চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শ্রীবাসদের বেঁচে থাকার গল্প

ওর নাম শ্রীবাস। বাবা ভক্তদাস গত হয়েছেন অনেক আগেই। কয়েক বছর হলো মা রেখা রাণীও চলে গেছেন। রেখে গেছেন তিন ছেলে, দুই মেয়ে। মেয়ে ভারতি আর তপতির বিয়ে হয়ে গেছে। তিন ভাইয়ের মেঝো ভাই প্রভাস প্রসাধনী সামগ্রির দোকানের বেতনভুক্ত কর্মচারী। বড় আর ছোট ভাই ভবেশ ও শ্রীবাস মধুমতি নদীতে মাছ ধরে। বিয়ে করেছে। ছেলেমেয়ে আছে। মাছ ধরার টাকা দিয়েই কষ্টেসিষ্টে চলে ওদের সংসার। না, চলে না, চালিয়ে নেয় ওরা। শ্রীবাসদের জীবন খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি ওদের দুঃখগাথার বাস্তব চিত্র। আমিও জেলে পরিবারের সন্তান। আমার বাস্তুভিটাও জেলেপাড়ায়।

সভ্যতার বিকাশ হয়। সেই আলোয় ওরা বিকশিত হয় না। ওদের কোন উন্নতি হয় না। ওরা ঘিঞ্জি আর নোংড়া পরিবেশে বসবাস করে। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার বদলে বাবার হাত ধরে নদীতে মাছ ধরতে যায়। ওদের ঘরের বেড়া দিয়ে কুকুর ঢোকে। বাদলার দিনে চালের ফুটো দিয়ে জল পড়ে। ঝড়ে ঘর ভাঙে। কোন বেলা খেতে পায়, কোন বেলা পায় না। ভাতের খিদে মেটাতে মাছ বিক্রি করে ওরা। ছেলেমেয়েরা কাদা-মাটি মেখে উলঙ্গ থাকে রাতদিন। উৎসব-পার্বণে একটা লাল জামার জন্য চোখের জলে ভাসে ওদের অবুঝ শিশুরা। আজও ওদের পরনে তেল চিটচিটে ছেঁড়া ময়লা কাপড়। বউরা দুই কাপড়ে বছর কাটায়। দিনরাত পরিশ্রম করার পরও নিত্যদিনের অভাব যেন ওদের ছায়াসঙ্গী। তারপরও চোখমুখে অন্ধকারে রাস্তা খোঁজার প্রাণান্তকর চেষ্টা।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

শ্রীবাসদের সাদা-কালো জীবনে বাঁক নিয়েছে শুকিয়ে যাওয়া নদী। এখন আর নদী আগের মতো ষোড়শী যৌবনা নেই, শুকিয়ে গেছে বার্ধক্যে চামড়া ঝোলা মানুষের মতো। এরপর আছে জেলেদের অসচেতনতার ফসল কারেন্ট জাল, কাঁথা জালের দৌরাত্ম্য। ছোট ছোট মাছের সঙ্গে মাছের ডিম পর্যন্ত তুলে নিয়ে আসে কাঁথা জাল দিয়ে। ওরা জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়ক্ষতি বোঝে না। একদিকে ওদের অসচেতনতা অন্যদিকে বৈরী জলবায়ুর রাহুগ্রাস দিন দিন মাছশূন্য করে তুলছে নদীগুলোকে। দূষণে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে নদীর গায়।

বেদে বহরের নৌকার মতো শ্রীবাসদের স্বপ্ন ভেসে বেড়ায়, ধরা দেয় না, বরং স্বপ্নগুলো দুঃস্বপ্ন হয়ে নেমে আসে জেলে পরিবারগুলোর আঙিনায়। নদীতে মাছ ধরতে গেলে প্রায়ই চাঁদা দিতে হয়। মাছ বিক্রি করতে গেলে স্থানীয় ক্ষমতাবানসহ অনেকেই মাছ নিয়ে কম দাম দেয়। নদীর মাছ বেশি দাম বলে ‘শালার জালে’ বলে গালি শুনতে হয়, এমনকি মারধোরও জোটে কপালে। স্ত্রী, ভাই-বোন, ছেলেমেয়ে ও পরিচিত জনদের সামনে ‘মার’ খায় জেলেরা। স্ত্রী স্বামীকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। হাউমাউ করে পাশে কাঁদে সন্তান। মা বুক চাপড়ায়। ভাই কপালে হাত দিয়ে বসে থাকে। পরিচিতজনেরা এগিয়ে আসতে দ্বিধা করে ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে। শ্রীবাসরা কিছুই বলতে পারে না। কেননা, ওরা কিছুই করতে পারে না। মুখ বুঁজে সহ্য করে। তারপর একদিন লজ্জা, ঘৃণা, অপমান আর নিরাপত্তার অভাবে রাতের আঁধারে ওরা চলে যায় ঠিকানা ছেড়ে ঠিকানার খোঁজে।

কালনা গ্রামের জেলেপাড়ার সীমানা অনেক বড় ছিল। ঠাকুরদা আর বাবার মুখে শুনেছি- ঘন বসতি আর জেলেদের সংখ্যা বেশি থাকায় সব সময় বাজার বাজার মনে হতো গ্রামটিকে। বার মাসের তের পার্বণে উৎসব যেন লেগেই থাকতো। দুর্গা পূজায় রামযাত্রা, সঙ্গে আসর বসতো যাত্রা পালারও। নৌকা বাইচ হতো মধুমতিতে, মেলা বসতো কামঠানা রক্ষাচণ্ডীর মন্দিরের সামনে বিশাল বটগাছের নিচে। এছাড়া গাজীর গান, রামায়ণ, কীর্তন, পুঁথিপাঠ, কবি গানের আসর বসতো প্রায় দু একদিন পর পরই। পাশের গ্রাম আমডাঙ্গায় হতো ঘোড়দৌড়। মধুমতির কালনাঘাটে বসতো গুনাইবিবি, রূপবান যাত্রাপালার আসর। জারিগান, পালাগান চলতো রাতভর। আজ কালনা গ্রামে জেলে পরিবার আছে মাত্র দু’ঘর। চারপাশ মানুষের অভাবে খা খা করে। একদিনের জমজমাট জেলেপাড়ায় আজ শশ্মানের নীরবতা।

বিজ্ঞাপন

মধুমতির পাড়ে কামঠানা গ্রামে এখনো বসবাস করছে প্রায় দেড়শ’ জেলে পরিবার। অভাবকে নিত্যসঙ্গী করে আজ ওরা বড় অসহায়। চাঁদা দেয়া, নদী থেকে মারা মাছ জোর করে কেড়ে নেয়া, মাছ নিয়ে ন্যাযমূল্য না দেয়া, মারধোর করায় ওদের পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে কালোছায়া। গত ১৩ এপ্রিলের কথাই ধরা যাক- রাত ১০টার দিকে মাছ মেরে ফিরছিল শ্রীবাস আর প্রনব। নদীপথে ট্রলার নিয়ে ওদের নৌকা আটকায় কয়েকজন। লোহার রড দিয়ে প্রথমে প্রনবকে আঘাত করে। তারপর শ্রীবাসকে নির্মমভাবে পেটায়। ওদের অপরাধ ছিল চাঁদা না দেয়া। প্রায় দিনই চাঁদা নিতে আসে এরা। চাঁদা না পেলে মাছ। যেদিন জেলেরা চাঁদা কিংবা মাছ দিতে অস্বীকার করে সেদিনই নেমে আসে নির্যাতন। পরিবারের ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে ওরা অধিকাংশ নির্যাতনই নীরবে সহ্য করে। কিন্তু যখন রক্তাক্ত ক্ষতে মলমের প্রয়োজন হয় তখন আর ঢেকে রাখতে পারে না।

শ্রীবাস লোহাগড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি। তার মাথা, পিঠ, পাজড়ে লোহার রডের আঘাতের ক্ষত। ডাক্তার জানিয়েছেন, মাথার আঘাতও গুরুতর। অসহ্য যন্ত্রণায় কাটছে তার প্রতিটি মুহূর্ত। ডাক্তার ওষুধ-পত্তর লিখে দিচ্ছেন। বাইরে থেকে প্রায় সবই কিনে আনতে হচ্ছে। টাকার জোগাড় হচ্ছে ধারদেনা আর শুভাকাঙ্খিদের কাছ থেকে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চললে নিত্য অভাবী পরিবারের শ্রীবাসের অবস্থা হবে তেল ফুরানো মাটির কুপির মতো। তার স্ত্রী-সন্তানের কী হবে তা শুধু ভবিতব্যই বলতে পারে।

১৩ এপ্রিল রাতের ঘটনার প্রতিবাদে ১৪ এপ্রিল কয়েকশ’ জেলে লোহাগড়া উপজেলা চত্বরে মানবন্ধন করে। পরে ওরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের বারান্দায় অবস্থান নেয়। সেসময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুবিচারের আশ্বাস দেন। থানায় মামলা করতে গেলে অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রথমে গড়িমসি করলেও পরে রাত এগারোটায় জেলেদের মামলা গ্রহণ করেন। শোনা যাচ্ছে শ্রীবাসদের প্রতিপক্ষ ক্ষমতা এবং টাকার প্রভাব খাটিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এ চিত্র নতুন নয়। তারপরও আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দিকে তাকিয়ে বুক বেঁধে আছি ন্যায়বিচারের আশায়।

শ্রীবাসের চিকিৎসার জন্য অর্থ সাহায্য চাইতে আমার এ লেখা নয়। আমি দেশজুড়ে শ্রীবাসদের নিরাপত্তা বিধানের পদক্ষেপ নিতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তারা নিজের মাটিতে যেন পরবাসী না হয়। কালনা গ্রামের জেলেপাড়া উজাড় হয়ে গেছে। কামঠানা গ্রামের জেলেপাড়াও একদিন উজাড় হয়ে যাবে যদি শ্রীবাসরা তাদের নিরাপত্তার অভাব মনে করে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন