চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

শেখ হাসিনা: একজন চলচ্চিত্র অনুরাগী

ফরিদুর রেজা সাগর-এর বই 'প্রিয় মানুষ' থেকে

Nagod
Bkash July

আমাদের দেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের ভিত্তিভূমি হচ্ছে বিএফডিসি। অর্থাৎ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন। এই বিএফডিসি প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৪ এর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মন্ত্রিসভার সর্ব কনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসাবে শপথ নিলেন। সেই তরুণ শিল্পমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু এফডিসি নির্মাণের প্রস্তাব করেন। এবং এফডিসি নির্মাণে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। চলচ্চিত্র একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম এটা তিনি তরুণ বয়সেই বুঝতে পেরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর গৌরবময় ও কীর্তিময় জীবনের একটা বড় সময় কাটিয়েছেন কারাবন্দী অবস্থায়। জেলখানার অখণ্ড অবসরে তিনি বই পড়তেন। নতুন নতুন স্বপ্ন দেখতেন। জেল থেকে ফিরে তাকে কর্মব্যস্ত রাজনৈতিক কর্মে আত্মনিয়োগ করতে হতো। যখন সামান্য অবসর পেতেন তখন সময় কাটাতেন পরিবারের সঙ্গে। তাদের সঙ্গে গল্প গুজবে তিনি মেতে উঠতেন। যে কারণে তার পাঁচ সন্তানই বিকশিত হয়েছিলেন সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে। সন্তানেরা প্রত্যেকেই শিল্প সাহিত্য জগতের অনুরাগী ছিলেন। তারা নিজেরাও নানাভাবে সংযুক্ত হয়েছেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে। বত্রিশ নম্বর বাড়ির ভেতরে বইতো সাংস্কৃতিক সুবাতাস।

আমার বাবা ফজলুল হক। এক অন্যরকম স্বপ্নবিলাসী ব্যক্তি। এদেশে চলচ্চিত্র নির্মাণের অনেক অনেক আগে চলচ্চিত্রের সচিত্র পত্রিকা বের করেছিলেন। তার সঙ্গে দেখা হলেই বঙ্গবন্ধু তাকে সম্বোধন করতেন- কী হে ডাক্তার কি খবর তোর?

বাবাকে একদিন প্রশ্ন করে জেনেছিলাম, কেন বঙ্গবন্ধু তাকে ডাক্তার ডাকেন। বাবার কাছ থেকে তখন জেনেছিলাম, বঙ্গবন্ধু সিনেমা হলে গিয়ে সে কালের জনপ্রিয় সিনেমা ‘রাজধানীর বুকে’ উপভোগ করেছিলেন। এই ছবিতেই তালাত মাহমুদ গেয়েছিলেন সেই অমর গান- তোমারে লেগেছে এত যে ভালো, চাঁদ বুঝি তা জানে। রাজধানীর বুকে সিনেমায় বাবা ডাক্তারের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাবার অভিনয় পছন্দ করেন। তারপর থেকে বঙ্গবন্ধু বাবাকে দেখলেই ডাক্তার বলে সম্বোধন করতেন। ষাট দশকের চরম উত্তাল সময়ে অতি ব্যস্ত থাকার পরও সময় পেলে ছবি দেখতেন। হলে গিয়ে সপরিবারে ছবি দেখার স্মৃতিও আছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখনই অবসর পেয়েছেন তখনই হয়তো বঙ্গমাতা বেগম মুজিবকে নিয়ে সিনেমা দেখেছেন। তারপর বাসায় ফিরে সেই ছবি নিয়ে অনেক আলোচনা হতো। বঙ্গবন্ধু নিজেও মতামত ব্যক্ত করতেন কোনো কোনো সিনেমা নিয়ে। বঙ্গবন্ধু পরিবারে শেখ ফজলুল হক মণি সিনেমা দেখতে খুব ভালোবাসতেন। স্বাধীনতার পরে তিনি ‘সিনেমা’ নামে একটা রঙিন চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিক প্রকাশ করেছিলেন

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সিনেমার প্রতি ভালোবাসা অর্জন করেছেন শৈশবেই। পারিবারিক পরিবেশে। ছবি দেখার অনেক স্মৃতির মধ্যে উল্লেখ করা যায়: নাজ সিনেমা হলে ছবি দেখার স্মৃতি। নাজে তখন ইংরেজি ছবি মুক্তি পেত। সেই নাজে শেখ হাসিনা, শেখ রেহানাসহ সবাই মিলে প্রচুর ছবি দেখেছেন। কথা প্রসঙ্গে জানা যায় তাদের ছবি দেখার বড় আকর্ষণ ছিল নাজের উল্টোদিকে আইসক্রিম পারলারে আইসক্রিম খাওয়া।

বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরা ছবি দেখতে যেতেন আর দশটা সাধারণ পরিবারের সদস্যদের মতো। বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে তারা বঙ্গবন্ধু পরিবারের সন্তান। ‘সাত ভাই চম্পা’ ছবিটা তখন সুপারহিট। হল উপচে পড়েছে দর্শকে। তখন শেখ কামাল বোনদের বললেন, ছবিটা দেখার জন্য চলো ঢাকা থেকে দূরে যাই। তাহলে সহজেই টিকেট পাওয়া যাবে। ছবিটাও দেখা যাবে সহজে। নারায়ণগঞ্জের ডায়না সিনেমা হলে সবাই মিলে তারা সাত ভাই চম্পা ছবিটা দেখেছিলেন।

জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিটা বঙ্গবন্ধু তাঁর সন্তানদের সাথে নিয়ে হলে গিয়ে দেখেছেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানার বর্ণনায় সেই স্মৃতি এখনো উজ্জ্বল হয়ে আছে। মধুমিতা সিনেমা হলে তখন বিদেশি ছবি মুক্তি পেত। বড় হল। বিশ্ববিখ্যাত ‘ক্লিওপেট্টা’ মধুমিতায় উপভোগ করেন বঙ্গবন্ধুর সন্তানেরা। শেখ রেহানার বর্ণনায় জানা যায়, তখন হলে এক ধরনের আলু ভাজা পাওয়া যেত। আর হল জুড়ে থাকত মিষ্টি সৌরভ। শেখ রেহানার কাছ থেকে শুনেছিলাম, একটি ছবি সে সময় দারুণ নাড়া দিয়েছিল। সত্যজিৎ রায়ের ‘মহানগর’। সেই স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বলে হয়ে আছে। ঢাকার বাইরে গেলেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরা সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখতে পছন্দ করতেন। বিশেষ করে খুলনায় ছোট চাচার বাসায় খুলনায় গেলে তারা স্থানীয় সিনেমা হলে ছবি দেখতে ছুটে যেতেন। এমনও হয়েছে, সময়ের অভাবে একই ছবি অংশ বিশেষ করে তিনবারে দেখেছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ভীষণ অনুরাগী। চলচ্চিত্রের প্রতি তার ভালোবাসা একই রকম আছে। তিনি সবসময় চেয়েছেন ভালো ছবির পৃষ্ঠপোষকতা করতে। চলচ্চিত্রের পাত্র পাত্রী, কলা কুশলীদের প্রতি তাঁর সহযোগিতার হাত অনেক দীর্ঘ। চলচ্চিত্র শিল্পের প্রতি তাঁর অবদান এখন ইতিহাস হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ বিমানে একসময় সিনেমা দেখার ব্যবস্থা ছিল না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটা জানার পর সিনেমা দেখার সুবিধা নাই এমন কোনো বিমান আর তিনি কেনেননি। বিমান যাত্রীরা সিটে বসে বাংলাদেশের সিনেমা দেখবে এটা বড় আনন্দের বিষয়।

যখন বিমানে বসে সিনেমা দেখার সুযোগ ছিল না তখন প্রধানমন্ত্রী একবার বিদেশে যাচ্ছেন। অখণ্ড অবসর সময় কিছুটা পাওয়া যাবে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইচ্ছা পোষণ করেন যে, বিমানে বসে তিনি বাংলাদেশের সিনেমা দেখতে চান। বিশেষ ব্যবস্থাধীনে পরে বাংলাদেশের সিনেমা তিনি দেখেন। এখনো দীর্ঘ বিমান ভ্রমণে তিনি সিনেমা দেখে থাকেন।

প্রধানমন্ত্রীর বিশাল ব্যস্ততার ফাঁকেও তিনি সিনেমার প্রতি একই রকম উৎসাহী আছেন। তার কনিষ্ঠ বোন শেখ রেহানা যদি কোনো সিনেমার খবর দেন তাকে তিনি সেটা মনে রাখেন। সময় পেলে হয়তো মধ্যরাতেই তিনি সেই সিনেমা দেখে ফেলেন।

আমার মনে আছে, সংবাদ পাঠক সামিয়া জামান ইমপ্রেস ফিল্মের ব্যানারে একটি ফিল্ম বানিয়েছেন। ফিল্মটির নাম ‘আকাশ কত দূরে’। কোনো এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা হওয়ায় সামিয়া জামান প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন ছবিটা একদিন দেখা সম্ভব কী না! এমন প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীকে অনেকেই করে থাকেন। সব কথা কী আর প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে রক্ষা করা সম্ভব?

কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে কয়েকদিন পর গণভবন থেকে ফোন এলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সামরিক সচিবের ফোন। আমরা জানলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামিয়া জামানের ছবিটা দেখার ব্যাপারে সদয় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমরা আশ্চর্য হয়ে গেলাম। প্রধানমন্ত্রী সেই সামান্য কথাটা মনে রেখেছেন। ছবি দেখার ব্যাপারে সময় দিয়েছেন।

আমরা সহজেই বুঝতে পারি, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর সুগভীর ভালোবাসার কথা। এখন যেমন বড় টেলিভিশনের পর্দায় খুব সহজেই মিনি সিনেমা হলের পরিবেশ বানিয়ে ছবি দেখা যায়, কিছুদিন আগেও এমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। সামিয়া জামানের ‘আকাশ কত দুরে’ ছবিটা বেটা ক্যাসেটে ট্রান্সফার করা হলো। গণভবনের একটা দেয়ালে সাদা পর্দা টাঙানো হলো। এইভাবে ছবিটা দেখানোর পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। ২ ঘণ্টা ১৮ মিনিটের ছবি। প্রধানমন্ত্রী পুরো ছবিটা তার ছোটবোন শেখ রেহানার পাশে বসে দেখলেন। এক পর্যায়ে খেয়াল করলাম মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে ছবিটি শুধু মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন তাই নয়, অন্ধকারেও বোঝা গেল তার চোখ দিয়ে পানি গড়াচ্ছে। ছবি শেষ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী আরও ত্রিশ মিনিট ছবিটি নিয়ে কথা বললেন। সেই সময়ে তাঁকে জিগ্যেশ করলাম আপা, আপনার কি কিছু মনে পড়ে গেছে ছবিটি দেখে?

ছোটবোন রেহানার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, আমাদের বাসায় এরকম একটা কাজের ছেলে ছিল। সে কাজ করত আর গান গাইতো। ছেলেটির অকাল মৃত্যু হয়। ছবিটা দেখার সময় ছেলেটার কথা মনে পড়ছিল। সামিয়া জামান বা আমরা কি কখনো ভেবেছি প্রধানমন্ত্রী ছবিটা দেখবেন? তাঁর ছবি দেখার বিষয়টা ছিল আমাদের অসম্ভব কল্পনা। এই সময় তিনি পাবেন কীভাবে? কিন্তু আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে শুধু ছবিটা দেখলেন তাই নয়, ছবির চরিত্র নিয়ে স্মৃতিচারণ করলেন।

আরেকটি ঘটনার কথা এই মুহূর্তে খুব মনে পড়ছে। সৈয়দ শামসুল হকের কাহিনি অবলম্বনে বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ নির্মিত ‘গেরিলা’ ছবিটি নিয়ে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম নির্মিত এই ছবিটি দেখার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাকে বলেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এরকম আরও ছবি হওয়া প্রয়োজন। আরও বানাও। কারণ একজন মানুষ বই পড়ে বা গল্প শুনে যা জানতে পারবে, একটা সিনেমা দেখে তার চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট ধারণা হবে। ছবি খুব শক্তিশালী মাধ্যম। তিনি আরও বললেন, বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের এই ছবি দেখানোর জন্য যা যা করা প্রয়োজন আমরা তাই করব। তোমরা কোনো প্রস্তাব দিতে সংকোচ বোধ করো না। তখন পরিকল্পনা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় জেলায় জেলায় ছবিটা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করবে। চলচ্চিত্র মানুষের জীবনে অনেক প্রভাব ফেলে- বঙ্গবন্ধুর মতো শেখ হাসিনাও তা বিশ্বাস করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া শিল্পী ও কলাকুশলীরা
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পাওয়া শিল্পী ও কলাকুশলীরা

ছবির জগতের মূলধারার মানুষের প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আলাদা স্নেহ-ভালোবাসা, সম্মান আছে। যে কারণে চলচ্চিত্র বিষয়ক রাষ্ট্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে তিনি নিজের আসন ছেড়ে বয়োজ্যেষ্ঠ শিল্পীর সামনে এসে পুরস্কার হাতে তুলে দিয়েছেন। নিরাপত্তা বলয়কে তিনি উপেক্ষা করেছেন। মঞ্চ থেকে নেমে এসেছেন দর্শকদের আসনের সামনে। কোনো এক বছর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর আসতে খানিকটা দেরি হয়। জাতীয় সংসদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ কাজ শেষ করে আসবেন তিনি। উদ্যোক্তরা তখন অনুষ্ঠান সংক্ষিপ্ত করে দিচ্ছেন। কারণ অনুষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে হবে। সেই বছর আজীবন সম্মাননা পান ববিতা ও মিয়াভাই ফারুক। তাদের সংক্ষিপ্ত অনুভূতি প্রকাশ করার কথা ছিল। কিন্তু সময়ের অভাবে তা বাতিল করা হলো।

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে ববিতা বললেন, আমি কিছু বলতে চাই। তখন প্রধানমন্ত্রী উদ্যোক্তাদের বললেন, শিল্পীদের যেন কথা বলার সুযোগ দেয়া হয়। ববিতা ও ফারুক সেদিন অসম্ভব সুন্দরভাবে তাদের চলচ্চিত্র ভাবনা নিয়ে কথা বলেন এবং অনুষ্ঠান শেষ হতে দেরি হলেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরোটা সময় উপস্থিত ছিলেন। সবার কথা শুনেছেন। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। আমাদের চলচ্চিত্রের প্রতি তার ভালোবাসার আরও উদাহরণ দেয়া যেতে পারে।

নেটফ্লিক্সের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে যখন বাংলাদেশের ছবি প্রথম সুযোগ পায় সেই আনন্দ সংবাদ কীভাবে যেন প্রধানমন্ত্রী খেয়াল করেন। নেটফ্লিক্সে তিনি বিজ্ঞাপন দেখেছিলেন সেই ছবির। তখন এই খবর কোনো পত্রিকা বা মিডিয়ায় প্রকাশ হয়নি। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে ফোন করে শুভেচ্ছা জানান আমাদের। নেটফ্লিক্সে বাংলাদেশের ছবি দেখা যাচ্ছে তিনি শুভেচ্ছা জানালেন। এমনই আন্তরিক ও চলচ্চিত্র বান্ধব প্রধানমন্ত্রী তিনি।

সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার গ্রহণ করেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর
ফাইল ফটো: সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার গ্রহণ করছেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড ও চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর

আরেকটি ঘটনার কথা বলি। প্রধানমন্ত্রী একদিন তৌকির আহমেদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি ছবি দেখলেন। আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, পরিচালক তৌকিরের সঙ্গে তিনি ফোনে কথা বলবেন। তৌকিরকে এই কথা বলতেই সে বলল, প্রধানমন্ত্রী ফোন করুক আর না করুক তিনি যে আমাকে ফোন করার কথা বলেছেন আমি তাতেই আনন্দিত। তৌকির আমার কথা পুরোটা বিশ্বাস করেনি। কণ্ঠে দ্বিধা ঝরে পড়েছিল। কয়েকদিন পর মধ্যরাতে তৌকিরের টেলিফোন। সে খুব উচ্ছাসভরা কণ্ঠে বলল, সত্যি প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন করেছিলেন। তিনি আমার ছবির ছোটখাট দৃশ্য নিয়েও কথা বলেছেন। তিনি আরও বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের ছবি করতে গিয়ে যদি কোনো সাহায্য সহযোগিতা প্রয়োজন পড়ে তাহলে নির্দ্বিধায় আমাকে বলবে। তৌকিরকে প্রথম ফোন দিয়েছিলেন শেখ রেহানা। তৌকির তখন সবেমাত্র বোম্বে থেকে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক ফিল্মের শুটিং শেষ করে দেশে ফিরেছে। শেখ রেহানা ফোনে হ্যালো বলতেই তৌকির আহমেদ স্বভাবসুলভ ভাবে বললেন, কে আপনি?
আমি আপনার একজন ভক্ত।

এখন ভক্তদের সাথে কথা বলার সময় নেই এমন কথা বলার আগেই ফোনের অপর প্রান্ত থেকে বলা হলো, আমার নামের আগে শেখ আছে। তৌকির সাথে সাথে বুঝে ফেললেন। তারপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সত্যি সত্যি তার কথা হলো। এই হলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় নানা কাজে ব্যস্ত থাকেন। নানা কাজের মধ্যে চলচ্চিত্রের খোঁজ-খবর নেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে আন্তর্জাতিক মানের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন।

একদিন আমাকে মুখোমুখি পেয়ে বললেন, সাগর তোমাদের ‘শঙ্খচিল’ ছবিটা দেখলাম। খুব ভালো হয়েছে।
আমি বললাম, আপা মনের মানুষ দেখেছেন?

আমি ভাবলাম, তিনি হয়তো বলবেন, মনের মানুষ যেন কার ছবিটা?
বরং তিনি আমাকে বললেন, লালনের জীবনী নিয়ে এরকম ছবি আর তৈরি হয়নি।
তখন আমি সাহস করে বললাম, বাহুবলী ছবিটা কী দেখেছেন?

তখন বাহুবলী সুপার হিট। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তখন আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন, উত্তরে বললেন, বাহুবলীর মতো জনপ্রিয় ছবি বহু দেশে বহু ভাষায় তৈরি হয়েছে। কিন্তু আমার ভালো লাগে ক্রেনস আর ফ্লাইং এবং ব্যালাড অব সোলজারের মতো ছবি। পৌরাণিক কাহিনি নয়। রুদ্ধশ্বাস যুদ্ধের ছবি এটা।

শেখ রেহানার সঙ্গে আফসানা মিমি, ফেরদৌস, মডেল ফয়সান, রিয়াজ, চয়নিকা চৌধুরী প্রমুখ

দুইবোন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সময় পেলে এখনও সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতার অনেক স্মৃতিচারণ করেন। বঙ্গবন্ধুর বাড়ির অবস্থান ধানমন্ডির লেকের পাড়ে। একসময় সেখানে প্রচুর শুটিং হতো। একদিন এমন এক শুটিং-এ রোজী সামাদ ছিলেন। সে সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী। তিনি শুটিংয়ের অবসরে বত্রিশ নম্বরে এলেন চা খেতে। তার সঙ্গে অনেক গল্প করলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এমন অনেক গল্প আছে। চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসার গল্প। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছায় আমাদের চলচ্চিত্র যেন এক গৌরবের আসনে অধিষ্ঠিত হয়।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অনেক সাফল্য আছে। ঋত্মিক ঘটকের ছবি ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ প্রযোজনা করেন হাবিবুর রহমান খান। বাংলাদেশের এই ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে ৫০টি ক্ল্যাসিক ছবির ক্যাটাগরিতে সংরক্ষিত আছে। চীন, কোরিয়া, ভারত, দুবাই, লন্ডনে আয়োজিত আন্তর্জাতিক নানা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে বাংলাদেশের ছবি পুরস্কৃত হয়েছে। আবু সাইয়ীদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, গোলাম রব্বানী বিপ্লব প্রমুখ ফিল্ম পরিচালনা করে খ্যাতি অর্জন করেছেন।

যখনই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এইসব সাফল্যের কথা জানিয়েছি তিনি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। আন্তরিকভাবে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। বারবার বলেছেন, ভালো মানের ছবি নির্মাণে যে কোনো সহযোগিতার জন্য তিনি প্রস্তুত। আমাদের ছবি যেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুনাম অর্জন করে সে জন্য যা করতে হয় আমার পক্ষ থেকে করা হবে।

এমনই আন্তরিক ও চলচ্চিত্রের জন্য নিবেদিত আমাদের প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্রাণ মন দিয়ে আমাদের চলচ্চিত্র উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। চলচ্চিত্রে অনুদান বৃদ্ধি, হল চালু করার জন্য ঋণ প্রদান, এফডিসিকে আরও আধুনিক ও বড় পরিসরে তৈরি করা, চলচ্চিত্র শিল্পীদের জন্য বিশেষ তহবিল গঠন। দেশের ছবি বিদেশে পাঠানো। এই রকম নানা উদ্যোগ। চলচ্চিত্রের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভালোবাসার কোনো উপমা হয় না।

আমরা যারা দেশীয় চলচ্চিত্র শিল্পের সঙ্গে জড়িত তাদের অপরিসীম সৌভাগ্য যে, আমাদের কালে দেশের প্রধান হিসেবে পেয়েছি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।

BSH
Bellow Post-Green View