চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শেখ ফজিলাতুন নেছার পারিবারিক জীবনের বৈচিত্র্যতা

চেতনায় অম্লান দীপ্তি: শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব

সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব। সঙ্গীতের সরঞ্জামাদি তিনি সযত্নে রেখে দিয়েছিলেন। নিজের ছেলেমেয়েদের ছায়ানটে ভর্তি করিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ব্যাপক ও সুবিস্তৃত থাকায় রাজনৈতিক কারণে বহুবার তাদের বাসা পরিবর্তন করতে হয়েছে। তবে ভুলেও কখনো তিনি সঙ্গীতের সরঞ্জামাদি ফেলে যাননি। সরঞ্জামাদি বিশেষ করে মুজিবের হাতে গড়া বাদ্যযন্ত্রগুলো এখনো ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে সংরক্ষিত আছে। সংসারের অভাব অনটনের মাঝে বাড়ির আসবাসপত্র ও নিজের ব্যবহৃত অলংকার বিক্রি করলেও সঙ্গীতের বাদ্যযন্ত্রগুলো কখনো বিক্রি করেন নাই। বঙ্গবন্ধুর কারাবরণকালীন সময়েও সাংসারিক টানাপোড়েনের মধ্যেই তিনি সঙ্গীত সামগ্রীগুলোকে হাতছাড়া করেননি।

শুধু নিজের ছেলেমেয়ে নয়, প্রতিবেশি আত্মীয়-স্বজনসহ সকলের ছেলেমেয়েদের সঙ্গীত শিক্ষার বিষয়ে নজরদারি করতেন। পারিবারিক পরিবেশটা এমনভাবেই গড়ে তুলেছিলেন তিনি। শেখ রেহানার ভাষ্যমতে, ‘কামাল ভাই সেতার বাজাতেন। ধরা যাক, বাড়িতে অনেক মানুষ। আমার পরীক্ষা। পড়ব কোথায়? পড়ার জায়গার খোঁজে ছাদে গেছি। গিয়ে দেখি কামাল ভাই। হাতে সেতার। আকাশে চাঁদ। চারদিকে থইথই করছে জোছনায়। কামাল ভাই বললেন, পড়তে হবে না আজকে। অত পড়ে কী করবি। আয়, আমার সঙ্গে বস। গান ধর। আমি তার সঙ্গে সঙ্গে গান ধরলাম। একজন-দুজন করে এসে বসে পড়ল পাশে। জামাল ভাই এলেন। হাসু আপা এলেন। আমরা গান করছি। আকাশে তখন চাঁদ, নারকেলের পাতার ফাঁকে অকৃপণ আলো বিলাচ্ছে পৃথিবীর কোনায় কোনায়। হাসু আপার কোলে রাসেল, তার ঢুলু ঢুলু চোখে এসে পড়েছে চাঁদের আলো। হাসনাহেনার গন্ধ বয়ে আনছে রাতের বাতাস।’ বাসায় এ মনোরম পরিবেশটা ফজিলাতুন নেছার হাত দিয়েই তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ফজিলাতুন নেছার বাড়ি সকলের জন্যই উন্মুক্ত ছিল। বাড়িতে কেউ প্রবেশ করেছে অথচ আপ্যায়ন হয়নি এমন ঘটনা খুব কমই হয়েছে। সকলের জন্য রান্নার ব্যবস্থা হতো এবং এ বাড়িতে খাবারের কোন নিয়ম কানুন ছিল না। যখনই কেউ আসত আপ্যায়নের সাধ্যমত চেষ্টা করতেন বঙ্গজননী। বাড়িতে প্রত্যেক বেলায় কমপক্ষে ২০-২৫ জন লোক অতিরিক্ত খেত। পরিবারের সবার খাবার-দাবারের পাশাপাশি বাকি সকলের রান্না করতেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব নিজ হাতে। সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করতেন না কখনো, আনন্দের সহিত সকল কাজ করতেন নিজ উদ্যোগেই। কিন্তু শেষের দিকে ১৯৭৪-৭৫ সালে ফজিলাতুন নেছা মুজিব সকলের রান্না না করলেও বঙ্গবন্ধুর জন্য রান্নাটা নিজেই করতেন, বঙ্গবন্ধুর কাজের ভাগ তিনি কাউকে কখনো দিতেন না। বঙ্গবন্ধুকে সবসময় নিজের সম্পদ বলেই মানতেন ফজিলাতুন নেছা।

ফজিলাতুন নেছা মুজিবের অতিথিপরায়ণতা ছিল অসম্ভব আকর্ষণীয়, অতুলনীয় ও কিংবদন্তীতুল্য। আওয়ামী লীগের জুনিয়র থেকে সিনিয়র পর্যন্ত যেকোন নেতাই বঙ্গজননীর হাতে সমান আদর ও আতিথেয়তা পেতেন। বর্তমানে জীবিত অনেক প্রবীণ নেতাই শ্রদ্ধাবনত চিত্তে ফজিলাতুন নেছা মুজিবের আতিথেয়তার কথা স্মরণ করেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। ফজিলাতুন নেছা মুজিবের স্নেহ, মায়া-মমতা, যত্ন, অভ্যর্থনা, আদর-আপ্যায়নের অসংখ্য কাহিনী এখনো তাদের মানসপটে ভেসে ওঠে। কারাবন্দী নেতাকর্মীর আত্মীয়-স্বজন ও ছেলেমেয়েদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা থাকতো ফজিলাতুন নেছা মুজিবের কাছে। কেউ অভুক্ত অবস্থায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে এসে উপস্থিত হলে ঘরে ভাত না থাকলেও মুড়ি-মুড়কি পরিবেশন করতেন। খালি মুখে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে কেউ কখনো ফেরত যেত না এ কথা দৃঢ়ভাবে শোনা যায়।

আত্মত্যাগ, আত্মদান, পরোপকারিতা, মমত্ববোধ ইত্যাদি প্রত্যয়গুলো ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। তিনি তার চরিত্রের মাধ্যমে এ বৈশিষ্ট্যগুলো ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। তিনি তার পরিশীলতার উজ্জ্বলতর ব্যক্তিত্ববোধের অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তারই একটি উদাহরণ হল এমন- ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটনাবহুল রাতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শেখ আবু নাসের। ঘাতকদের গুলি হঠাৎ শেখ নাসেরের হাতে লেগে প্রচণ্ড বেগে রক্ত বের হয়। এই মারত্মক সময়েও ফজিলাতুন নেছা মুজিব তার শাড়ীর আচল ছিড়ে বেঁধে দেন প্রিয় দেবরকে। মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বে আপনজনের প্রতি ভালোবাসার যে বিরল দৃষ্টান্ত তিনি রেখেছিলেন তা বাঙালি জাতির কাছে দৃষ্টান্তস্বরূপ।

বিজ্ঞাপন

ছাত্রলীগের প্রিয় ভাবী, প্রিয় আপা এবং পরম পূজনীয় জননীর ন্যায় কাজ করেছিলেন সারাটা জীবন। এমন কোন কর্মী নেই যার নিকট প্রিয়পাত্র ছিলেন না ফজিলাতুন নেছা মুজিব। ছাত্রলীগের কর্মীদের তিনি তার নিজের সন্তানতুল্য মনে করতেন। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল হিসেবে এতটা শক্ত অবস্থায় কখনো আসতো না যদি না ফজিলাতুন নেছা মুজিব তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিভিন্ন সময়ে নেতাদের একত্রিত করতেন। বঙ্গবন্ধু কারান্তরীন থাকলে নেতাদের দিক নির্দেশনা সংক্রান্ত যোগাযোগের একমাত্র আশা ভরসার স্থল হয়ে উঠেছিলেন ফজিলাতুন নেছা মুজিব। এক্ষেত্রে তার আতিথেয়তার ভূমিকা ছিল অনন্য, তিনি গোপনে চুপিসারে সকল নেতাদের খোঁজ নিতেন। এখনো শেখ হাসিনা তার মায়ের দেখানো পথেই তৃণমূল কোন কর্মীর অসুস্থতার খবরে নিজে ফোন দিয়ে চিকিৎসার দেখভাল করেন।

মমতার বাঁধনে ফজিলাতুন নেছা মুজিব যে কাউকে শক্ত বাঁধনে বেঁধে রাখতে পারতেন। নিজস্ব চলন-বলন, বাগ্মীতা, সম্মোহনী শক্তি, প্রাজ্ঞতার সম্মিলনে ফজিলাতুন নেছা মুজিবের কাছে শক্ত দাগী আসামীরাও ভালো মানুষে পরিণত হতে পেরেছিল। আর সাধারণ মানুষ নিজেদেরকে ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সাহচর্যে অসাধারণ হিসেবে গড়ে তুলতে পেরেছিল যোগ্যতা এবং মানসিকতার মাপকাঠিতে। পরিচিত অপরিচিত সকলকেই সমান স্নেহভরে দেখতেন এবং সমান বিশ্বাসের জায়গায় স্থান দিয়েছিলেন। এই সকল অসাধারণ গুণের জন্য তিনি অন্যদের থেকে আলাদা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখকরণ অবশ্যাম্ভাবী- বঙ্গবন্ধু জেলখানায় থাকাকালীন অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর ফালতু হিসেবে কাজ করতো মিথ্যা খুনের আসামি আজিজ মিঞা। জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আজিজ মিঞা বঙ্গবন্ধুর কাছে আশ্রয়ের সন্ধানে আসেন। বঙ্গবন্ধু আজিজ মিঞাকে বাড়ির কাজের লোক হিসেবে বাড়িতে রেখে দেন। এ বিষয়টি দেখে রেণু মন খারাপ করেন ‘তুমি যখন তখন জেলে যাবে, বাড়ির ভেতর একটা খুনির আসামি ঢুকিয়ে দিয়ে গেলে।’ প্রতি উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘না, না, ও খুন করেনি।’ স্বামীর কথায় রেণু আজিজ মিঞাকে বাড়িতে রেখে দেন এবং অত্যন্ত বিশ্বস্ত হিসেবে পরিণত হন আজিজ মিঞা। যুদ্ধের উত্তাল সময়ে অনেকেই যখন বঙ্গবন্ধু পরিবারকে বাড়ি ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় বিশেষ করে নিকট-আত্মীয়রা, সে সময়টাতে বঙ্গবন্ধু পরিবারের পাশে ধানমন্ডির ১৮নং রোডের বাড়িতে ছায়ার মত ছিলেন আজিজ মিঞা। ফজিলাতুন নেছা মুজিব নিজস্ব মহিমায় সকলের কাছে বিশেষ শ্রদ্ধা লাভ করেছিলেন, বাড়ির কাজের মানুষদেরকেও নিজের সন্তানের মত জানতেন, লালন-পালন করতেন, ভালোবাসতেন। বিশেষ বিশেষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন রেণু, কখনো ভাবী, কখনো বড় বোন আবার কখনো মমতাময়ী মা। সবগুলো চরিত্রায়নে তিনি ছিলেন বিরাট মহিরুহের ন্যায়, আদর্শের মাপকাঠিতে অনুসরণযোগ্য।

ব্যক্তি জীবনে নিজে যেমন সৎ ছিলেন সন্তানদের সে দীক্ষায় দীক্ষিত করেছিলেন। সততাই মানুষের ভালবাসা লাভের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত হয় এ বোধটা সন্তানদের মজ্জায় বপন করতে পেরেছিলেন। একবারের উদাহরণ টেনে শেখ রেহানা বলেন, “আমরা সবাই ডাকটিকেট সংগ্রহ করতাম। ধানমন্ডির কোণে যে লেকটা আছে না, একবার তার তীরে আবির্ভাব হলো এক ভদ্রলোকের। তিনি বাচ্চাদের স্ট্যাম্প দিতেন। আমাদেরও দিতেন। আমরাও আনতাম। সবার থেকে বেশি দিতেন আমাদের। সে কথা জানতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে মা বললেন, ‘যাও, ফেরত দিয়ে এসো। অচেনা কারো কাছ থেকে কিছু নেবে না।’ সে লোকটাও গুপ্তচর ছিল। এই ঘটনার পর তাকে আর দেখা যায়নি।”

এমনই ছিল ফজিলাতুন নেছা মুজিবের ব্যক্তিত্ব, পারিবারিক পরিমণ্ডলের শিক্ষাটা এখনো বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নিরন্তর। প্রকৃত অর্থে, মানবিক এবং যৌক্তিক মানুষ হওয়ার শিক্ষাটা একাডেমিক শিক্ষা থেকে যতটুকু হয়, তার থেকে বহুলাংশে হয়ে থাকে পারিবারিক পরিমণ্ডলে। সে শিক্ষাটাই ফজিলাতুন নেছা তার সন্তানদের দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সময় থেকে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের নিত্যনৈমিত্তিক আচরণে ফুটে উঠেছে তাদের পারিবারিক শিক্ষার যথার্থতা।

চলবে…

Bellow Post-Green View