চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিই কী করোনা থেকে বাঁচার শেষ ভরসা?

‘প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস হয়তো কখনোই পৃথিবী থেকে চিরতরে যাবে না’ এই সতর্কবার্তা দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, এইচআইভি ভাইরাসের মতো কোভিড-১৯ রোগ সৃষ্টিকারী করোনা স্থানীয় ভাইরাস হয়ে যেতে পারে। সংস্থাটি গত ১৩ মে বলেছে, বিশ্বজুড়ে সব মানুষকে এটির সঙ্গে লড়ে বেঁচে থাকা শিখতে হবে। এ ভাইরাসজনিত রোগটি কত দিন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে, এ নিয়ে পূর্বধারণা করা ঠিক হবে না। তবে এটি ঠেকাতে ব্যাপক চেষ্টা চালাতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাই হয়তো ঠিক কথা বলেছে। বর্তমানে এটাই সত্য! করোনা এক অদৃশ্য ঘাতক ব্যাধি। এটা কোনো ঝড় বন্যা বা ভূমিকম্প নয় যে দেখে সাবধান হওয়া যাবে! সুতরাং বাকি জীবন হয়তো করোনাকে সঙ্গী করেই বাঁচতে হবে আমাদের!

বিজ্ঞাপন

ক্রমাগত করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সংক্রমণ রুখতে সাধারণ ছুটির মেয়াদ ৩০ মে পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এই ছুটিতে মানুষ যেন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে না পারে, সে জন্য কড়াকড়ি আরোপের জন্যও পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এতে করে কি করোনাসংক্রমণ কমবে? এরপর যখন সব কিছু খুলে দেওয়া হবে, তখন কী ঘটবে? হ্যাঁ, এটা বোঝা দরকার যে শত্রুর থেকে নিজেকে লুকিয়ে রেখে হয়তো আমরা সাময়িকভাবে তার হাত থেকে নিস্তার পেতে পারি, কিন্তু সে যতক্ষণ দোরগোড়ায় বসে থাকবে, ততক্ষণ সে আবার আমাদের আক্রমণ করতে পারে। তাই সাধারণ ছুটির নামে এই ‘ঘরবন্দি’ একটি স্বল্পমেয়াদি বা ‘শর্ট টার্ম’ পরিকল্পনামাত্র, যাতে এই ভাইরাসের দ্রুত প্রসার রোখা যায়। তার সঙ্গে দরকার কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি বা ‘লং টার্ম’ পরিকল্পনা।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘমেয়াদে টিকা বা প্রতিষেধক ঔষধই হচ্ছে চূড়ান্ত রক্ষাকবচ। কিন্তু প্রতিষেধকের ব্যাপারে আমাদের কাছে আপাতত একরাশ হতাশা ছাড়া তেমন কিছুই নেই। যদিও এই ভাইরাস ঠেকাতে টিকা তৈরি নিয়ে সারা পৃথিবীতে খুব উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে, কিন্তু তা কবে উদ্ভাবন হবে, উদ্ভাবন হলেও কতটা কার্যকর হবে, কার্যকর হলেও আমাদের হাতে কবে পৌঁছবে-সে ব্যাপারে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। সবচেয়ে শঙ্কার কথা যেটা বিজ্ঞানীরা বলছেন তা হলো, এই ধরনের ভাইরাস খুব দ্রুত তার ভোল পাল্টে উদ্ভাবিত টিকাকেও অক্ষম করে দিতে পারে!

তাহলে আমাদের রক্ষা করবে কে? কোনো আশাই কি আমাদের সামনে নেই? এর উত্তরে না, এবং হ্যাঁ দুটোই বলতে হয়। এমনিতে তেমন কোনো আশা নেই। আপাতত সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা ‘প্রাকৃতিক নিয়ম।’ বিষয়টি নিয়তিবাদের মতো শোনালেও বিজ্ঞানগবেষকরা পর্যন্ত এখন এটাতেই আস্থা প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিকভাবেই মানুষ এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে একে পরাস্ত করবে। যাকে বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বলা হচ্ছে। করোনার বিরুদ্ধেও ‘হার্ড ইমিউনিটি’ গড়ে তোলা খুব প্রয়োজন।

এউ মুহুর্তে আমাদের সবচেয়ে বড় ভরসা হলো, আমাদের দেশে ১৭ কোটির মধ্যে প্রায় ৮ কোটি নাগরিকের বয়স ৩৫ বছরের নীচে, এবং এরা এই ভাইরাসের দ্বারা সংক্রমিত হলেও প্রবলভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ার আশঙ্কা কম। বরং এরাই ভাইরাসটির বিরুদ্ধে সাফল্যের সঙ্গে প্রতিরোধক অ্যান্টিবডি তৈরি করে বাকি সবাইকে ‘হার্ড ইমিউনিটি’র সুরক্ষা দিতে পারে। তাই এই ভাইরাসের প্রকোপ বাড়লেও আমরা আশানুরূপভাবে সেটা হয়তো কাটিয়েও উঠতে পারব। এর জন্য আমাদের ধৈর্য করতে হবে এবং ও অপেক্ষা করতে হবে।

আসলে প্রকৃতির চেয়ে বড় শিক্ষক সম্ভবত আর কেউ নেই। প্রথমে একটু আধটু বেয়াদবি সহ্য করবে, তারপর বকুনি-কানমলা। সে সব না শুনলে বিতাড়ন করে দেবে! এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে ম্যালথাসের কথা। ১৭৯৮ সালে ম্যালথাস নামে এক পাদ্রি ‘অ্যান এসে অন দ্য প্রিন্সিপল অব পপুলেশন’ বইটিতে তাঁর জনসংখ্যা তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। ম্যালথাস খাদ্য সরবরাহের প্রকৃতি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনামূলক আলোচনা করে বলেছিলেন— জনসংখ্যা অনিয়ন্ত্রিত হলে বৃদ্ধির হার হয় জ্যামিতিক। কিন্তু জীবনধারণের জন্য দরকারি সামগ্রীর (যেমন খাদ্যশস্য) বৃদ্ধির হার হয় গাণিতিক ভাবে।

এই তত্ত্বের মূল কথাই হহলো, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খাদ্যের জোগানের হারের চেয়ে হবে দ্রুততর। এই প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অভাব একসময় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে কমিয়ে দেবে। তার দ্বিতীয় বক্তব্য ছিল, জনসংখ্যা কমানোর জন্য মানুষ যদি প্রতিরোধ বা নিয়ন্ত্রণমূলক কিছু ব্যবস্থা গ্রহণ না করে, তা হলে মহামারী, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষের মতো দুর্যোগে মৃত্যুর হার বাড়িয়ে জনসংখ্যার হার কমাবে।

বিজ্ঞাপন

ম্যালথাস প্রশ্নাতীত নন। বস্তুত কোনও মতবাদ বা তত্ত্বই পৃথিবীতে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু ইতিহাসের কিছু ঘটনা ম্যালথাসের তত্ত্বকে পরোক্ষে সমর্থন জানাচ্ছে। ১৩২০ সালে ইউরোপ ও এশিয়ায় মহামারীর আকার ধারণ করেছিল ‘দ্য ব্ল্যাক ডেথ অফ বুবনিক’। ইঁদুর ও কালোমাছি থেকে ছড়িয়ে পড়া এই রোগে মারা গিয়েছিলেন ১০ কোটি মানুষ। ১৪২০ সালে রোমে হয়েছিল ‘ব্ল্যাক ডেথ প্লেগ’। ১৫২০ সালে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে ‘স্মল পক্স’। ১৬২০-তে মহামারী ‘মে ফ্লাওয়ার’। ওই শতকেই ১৬২৯-এ দেড় কোটি মানুষ মারা গিয়েছিলেন ‘গ্রেট প্লেগ অফ লন্ডনে’। ১৭২০-এ ফ্রান্সের ‘দ্য গ্রেট প্লেগ অফ মার্সেই’ প্রচুর মানুষের প্রাণ কেড়েছিল।

১৮২০ সালে ভারতে ‘কলেরা’ ও ‘ইয়োলো ফিভারে’ প্রচুর মানুষ গিয়েছিল। ১৯২০-তে স্পেনের ‘স্প্যানিশ ফ্লু’ প্রকৃতির উপর বিরাট আকারে নেমে আসা সর্বশেষ অভিশাপ। এর মাঝে দু’টো বিশ্বযুদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

পৃথিবী এখন ‘রাস্টিকেট’ পর্ব চালাতে শুরু করেছে! মানুষের সংখ্যা লাগাম ছাড়া বেড়েছে। তাই মানুষ নিজের প্রয়োজনে এমন অনেক কাজই করছে যা প্রকৃতি অনুমোদন করে না। বনাঞ্চল কেটে বসতি, কৃষিজমি, শিল্প, রাস্তা, পর্যটনকেন্দ্র বানানো হয়েছে। মানুষ তার প্রয়োজনীয়তার সীমাকে সীমিত করতে পারেনি। স্লোগান হয়ে পড়ল মানুষের ‘গিভ-মি-মোর’। কলকারখানা, যানবাহনের ধোঁয়ায় আকাশ ছেয়ে গেল। কত পাখি, কত প্রাণ হারিয়ে গেল, মানুষ খোঁজও রাখল না। বরফ গলে জল কত দূর গড়িয়ে গেল, খেয়ালও করল না।

তার প্রতিফলন? প্রকৃতি তো খামখেয়ালি হবেই। এই জনসংখ্যার ভার পৃথিবীর বুকে পাথরের মতো চেপে আসতে চাইলে পৃথিবী তো চাইবেই সেটা সরিয়ে দিয়ে ভারমুক্ত হতে!

এই মহামারীর পাঁচ মাস শিখিয়ে দিল যার হাতে পরমাণু অস্ত্র, যুদ্ধাস্ত্র আছে সে শক্তিধর নয়। যার হাতে হাসপাতাল আছে, চিকিৎসা আছে, চিকিৎসক, গবেষণাগার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে সে-ই প্রকৃত শক্তিশালী। প্রকৃতির চেয়ে শক্তিশালী কেউ নয়। মানবিকতা ও মানবিক বিজ্ঞানের চেয়ে বড় আশীর্বাদ আর কিছুই হতে পারে না। ক্ষমতার গর্ব করতে গিয়ে নাকানিচুবানি খেতে হচ্ছে শক্তিধর দেশগুলোকে নভেল করোনাভাইরাসের কাছে। অদেখা এক শত্রু! দেশ ও সীমার বাছবিচার করছে না। সব জাতির মানুষকে সঙ্কটের এক আকাশের নিচে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যুদ্ধাস্ত্র নয়, মাত্র একটা ভ্যাকসিন যে দেশের গবেষণাগার দিতে পারবে সেই দেশের বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানীদের উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন করবে বাকি বিশ্ব।

প্রকৃতির বার্তাকে আমল না দেওয়ায় আজ মানুষ অস্তিত্বের সঙ্কটের সীমান্তে দাঁড়িয়ে। মৃত্যু চোখ রাঙাচ্ছে আর মানুষ ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করছে। কলকারখানা ও যানবাহনের ব্যবহার কয়েক মাসে এতটাই কমে গিয়েছে যে পরিবেশ তাঁর শুদ্ধতা ফিরে পেতে শুরু করেছে। শহরের গাছে অনেক নাম না জানা পাখি আসছে। যে কাকলি বহুবছর শোনা যায়নি বদ্ধ ঘরের জানালা থেকে মানুষ শুনতে পাচ্ছে সে সব। দলে দলে প্রজাপতি আসছে। নীল আকাশের বিশুদ্ধতায় এই রোগ জরার পৃথিবীতেও মানুষের মন ভালো করে দিচ্ছে। সমুদ্রতটে মানুষের খোঁজ নিতে দলবেঁধে আসছে ডলফিনেরা। যারা তাদের দেখতে পাচ্ছেন, তারা মনে মনে জিজ্ঞেস করছেন— ‘এতদিন কোথায় ছিলে?’

মানুষকে শেষ পর্যন্ত ভরসা রাখতেই হবে প্রকৃতির উপর। ভ্যাকসিন ভ্যাকসিন করে মরিয়া হওয়া মানুষকে প্রকৃতি নিরাশ করবে না। এখন খুব শিগগির অজানা ‘পাতালপুরী’ থেকে করোনার ভ্যাকসিন না পাওয়া গেলে হয়তো মৃত্যুর মিছিল চলতে থাকবে আরও কিছু কাল। কিন্তু একদিন এই আক্রান্ত মানুষের শরীরেই জন্ম নেবে অ্যান্টিবডি। তাদের শ্বাস ছড়িয়ে পড়বে প্রকৃতির আশীর্বাদের মতো। মারণ ভাইরাসের বিরুদ্ধে ইমিউনিটি মানুষের হাতে তুলে দেবে প্রকৃতি। কেননা প্রকৃতি তাঁর কোনও সন্তানকেই হারাতে চায় না!

শেষ পর্যন্ত প্রকৃতিই কী হবে আমাদের শেষ ভরসা?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)