চায় তা ১৪ দল দেবে না। বিএনপি’র এমন কোন সামর্থ্য নেই যে তা আদায় করে নিতে পারে।

লাভ যা হচ্ছে তা ড. কামাল, রব আর মান্নাদের। কয়েক দিন জোট- জোট খেলে তারা এখন জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাদের দলগুলোর পল্টিবাজ নেতাদের অনেককেই পাবলিক চিনত না। এখন তাদের নাম পত্রিকায় ছাপা হয়; চেহারা দেখা যায় সবগুলো টেলিভিশনে।

তানিয়া রব, সুব্রত চৌধুরীদের নাম এক মাস আগে ক’জনে জানত? সুলতান মোহাম্মদ মনসুরতো হারিয়েই গিয়েছিলেন। ফখরুল ইসলাম আলমগীর আর মওদুদ সাহেব ছাড়া আর কোন বিএনপি নেতা এখন ফ্রন্ট লাইন রাজনীতিতে নেই। বিএনপি’র লাভ হচ্ছে না কিছুই।

জিয়া পরিবার যে চিরতরে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হয়েছে তা এখন বিএনপিকে বুঝতে হবে, মানতে হবে। জামায়াত, জঙ্গি নিয়ে সমাজে চলা যায় না। তাদের নিয়ে গণভবন দূরে থাক, ড. কামালদের সঙ্গেও বসতে পারেনি বিএনপি।

এদেরকে দিয়ে গ্রেনেড আর পেট্রোল বোমা মারা ছাড়া অন্য কোন কাজে লাগানো যায় না – একথা বিএনপিকে বুঝতে হবে। জামায়াত-জঙ্গিরা বিএনপি’র জোটে থাকুক আর না থাকুক তাদের ভোট বিএনপি’র বাক্স ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়া সম্ভব না।

এ কথা কে না বোঝে? জামায়াতকে তাদের এত কী প্রয়োজন? জামায়াত ছেড়ে দিলে বিএনপি’র ইমেজ বাড়বে; ভয়েসটা আরেকটু চড়া করতে পারবে; নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা ঘাড়টা আরেকটু সোজা করে নিজেদের কথা বলতে পারবে। এরপর সুস্থ ধারার রাজনীতি করে দেশকে কিছু দিতে পারবে।

এত বছর পরে হলেও ৭১ এর ঘাতকদের, ৭৫ আর ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়ায় দেশ থেকে চিরতরে খুনের রাজনীতি বন্ধ হয়েছে। কেউ চাইলেও এখন আর সে রাজনীতি ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

দেশি এবং আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। শুধু বাংলাদেশে কেন, পৃথিবীর কোথাও আর ইসলামী সন্ত্রাস ভিত্তিক রাজনীতি চলবে না। জামায়াত ও জঙ্গিদের এখন আর বিএনপি’র কোন দরকার নেই।

সোভিয়েট-আফগান যুদ্ধের সময় থেকে ইসলামী জঙ্গি দিয়ে কমিউনিস্ট দমনের আমেরিকান নীতির ফসল হচ্ছে জামায়াত এবং ইসলামের নামে সৃষ্ট অন্যান্য জঙ্গি সংগঠনগুলোর উত্থান। আমেরিকানরা ডলার দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে এদের শক্তিশালী করে তুলেছিল। তারা তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে আমাদের দেশটাকে আফগানিস্তান ,পাকিস্তানের সঙ্গে এক কাতারে রেখে জঙ্গি উৎপাদনের কারখানা বানিয়েছিল নিয়মিত জঙ্গি সরবরাহ করে মার্কিন স্বার্থ উদ্ধারের জন্য।

বাংলাদেশ রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জামায়াতের আবার দরকার ছিল একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কাভারেজ যার জন্য সৃষ্টি হয়েছিল বিএনপি। হিলারী ক্লিন্টনের সঙ্গে বিদায় নিয়েছে আমেরিকার জঙ্গিবাদী রাজনীতি।

বার্নি সান্ডার্স এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প বদলে দিয়েছে আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি। সিরিয়া যুদ্ধের সঙ্গে শেষ হয়ে যাচ্ছে আমেরিকার জঙ্গি- জঙ্গি খেলা।

জামায়াতের বিশ্ববাজার দর এখন তলানিতে। জঙ্গি রাজনীতি আমেরিকা আর করবে না; দরকার হবে না জামায়াতকে। বিএনপি’র এসব বোঝা উচিত। তাদের কোন দরকার নেই জামায়াতের সঙ্গে থেকে রাজনীতি করার। এদেশের আওয়ামী বিরোধীদের, ইসলামী সাম্প্রদায়িকদের বিএনপি’র বাক্সে ভোট দেয়া ছাড়া উপায় নেই। জামায়াতের সঙ্গে জোট থাকলেও যা না থাকলেও তা। বিএনপি’র ভোট ব্যাংকে হেরফের হবে না।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশটা গত দশ বছরে রাজনীতি এবং অর্থনীতি সংস্কারে অনেক দূর এগিয়েছে।বাংলাদেশ বিরোধী এবং ইসলামের নামে সৃষ্টি করা জঙ্গিরা দমন হয়েছে। দেশ এখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এখন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ। প্রগতিশীলেরা প্রত্যাশা করে আছে যে আগামী নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ দেশ থেকে দুর্নীতিবাজ আর সাম্প্রদায়িক রাজনীতির উচ্ছেদ করবেন।

অজঙ্গি মৌলবাদীরা এখন শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেবার জন্য প্রস্তুত হয়েছে। যে হেফাজতে ইসলাম শেখ হাসিনার নারীনীতির প্রতিবাদে সংগঠিত হয়েছিল; ১৩ সালে মধ্যযুগীয় ১৩ দফা দিয়ে জামায়াত-বিএনপি’র সহযোগিতায় দেশে হাসিনা সরকার হটিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র কায়েম করার দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছিল তারা আগামী ৪ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ হাসিনাকে সংবর্ধনা দেবার আয়োজনরত। স্বাধীনতা বিরোধী এবং জঙ্গিদের সমর্থক, আমেরিকার দালালী করা সুশীলেরা এখন নির্বাক, নিশ্চুপ। আওয়ামী বিরোধীদের নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে প্রাক্তন আওয়ামী লীগাররা।

এরকম পরিস্থিতিতে শুধু আগামী নির্বাচনই নয়; দীর্ঘ মেয়াদী চিন্তাভাবনা নিয়ে নতুন করে পথ চলা শুরু করা দরকার বিএনপি’র। জামায়াতে ইসলামি, পাকিস্তান আর আমেরিকার তত্ত্বাবধায়নে জিয়াউর রহমান যখন দলটা তৈরি করেন তখন শুরুতে মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের ছাড়া দলের জন্য আর কাউকে তিনি পাননি।

কিছুদিনের মধ্যেই ভাষানী ন্যাপের যাদু মিয়া বুঝে ফেললেন যে মওকা একটা এসেছে। যাদু মিয়া এবং তাঁর সুবিধাবাদী অনুসারীরা বিএনপিতে যোগ দিয়ে বিলীন হয়ে গেলেন। এরপর দীর্ঘ দিনে অন্যান্য সুবিধাবাদী বাম, ডান, মোল্লা, সাম্প্রদায়িক, জঙ্গি, ইত্যাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-মতের সমারোহ হওয়ায় বিএনপি’র কোন নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ তৈরী হয়নি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেখা যায় প্রধান দুটি রাজনৈতিক ধারা: একটা মধ্যবাম আরেকটা রক্ষণশীল। এই দুই ধারার লোকেরা আমেরিকায় রয়েছে যথাক্রমে ডেমোক্রেটিক এবং রিপাবলিকান পার্টিতে, ব্রিটেনে লেবার এবং টোরি পার্টিতে, জার্মানিতে সোশ্যালিস্ট এবং ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টিতে।

বাংলাদেশ রাজনীতিতে মধ্যবাম ধারায় রয়েছে আওয়ামী লীগ; বিএনপি ছাড়া আর কেউ পূরণ করতে পারে না রক্ষণশীল রাজনীতির ঘাটতি। বিএনপি’র সুযোগ রয়েছে জামায়াতসহ সকল জঙ্গিদের সঙ্গ পরিত্যাগ করে ধীরে ধীরে একটা যথার্থ রক্ষনশীল দল হয়ে ওঠা। এজন্য দরকার দুর্নীতি এবং ২১ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত জিয়া পরিবার বাদ দিয়ে নিজেদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচন করে আগামী দিনের রাজনীতির জন্য তৈরি হওয়া।

নির্বাচন কমিশননির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি নিয়ে বসে থাকলে তারা দিন দিন ক্ষয় হবেন। দলের নেতা-কর্মীদের মানসিকতায় পরিবর্তন এনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তাদের বলীয়ান করে তুলতে হবে।

এসব করতে পারলে টিকে থাকতে পারে বেশ বড় একটা অংশের জনসমর্থনপুষ্ট দলটি। অন্যথায় দলটি অচিরেই খন্ডিত হতে হতে স্থান নেবে ইতিহাসের পাতায়। বিএনপি’র শূন্যস্থান পুরন করবে নতুন কেউ।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)